Home Blog Page 7

আমার ছেলেবেলা ৬ সেই রাতগুলো আজও মনে পড়ে

মো. কামাল উদ্দিন
আমার ছেলেবেলার অনেক কথাই আজ আর স্পষ্ট মনে পড়ে না। সময়ের স্রোতে কত মানুষ হারিয়ে গেছে, কত ঘরবাড়ি বদলে গেছে, কত পরিচিত মুখ অচেনা হয়ে গেছে। কিন্তু কিছু কিছু ঘটনা মানুষের স্মৃতিতে এমনভাবে গেঁথে থাকে, যা বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে মুছে যায় না, বরং আরও গভীর হয়ে ওঠে। আমার ছেলেবেলার সেই স্মৃতিগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বেশি মনে পড়ে আমাদের বাড়ির সেই রাতগুলো, মায়ের অসহ্য মাথাব্যথা, ডাকাতির আতঙ্ক, নদী পেরিয়ে মানুষের আশ্রয় নেওয়া এবং স্বাধীনতার পরের অস্থির বাংলাদেশের সেই দিনগুলো।
স্বাধীনতার পরপরই আমাদের বাড়িতে এক রাতে ডাকাত পড়েছিল। তখন আমি খুব ছোট। বয়স এত কম ছিল যে দেশের রাজনীতি, স্বাধীনতা, যুদ্ধ, অস্ত্র কিংবা অপরাধের ভয়াবহতা বোঝার মতো বয়স আমার হয়নি। কিন্তু ভয় বোঝার বয়স হয়েছিল। মানুষের কান্না বোঝার বয়স হয়েছিল। মায়ের কষ্ট দেখলে বুকের ভেতরটা কেমন করে উঠত, সেটুকু বোঝার বয়স হয়েছিল।
সেই রাতেই আমার মায়ের প্রচণ্ড মাথাব্যথা উঠেছিল।
আমার মায়ের মাথাব্যথা ছিল আমাদের পরিবারের কাছে এক দীর্ঘ দুঃস্বপ্নের মতো। ব্যথা উঠলে মা আর ঘুমাতে পারতেন না। রাত জেগে সবাইকে মায়ের পাশে থাকতে হতো। কখনো মাথায় পানি দেওয়া হতো, কখনো ওষুধ খাওয়ানো হতো, কখনো মাথায় হাত বুলিয়ে দেওয়া হতো। কিন্তু ব্যথা যখন তীব্র হয়ে উঠত, তখন কোনো কিছুতেই যেন মায়ের কষ্ট কমত না।
মায়ের মাথাব্যথার সময় নাক ও চোখ দিয়ে পানি পড়ত। অনেক সময় চোখে ভালোভাবে দেখতে পারতেন না। অসহ্য যন্ত্রণায় মা যখন কাঁদতেন, তখন আমরা ভাইবোনরাও কাঁদতাম। মায়ের সেই কান্না আমাদের ছোট্ট ঘরটাকে যেন আরও ভারী করে তুলত।
আমরা তখন জানতাম না রোগের নাম কী। শুধু শুনতাম, কারও মুখে বলা হচ্ছে মায়ের মাথায় টিউমার হয়েছে। কেউ বলত, মাথার মগজে সমস্যা হয়েছে। কেউ আবার অন্য কোনো রোগের কথা বলত। আমাদের ভয় আরও বেড়ে যেত।
শহরের কত ডাক্তার যে মাকে দেখানো হয়েছিল, তার কোনো হিসাব নেই। কিন্তু তখনকার বাংলাদেশ আর আজকের বাংলাদেশ এক ছিল না। দেশ মাত্র স্বাধীন হয়েছে। যুদ্ধের ক্ষত তখনও শুকায়নি। চারদিকে অভাব, অনিশ্চয়তা এবং নানা সংকট। উন্নত চিকিৎসার সুযোগও ছিল সীমিত। ফলে মায়ের অসুস্থতা আমাদের পরিবারের জন্য শুধু একটি রোগ ছিল না, ছিল প্রতিদিনের এক নতুন দুশ্চিন্তা।
আমার বাবা তখন সংসারের দায়িত্ব সামলাচ্ছেন। আমার বড় তিন বোনও ঘরে। আর আমি ছিলাম একেবারে ছোট। মায়ের মাথাব্যথা উঠলে ঘরের সবাই মাকে ঘিরে বসতাম। কেউ মায়ের মাথায় হাত বুলিয়ে দিত, কেউ পানি এনে দিত, কেউ ওষুধ খুঁজত। আর আমি শুধু মায়ের মুখের দিকে তাকিয়ে থাকতাম।
