
মো. কামাল উদ্দিন:
ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়—যারা সত্যের পথে হাঁটে, অন্যায়ের বিরুদ্ধে মাথা উঁচু করে দাঁড়ায়, শোষিত মানুষের পক্ষে কণ্ঠ উচ্চারণ করে, তাদের জীবন কখনোই সহজ হয় না। তাদের পথের প্রতিটি বাঁকে অপেক্ষা করে ষড়যন্ত্র, অপপ্রচার, হুমকি, ভয়ভীতি এবং চরিত্রহননের অপচেষ্টা। কিন্তু তবুও সত্যের সৈনিকরা থেমে যায় না। কারণ তারা জানে, সাময়িকভাবে মিথ্যার জয়গান শোনা গেলেও শেষ পর্যন্ত বিজয় সত্যেরই হয়। আজ এমনই এক সত্যসন্ধানী, সাহসী ও আপসহীন সাংবাদিক মিজানুর রহমান চৌধুরীর বিরুদ্ধে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ফেক আইডি খুলে পরিকল্পিত অপপ্রচার, মিথ্যাচার ও হুমকি-ধমকিমূলক প্রচারণা চালানো হচ্ছে। একজন সচেতন নাগরিক, সাংবাদিক, লেখক এবং দীর্ঘদিনের সহযোদ্ধা হিসেবে আমি এই ন্যক্কারজনক কর্মকাণ্ডের তীব্র নিন্দা, প্রতিবাদ ও ঘৃণা জানাই। মিজানুর রহমান চৌধুরী কোনো সাধারণ নাম নয়। চট্টগ্রামের সাংবাদিকতা জগতে তিনি একটি প্রতিষ্ঠান, একটি সাহসী কণ্ঠস্বর, একটি প্রতিবাদী চেতনার নাম। তিনি শুধু সংবাদপত্রের সম্পাদক নন; তিনি মানুষের অধিকার, ন্যায়বিচার এবং সত্যের জন্য নিরন্তর সংগ্রামরত একজন যোদ্ধা। aতাঁর বিরুদ্ধে আজ যারা অপপ্রচারে লিপ্ত হয়েছে, তারা মূলত একজন ব্যক্তিকে নয়—একটি আদর্শকে আঘাত করতে চায়। তারা ভয় পায় তাঁর কলমকে, ভয় পায় তাঁর সত্য উচ্চারণকে, ভয় পায় তাঁর সাহসী অবস্থানকে। কারণ ইতিহাসে সবসময়ই দেখা গেছে, মিথ্যা সত্যকে ভয় পায়, অন্যায় ন্যায়কে ভয় পায়, আর দুর্নীতি ভয় পায় একজন সৎ মানুষের বিবেককে। আমাদের পরিচয় প্রায় তিন দশকের। এই দীর্ঘ সময়ে আমি তাঁকে বহু রূপে দেখেছি—সাংবাদিক হিসেবে, সংগঠক হিসেবে, সমাজচিন্তক হিসেবে এবং একজন দেশপ্রেমিক মানুষ হিসেবে। কিন্তু সম্প্রতি চাটগাঁ টিভিতে প্রচারিত তাঁর দীর্ঘ সাক্ষাৎকার আমাকে যেন নতুন করে তাঁর জীবনের গভীরে নিয়ে গেছে।
সেই সাক্ষাৎকারে আমি দেখেছি একজন মানুষের সংগ্রামের ইতিহাস, যিনি জন্মসূত্রে নয়, লড়াইয়ের মধ্য দিয়ে নিজেকে নির্মাণ করেছেন। তিনি অকপটে তুলে ধরেছেন তাঁর শৈশবের কঠিন দিনগুলোর কথা। স্বাধীনতার পরও কীভাবে সমাজের একটি অংশ ক্ষমতার দাপটে সাধারণ মানুষের জীবনকে দুর্বিষহ করে তুলেছিল, কীভাবে রাজনৈতিক আশ্রয়ে কিছু অপশক্তি নিরীহ পরিবারগুলোর ওপর নির্যাতন চালিয়েছে—সেসব নির্মম স্মৃতি তিনি বর্ণনা করেছেন অসাধারণ সাহসিকতার সঙ্গে।
