
মো.কামাল উদ্দিনঃ
আধুনিক নারী সাংবাদিকতার এক উজ্জ্বল প্রতিচ্ছবি
কিছু মুখ শুধু সুন্দর নয়, কিছু উপস্থিতি শুধু দৃষ্টিনন্দন নয়—কিছু মানুষ তাঁদের ব্যক্তিত্ব, মেধা, কণ্ঠস্বর ও কর্মগুণ দিয়ে নিজের চারপাশে আলাদা এক আলোর বলয় তৈরি করেন। শারাহ মেহজাবিন তেমনই এক সম্ভাবনাময় ও দীপ্তিমান নাম। পাহাড়ের বিস্তীর্ণ নীলাভ প্রান্তর, মেঘে ঢাকা দূর দিগন্ত আর প্রকৃতির অপার সৌন্দর্যের সামনে দাঁড়িয়ে থাকা তাঁর এই ছবিটি যেন কেবল একটি মুহূর্তকে ধারণ করেনি; ধারণ করেছে আত্মবিশ্বাসী, আধুনিক ও স্বপ্নবান এক নারীর প্রতিচ্ছবি।
একজন লেখক, সাংবাদিক ও টেলিভিশন উপস্থাপক হিসেবে বহু মানুষের কণ্ঠ, মুখ ও গল্পের সঙ্গে আমার পরিচয় হয়েছে। গণমাধ্যমের দীর্ঘ পথচলায় দেখেছি—ক্যামেরার সামনে দাঁড়ানো সহজ, কিন্তু ক্যামেরার সামনে নিজের ব্যক্তিত্ব, বিশ্বাসযোগ্যতা ও পেশাদারিত্বকে প্রতিষ্ঠিত করা সহজ নয়। সংবাদ পাঠের প্রতিটি শব্দে দায়িত্ববোধ, প্রতিটি উচ্চারণে স্পষ্টতা, প্রতিটি উপস্থাপনায় সংযম এবং প্রতিটি উপস্থিতিতে আত্মবিশ্বাস প্রয়োজন। শারাহ মেহজাবিনের মধ্যে সেই সম্ভাবনার সুন্দর সমন্বয় লক্ষ করা যায়।
একজন ভালো সংবাদ পাঠিকা কেবল সংবাদ পড়ে শোনান না; তিনি সময়ের সঙ্গে মানুষের একটি সেতুবন্ধন তৈরি করেন। একটি সংবাদ যখন তাঁর কণ্ঠে উচ্চারিত হয়, তখন সেটি কেবল তথ্য থাকে না—তা হয়ে ওঠে মানুষের কাছে পৌঁছে যাওয়ার একটি জীবন্ত মাধ্যম। একজন দক্ষ টেলিভিশন উপস্থাপকও শুধু পর্দায় উপস্থিত থাকেন না; তিনি দর্শকের সঙ্গে এক ধরনের নীরব সম্পর্ক গড়ে তোলেন। শারাহ মেহজাবিনের ব্যক্তিত্বে সেই যোগাযোগের শক্তি আছে বলেই তাঁকে আলাদা করে চোখে পড়ে।
তাঁর সবচেয়ে আকর্ষণীয় দিক হলো—সৌন্দর্য ও ব্যক্তিত্বের মধ্যে একটি স্বাভাবিক ভারসাম্য। সৌন্দর্য যেখানে অনেক সময় ক্ষণস্থায়ী, সেখানে ব্যক্তিত্ব মানুষের মনে দীর্ঘস্থায়ী ছাপ রেখে যায়। শারাহর উপস্থিতিতে সেই ব্যক্তিত্বের ছাপ স্পষ্ট। তাঁর চোখে আত্মবিশ্বাস, মুখের অভিব্যক্তিতে স্বাভাবিকতা এবং আচরণে আধুনিকতার যে ছোঁয়া—সব মিলিয়ে তিনি সমকালীন নারী সাংবাদিকতার একটি নান্দনিক ও শক্তিশালী প্রতিচ্ছবি হয়ে উঠতে পারেন।
