জন্মদিনে আহমদ ছফা: বাংলা বুদ্ধিবৃত্তির অগ্নিশিখা, আপসহীন বিবেক ও জাতির আত্মজিজ্ঞাসার চিরন্তন নাম

By admin
5 Min Read

 — মো. কামাল উদ্দিন বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে এমন কিছু মানুষ জন্ম নেন, যাঁদের পরিচয় কোনো একক অভিধায় সীমাবদ্ধ থাকে না। তাঁরা একই সঙ্গে সাহিত্যিক, চিন্তক, সমাজবিশ্লেষক, দার্শনিক, সংস্কৃতিকর্মী এবং সময়ের নির্মম সমালোচক। তাঁদের জীবন কেবল ব্যক্তিগত সাফল্যের ইতিহাস নয়; বরং একটি জাতির আত্মপরিচয় নির্মাণের সংগ্রামের দলিল। আহমদ ছফা তেমনই এক বিরল ব্যক্তিত্ব।  ৩০ জুন বাংলা বুদ্ধিবৃত্তির এক অনন্য আলোকবর্তিকার জন্মদিন। ১৯৪৩ সালের এই দিনে চট্টগ্রামের চন্দনাইশ উপজেলার গাছবাড়িয়া গ্রামের এক সাধারণ মধ্যবিত্ত পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন তিনি। জন্মেছিলেন গ্রামে, কিন্তু তাঁর চিন্তার পরিধি ছড়িয়ে পড়েছিল বিশ্বের জ্ঞানভুবনে। তিনি ছিলেন এমন একজন মানুষ, যিনি কখনো ক্ষমতার ছায়ায় দাঁড়িয়ে লেখেননি; বরং ক্ষমতার চোখে চোখ রেখে সত্য উচ্চারণ করেছেন। আপস তাঁর অভিধানে ছিল না, তোষামোদ ছিল তাঁর স্বভাববিরুদ্ধ, আর সত্য ছিল তাঁর একমাত্র আশ্রয়। আহমদ ছফা ছিলেন এমন এক লেখক, যিনি সাহিত্যকে কেবল বিনোদনের মাধ্যম মনে করেননি; তিনি বিশ্বাস করতেন, সাহিত্য মানুষের বিবেককে জাগিয়ে তোলার অস্ত্র। তাঁর প্রতিটি লেখা সমাজের অসুস্থতা শনাক্ত করার এক নির্মোহ অস্ত্রোপচার। তিনি লিখেছেন রাষ্ট্র নিয়ে, ধর্ম নিয়ে, ইতিহাস নিয়ে, বিশ্ববিদ্যালয় নিয়ে, রাজনীতি নিয়ে, সংস্কৃতি নিয়ে এবং সর্বোপরি মানুষ নিয়ে। তাঁর লেখনী ছিল ধারালো, কিন্তু বিদ্বেষহীন; কঠোর, কিন্তু মানবিক।
চট্টগ্রামের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য, নদী, পাহাড়, গ্রামীণ সমাজ ও সাধারণ মানুষের জীবনসংগ্রাম তাঁর মানসগঠনে গভীর প্রভাব ফেলেছিল। পরবর্তীকালে চট্টগ্রাম কলেজে পড়াশোনা শেষে তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে রাষ্ট্রবিজ্ঞানে স্নাতকোত্তর সম্পন্ন করেন। কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয়ের পাঠক্রমের চেয়ে জীবনের পাঠই তাঁকে বেশি সমৃদ্ধ করেছিল। তিনি বই পড়তেন অসীম ক্ষুধা নিয়ে, মানুষের সঙ্গে মিশতেন গভীর কৌতূহল নিয়ে এবং সমাজকে দেখতেন একজন নির্মোহ গবেষকের দৃষ্টিতে। ষাটের দশকে সাহিত্যজগতে তাঁর আত্মপ্রকাশ ঘটে। কিন্তু খুব অল্প সময়ের মধ্যেই তিনি বুঝিয়ে দেন, তিনি প্রচলিত ধারার লেখক নন। তিনি নিজের জন্য আলাদা একটি পথ নির্মাণ করেছেন। তাঁর সাহিত্য কখনো জনপ্রিয়তার মোহে আবদ্ধ হয়নি; বরং সত্য উচ্চারণের সাহসেই প্রতিষ্ঠা পেয়েছে। ‘সূর্য তুমি সাথী’, ‘উদ্ধার’, ‘একজন আলী কেনানের উত্থান-পতন’, ‘ওঙ্কার’, ‘অলাতচক্র’, ‘গাভীবৃত্তান্ত’, ‘অর্ধেক নারী অর্ধেক ঈশ্বরী’—প্রতিটি উপন্যাসই বাংলাদেশের সমাজ, রাষ্ট্র, রাজনীতি ও মানুষের সংকটের একেকটি জীবন্ত দলিল। বিশেষ করে ‘অলাতচক্র’ মুক্তিযুদ্ধকালীন সময়ের রাজনৈতিক ও মানসিক সংকটকে এমন গভীর শিল্পভাষায় তুলে ধরেছে, যা বাংলা সাহিত্যে এক অনন্য সংযোজন। আর ‘গাভীবৃত্তান্ত’ আজও ক্ষমতাকেন্দ্রিক বুদ্ধিজীবী