তিনি বলেছেন তাঁর বাবার কথা—একজন নিরীহ মানুষের কথা, যাকে মিথ্যা মামলায় জড়িয়ে বারবার কারাগারে পাঠানো হয়েছিল। তিনি বলেছেন সেই দিনের কথা, যখন তাঁদের পরিবারকে আর্থিকভাবে ধ্বংস করার চেষ্টা করা হয়েছিল। তিনি বলেছেন ক্ষুধা, বঞ্চনা, অপমান আর অসহায়ত্বের কথা। একজন কিশোর মিজানুর তখন দেখেছেন কীভাবে মানুষ অন্যায়ের কাছে মাথা নত করে, আবার দেখেছেন কীভাবে কিছু মানুষ অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে ইতিহাস সৃষ্টি করে। সেই কিশোর বয়সের অভিজ্ঞতাই তাঁর মধ্যে জন্ম দিয়েছে প্রতিবাদের আগুন। জন্ম দিয়েছে সত্যের প্রতি এক অটল প্রতিশ্রুতি। তাই তিনি ভেঙে পড়েননি, বরং প্রতিকূলতাকে শক্তিতে রূপান্তর করেছেন। জীবনের এক পর্যায়ে তিনি রাজনীতির পথেও হেঁটেছেন। কিন্তু খুব দ্রুত উপলব্ধি করেন—ক্ষমতার রাজনীতি এবং জনকল্যাণের রাজনীতি সবসময় এক নয়। তিনি দেখেছেন, অনেক সময় দলীয় স্বার্থ জনগণের স্বার্থকে গ্রাস করে ফেলে। তখন তিনি সিদ্ধান্ত নেন, কোনো দলের পতাকার নিচে নয়, মানুষের পাশে দাঁড়াবেন নিজের বিবেকের শক্তিতে। এই সিদ্ধান্তই তাঁকে নিয়ে আসে সাংবাদিকতার জগতে।
সাংবাদিকতা তাঁর কাছে কখনো পেশা ছিল না; এটি ছিল একটি মিশন। একটি সামাজিক দায়িত্ব। একটি নৈতিক অঙ্গীকার। তিনি জানতেন, সত্য বলার মূল্য আছে। তবুও তিনি সত্য বলেছেন। তিনি জানতেন, ক্ষমতাবানদের বিরুদ্ধে লিখলে শত্রু বাড়বে। তবুও তিনি কলম থামাননি। তিনি জানতেন, সুবিধাবাদী সমাজ সাহসী মানুষকে একা ফেলে দেয়। তবুও তিনি আপস করেননি।
অনেক বাধা-বিপত্তি, অর্থনৈতিক সংকট ও প্রতিকূলতার মধ্য দিয়ে তিনি গড়ে তুলেছেন নিজের সংবাদপত্র। সৃষ্টি করেছেন স্বাধীন মতপ্রকাশের প্ল্যাটফর্ম। একজন সম্পাদক হিসেবে তিনি কখনোই কেবল সংবাদ প্রকাশে সীমাবদ্ধ থাকেননি; তিনি সমাজের বিবেক হয়ে ওঠার চেষ্টা করেছেন। আজকের সাংবাদিকতার বাস্তবতা নিয়ে তাঁর মূল্যায়নও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তিনি মনে করেন, সাংবাদিকতা যদি ক্ষমতার মুখপাত্রে পরিণত হয়, তবে জনগণ তাদের শেষ আশ্রয়টুকুও হারিয়ে ফেলে। তাই তিনি বারবার সাংবাদিকদের জনগণের পাশে দাঁড়ানোর আহ্বান জানিয়েছেন।