মায়ের কষ্ট দেখে তখন আমার মনে হতো, মা বুঝি আর কোনোদিন ভালো হবেন না।
এই ভয়টা আমার শিশুমনে খুব গভীরভাবে ঢুকে গিয়েছিল।
এর মধ্যেই এক রাতে ডাকাতদের আগমনের শব্দ শোনা গেল।
রাতের নীরবতা হঠাৎ ভেঙে গেল। চারদিকে মানুষের মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ল। ডাকাতরা বুঝতে পেরেছিল, আমাদের এলাকায় তাদের উপস্থিতির খবর ছড়িয়ে পড়ছে। পরিবারের কাছে পরে শুনেছি, তারা সন্দেহ করেছিল আমাদের বাড়ি থেকেই হয়তো ডাকাতির খবর বাইরে চলে গেছে। সেই সন্দেহ থেকেই আমাদের ঘরের দিকে আক্রমণের চেষ্টা করেছিল।
ডাকাতদের কাছে নাকি আগেই খবর ছিল, আমাদের বাড়ির কোনো একটি ঘরে টাকা রাখা আছে।
সেই সময় আমার জেঠাতো ভাই এজলস মিঞা দুবাই যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন। দুবাই যাওয়ার জন্য তিনি কিছু জায়গা বিক্রি করেছিলেন এবং সেই টাকা ঘরে রেখেছিলেন। ডাকাতরা সেই টাকার সন্ধানেই এসেছিল বলে আমরা পরে জানতে পারি।
কিন্তু ভাগ্যের কী অদ্ভুত পরিহাস।
ডাকাতরা যে ঘরে টাকা রাখা ছিল বলে ধারণা করেছিল, ভুল করে অন্য একটি ঘরের দরজা ভেঙে ঢুকে পড়ে। ফলে তাদের আসল উদ্দেশ্য সফল হয়নি।
কিন্তু তারা যখন প্রত্যাশিত টাকা পেল না, তখন ক্ষোভে পুরো বাড়িতে তাণ্ডব শুরু করল।
আমাদের বাড়ির প্রায় প্রতিটি ঘরেই তারা হামলা চালিয়েছিল। দরজা ভাঙা হয়েছিল। ঘরের আসবাবপত্র তছনছ করা হয়েছিল। জিনিসপত্র ছড়িয়ে ছিটিয়ে দেওয়া হয়েছিল। আমার মনে আছে, আমাদের পশ্চিম পাশের এজলস মিঞার ঘরটি ছাড়া প্রায় সব ঘরেই ডাকাতরা হামলা চালিয়েছিল।
আজ এত বছর পর সেই রাতের কথা মনে হলে সবচেয়ে বেশি মনে পড়ে আমার মায়ের কথা।
বাইরে ডাকাতদের ভয়, আর ঘরের ভেতরে মায়ের অসহ্য মাথাব্যথা।
একজন অসুস্থ মায়ের পাশে বসে থাকা ছোট্ট একটি শিশুর কাছে সেই রাতটি কেমন ছিল, তা ভাষায় পুরোপুরি প্রকাশ করা সম্ভব নয়।
মায়ের কান্না, চারপাশের মানুষের ছোটাছুটি, দরজা ভাঙার শব্দ, আতঙ্কিত মানুষের ফিসফাস এবং বাইরে অন্ধকার রাতের মধ্যে ডাকাতদের আনাগোনা সবকিছু মিলিয়ে সেই রাতটি আমার শৈশবের এক ভয়ংকর ছবির মতো আজও মনে আছে।
স্বাধীনতার পরের সেই বাংলাদেশ
দেশ তখন সদ্য স্বাধীন হয়েছে। মানুষের মনে স্বাধীনতার আনন্দ ছিল, কিন্তু সেই আনন্দের সঙ্গে মিশে ছিল যুদ্ধের ক্ষত এবং ভয়াবহ বাস্তবতা।
দেশের সর্বত্র তখন অভাব ছিল। খাদ্যের সংকট ছিল। মানুষের হাতে টাকা ছিল না। যোগাযোগ ব্যবস্থা ছিল দুর্বল। চারদিকে যুদ্ধের ধ্বংসাবশেষ। কোথাও বাড়িঘর ক্ষতিগ্রস্ত, কোথাও পরিবার হারিয়েছে আপনজনকে, কোথাও মানুষ অস্ত্র হাতে ঘুরছে।
দেশ স্বাধীন হয়েছে, কিন্তু মানুষের জীবনে তখনও শান্তি পুরোপুরি ফিরে আসেনি।
