প্রেমের দরবারের এক নিবেদিত প্রাণ এমদাদুল হক মাইজভান্ডারী: নীরব সেবার আলোয় উজ্জ্বল এক মানবিক ব্যক্তিত্ব

By admin
6 Min Read

মো. কামাল উদ্দিন: বাংলার আধ্যাত্মিক ইতিহাসে এমন কিছু পবিত্র জনপদ রয়েছে, যেখানে গিয়ে মানুষ শুধু একটি স্থান দেখে না; অনুভব করে এক অন্যরকম প্রশান্তি, আত্মার গভীরে জেগে ওঠে অদৃশ্য এক টান। চট্টগ্রামের ফটিকছড়ীর ঐতিহাসিক মাইজভান্ডার শরীফ তেমনই এক পবিত্র ভূমি। এটি কেবল একটি দরবার নয়, এটি প্রেমের বিদ্যালয়, মানবতার বিশ্ববিদ্যালয় এবং আত্মশুদ্ধির এক অনন্য কেন্দ্র। যুগের পর যুগ ধরে এই দরবার মানুষের হৃদয়ে জ্বালিয়ে রেখেছে আল্লাহর প্রেম, রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর ভালোবাসা এবং মানবতার দীপশিখা। এই পবিত্র দরবারের প্রাণপুরুষ, উপমহাদেশে মাইজভান্ডারী তরিকার প্রবর্তক গাউসুল আজম হযরত শাহ সুফি সৈয়দ আহমদ উল্লাহ মাইজভান্ডারী (রহ.) তাঁর জীবন, সাধনা ও আদর্শের মাধ্যমে এমন এক আধ্যাত্মিক বিপ্লবের সূচনা করেছিলেন, যার আলো আজও কোটি কোটি মানুষের হৃদয়কে আলোকিত করছে। তাঁর শিক্ষা ছিল বিভেদ নয়—ভালোবাসা; ঘৃণা নয়—ক্ষমা; অহংকার নয়—বিনয়; প্রতিহিংসা নয়—মানবসেবা। এই মহান আদর্শকে হৃদয়ে ধারণ করে যারা নীরবে মানুষের সেবা করে চলেছেন, তাঁদের অন্যতম পরিচিত নাম এমদাদুল হক মাইজভান্ডারী। তিনি প্রচারের আলোয় নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করার মানুষ নন; বরং নীরবে কাজ করে যাওয়াই তাঁর স্বভাব। তাঁর পরিচয় পদবি দিয়ে নয়, তাঁর ব্যবহার, মানবিকতা, বিনয় এবং মানুষের প্রতি আন্তরিক ভালোবাসা দিয়ে। দরবারে আগত একজন আশেক যখন শত শত কিলোমিটার পথ পাড়ি দিয়ে মাইজভান্ডারে পৌঁছান, তখন তাঁর প্রথম চাওয়া থাকে একটি আন্তরিক হাসিমুখ, একটি ভালোবাসার স্পর্শ এবং একটি আপনজনের মতো অভ্যর্থনা। এমদাদুল হক মাইজভান্ডারীর মধ্যে সেই আন্তরিকতার প্রকাশ বহু মানুষ অনুভব করেছেন। তাঁর আচরণে নেই কোনো কৃত্রিমতা, নেই ক্ষমতার অহংকার; আছে কেবল ভালোবাসা দিয়ে মানুষকে আপন করে নেওয়ার বিরল ক্ষমতা। বাংলা ১০ মাঘ এলেই মাইজভান্ডার শরীফ যেন রূপ নেয় এক মহাসাগরে। লাখো আশেক-ভক্তের পদচারণায় মুখরিত হয়ে ওঠে পুরো জনপদ। চারদিকে ধ্বনিত হয় জিকির, দরুদ, কোরআন তিলাওয়াত এবং মহান আল্লাহর স্মরণ। অসংখ্য মানুষ একই কাতারে দাঁড়িয়ে প্রার্থনা করেন—হৃদয়ের শান্তির জন্য, আত্মার পরিশুদ্ধির জন্য এবং মানবতার কল্যাণের জন্য।
এই বিশাল আয়োজনের নেপথ্যে যারা দিন-রাত নিরলস পরিশ্রম করেন, তাঁদের অবদান অনেক সময় মানুষের চোখে পড়ে না। কিন্তু ইতিহাস নীরব কর্মীদেরই মনে রাখে। এমদাদুল হক মাইজভান্ডারী তাঁদেরই একজন। তিনি বিশ্বাস করেন, দরবারে আগত একজন ভক্তকে সম্মান জানানো মানে গাউসুল আজম (রহ.)-এর শিক্ষা ও আদর্শকে সম্মান জানানো। আজকের পৃথিবীতে মানুষ যত আধুনিক হয়েছে, ততই যেন হৃদয় থেকে হারিয়ে যাচ্ছে সহমর্মিতা। মানুষ মানুষকে ভুলে যাচ্ছে, সম্পর্কগুলো হয়ে উঠছে স্বার্থের। এমন সময়ে মাইজভান্ডার শরীফ আমাদের নতুন করে শেখায়—মানুষের হৃদয় জয় করতে সম্পদ লাগে না, লাগে একটি সুন্দর আচরণ, একটি আন্তরিক হাসি এবং একটি ভালোবাসায় ভরা হৃদয়। এমদাদুল হক মাইজভান্ডারীর জীবন যেন সেই শিক্ষারই বাস্তব প্রতিফলন।
