গানের সুরে, বন্ধুত্বের উষ্ণতায়, স্মৃতির রঙে রাঙানো এক অনন্য সন্ধ্যা চট্টগ্রাম শিল্পকলা একাডেমিতে স্বরলিপি সাংস্কৃতিক অঙ্গনের দেশীয় ফল উৎসব

By admin
5 Min Read

 — মো. কামাল উদ্দিন 
মানুষের জীবনে কিছু সন্ধ্যা আসে, যা কেবল ক্যালেন্ডারের একটি তারিখ হয়ে থাকে না; বরং হৃদয়ের গভীরে চিরস্থায়ী হয়ে যায়। এমন কিছু মুহূর্ত আছে, যা কোনো অর্জনের জন্য নয়, কোনো আনুষ্ঠানিকতার জন্য নয়—শুধু মানুষে মানুষে ভালোবাসা, বন্ধুত্ব, সংস্কৃতি আর হৃদয়ের টানেই অনন্য হয়ে ওঠে। গত সন্ধ্যায় চট্টগ্রাম শিল্পকলা একাডেমির মিলনায়তনে স্বরলিপি সাংস্কৃতিক অঙ্গনের উদ্যোগে আয়োজিত দেশীয় ফল উৎসব ছিল ঠিক তেমনই এক হৃদয়স্পর্শী আয়োজন। শিল্পকলা একাডেমিতে প্রবেশের সঙ্গে সঙ্গেই অনুভব করলাম এক ভিন্ন আবহ। মনে হচ্ছিল, ইট-পাথরের এই ভবনটি যেন সুর, সৌন্দর্য আর প্রাণের স্পর্শে জীবন্ত হয়ে উঠেছে। চারদিকে শিল্পমনস্ক মানুষের পদচারণা, পরিচিত মুখের হাসি, আন্তরিক কুশল বিনিময় এবং দীর্ঘদিন পর দেখা হওয়ার উচ্ছ্বাস—সব মিলিয়ে পরিবেশটি হয়ে উঠেছিল এক বিশাল পারিবারিক মিলনমেলা। আজকের পৃথিবীতে মানুষ যত আধুনিক হচ্ছে, ততই যেন একে অপরের কাছ থেকে দূরে সরে যাচ্ছে। ব্যস্ততা, পেশাগত চাপ, ব্যক্তিগত দায়িত্ব—সবকিছু মিলিয়ে প্রিয় মানুষগুলোর সঙ্গে বসে গল্প করার সময়ও যেন আর পাওয়া যায় না। তাই দীর্ঘদিন পর প্রিয় শিল্পী ইকবাল পিন্টু, স্নেহের দিদার ভাই, প্রিয় মোহাম্মদ আলী এবং আরও অনেক শুভানুধ্যায়ী ও সংস্কৃতিপ্রেমী মানুষের সঙ্গে একই ছাদের নিচে মিলিত হওয়ার আনন্দ ছিল সত্যিই ভাষাতীত। অনুষ্ঠানের শুরু থেকেই ছিল এক প্রাণবন্ত পরিবেশ। দেশীয় ফলের ঐতিহ্যকে ঘিরে সাজানো হয়েছিল নান্দনিক আয়োজন। আমাদের শেকড়ের সঙ্গে জড়িয়ে থাকা মৌসুমি ফল যেন শুধু খাদ্য নয়, বাংলার মাটি, প্রকৃতি ও সংস্কৃতিরই এক জীবন্ত প্রতীক। ফলের ঘ্রাণ আর মানুষের হাসিমাখা মুখ একাকার হয়ে তৈরি করেছিল উৎসবের নির্মল আবহ। এরপর শুরু হয় সংগীতের পর্ব। একের পর এক গান যেন হৃদয়ের জানালায় আলতো করে কড়া নাড়ছিল। কেউ গাইছিলেন ভালোবাসার কথা, কেউ বাংলার মাটির গান, কেউ আবার জীবনের আনন্দ-বেদনার গল্প। দর্শকদের করতালি আর শিল্পীদের নিবেদিত পরিবেশনায় পুরো মিলনায়তন হয়ে উঠেছিল সুরের এক অপার্থিব ভুবন। আমরা যারা একসঙ্গে বসেছিলাম, তাদের আড্ডাও ছিল অসাধারণ। গল্পের ফাঁকে উঠে এসেছে পুরোনো দিনের স্মৃতি, সাংবাদিকতার অভিজ্ঞতা, শিল্প-সংস্কৃতির নানা প্রসঙ্গ, আবার কখনো হাসির রোলে ভরে উঠেছে চারপাশ। মনে