
—মো. কামাল উদ্দিন “ওলিগণ দুনিয়া থেকে বিদায় নেন, কিন্তু তাঁদের নূর কখনো নিভে যায় না। তাঁদের দেহ মাটির বুকে শায়িত হয়, আর তাঁদের শিক্ষা, ভালোবাসা ও মানবতার আলো যুগের পর যুগ মানুষের অন্তরে জ্বলে থাকে।” আজ ঠিক এক বছর। সময়ের ক্যালেন্ডারে একটি বছর হয়তো মাত্র বারোটি মাস, কিন্তু প্রিয়জন হারানোর বেদনায় এই একটি বছর যেন বহু যুগের সমান দীর্ঘ।
আজও সেই ভোরের কথা মনে পড়ে। সূর্যের প্রথম আলো তখনও পুরোপুরি পৃথিবীকে স্পর্শ করেনি। ঠিক সেই সময় ছড়িয়ে পড়েছিল হৃদয়বিদারক সংবাদ—মাইজভাণ্ডারি তরিকার উজ্জ্বল নক্ষত্র, গাউছুল আজম শাহসুফি আহমদউল্লাহ মাইজভাণ্ডারী (কঃ)-এর চতুর্থ শাহজাদা, আলহাজ্ব শাহসুফি ডাঃ সৈয়দ দিদারুল হক মাইজভাণ্ডারী (রহঃ) মহান রবের ডাকে সাড়া দিয়েছেন।
ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন। সেদিন শুধু একটি পরিবারের নয়, হাজার হাজার ভক্ত, অনুরাগী, মুরিদ এবং অসংখ্য সাধারণ মানুষের হৃদয়ে নেমে এসেছিল গভীর শোকের ছায়া। মনে হয়েছিল, যেন মাইজভাণ্ডারের আকাশ থেকে একটি উজ্জ্বল নক্ষত্র আড়াল হয়ে গেছে। কিন্তু সময় শিখিয়েছে—আল্লাহর প্রিয় বান্দারা কখনো হারিয়ে যান না; তাঁরা তাঁদের কর্ম, আদর্শ ও আধ্যাত্মিক আলোয় মানুষের মাঝে চিরজীবী হয়ে থাকেন। ২০১৭ সালে বাংলা টিভির জন্য “১০ই মাঘ, মাইজভাণ্ডার শরীফ” শীর্ষক একটি প্রামাণ্যচিত্র নির্মাণের সময় তাঁর সান্নিধ্যে যাওয়ার সৌভাগ্য আমার হয়েছিল। কাছ থেকে দেখেছিলাম এক অসাধারণ মানুষকে—যাঁর ব্যক্তিত্বে ছিল বিনয়, কথায় ছিল প্রজ্ঞা, আচরণে ছিল মমতা এবং হৃদয়ে ছিল মানুষের প্রতি সীমাহীন ভালোবাসা।
তিনি কখনো নিজেকে বড় করে দেখেননি। মানুষের কষ্টকে নিজের কষ্ট মনে করতেন। একজন চিকিৎসক হিসেবে যেমন অসুস্থ মানুষের পাশে দাঁড়িয়েছেন, তেমনি একজন আধ্যাত্মিক পথপ্রদর্শক হিসেবে মানুষের অন্তরের অন্ধকার দূর করার চেষ্টা করেছেন। তাঁর কাছে ধর্ম ছিল বিভাজনের নয়, ভালোবাসার; আধ্যাত্মিকতা ছিল লোকদেখানো আচার নয়, মানবসেবার এক অনন্য দর্শন।
এই শিক্ষা তিনি পেয়েছিলেন সেই মহান আধ্যাত্মিক ধারার প্রতিষ্ঠাতা গাউছুল আজম শাহসুফি আহমদউল্লাহ মাইজভাণ্ডারী (কঃ)-এর উত্তরাধিকার থেকে। যে দর্শনের মূল কথা—আল্লাহর প্রেম, মানুষের সেবা, সহমর্মিতা, যিকির, আত্মশুদ্ধি এবং সাম্যের সমাজ প্রতিষ্ঠা। আজকের বিভক্ত, অস্থির ও সহিংস পৃথিবীতে এই দর্শনের প্রয়োজন আরও বেশি। যখন মানুষ মানুষকে ভুলে যাচ্ছে, তখন মাইজভাণ্ডারের শিক্ষা আমাদের মনে করিয়ে দেয়—মানুষের সেবাই ইবাদত, ভালোবাসাই প্রকৃত শক্তি এবং মানবতাই সর্বশ্রেষ্ঠ পরিচয়। এক বছর পেরিয়ে গেছে। কিন্তু তাঁর অনুপস্থিতি আজও অনুভূত হয়। মাইজভাণ্ডার শরীফে গেলে, দরবারের পরিবেশে, যিকিরের ধ্বনিতে, মাইজভাণ্ডারি গানের সুরে, ভক্তদের চোখের জলে এবং নীরব প্রার্থনায় যেন তাঁর স্মৃতি বারবার ফিরে আসে।
আমাদের বিশ্বাস, একজন ওলির প্রকৃত মৃত্যু হয় না। তিনি তাঁর অনুসারীদের হৃদয়ে, তাঁর শিক্ষা ও আদর্শে এবং মানুষের কল্যাণে রেখে যাওয়া কর্মের মধ্য দিয়ে চিরকাল বেঁচে থাকেন।
তাঁর প্রথম মৃত্যুবার্ষিকীতে গভীর শ্রদ্ধা ও বিনম্র ভালোবাসায় তাঁকে স্মরণ করছি। মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামীন যেন তাঁকে জান্নাতুল ফেরদৌসের সর্বোচ্চ মর্যাদা দান করেন এবং তাঁর দেখানো মানবতা, ভালোবাসা ও আধ্যাত্মিকতার পথে চলার তাওফিক আমাদের সকলকে দান করেন।
আমিন।