রাতে ডাকাতির ভয় ছিল। কোথাও কোথাও হত্যা, রাহাজানি এবং বিভিন্ন অপরাধের খবর পাওয়া যেত। মানুষের মনে নিরাপত্তাহীনতা ছিল প্রবল।
অস্ত্র উদ্ধারের জন্য তখন বিভিন্ন এলাকায় অভিযান চলত। রক্ষীবাহিনীর নাম আমরা ছোটবেলায় শুনতাম এবং তাদের উপস্থিতি আমাদের মনে এক ধরনের ভয় তৈরি করত।
বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সরকার স্বাধীনতার পর দেশকে অস্ত্রমুক্ত করার উদ্যোগ নিয়েছিল। অস্ত্র জমা দেওয়ার জন্য সাধারণ ক্ষমার ঘোষণার কথাও তখন মানুষের মুখে মুখে ছিল। কিন্তু সব অস্ত্র যে জমা পড়েনি, সেটিও আমরা বড়দের আলোচনায় শুনতাম।
অস্ত্র উদ্ধারের অভিযানে আমাদের এলাকায়ও নানা ঘটনা ঘটেছে।
আমরা ছোট ছিলাম বলে এসব ঘটনার রাজনৈতিক কিংবা আইনি দিক বুঝতাম না। আমরা শুধু দৃশ্য দেখতাম। কখনো কাউকে ধরে আনা হচ্ছে, কখনো কাউকে রাস্তায় দাঁড় করিয়ে রাখা হচ্ছে, কখনো গাছের সঙ্গে বেঁধে রাখা হচ্ছে। কোনো কোনো দৃশ্য আমাদের ভয় দেখাত, আবার শিশুমনের কৌতূহলও জাগাত।
আজ বয়সের ভারে দাঁড়িয়ে সেই স্মৃতিগুলোকে অন্যভাবে দেখি।
তখন যা দেখে কৌতূহল হতো, আজ তা মনে হলে বিবেক প্রশ্ন করে।
একজন মানুষকে শাস্তি দেওয়ার অধিকার কার?
অপরাধ করলে তার বিচার হবে, সেটিই স্বাভাবিক। কিন্তু বিচার আর প্রতিশোধ এক জিনিস নয়। আইন আর জনতার ক্রোধও এক জিনিস নয়।
শিশু বয়সে এসব বুঝিনি। কিন্তু বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে বুঝেছি, স্বাধীনতার পরের সেই অস্থির সময়টি ছিল আমাদের জাতির জন্য অত্যন্ত কঠিন একটি অধ্যায়।
মুক্তিযোদ্ধাদের দেখলেই অন্যরকম অনুভূতি হতো
আমাদের এলাকায় অনেক মুক্তিযোদ্ধা ছিলেন। তাদের আমরা আলাদা চোখে দেখতাম।
তখন মুক্তিযুদ্ধের প্রকৃত ইতিহাসের গভীরতা বোঝার মতো বয়স আমাদের ছিল না। কিন্তু আমরা জানতাম, তারা দেশের জন্য যুদ্ধ করেছেন। তারা পাকিস্তানি বাহিনীর বিরুদ্ধে অস্ত্র হাতে নিয়েছিলেন। তারা স্বাধীনতার জন্য জীবন বাজি রেখেছিলেন।
তাই তাদের প্রতি আমাদের এক ধরনের শ্রদ্ধা ছিল।
মুক্তিযোদ্ধারা যখন এলাকায় আসতেন, আমরা দূর থেকে তাদের দেখতাম। তাদের হাতে অস্ত্র থাকত। তাদের চলাফেরায় একটা আলাদা আত্মবিশ্বাস ছিল। আমাদের কাছে তারা যেন বাস্তব জীবনের নায়ক।
আমরা মনে মনে ভাবতাম, আমরা যদি একটু বড় হতাম, আমরাও মুক্তিযোদ্ধা হতাম।
বাস্তবে আমরা যুদ্ধ করতে পারিনি। কিন্তু যুদ্ধ যুদ্ধ খেলতাম।
আমাদের খেলার মাঠই ছিল আমাদের যুদ্ধক্ষেত্র। কেউ মুক্তিযোদ্ধা, কেউ শত্রু। বাঁশের কঞ্চি কখনো বন্দুক হয়ে যেত, কাঠের টুকরো হয়ে যেত অস্ত্র। আমরা দল ভাগ করে যুদ্ধ করতাম। কখনো ধাওয়া, কখনো পালানো, কখনো ধরা পড়া। খেলার মধ্যে হাতাহাতি হতো, কখনো মারামারিও হয়ে যেত। কিন্তু কিছুক্ষণ পর আবার সবাই বন্ধু হয়ে যেতাম।