হচ্ছিল, সময় যেন থমকে দাঁড়িয়েছে। এই অল্প কয়েক ঘণ্টার মিলনেই যেন বহুদিনের দূরত্ব মুছে গেল। সন্ধ্যার শেষ পর্বে শিল্পী ইকবাল পিন্টু যখন মাইক্রোফোন হাতে নিলেন, তখন পুরো পরিবেশ যেন আরও আবেগঘন হয়ে উঠল। তাঁর কণ্ঠের মাধুর্য, সুরের শুদ্ধতা এবং আন্তরিক পরিবেশনা উপস্থিত প্রতিটি মানুষকে মুগ্ধ করে রাখে। একের পর এক গানের আবেশে শ্রোতারা যেন নিজেদের হারিয়ে ফেলেছিলেন অন্য এক জগতে। তাঁর গান দিয়েই অনুষ্ঠানের সমাপ্তি ঘটে, আর সেই সমাপ্তি ছিল এক অপূর্ণতার অনুভূতি—মনে হচ্ছিল, সন্ধ্যাটি যদি আরও কিছুক্ষণ দীর্ঘ হতো! এই অসাধারণ আয়োজনের সফলতার পেছনে যাঁর শ্রম, মেধা, আন্তরিকতা ও সাংগঠনিক দক্ষতা সবচেয়ে বেশি দৃশ্যমান ছিল, তিনি শামসুল হায়দার তুষার। একজন সংস্কৃতিসেবী হিসেবে তাঁর নিষ্ঠা সত্যিই প্রশংসার দাবিদার। তিনি শুধু একটি অনুষ্ঠান আয়োজন করেননি; তিনি মানুষের হৃদয়কে এক সুতোয় গেঁথে দিয়েছেন। তাঁর নেতৃত্বে পুরো আয়োজনটি ছিল সুশৃঙ্খল, রুচিশীল এবং প্রাণবন্ত। অনুষ্ঠান শেষে আমরা সবাই একসঙ্গে দাঁড়িয়ে একটি ছবি তুললাম। সাধারণ চোখে এটি হয়তো একটি দলীয় ছবি। কিন্তু আমার কাছে এই ছবিটি একটি সময়ের দলিল। এখানে ধরা আছে বন্ধুত্বের হাসি, ভালোবাসার স্পর্শ, শিল্পের প্রতি অঙ্গীকার, দীর্ঘদিন পর দেখা হওয়ার আনন্দ এবং ভবিষ্যতে আবারও একত্র হওয়ার নীরব প্রত্যাশা। জীবনের পথ চলায় মানুষ অনেক কিছু অর্জন করে—অর্থ, খ্যাতি, পদমর্যাদা। কিন্তু দিনের শেষে হৃদয়ে যে সম্পদ সবচেয়ে বেশি আলো ছড়ায়, তা হলো মানুষের ভালোবাসা, আন্তরিক সম্পর্ক এবং এমন কিছু স্মরণীয় মুহূর্ত। কারণ গান শেষ হয়ে যায়, অনুষ্ঠান শেষ হয়ে যায়, আলো নিভে যায়; কিন্তু ভালোবাসার স্মৃতি কখনো শেষ হয় না। সেটি আজীবন হৃদয়ের গভীরে সযত্নে রয়ে যায়।  স্বরলিপি সাংস্কৃতিক অঙ্গনের এই আয়োজন আমাকে আবারও মনে করিয়ে দিয়েছে—সংস্কৃতি কখনো বিভাজনের ভাষা নয়, এটি মিলনের ভাষা; সংগীত কখনো কেবল বিনোদন নয়, এটি আত্মার খাদ্য; আর বন্ধুত্ব কখনো সময়ের কাছে হার মানে না, বরং প্রতিটি পুনর্মিলনে আরও গভীর, আরও উজ্জ্বল হয়ে ওঠে। এই সুন্দর আয়োজনের সঙ্গে সম্পৃক্ত সকল শিল্পী, আয়োজক, অতিথি এবং সংস্কৃতিপ্রেমী মানুষকে জানাই আন্তরিক শুভেচ্ছা ও অভিনন্দন। প্রার্থনা করি, এমন আলোকিত সাংস্কৃতিক আয়োজন বারবার ফিরে আসুক। গানের সুরে, মানুষের ভালোবাসায় এবং বাংলার সংস্কৃতির দীপ্ত আলোয় ভরে উঠুক আমাদের সমাজ, আমাদের আগামী এবং আমাদের হৃদয়ের আঙিনা।

Share This Article
Leave a Comment