আমি ব্যক্তিগতভাবে নিজেকে সৌভাগ্যবান মনে করি যে, সাংবাদিক পরিচয়ের পাশাপাশি একজন মাইজভান্ডারী ভক্ত হিসেবেও এই দরবারের সঙ্গে আমার গভীর আত্মিক সম্পর্ক রয়েছে। ২০০৫ সালে আমি দীর্ঘদিন ঠান্ডাজনিত অসুস্থতায় ভুগছিলাম। চিকিৎসার পরও কাঙ্ক্ষিত ফল পাচ্ছিলাম না। এক রাতে স্বপ্নে দেখলাম—বাবাজান কেবলার পুকুরে গোসল করলে মহান আল্লাহর রহমতে সুস্থ হয়ে উঠব। সেই স্বপ্নকে বিশ্বাস করে মাইজভান্ডার শরীফে গিয়ে পুকুরে গোসল করি। মহান আল্লাহর অশেষ অনুগ্রহে ধীরে ধীরে সুস্থতা অনুভব করি। এই ঘটনাকে আমি আল্লাহর রহমতের একটি ব্যক্তিগত স্মৃতি হিসেবে হৃদয়ে ধারণ করে আছি। একই বছরে বাংলা টেলিভিশনে ১০ মাঘ উপলক্ষে একটি বিশেষ তথ্যচিত্র নির্মাণ ও উপস্থাপনার সৌভাগ্য হয়েছিল আমার। সেই কাজ করতে গিয়ে আরও গভীরভাবে উপলব্ধি করেছি—মাইজভান্ডার শরীফের প্রকৃত সৌন্দর্য শুধু এর ইতিহাসে নয়, বরং এখানে কর্মরত নিবেদিতপ্রাণ মানুষের আন্তরিক সেবায়। তাঁদের অন্যতম একজন এমদাদুল হক মাইজভান্ডারী। তিনি কখনো নিজের কৃতিত্বের কথা বলেন না। কিন্তু তাঁর কাজই তাঁর পরিচয় বহন করে। একজন ক্লান্ত ভক্তকে পথ দেখানো, একজন অসহায় মানুষের কথা ধৈর্য নিয়ে শোনা, অতিথিকে সম্মান করা, দরবারের মর্যাদা অক্ষুণ্ণ রাখতে নীরবে কাজ করে যাওয়া—এসব ছোট ছোট কাজই একজন মানুষের মহত্ত্বকে বড় করে তোলে। মাইজভান্ডারী তরিকার শিক্ষা কখনো বিভাজনের শিক্ষা নয়; এটি ভালোবাসার শিক্ষা। এই তরিকা শেখায়—মানুষকে ভালোবাসো, মানুষের উপকার করো, হৃদয়কে অহংকারমুক্ত করো এবং মহান আল্লাহর সন্তুষ্টিকে জীবনের একমাত্র লক্ষ্য বানাও। এমদাদুল হক মাইজভান্ডারীর জীবন ও আচরণে সেই আদর্শেরই প্রতিফলন খুঁজে পাওয়া যায়। সমাজে এমন মানুষ খুব বেশি নেই, যারা প্রচারের বাইরে থেকে মানুষের জন্য কাজ করেন। অথচ তাঁরাই সমাজের প্রকৃত সম্পদ। তাঁরা ফুলের মতো—নিজে নীরবে ফুটে থেকে চারদিকে সুবাস ছড়িয়ে দেন। এমদাদুল হক মাইজভান্ডারী তেমনি এক নীরব সুবাসের নাম। বাংলা ১০ মাঘের এই পবিত্র দিন আমাদের শুধু একটি অনুষ্ঠান উদযাপন করতে শেখায় না; এটি শেখায় হৃদয়কে আলোকিত করতে, মানুষকে ভালোবাসতে, অন্যের কষ্ট অনুভব করতে এবং মহান আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য নিজেকে উৎসর্গ করতে। আমি বিশ্বাস করি, ইতিহাস শুধু মহান সাধকদের নয়, তাঁদের আদর্শকে ধারণ করে নীরবে কাজ করে যাওয়া মানুষের কথাও একদিন শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করবে। এমদাদুল হক মাইজভান্ডারী সেই নীরব আলোকবর্তিকাদের একজন, যাঁদের কর্ম মানুষের হৃদয়ে আলো জ্বালায়, যাঁদের বিনয় মানুষকে মুগ্ধ করে এবং যাঁদের ভালোবাসা মানুষকে মাইজভান্ডার শরীফের প্রতি আরও গভীরভাবে আকৃষ্ট করে। মহান আল্লাহ তাঁর খেদমত কবুল করুন। তাঁকে সুস্বাস্থ্য, দীর্ঘ জীবন এবং মানবতার সেবায় আরও বেশি কাজ করার তাওফিক দান করুন। তিনি যেন গাউসুল আজম হযরত শাহ সুফি সৈয়দ আহমদ উল্লাহ মাইজভান্ডারী (রহ.)-এর প্রেম, মানবতা ও আধ্যাত্মিকতার বাণী আরও বহু বছর মানুষের মাঝে ছড়িয়ে দিতে পারেন—এই দোয়াই রইল।
প্রেমের পথই আল্লাহর নৈকট্যের পথ। আর সেই প্রেমের পথকে মানুষের হৃদয়ে পৌঁছে দিতে যারা নীরবে কাজ করে চলেছেন, এমদাদুল হক মাইজভান্ডারী তাঁদের অন্যতম। তাঁর জীবন হোক সেবা, বিনয় ও মানবতার এক উজ্জ্বল অনুপ্রেরণা।

Share This Article
Leave a Comment