মানুষের প্রতি ভালোবাসাই জীবনের সবচেয়ে বড় সম্পদ

By admin
4 Min Read

বর্ষীয়ান সাংবাদিক ও সম্পাদক মিজানুর রহমান চৌধুরীর সঙ্গে এক স্মরণীয় মধ্যাহ্নভোজ ও হৃদয়ছোঁয়া আড্ডা জীবনের ব্যস্ততা, সংগ্রাম, সাফল্য আর সমালোচনার ভিড়ে এমন কিছু মুহূর্ত আসে, যা কেবল সময়ের একটি অংশ নয়—বরং স্মৃতির অমলিন অধ্যায়ে চিরদিনের জন্য জায়গা করে নেয়। আজকের দিনটি ছিল ঠিক তেমনই এক অনন্য দিন। চট্টগ্রামের চান্দগাঁও আবাসিক এলাকার নিজ বাসভবনে বর্ষীয়ান সাংবাদিক, সম্পাদক, আপসহীন প্রতিবাদী কণ্ঠস্বর এবং ন্যায়ের পক্ষে আজীবন সোচ্চার এক সাহসী মানুষ মিজানুর রহমান চৌধুরী-এর আন্তরিক আমন্ত্রণে তাঁর সঙ্গে দীর্ঘ সময় কাটানোর সৌভাগ্য হলো। আমার সঙ্গে ছিলেন আমার দীর্ঘদিনের একান্ত বন্ধু আজগর খান। আমাদের এই মিলন ছিল আনুষ্ঠানিকতার গণ্ডি পেরিয়ে আত্মার সঙ্গে আত্মার, হৃদয়ের সঙ্গে হৃদয়ের এক গভীর সংলাপ। মিজানুর রহমান চৌধুরী শুধু একজন সাংবাদিক নন; তিনি সত্যের প্রতি দায়বদ্ধ এক নির্ভীক মানুষ। সময়ের নানা ঝড়-ঝাপটা, রাজনৈতিক পরিবর্তন, সামাজিক টানাপোড়েন কিংবা ব্যক্তিগত প্রতিকূলতা—কোনো কিছুই তাঁকে সত্য উচ্চারণ থেকে বিরত রাখতে পারেনি। তাঁর মতো মানুষদের কারণেই সাংবাদিকতা এখনো সমাজের বিবেক হয়ে টিকে আছে। বসার পর থেকেই শুরু হয় প্রাণবন্ত আলোচনা। গল্পের বিষয় যেন শেষ হওয়ার নয়। উঠে আসে সাংবাদিকতার অতীত ও বর্তমান, দেশের গণমাধ্যমের চ্যালেঞ্জ, চট্টগ্রামের সামাজিক ও রাজনৈতিক বাস্তবতা, বাংলাদেশের সাম্প্রতিক পরিস্থিতি, ভারতের রাজনীতি, সাহিত্য, সংস্কৃতি, ইতিহাস, সমাজ এবং মানুষের পরিবর্তিত জীবনবোধ।  আলোচনার একপর্যায়ে উঠে আসে আমার দীর্ঘদিনের লেখালেখির পথচলা। আলোচনা হয় আমার সম্পাদিত দি টুরিস্ট এবং উনার সম্পাানায় দৈনিক আমাদের চট্টগ্রাম-এর প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে বিভিন্ন পরিকল্পনা, নতুন উদ্যোগ এবং ভবিষ্যৎ কর্মপরিকল্পনা নিয়ে। কীভাবে গণমাধ্যমকে আরও দায়িত্বশীল, সাহসী ও জনমুখী করা যায়—তা নিয়েও ছিল দীর্ঘ মতবিনিময়। স্বাভাবিকভাবেই আলাপের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশজুড়ে ছিল আমাকে নিয়ে কিছু মানুষের অহেতুক সমালোচনা, অপপ্রচার ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বিতর্ক। এসব প্রসঙ্গে মিজানুর রহমান চৌধুরী অত্যন্ত দৃঢ় কণ্ঠে বলেন—যে মানুষ সমাজে কাজ করে, মানুষের পাশে দাঁড়ায়, কলম দিয়ে অন্যায়ের বিরুদ্ধে লড়াই করে, তাকে নিয়েই সবচেয়ে বেশি আলোচনা হয়। মিথ্যা অপপ্রচার