আমি বিশ্বাস করি, আধুনিক নারী সাংবাদিকতার প্রকৃত পরিচয় কেবল পর্দায় সুন্দরভাবে উপস্থিত হওয়া নয়। একজন আধুনিক নারী সাংবাদিককে হতে হয় অনুসন্ধিৎসু, সাহসী, সচেতন, দায়িত্বশীল এবং সময়ের পরিবর্তনকে বুঝতে সক্ষম। তাঁকে প্রশ্ন করতে জানতে হয়, সত্যকে অনুসরণ করতে হয়, মানুষের কথা শুনতে হয় এবং কখনো কখনো কঠিন বাস্তবতার সামনে নিজের অবস্থানও দৃঢ়ভাবে তুলে ধরতে হয়। এই বহুমাত্রিক গুণের সমন্বয়েই একজন নারী সাংবাদিক নিজেকে শুধু পেশাজীবী হিসেবে নয়, সমাজের একজন প্রভাবশালী কণ্ঠস্বর হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে পারেন।
শারাহ মেহজাবিনের মধ্যে আমি সেই সম্ভাবনাটিই দেখতে পাই।
তাঁর এই ছবির পেছনে যে পাহাড়, তা যেন তাঁর পেশাগত পথচলারই একটি প্রতীক। পাহাড় কখনো সহজ পথের প্রতীক নয়। তার চূড়ায় উঠতে হলে পাথুরে পথ পেরোতে হয়, কুয়াশার ভেতর দিয়ে এগোতে হয়, কখনো থামতে হয়, আবার নতুন সাহসে পথ ধরতে হয়। সাংবাদিকতাও তেমনই একটি পথ। এখানে আলো যেমন আছে, তেমনি আছে অন্ধকার; প্রশংসা যেমন আছে, তেমনি আছে সমালোচনা; সাফল্য যেমন আছে, তেমনি আছে প্রতিদিন নিজেকে প্রমাণ করার কঠিন পরীক্ষা।
যে নারী সেই পথ পেরিয়ে নিজের পরিচয় নির্মাণ করতে পারেন, তিনিই একদিন হয়ে ওঠেন অন্য নারীদের অনুপ্রেরণা।
শারাহ মেহজাবিনকে তাই আমার চোখে শুধু একজন গুণী সাংবাদিক, সংবাদ পাঠিকা বা টেলিভিশন উপস্থাপক হিসেবে দেখলে তাঁর সম্ভাবনার পুরোটা বলা হয় না। তিনি হতে পারেন এমন এক প্রজন্মের প্রতিনিধি, যে প্রজন্ম বিশ্বাস করে—নারীর কণ্ঠস্বর কোনো সীমারেখায় আটকে থাকবে না। সংবাদকক্ষ থেকে টেলিভিশনের পর্দা, স্টুডিও থেকে মাঠের প্রতিবেদন, জাতীয় ইস্যু থেকে মানুষের ব্যক্তিগত গল্প—সবখানেই একজন নারী নিজের মেধা ও যোগ্যতা দিয়ে সমান শক্তিতে জায়গা করে নিতে পারেন।
বিশ্বের শ্রেষ্ঠ নারী সাংবাদিক ও টেলিভিশন উপস্থাপকদের দিকে তাকালে আমরা দেখি, তাঁদের সাফল্যের পেছনে শুধু সৌন্দর্য নয়; রয়েছে কঠোর পরিশ্রম, অধ্যবসায়, জ্ঞান, ভাষার দক্ষতা, সময়জ্ঞান, আত্মবিশ্বাস এবং সত্যের প্রতি দায়বদ্ধতা। শারাহ মেহজাবিনের মতো তরুণ ও মেধাবী মুখদের সামনে সেই বিশ্বমানের পথটি উন্মুক্ত। তাঁদের প্রয়োজন নিরন্তর শেখা, নিজেকে প্রতিদিন আরও সমৃদ্ধ করা এবং সাংবাদিকতার মূল আদর্শ—সত্য, ন্যায় ও মানুষের প্রতি দায়বদ্ধতাকে হৃদয়ে ধারণ করা।
