“কলমের বিদ্রোহ, বিবেকের চট্টগ্রাম-

By admin
5 Min Read
-মো. কামাল উদ্দিনঃ 
আজ আমি মাইক্রোফোনের সামনে দাঁড়িয়েছি,
গান শোনাতে নয়,
কারও প্রশংসা কুড়াতে নয়,
দাঁড়িয়েছি মানুষের না-বলা কথাগুলো বলার জন্য।
আমার হাতে কোনো রাজদণ্ড নেই,
নেই ক্ষমতার অহংকার,
আছে শুধু একটি কলম,
যার কালিতে মিশে আছে
মায়ের কান্না,
শ্রমিকের ঘাম,
নদীর আর্তনাদ,
শিশুর স্বপ্ন,
আর একটি শহরের দীর্ঘশ্বাস।
আমি লিখি—
কারণ নীরবতা অনেক সময় অপরাধের সঙ্গী হয়ে যায়।
আমি লিখি—
কারণ সত্য লুকিয়ে রাখলে
মিথ্যারাই উৎসব করে।
আমি লিখি—
কারণ একজন লেখকের মৃত্যু হয় না,
মৃত্যু হয় তখনই,
যখন সে সত্য বলা বন্ধ করে দেয়।
হে চট্টগ্রাম!
তুমি শুধু একটি শহরের নাম নও,
তুমি পাহাড়ের বুক চিরে জন্ম নেওয়া সাহস,
তুমি কর্ণফুলীর জোয়ারের মতো অদম্য গতি,
তুমি সমুদ্রের মতো উদার,
আবার বজ্রপাতের মতো প্রতিবাদী।
কিন্তু আজ তোমার বুকেও জমেছে কত কষ্ট!
যেখানে একদিন শিশুদের হাসির শব্দ ভেসে আসত,
আজ সেখানে মাদকের ছোবল।
যেখানে স্বপ্ন বোনা হতো,
আজ সেখানে ভয়ের ছায়া।
যেখানে মানুষ নিরাপদে চলার কথা,
আজ সেখানে চাঁদাবাজির কালো হাত।
আমি দেখি—
একজন মা রাত জেগে অপেক্ষা করেন,
ছেলেটি নিরাপদে ফিরবে তো?
আমি দেখি—
একজন বাবা নিজের কষ্ট লুকিয়ে
সন্তানের ভবিষ্যৎ গড়তে চান।
আমি দেখি—
অসংখ্য তরুণ স্বপ্ন নিয়ে পথচলা শুরু করে,
কিন্তু মাদকের অন্ধকার তাদের গ্রাস করতে চায়।
তখন আমার কলম চুপ থাকতে পারে না।
আমি লিখি—
না,
এই সমাজ মাদকের কাছে হার মানবে না।
আমি লিখি—
না,
এই দেশ সন্ত্রাসের কাছে মাথা নত করবে না।
আমি লিখি—
না,
নারীর সম্মান কোনো আপসের বিষয় হতে পারে না।
একটি শিশুর কান্না
পুরো পৃথিবীর বিবেককে কাঁপিয়ে দেওয়ার জন্য যথেষ্ট।
তবুও কেন
শিশু হত্যা হয়?
কেন নিষ্পাপ প্রাণ হারায়?
কেন ধর্ষকেরা সমাজে বুক ফুলিয়ে হাঁটে?
কেন বিচার পেতে বছরের পর বছর কেটে যায়?