শৈশবের সেই খেলাগুলো ছিল আমাদের কাছে আনন্দের, কিন্তু আজ বুঝি, সেগুলোর মধ্যেও আমাদের চারপাশের ইতিহাসের ছায়া ছিল।
রাজাকার ধরার দৃশ্য
স্বাধীনতার পর রাজাকার ধরার ঘটনাও আমরা দেখেছি।
যাদের রাজাকার হিসেবে ধরা হতো, তাদের অনেক সময় অপমানজনকভাবে এলাকায় ঘোরানো হতো। কারও গলায় জুতো পরিয়ে দেওয়া হতো, কারও কোমরে রশি বাঁধা হতো। মানুষ তাদের দেখতে ছুটে আসত।
আমরাও ছোটরা দল বেঁধে পেছনে পেছনে যেতাম।
কখনো হাততালি দিতাম।
তখন আমাদের কাছে বিষয়টি ছিল এক ধরনের দৃশ্য, এক ধরনের উত্তেজনা। আমরা বুঝতাম না মানুষের অপমানের ভেতর কত গভীর ইতিহাস লুকিয়ে থাকে।
যাদের একসময় এলাকার প্রভাবশালী মানুষ হিসেবে সবাই ভয় করত, তাদেরই একদিন দড়ি দিয়ে টেনে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে দেখে আমরা বিস্মিত হতাম।
তখন মনে হতো, এটাই বুঝি ন্যায়বিচার।
আজ বুঝি, ন্যায়বিচারের প্রকৃত সৌন্দর্য প্রতিশোধে নয়, ন্যায়সংগত বিচারে।
কর্ণফুলী নদীর তীরে আমাদের বাড়ি
আমাদের বাড়ির সবচেয়ে বড় সৌন্দর্য ছিল কর্ণফুলী নদী।
নদীটি আমাদের জীবনের সঙ্গে এমনভাবে মিশে ছিল যে নদী ছাড়া আমাদের বাড়িকে কল্পনা করা কঠিন।
আমরা ছিলাম কর্ণফুলী নদীর দক্ষিণ তীরে। নদীর ওপারে ছিল রাউজানের নোয়াপাড়া। সেই অঞ্চলে হিন্দু পরিবারের সংখ্যা ছিল অনেক।
মুক্তিযুদ্ধের সময় নদীটি শুধু নদী ছিল না। নদী হয়ে উঠেছিল মানুষের পালিয়ে যাওয়ার পথ, নিরাপদ আশ্রয়ে যাওয়ার পথ এবং কখনো কখনো বেঁচে থাকার শেষ অবলম্বন।
রাত গভীর হলে অনেক মানুষ নদী পার হয়ে আমাদের পাড়ে আসত।
বিশেষ করে হিন্দু পরিবারের অনেক নারী ও তরুণী রাতের অন্ধকারে নদী পার হয়ে আমাদের বাড়িতে আশ্রয় নিতেন।
আমাদের ঘরে কত শত মানুষ রাত কাটিয়েছে, তার কোনো হিসাব নেই।
আজও চোখ বন্ধ করলে সেই দৃশ্য দেখতে পাই।
রাতের অন্ধকার।
নদীর ওপার থেকে নৌকা আসছে।
কেউ ভয়ে চুপ করে আছে।
কেউ সন্তানকে বুকে জড়িয়ে রেখেছে।
কেউ আবার বারবার পেছনে তাকাচ্ছে।
তারা জানত না পরদিন কী হবে।
তারা শুধু জানত, আজ রাতটা বাঁচতে হবে।
আমাদের বাড়ির দরজা তাদের জন্য খুলে যেত।
আমার মা এবং বাবা নিজের পরিবারের নিরাপত্তা নিয়ে চিন্তিত থাকলেও অসহায় মানুষকে ফিরিয়ে দিতেন না।
আমাদের চারজন বড় বোন ছিল। স্বাভাবিকভাবেই মা বাবার মনে ভয় ছিল। বাড়িতে এত অপরিচিত মানুষ, তার মধ্যে হিন্দু পরিবারগুলোর নিয়মিত আসা যাওয়া, আর বাইরে তখনকার অস্থির পরিস্থিতি, সব মিলিয়ে ঝুঁকি কম ছিল না।
তবুও মানুষের বিপদের সময় মানুষকে আশ্রয় দেওয়া হয়েছিল।
আজ মনে হয়, সেটাই ছিল আমাদের পরিবারের সবচেয়ে বড় মানবিক শিক্ষা।
ধর্মের পরিচয়ের ওপরে মানুষের পরিচয়
আমাদের এলাকায় সবাই একই রকম ছিল না।