একজন লেখক হিসেবে আমি শব্দের শক্তিতে বিশ্বাস করি। একজন সাংবাদিক হিসেবে জানি, একটি সঠিক প্রশ্ন কখনো কখনো একটি বড় সত্যের দরজা খুলে দিতে পারে। আর একজন টেলিভিশন উপস্থাপক হিসেবে জানি, কণ্ঠের প্রতিটি বিরতি, প্রতিটি উচ্চারণ এবং প্রতিটি অভিব্যক্তিরও আলাদা ভাষা আছে। শারাহ মেহজাবিনের মতো একজন উপস্থাপকের শক্তি তখনই পূর্ণতা পাবে, যখন তাঁর সৌন্দর্যের সঙ্গে মেধা, তাঁর কণ্ঠের সঙ্গে সত্য, তাঁর উপস্থিতির সঙ্গে দায়িত্ববোধ এবং তাঁর স্বপ্নের সঙ্গে মানুষের প্রতি দায়বদ্ধতা আরও গভীরভাবে যুক্ত হবে।
তাঁর এই ছবিতে পাহাড়ের যে বিশালতা, আকাশের যে নীরবতা আর মুখে যে প্রশান্ত হাসি—সবকিছু মিলিয়ে মনে হয়, সামনে আরও দীর্ঘ পথ পড়ে আছে। সেই পথ শুধু ব্যক্তিগত সাফল্যের নয়; সেই পথ হতে পারে আরও বড় কোনো পরিচয়ের দিকে এগিয়ে যাওয়ার পথ।
হয়তো একদিন শারাহ মেহজাবিনের কণ্ঠে শুধু সংবাদ শোনা যাবে না, শোনা যাবে একটি প্রজন্মের প্রত্যয়। তাঁর উপস্থাপনায় শুধু অনুষ্ঠান প্রাণ পাবে না, দর্শক খুঁজে পাবে বিশ্বাসযোগ্যতার একটি পরিচিত মুখ। তাঁর সাংবাদিকতায় শুধু তথ্য থাকবে না, থাকবে মানুষের গল্প, সমাজের বাস্তবতা এবং সত্যকে জানার এক নিরন্তর অনুসন্ধান।
তাই শারাহ মেহজাবিনকে নিয়ে আমার এই প্রশংসা নিছক কোনো ছবির সৌন্দর্যবন্দনা নয়। এটি একজন নারী সাংবাদিকের সম্ভাবনা, ব্যক্তিত্ব ও পেশাগত পথচলার প্রতি একজন সহকর্মী লেখক-সাংবাদিক-টেলিভিশন উপস্থাপকের শ্রদ্ধা ও শুভকামনা।
শারাহ মেহজাবিন—আপনার সৌন্দর্য চোখে পড়ে, আপনার ব্যক্তিত্ব মনে থাকে; কিন্তু আপনার সবচেয়ে বড় পরিচয় হোক আপনার মেধা, আপনার কণ্ঠস্বর, আপনার সাংবাদিকতা এবং সত্যের প্রতি আপনার দায়বদ্ধতা।
পাহাড়ের চূড়ায় দাঁড়িয়ে যেমন দিগন্ত আরও বিস্তৃত হয়ে যায়, তেমনি একজন নারী যখন নিজের আত্মবিশ্বাসের উচ্চতায় পৌঁছান, তখন তাঁর সামনে পৃথিবীর সম্ভাবনাগুলোও আরও বড় হয়ে ওঠে।
আপনার পথ হোক আলোকিত, আপনার কণ্ঠ হোক সত্যের, আপনার সাংবাদিকতা হোক মানুষের—আর আপনার পরিচয় হোক আধুনিক, সাহসী ও মেধাবী নারী সাংবাদিকতার এক উজ্জ্বল প্রতীক হিসেবে।