ক্ষণস্থায়ী; কিন্তু সততা ও কর্মই মানুষের প্রকৃত পরিচয় বহন করে। তাঁর এই কথাগুলো আমার হৃদয়ে নতুন সাহস ও আত্মবিশ্বাসের সঞ্চার করেছে। এরপর আমাদের সঙ্গে যোগ দেন বন্ধু আজগর খান। স্মৃতির পাতা উল্টাতে উল্টাতে তিনি শোনাতে থাকেন বহু বছরের পরিচয়, সংগ্রাম, বন্ধুত্ব এবং জীবনের নানা অজানা অধ্যায়ের গল্প। কখনো হাসিতে ভরে ওঠে ঘর, কখনো আবার নীরবতা জানিয়ে দেয় জীবনের গভীরতম সত্যগুলো। দীর্ঘ আড্ডার মাঝেই আসে মধ্যাহ্নভোজের আমন্ত্রণ। ছিল একেবারেই সাধারণ ঘরোয়া আয়োজন—সাদা ভাত, সহজ-সরল কিছু রান্না। কিন্তু সেই খাবারের প্রতিটি কণায় ছিল আন্তরিকতার সুবাস, ভালোবাসার উষ্ণতা এবং আপনজনের স্পর্শ। সত্যিই, খাবারের স্বাদ শুধু মসলায় নয়; মানুষের আন্তরিকতায়। সেই সাধারণ মধ্যাহ্নভোজ আমার কাছে হয়ে উঠেছিল অসাধারণ এক অভিজ্ঞতা, কারণ সেখানে ছিল হৃদয়ের আতিথেয়তা। খেতে খেতে গল্পের ধারা আবারও নতুন মোড় নেয়। আলোচনায় উঠে আসে পারিবারিক মূল্যবোধ, পুরোনো দিনের চট্টগ্রাম, সাংবাদিকতার স্বর্ণযুগ, মানুষের প্রতি দায়িত্ববোধ, বন্ধুত্বের মর্যাদা এবং একজন লেখকের নৈতিক দায়। সময় যেন থমকে দাঁড়িয়েছিল। মনে হচ্ছিল, ঘড়ির কাঁটা নয়—কথার গভীরতাই আজ সময়কে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছে। মিজানুর রহমান চৌধুরীর ব্যক্তিত্বের সবচেয়ে বড় সৌন্দর্য হলো তাঁর সরলতা। জীবনের এত দীর্ঘ পথ পেরিয়েও তাঁর মধ্যে নেই কোনো অহংকার, নেই কৃত্রিমতা। তিনি মানুষকে আপন করে নিতে জানেন, সম্মান দিতে জানেন, সাহস দিতে জানেন। তাঁর কথায় যেমন দৃঢ়তা, তেমনি আচরণে রয়েছে অসাধারণ সৌজন্য ও মমতা। এমন মানুষের সান্নিধ্যে এলে উপলব্ধি হয়—সম্পদ, পদ কিংবা ক্ষমতার চেয়ে বড় হলো মানুষের ভালোবাসা এবং অর্জিত সম্মান। জীবন শেষে মানুষ স্মরণীয় হয় তার ব্যবহারে, সততায়, সাহসে এবং মানুষের প্রতি ভালোবাসায়। আজকের এই দীর্ঘ আড্ডা, প্রাণখোলা আলোচনা, স্মৃতিচারণ এবং আন্তরিক মধ্যাহ্নভোজ আমার জীবনের স্মরণীয় অধ্যায় হয়ে থাকবে। কিছু কিছু দিন ক্যালেন্ডারে নয়, হৃদয়ে লেখা থাকে। আজকের দিনটি তেমনই এক দিন—যেখানে ছিল বন্ধুত্ব, শ্রদ্ধা, ভালোবাসা, সাহস, স্মৃতি, সাহিত্য, সাংবাদিকতা এবং মানুষের প্রতি মানুষের নিখাদ আন্তরিকতার এক অপূর্ব সম্মিলন। প্রিয় মিজানুর রহমান চৌধুরী ভাইয়ের প্রতি রইল গভীর শ্রদ্ধা, অকৃত্রিম ভালোবাসা ও আন্তরিক কৃতজ্ঞতা। মহান আল্লাহ তাঁকে সুস্থতা, দীর্ঘায়ু, সম্মান এবং সত্য ও ন্যায়ের পথে অবিচল থাকার শক্তি দান করুন। আমীন

Share This Article
Leave a Comment