কেউ মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে ছিল। কেউ ধর্মকে সামনে রাখত। কেউ আবার নানা কারণে পাকিস্তানি পক্ষের মানুষের সঙ্গে যোগাযোগ রাখত বলে এলাকায় আলোচনা ছিল।
কিছু মানুষ নাকি গোপনে রাজাকারদের কাছে খবর দিত যে আমাদের এলাকায় হিন্দু পরিবারগুলো আসা যাওয়া করছে এবং কোথায় তারা আশ্রয় নিচ্ছে।
এই খবর যদি সত্যিই বাইরে চলে যায়, তাহলে আমাদের বাড়িও যে বিপদের মধ্যে পড়তে পারত, তা বলার অপেক্ষা রাখে না।
আমার মা বাবার জন্য সেটি ছিল এক কঠিন সময়।
একদিকে নিজের সন্তানদের নিরাপত্তা।
অন্যদিকে অসুস্থ মা।
তার ওপর বাড়িতে আশ্রয় নেওয়া অসহায় মানুষ।
বাইরে ডাকাতির ভয়।
চারদিকে যুদ্ধের পরের অস্থিরতা।
তারপরও আমাদের বাড়ির দরজা বন্ধ হয়ে যায়নি।
আজ যখন সেই দিনগুলোর কথা মনে করি, তখন বুঝতে পারি, আমার মা শুধু একজন মা ছিলেন না, তিনি ছিলেন একজন অসহায় মানুষের আশ্রয়।
আমার বাবা শুধু পরিবারের কর্তা ছিলেন না, তিনি ছিলেন কঠিন সময়ের একজন নীরব সাহসী মানুষ।
তাদের কোনো বড় বক্তৃতা ছিল না।
কোনো মঞ্চ ছিল না।
কোনো সংবাদপত্রে তাদের ছবি ছাপা হয়নি।
কিন্তু রাতের অন্ধকারে ভীত মানুষকে নিজের ঘরে জায়গা করে দেওয়া যে কত বড় মানবিক কাজ, সেটি আমি বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে বুঝেছি।
সেই রাতগুলো আমাকে মানুষ চিনতে শিখিয়েছে
আমার ছেলেবেলার সেই দিনগুলো ছিল ভয় আর ভালোবাসার এক অদ্ভুত মিশ্রণ।
একদিকে ছিল মায়ের অসহ্য মাথাব্যথা।
অন্যদিকে ছিল ডাকাতির আতঙ্ক।
একদিকে ছিল স্বাধীনতার আনন্দ।
অন্যদিকে ছিল যুদ্ধের পরের অস্থিরতা।
একদিকে ছিল মুক্তিযোদ্ধাদের প্রতি আমাদের শিশুমনের শ্রদ্ধা।
অন্যদিকে ছিল মানুষের ওপর নির্যাতনের দৃশ্য।
একদিকে ছিল রাজাকারদের ধরে নিয়ে যাওয়ার দৃশ্য।
অন্যদিকে ছিল রাতের অন্ধকারে পালিয়ে আসা অসহায় মানুষের চোখের ভয়।
এই সবকিছুর মধ্যেই আমার শৈশব তৈরি হয়েছে।
আমি তখন বুঝিনি, কিন্তু আজ বুঝি, আমার ছেলেবেলার সেই নদী আমাকে মানুষের কষ্ট দেখতে শিখিয়েছে।
মায়ের যন্ত্রণা আমাকে অসহায় মানুষের কান্না বুঝতে শিখিয়েছে।
ডাকাতির রাত আমাকে নিরাপত্তার মূল্য বুঝিয়েছে।
মুক্তিযোদ্ধাদের দেখে দেশপ্রেমের প্রথম অনুভূতি পেয়েছি।
আর রাতের অন্ধকারে আশ্রয় নেওয়া হিন্দু পরিবারগুলোর মুখ আমাকে শিখিয়েছে, মানুষের পরিচয়ের সবচেয়ে বড় নাম মানুষ।
আজও যখন কর্ণফুলী নদীর দিকে তাকাই, আমার মনে হয় নদীটি শুধু পানি বয়ে নিয়ে যায়নি।
সে বয়ে নিয়ে গেছে আমার শৈশব।
সে বয়ে নিয়ে গেছে যুদ্ধের স্মৃতি।
সে বয়ে নিয়ে গেছে মায়ের কান্না।
সে বয়ে নিয়ে গেছে অসংখ্য মানুষের ভয়।
আর সে বয়ে নিয়ে গেছে সেই সময়ের মানুষের ভালোবাসা, সাহস ও মানবিকতার গল্প।
আমার ছেলেবেলার সেই রাতগুলো তাই আজও আমার কাছে শুধু স্মৃতি নয়।
সেগুলো আমার জীবনবোধের প্রথম পাঠ।
