
-মো.কামাল উদ্দিনঃ
চট্টগ্রাম মহানগর পুলিশের ভেতরে সংঘটিত একটি ভয়াবহ ইয়াবা আত্মসাতের ঘটনা শুধু আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর শৃঙ্খলা নিয়েই প্রশ্ন তুলেনি, বরং উন্মোচন করেছে পুলিশের ভেতরে থাকা একটি অসৎ চক্রের অন্ধকার মুখ। একই সঙ্গে এই ঘটনা প্রমাণ করেছে—সততা ও পেশাদারিত্বের পথে যারা দৃঢ়ভাবে হাঁটেন, তাদের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র অনিবার্য হলেও শেষ পর্যন্ত সত্যই বিজয়ী হয়। এক পুলিশ সদস্যের কাছ থেকে বিপুল পরিমাণ ইয়াবা উদ্ধারের পর তাঁকে রহস্যজনকভাবে ছেড়ে দেওয়া এবং উদ্ধার করা মাদক যথাযথ আইনি প্রক্রিয়া অনুসরণ না করে আত্মসাতের অভিযোগে চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশের আট সদস্যকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে। সোমবার (৫ জানুয়ারি) নগর পুলিশ কমিশনারের নির্দেশে এই সিদ্ধান্ত কার্যকর করা হয়। বরখাস্ত যাঁরা বরখাস্ত হওয়া পুলিশ সদস্যরা হলেন— বাকলিয়া থানার উপপরিদর্শক (এসআই) মোহাম্মদ আল-আমিন সরকার, এসআই মোহাম্মদ আমির হোসেন (বর্তমানে কোতোয়ালি থানায় কর্মরত), সহকারী উপপরিদর্শক (এএসআই) সাইফুল আলম, মো. জিয়াউর রহমান, মো. সাদ্দাম হোসেন, এনামুল হক, কনস্টেবল মো. রাশেদুল হাসান ভূঞা এবং নারী কনস্টেবল উম্মে হাবিবা। পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, মাদকদ্রব্য আত্মসাৎ, ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে মিথ্যা ও বিভ্রান্তিকর তথ্য প্রদান এবং বৈধ আদেশ অমান্য করার গুরুতর অভিযোগে পুলিশ রেগুলেশনস অব বেঙ্গল (পিআরবি) বিধি-৮৮০ অনুযায়ী তাঁদের বিরুদ্ধে এই শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। নগর পুলিশের সহকারী কমিশনার (গণমাধ্যম) আমিনুর রশিদ বিষয়টি নিশ্চিত করে বলেন, বরখাস্তকালীন সময়ে অভিযুক্ত পুলিশ সদস্যদের দামপাড়া পুলিশ লাইনে সংযুক্ত করে নিয়মিত হাজিরা ও রোলকল দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। ঘটনার শুরু: নতুনব্রিজ তল্লাশিচৌকি পুলিশের তথ্যমতে, গত বছরের ৮ ডিসেম্বর গভীর রাতে নগরের নতুনব্রিজ এলাকার একটি তল্লাশিচৌকিতে কক্সবাজার থেকে ঢাকাগামী দেশ ট্রাভেলসের একটি বাসে তল্লাশি চালানো হয়। তল্লাশির সময় বাসে থাকা কক্সবাজার জেলা পুলিশের কনস্টেবল মো. ইমতিয়াজ হোসেনের সঙ্গে থাকা একটি ট্রলি ব্যাগ সন্দেহজনক মনে হলে তা খুলে দেখা হয়। সেখান থেকে উদ্ধার হয় আনুমানিক ৮০ হাজার থেকে এক লাখ পিস ইয়াবা—যার বাজারমূল্য কোটি টাকারও বেশি বলে ধারণা করা হয়। সাধারণ নিয়ম অনুযায়ী, এই পরিমাণ মাদক উদ্ধারের সঙ্গে সঙ্গেই মামলা দায়ের, আসামি গ্রেপ্তার এবং ইয়াবা জব্দ দেখিয়ে আদালতে পাঠানোর কথা ছিল। কিন্তু সেখানেই ঘটে ব্যতিক্রম ও রহস্যজনক ঘটনা। ইয়াবা উদ্ধার, কিন্তু আসামি মুক্ত অভিযোগ অনুযায়ী, উদ্ধার করা ইয়াবা যথাযথ আইনানুগ প্রক্রিয়ায় জব্দ না করে সংশ্লিষ্ট কয়েকজন দায়িত্বপ্রাপ্ত পুলিশ কর্মকর্তা তা আত্মসাৎ করেন। বিস্ময়করভাবে, রাত আনুমানিক সাড়ে তিনটার দিকে কনস্টেবল মো. ইমতিয়াজ হোসেনকে কোনো মামলা ছাড়াই ছেড়ে দেওয়া হয়। পরবর্তী তদন্তে জানা যায়, কনস্টেবল ইমতিয়াজ হোসেন কক্সবাজারের কলাতলী এলাকার কয়েকজন মাদক কারবারির কাছ থেকে অর্থের বিনিময়ে ইয়াবার চালান ঢাকায় পৌঁছে দিতে সম্মত হয়েছিলেন। তিনি কোনো ধরনের সরকারি ছুটি না নিয়েই ইয়াবাভর্তি লাগেজসহ ঢাকার উদ্দেশে রওনা দেন। নতুনব্রিজ তল্লাশিচৌকিতে ইয়াবা উদ্ধার হলেও তাঁকে ছেড়ে দেওয়ার ঘটনায় পুলিশের ভেতরেই প্রশ্ন ওঠে। বিষয়টি জানাজানি হলে