তাঁর বক্তব্যে আমি শুনেছি এক নির্ভীক মানুষের কণ্ঠস্বর। একজন মানুষের আর্তনাদ, যিনি দেশকে ভালোবাসেন। একজন নাগরিকের উদ্বেগ, যিনি চান বাংলাদেশ একটি ন্যায়ভিত্তিক রাষ্ট্রে পরিণত হোক। এই ভাবনা থেকেই তিনি প্রতিষ্ঠা করেছেন “লাভ বাংলাদেশ”। নামটি যত সরল, এর দর্শন তত গভীর। তিনি বিশ্বাস করেন—দেশপ্রেম শুধু জাতীয় দিবসে পতাকা ওড়ানো নয়; দেশপ্রেম হলো দুর্নীতির বিরুদ্ধে দাঁড়ানো, অন্যায়ের প্রতিবাদ করা, জনগণের সম্পদ রক্ষা করা এবং নিজের দায়িত্ব সততার সঙ্গে পালন করা।
তিনি মানুষকে আহ্বান জানান প্রতিদিন অন্তত একবার বলার জন্য—“আমি বাংলাদেশকে ভালোবাসি।” এই বাক্যটি তাঁর কাছে শুধু একটি স্লোগান নয়; এটি একটি নৈতিক অঙ্গীকার, একটি নাগরিক শপথ। আজ যখন সমাজের বিভিন্ন স্তরে দুর্নীতি, লুটপাট, স্বজনপ্রীতি এবং নৈতিক অবক্ষয়ের কথা আমরা শুনি, তখন মিজানুর রহমান চৌধুরীর মতো মানুষদের উপস্থিতি আমাদের আশার আলো দেখায়।
তিনি আমাদের মনে করিয়ে দেন—বাংলাদেশ এখনো শেষ হয়ে যায়নি। সত্য এখনো বেঁচে আছে। বিবেক এখনো জাগ্রত আছে। প্রতিবাদের কণ্ঠ এখনো স্তব্ধ হয়নি। এই কারণেই তাঁর বিরুদ্ধে অপপ্রচার শুধু একজন ব্যক্তির বিরুদ্ধে আক্রমণ নয়; এটি সত্য, ন্যায়, স্বাধীন সাংবাদিকতা এবং মুক্তচিন্তার বিরুদ্ধে আক্রমণ। আমি বিশ্বাস করি, অপপ্রচারকারীরা সাময়িকভাবে বিভ্রান্তি ছড়াতে পারলেও ইতিহাসে তাদের কোনো স্থান হবে না। কিন্তু সত্যের জন্য লড়াই করা মানুষদের নাম সময়ের পাতায় স্বর্ণাক্ষরে লেখা থাকবে। আজ আমি গভীর শ্রদ্ধার সঙ্গে বলতে চাই—মিজানুর রহমান চৌধুরী শুধু একজন সম্পাদক নন; তিনি এক চলমান ইতিহাস, এক সংগ্রামী চেতনা, এক জাগ্রত বিবেকের নাম। তিনি প্রমাণ করেছেন, মানুষ চাইলে প্রতিকূলতার পাহাড় ভেদ করেও আলোর পথে এগিয়ে যেতে পারে। তাঁর কলম আরও শক্তিশালী হোক, তাঁর কণ্ঠ আরও উচ্চকিত হোক, তাঁর সংগ্রাম আরও বিস্তৃত হোক—এই প্রত্যাশাই করি।
লাল সালাম একজন সাহসী সম্পাদককে।
লাল সালাম একজন নির্ভীক সত্যসন্ধানী সাংবাদিককে।
লাল সালাম একজন সংগ্রামী দেশপ্রেমিককে।
লাল সালাম সেই মানুষটিকে, যিনি এখনো বিশ্বাস করেন—বাংলাদেশ একদিন সত্য, ন্যায়, মানবিকতা ও সততার এক উজ্জ্বল রাষ্ট্রে পরিণত হবে। মিজানুর রহমান চৌধুরী—আপনি ব্যক্তি নন, আপনি এক সাহসের নাম। আপনি এক অনুপ্রেরণার নাম। আপনি এক জাগ্রত বাংলাদেশের স্বপ্নের নাম।
লেখক – ডেপুটি এডিটর দি টুরিস্ট পত্রিকা।