সেই পাঠ আমাকে শিখিয়েছে, মানুষ বিপদে পড়লে তার পাশে দাঁড়ানোই সবচেয়ে বড় পরিচয়।
সেই পাঠ আমাকে শিখিয়েছে, স্বাধীনতার প্রকৃত অর্থ শুধু একটি ভূখণ্ডের স্বাধীনতা নয়।
স্বাধীনতার অর্থ হলো একজন মা যেন সন্তানের সামনে নিশ্চিন্তে ঘুমাতে পারেন।
একজন মানুষ যেন ধর্মের কারণে নিজের ঘর ছেড়ে পালাতে বাধ্য না হন।
একজন অসুস্থ মানুষ যেন চিকিৎসার অভাবে কষ্টে কাতরাতে না হয়।
আর কোনো শিশুকে যেন রাতের অন্ধকারে দরজা ভাঙার শব্দ শুনে ভয়ে কাঁপতে না হয়।
আমার ছেলেবেলার সেই দিনগুলো আজও আমাকে প্রশ্ন করে।
আমরা কি সত্যিই সেই ভয়গুলো থেকে মুক্ত হতে পেরেছি?
সময়ের সঙ্গে অনেক কিছু বদলেছে।
দেশ বদলেছে।
শহর বদলেছে।
মানুষের জীবন বদলেছে।
কিন্তু মানুষের প্রতি মানুষের দায়বদ্ধতা কি বদলেছে?
এই প্রশ্নের উত্তর আমি আজও খুঁজে চলেছি।
হয়তো আমার ছেলেবেলার গল্প শেষ হয়নি।
কারণ নদী এখনও বয়ে যায়।
স্মৃতি এখনও জেগে থাকে।
আর মায়ের সেই কাতর মুখটি আজও আমার হৃদয়ের ভেতর নীরবে বলে যায়, মানুষের কষ্টকে কখনো ছোট করে দেখো না।

এপিবিএন: ইতিহাসের অগ্রযাত্রায় জিয়াউর রহমান থেকে আজিজুল হক, আজিজুল হক থেকে হাসিব আজিজ একটি বাহিনীর জন্ম, রাষ্ট্রের নিরাপত্তা ভাবনার বিবর্তন, দুই প্রজন্মের নেতৃত্ব এবং জননিরাপত্তার নতুন অঙ্গীকার

মো. কামাল উদ্দিনঃ
ইতিহাস কখনো শুধু কয়েকটি তারিখ, সরকারি প্রজ্ঞাপন কিংবা পুরোনো নথির স্তূপ নয়। ইতিহাসের গভীরে থাকে একটি সময়ের প্রয়োজন, রাষ্ট্রের নিরাপত্তা ভাবনা, মানুষের জীবন ও সম্পদের সুরক্ষার দায়, সংকট মোকাবিলার অভিজ্ঞতা এবং কিছু মানুষের নেতৃত্বের অমোচনীয় ছাপ।
বাংলাদেশের আর্মড পুলিশ ব্যাটালিয়ন বা এপিবিএন সেই অর্থে শুধু একটি বিশেষায়িত পুলিশ বাহিনীর নাম নয়। এটি বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা ব্যবস্থার পরিবর্তন, বিশেষায়িত পুলিশিংয়ের বিকাশ, দুর্গম এলাকা থেকে গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনার নিরাপত্তা, সন্ত্রাস ও অপরাধ মোকাবিলা এবং সর্বশেষে জনবান্ধব ও আইনভিত্তিক আধুনিক পুলিশিংয়ের দিকে এগিয়ে যাওয়ার একটি দীর্ঘ ইতিহাস।
এই ইতিহাসের একটি প্রান্তে রয়েছে ১৯৭৯ সালের The Armed Police Battalions Ordinance। ৩১ মার্চ ১৯৭৯ জারি হওয়া ওই অধ্যাদেশ এপিবিএন গঠন ও পরিচালনার আইনগত ভিত্তি তৈরি করে।
আর আজ ২০২৬ সালে এসে সেই ১৯৭৯ সালের আইনগত কাঠামোকে যুগোপযোগী করে নতুন আর্মড পুলিশ ব্যাটালিয়ন আইন, ২০২৬ প্রণীত হয়েছে। ১৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬ সরকারি গেজেটে নতুন আইনটি প্রকাশিত হয়েছে। অর্থাৎ ১৯৭৯ সালের অধ্যাদেশ থেকে ২০২৬ সালের আইনে এপিবিএনের দীর্ঘ অভিযাত্রা একটি নতুন আইনগত অধ্যায়ে প্রবেশ করেছে।