নগর পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ অভ্যন্তরীণ তদন্ত শুরু করতে বাধ্য হয়। তদন্তে বেরিয়ে আসে ভয়াবহ অনিয়ম তদন্তে স্পষ্টভাবে উঠে আসে—ইয়াবাসহ ওই পুলিশ সদস্যকে ছেড়ে দেওয়া হয়েছে এবং উদ্ধারকৃত মাদক আত্মসাৎ করা হয়েছে। এ ঘটনায় একাধিক পুলিশ সদস্যের সংশ্লিষ্টতার প্রমাণ মেলে। এরই ধারাবাহিকতায় আট পুলিশ সদস্যকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়। আদালতের কঠোর অবস্থান এই ঘটনায় বিচার বিভাগও নীরব থাকেনি। গত ২৩ ডিসেম্বর চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট এস এম আলাউদ্দিন মাহমুদ স্বপ্রণোদিত হয়ে একটি মামলা করেন। একই সঙ্গে নগর পুলিশের উপকমিশনারকে (দক্ষিণ) ৫ জানুয়ারির মধ্যে আদালতে তদন্ত প্রতিবেদন দাখিলের নির্দেশ দেওয়া হয়। আইন বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এটি একটি ব্যতিক্রমী দৃষ্টান্ত যেখানে আদালত নিজ উদ্যোগে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ভেতরের অনিয়মের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছে। ওসি আফতাব উদ্দিনকে জড়িয়ে অপচেষ্টার নেপথ্য কাহিনি এই ঘটনার পরপরই একটি কুচক্রী মহল পরিকল্পিতভাবে বর্তমান কোতোয়ালি থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) আফতাব উদ্দিনকে ইয়াবা আত্মসাতের ঘটনার সঙ্গে জড়ানোর অপপ্রচার শুরু করে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম থেকে শুরু করে গোপন মহলে নানা ধরনের বিভ্রান্তিকর তথ্য ছড়ানো হয়। কিন্তু অনুসন্ধানে স্পষ্টভাবে প্রমাণিত হয়েছে—এই ইয়াবা আত্মসাতের ঘটনায় ওসি আফতাব উদ্দিনের কোনো ধরনের সম্পৃক্ততা নেই। বরং তিনি ঘটনার সময় সংশ্লিষ্ট সিদ্ধান্ত গ্রহণ বা তল্লাশি কার্যক্রমের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত ছিলেন না। কেন টার্গেট করা হলো ওসি আফতাব উদ্দিনকে পুলিশ ও স্থানীয় সূত্রগুলো বলছে, ওসি আফতাব উদ্দিন একজন সৎ, সাহসী ও আপসহীন পুলিশ কর্মকর্তা হিসেবে সাম্প্রতিক সময়ে চট্টগ্রামে বিশেষ সুনাম অর্জন করেছেন। তাঁর নেতৃত্বে একের পর এক সন্ত্রাসী গ্রেপ্তার হয়েছে মাদক কারবারিদের বিরুদ্ধে কঠোর অভিযান চালানো হয়েছে চাঁদাবাজি ও দখলবাজির বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স নীতি গ্রহণ করা হয়েছে বিশেষ করে বাকলিয়া এলাকার অবৈধ বালুর ব্যবসার বিরুদ্ধে নজিরবিহীন অভিযান পরিচালিত হয়েছে এইসব অভিযানে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে একটি শক্তিশালী অপরাধী ও সুবিধাভোগী চক্র। শুধু বাইরের সন্ত্রাসী গোষ্ঠী নয়, পুলিশের ভেতরের কিছু অসৎ কর্মকর্তা ওসি আফতাব উদ্দিনের সাফল্য ও জনপ্রিয়তা সহ্য করতে না পেরে তাঁর বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হয়। বিশ্বস্ত সূত্রের দাবি, ইয়াবা আত্মসাতের ঘটনাকে কেন্দ্র করে তাঁকে জড়িয়ে দেওয়ার চেষ্টা ছিল সেই ষড়যন্ত্রেরই অংশ। কিন্তু তদন্তে সেই অপচেষ্টা ভেস্তে গেছে। চট্টগ্রামের এই ইয়াবা আত্মসাতের ঘটনা প্রমাণ করে—আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ভেতরে অনিয়ম থাকলেও, তা আড়াল করে রাখার সুযোগ আর নেই। একই সঙ্গে এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তা দেয়—সৎ ও সাহসী পুলিশ কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করে সত্যকে চাপা দেওয়া যায় না। ওসি আফতাব উদ্দিনের মতো কর্মকর্তারা আজও প্রমাণ করছেন, পুলিশ মানেই অন্যায়ের সহযোগী নয়; বরং অনেক পুলিশ সদস্য এখনও জনগণের নিরাপত্তা ও ন্যায়বিচারের পক্ষে নির্ভীকভাবে দাঁড়িয়ে আছেন।