সমাজের আত্মসমালোচনার অন্যতম শ্রেষ্ঠ রূপক। তাঁর প্রবন্ধগ্রন্থ ‘বাঙালি মুসলমানের মন’ কেবল একটি বই নয়; এটি বাংলাদেশের সামাজিক মনস্তত্ত্ব বিশ্লেষণের এক যুগান্তকারী দলিল। একইভাবে ‘বুদ্ধিবৃত্তির নতুন বিন্যাস’ আমাদের বুদ্ধিজীবী সমাজের সীমাবদ্ধতা, আত্মসমর্পণ এবং চিন্তার সংকটকে নির্ভীকভাবে উন্মোচন করেছে। এসব রচনায় তিনি যে প্রশ্ন তুলেছিলেন, তার অনেকগুলোর উত্তর আজও জাতি খুঁজে বেড়াচ্ছে। ছফার ভাষা ছিল স্বতন্ত্র। তিনি একই সঙ্গে লোকজ শব্দ, শাস্ত্রীয় ভাষা এবং আধুনিক বুদ্ধিবৃত্তিক পরিভাষাকে এমন দক্ষতায় ব্যবহার করেছেন, যা বাংলা গদ্যকে নতুন মাত্রা দিয়েছে। তাঁর লেখায় আবেগ আছে, যুক্তি আছে, ব্যঙ্গ আছে, আবার গভীর মানবিকতাও আছে। তাই তাঁর গদ্য পড়তে গেলে মনে হয়, একজন লেখক নন—সময়ের একজন নির্ভীক সাক্ষীর সঙ্গে কথোপকথন চলছে। কবি হিসেবেও আহমদ ছফা ছিলেন স্বাতন্ত্র্যের দাবিদার। ‘জল্লাদ সময়’, ‘একটি প্রবীণ বটের কাছে প্রার্থনা’-এর মতো কবিতায় তিনি সময়ের নিষ্ঠুরতা, মানুষের নিঃসঙ্গতা এবং সভ্যতার সংকটকে এমনভাবে তুলে ধরেছেন, যা পাঠকের অন্তরকে নাড়া দেয়। তাঁর কবিতা অলংকারের চেয়ে চিন্তায় বেশি উজ্জ্বল। বাংলা ভাষায় বিশ্বসাহিত্যের গুরুত্বপূর্ণ রচনাও তিনি অনুবাদ করেছেন। গ্যেটের ‘ফাউস্ট’ এবং বার্ট্রান্ড রাসেলের নির্বাচিত রচনা অনুবাদের মাধ্যমে তিনি বাংলা ভাষার জ্ঞানভাণ্ডারকে সমৃদ্ধ করেছেন। তাঁর বিশ্বাস ছিল—একটি জাতি যত বেশি বিশ্বসাহিত্যের সঙ্গে পরিচিত হবে, ততই তার চিন্তার পরিধি প্রসারিত হবে। বাংলাদেশের সাহিত্যাঙ্গনে আহমদ ছফার আরেকটি বড় অবদান হলো তরুণ লেখকদের পাশে দাঁড়ানো। আজকের বহু খ্যাতিমান লেখক তাঁদের সাহিত্যজীবনের শুরুতে ছফার উৎসাহ, পরামর্শ ও সহযোগিতা পেয়েছেন। তিনি বিশ্বাস করতেন, একটি জাতির ভবিষ্যৎ নির্ভর করে তার নতুন প্রজন্মের মুক্ত চিন্তার ওপর। ২০০১ সালের ২৮ জুলাই তাঁর জীবনাবসান ঘটে। কিন্তু মৃত্যু তাঁকে থামাতে পারেনি। তাঁর বই, তাঁর চিন্তা, তাঁর প্রশ্ন, তাঁর প্রতিবাদ—সবই আজও সমান প্রাসঙ্গিক। যখন সমাজে সত্য বলা কঠিন হয়ে ওঠে, যখন বুদ্ধিবৃত্তি ক্ষমতার কাছে আত্মসমর্পণ করে, যখন নৈতিকতা ভোগবাদের কাছে পরাজিত হয়—তখন আহমদ ছফা আরও বেশি প্রয়োজনীয় হয়ে ওঠেন। আজ তাঁর জন্মদিনে তাঁকে স্মরণ করা মানে শুধু একজন সাহিত্যিককে শ্রদ্ধা জানানো নয়; বরং নিজের বিবেককে প্রশ্ন করা। আমরা কি তাঁর মতো সত্য বলার সাহস রাখি? আমরা কি মেধাকে স্বাধীন রাখতে পেরেছি? আমরা কি এখনও প্রশ্ন করতে শিখেছি? আহমদ ছফা কোনো অতীতের নাম নন। তিনি বর্তমানের প্রয়োজন, ভবিষ্যতের প্রেরণা। তিনি বাংলা সাহিত্যের অগ্নিশিখা, বাংলাদেশের বুদ্ধিবৃত্তিক স্বাধীনতার প্রতীক, আপসহীন সত্যের উচ্চারণ এবং জাতির আত্মজিজ্ঞাসার এক চিরন্তন নাম। এই লেখাটি আরও সম্প্রসারণ করে প্রায় ২০০০ শব্দের একটি পূর্ণাঙ্গ গবেষণাভিত্তিক প্রবন্ধে রূপ দেওয়া যেতে পারে, যেখানে তাঁর ব্যক্তিজীবন, মুক্তিযুদ্ধ-ভাবনা, বিশ্ববিদ্যালয়-চিন্তা, রাজনৈতিক দর্শন, সমকালীন লেখকদের সঙ্গে সম্পর্ক এবং তাঁর সাহিত্যকর্মের গভীর মূল্যায়নও সংযোজিত থাকবে।

Share This Article
Leave a Comment