এই দীর্ঘ পথের দিকে ফিরে তাকালে কয়েকটি নাম, কয়েকটি সময় এবং কয়েকটি অধ্যায় বিশেষভাবে সামনে আসে। জিয়াউর রহমানের রাষ্ট্র পরিচালনার সময়, আজিজুল হকের প্রারম্ভিক নেতৃত্ব এবং কয়েক দশক পর হাসিব আজিজের নেতৃত্ব। এ যেন একটি প্রতিষ্ঠানের ইতিহাসে দুই প্রজন্মের দায়িত্বের এক দীর্ঘ সেতুবন্ধন।
জিয়াউর রহমানের সময়: নতুন নিরাপত্তা কাঠামোর প্রাতিষ্ঠানিক সূচনা
স্বাধীনতার পর বাংলাদেশকে একদিকে রাষ্ট্র পুনর্গঠন, অন্যদিকে অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা ও আইনশৃঙ্খলার নানা চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে হয়েছে। সত্তরের দশকের শেষভাগে রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা কাঠামোকে আরও সংগঠিত ও বিশেষায়িত করার প্রয়োজনীয়তা সামনে আসে।
সেই সময় রাষ্ট্রপতি ছিলেন শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান।
১৯৭৯ সালের ৩১ মার্চ The Armed Police Battalions Ordinance, 1979 জারি হয়। এর মাধ্যমে Armed Police Battalions নামে একটি বিশেষায়িত সশস্ত্র পুলিশ কাঠামোর আইনগত ভিত্তি তৈরি হয়।
তাই রাজনৈতিক মূল্যায়নের বাইরে একটি ঐতিহাসিক তথ্য হিসেবে বলা যায়, এপিবিএনের প্রাতিষ্ঠানিক আইনগত যাত্রা জিয়াউর রহমান রাষ্ট্র পরিচালনার সময়েই শুরু হয়েছিল।
একটি বাহিনীর জন্ম মানে শুধু অস্ত্র, পোশাক কিংবা জনবল নয়। এর জন্য প্রয়োজন হয় শৃঙ্খলা, কমান্ড কাঠামো, প্রশিক্ষণ, সাংগঠনিক সংস্কৃতি, দায়িত্ব পালনের মানসিকতা এবং সর্বোপরি রাষ্ট্র ও মানুষের নিরাপত্তাকে সামনে রেখে একটি পেশাদার বাহিনী গড়ে তোলার দীর্ঘ প্রস্তুতি।
আজিজুল হক: প্রতিষ্ঠার শুরুর দিনের একটি গুরুত্বপূর্ণ নাম
এপিবিএনের প্রারম্ভিক ইতিহাসের সঙ্গে তৎকালীন ডিআইজি আজিজুল হকের নাম যুক্ত থাকার বিষয়টি বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য।
আপনার সংগৃহীত স্মৃতিচারণ ও তথ্য অনুযায়ী, ১৮ এপ্রিল ১৯৮০ থেকে ১৯ জুলাই ১৯৮০ পর্যন্ত তিনি এপিবিএনের প্রাথমিক পর্যায়ের দায়িত্বে ছিলেন। পরবর্তী সময়ে তিনি বাংলাদেশ পুলিশের আইজিপি হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন।
একটি প্রতিষ্ঠানের জন্মলগ্নে কয়েক মাসও কখনো কখনো দীর্ঘ ইতিহাসের ভিত্তি হয়ে থাকে। কারণ তখন একটি নতুন বাহিনীকে দাঁড় করানোর প্রশ্ন ছিল। কী হবে তার দায়িত্ব, কী হবে তার কমান্ড কাঠামো, কীভাবে হবে সদস্যদের প্রশিক্ষণ, কীভাবে গড়ে উঠবে অপারেশনাল সক্ষমতা এবং কীভাবে দুর্গম অঞ্চলে রাষ্ট্রের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হবে, এসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে খুঁজতেই এপিবিএনের সাংগঠনিক চরিত্র ধীরে ধীরে বিকশিত হয়েছে।