আমি উত্তর চাই।
আমি বিচার চাই।
আমি প্রতিশোধ নয়,
ন্যায়বিচারের বিজয় চাই।
আইনের শাসন এমন হোক,
যেখানে ক্ষমতাবান ও সাধারণ মানুষ
একই দাঁড়িপাল্লায় বিচার পায়।
আমি চাই—
পুলিশের পোশাক দেখে
মানুষের মনে নিরাপত্তা জন্ম নিক।
আদালতের দরজায় দাঁড়িয়ে
মানুষের বিশ্বাস ফিরে আসুক।
প্রশাসনের প্রতিটি সিদ্ধান্তে
জনগণের কল্যাণ ফুটে উঠুক।
চট্টগ্রাম উন্নয়ন মানে
শুধু আকাশছোঁয়া ভবন নয়।
উন্নয়ন মানে—
সবুজ পাহাড় রক্ষা করা।
দূষণমুক্ত কর্ণফুলী।
অবৈধ দখলমুক্ত খাল।
পরিচ্ছন্ন বাতাস।
নিরাপদ রাস্তা।
কর্মসংস্থানের সুযোগ।
সৎ নেতৃত্ব।
স্বচ্ছ প্রশাসন।
উন্নয়ন তখনই অর্থবহ,
যখন একজন রিকশাচালকের সন্তানও
সমান স্বপ্ন দেখতে পারে।
আমি কলম ধরি
কারও বিরুদ্ধে বিদ্বেষ ছড়াতে নয়।
আমি লিখি
যেন মানুষ মানুষকে ভালোবাসতে শেখে।
আমি প্রতিবাদ করি
কারণ প্রতিবাদ মানেই ধ্বংস নয়।
প্রতিবাদ মানে—
অন্যায়ের বিরুদ্ধে বিবেকের জাগরণ।
আমি জানি—
সত্য বলার পথ সহজ নয়।
এ পথে অপবাদ আসে।
ষড়যন্ত্র আসে।
মিথ্যা অভিযোগ আসে।
বন্ধুর মুখোশে শত্রুও আসে।
তবুও আমি থামি না।
কারণ ইতিহাস কখনো কাপুরুষদের মনে রাখে না।
ইতিহাস মনে রাখে
তাদের,
যারা একা হলেও সত্যের পাশে দাঁড়িয়েছিল।
আমি স্বপ্ন দেখি—
একদিন চট্টগ্রাম হবে
বাংলাদেশের সবচেয়ে নিরাপদ শহর।
যেখানে মাদক বিক্রি হবে না।
চাঁদাবাজি থাকবে না।
দুর্নীতি থাকবে না।
ধর্ষকের কোনো আশ্রয় থাকবে না।
অন্যায় হত্যার কোনো ক্ষমা থাকবে না।
আমি চাই—
প্রতিটি তরুণ বই হাতে নিক,
অস্ত্র নয়।
প্রতিটি শিশু বিদ্যালয়ে যাক,
ভয়ের মধ্যে নয়।
প্রতিটি নারী সম্মানের সঙ্গে পথ চলুক।
প্রতিটি বৃদ্ধ শান্তিতে শেষ জীবন কাটাক।
প্রতিটি শ্রমিক ন্যায্য মজুরি পাক।
প্রতিটি সাংবাদিক সত্য লেখার স্বাধীনতা পাক।
প্রতিটি লেখক বিবেকের স্বাধীনতা পাক।
আর প্রতিটি নাগরিক
নিজেকে এই দেশের গর্বিত সন্তান বলতে পারুক।
আমি বিশ্বাস করি—
একটি সৎ কলম
একদিন হাজারো দুর্নীতির দেয়াল ভেঙে দিতে পারে।
একটি সত্য উচ্চারণ
হাজার মিথ্যার সাম্রাজ্য কাঁপিয়ে দিতে পারে।
একটি বিবেকবান মানুষ
একটি জাতির ভবিষ্যৎ বদলে দিতে পারে।
আজ তাই আমি আবার বলি—
আমার কণ্ঠ থামবে না।
আমার কলম শুকাবে না।
আমার বিবেক বিক্রি হবে না।
যতদিন পাহাড় কাঁদবে,
আমি লিখব।
যতদিন নদী দূষিত হবে,
আমি লিখব।
যতদিন কোনো মা সন্তানের জন্য কাঁদবেন,
আমি লিখব।
যতদিন কোনো নারী নিরাপত্তাহীনতায় ভুগবেন,
আমি লিখব।
যতদিন অন্যায়ের অন্ধকার পৃথিবীকে গ্রাস করতে চাইবে,
ততদিন আমি শব্দের প্রদীপ জ্বালিয়ে রাখব।
কারণ আমি বিশ্বাস করি—
কলমের কালি শুকিয়ে যেতে পারে,
কিন্তু সত্যের আলো কখনো নিভে যায় না।
প্রতিবাদের কণ্ঠ রুদ্ধ করা যায়,
কিন্তু প্রতিবাদের জন্ম থামানো যায় না।
আর যেদিন মানুষ জেগে উঠবে,
সেদিন চট্টগ্রাম শুধু একটি শহর নয়—
হয়ে উঠবে ন্যায়, সাহস, মানবতা, পরিবেশ, উন্নয়ন ও ভালোবাসার এক জীবন্ত প্রতীক।
সেদিনই হবে আমার কলমের সবচেয়ে বড় বিজয়।
Share This Article
Leave a Comment