বিলাইছড়ি: পাহাড়ের দুর্গমতায় এপিবিএনের শুরুর স্মৃতি
রাঙামাটির বিলাইছড়ি। পাহাড়, নদী, দুর্গম জনপদ আর কঠিন ভৌগোলিক বাস্তবতার এক জনপদ।
এপিবিএনের প্রারম্ভিক সময়ের স্মৃতিচারণে বিলাইছড়ির নামও বিশেষভাবে উঠে আসে। আপনার সংগৃহীত তথ্য অনুযায়ী, রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের উপস্থিতিতে সেখানে এপিবিএনের প্রথম ব্যাটালিয়নের কার্যক্রম উদ্বোধনের সঙ্গে আজিজুল হকের নামও যুক্ত রয়েছে।
তবে ইতিহাসের স্বার্থে এই অংশটি আরও শক্তভাবে প্রতিষ্ঠা করতে সরকারি আদেশ, উদ্বোধনী নথি, পুরোনো ছবি, সংবাদপত্রের প্রতিবেদন এবং প্রত্যক্ষদর্শীদের সাক্ষ্য সংরক্ষণ করা জরুরি।
কারণ স্মৃতি ইতিহাসের প্রাণ, আর নথি ইতিহাসের মেরুদণ্ড।
দুর্গম পাহাড়ে দায়িত্ব পালন ছিল সহজ কোনো কাজ নয়। সীমিত যোগাযোগব্যবস্থা, কঠিন যাতায়াত, ভৌগোলিক প্রতিকূলতা এবং নিরাপত্তা পরিস্থিতির মধ্যে এপিবিএনের সদস্যদের দায়িত্ব পালন করতে হয়েছে। সেই দায়িত্বের মধ্য দিয়েই একটি বিশেষায়িত বাহিনীর মাঠপর্যায়ের সংস্কৃতি তৈরি হয়েছে।
অস্ট্রেলিয়ায় প্রশিক্ষণ এবং ইতিহাসের নির্মম বাঁক
আপনার সংগৃহীত স্মৃতিচারণে আরও জানা যায়, আজিজুল হক অস্ট্রেলিয়ায় উচ্চতর প্রশিক্ষণে ছিলেন।
১৯৮১ সালের ৩০ মে চট্টগ্রামে রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান নিহত হন। স্মৃতিচারণ অনুযায়ী, সেই সময় আজিজুল হক অস্ট্রেলিয়ায় প্রশিক্ষণে ছিলেন।
ইতিহাসের কী অদ্ভুত পরিহাস। একজন রাষ্ট্রনায়ক দেশের মাটিতে জীবন হারালেন, আর তাঁর সময়ের নিরাপত্তা কাঠামো গড়ে তোলার সঙ্গে যুক্ত একজন কর্মকর্তা তখন দেশের বাইরে পেশাগত প্রশিক্ষণে ছিলেন।
কিন্তু রাষ্ট্র থেমে থাকেনি। প্রতিষ্ঠান থেমে থাকেনি। এপিবিএনের যাত্রাও থেমে থাকেনি।
সময়ের সঙ্গে নেতৃত্ব বদলেছে, প্রজন্ম বদলেছে, প্রযুক্তি বদলেছে, অপরাধের ধরন বদলেছে এবং নিরাপত্তার চ্যালেঞ্জ বদলেছে। কিন্তু রাষ্ট্র ও মানুষের নিরাপত্তার দায়িত্ব থেকে গেছে।
পাহাড় থেকে বিমানবন্দর, গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা থেকে শরণার্থী শিবির
সময় যত গড়িয়েছে, এপিবিএনের দায়িত্বও তত বিস্তৃত হয়েছে।
বাংলাদেশ পুলিশের সরকারি তথ্য অনুযায়ী, এপিবিএনের মূল দায়িত্বের মধ্যে অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা রক্ষা, সশস্ত্র অপরাধী চক্র দমন, অবৈধ অস্ত্র ও বিস্ফোরক উদ্ধারে সহায়তা এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় পুলিশের সহায়তা অন্যতম। বাহিনীর বিভিন্ন ইউনিট গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা ও গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের নিরাপত্তার দায়িত্বও পালন করে।
আজকের এপিবিএনের দায়িত্ব তাই শুধু কোনো একটি অঞ্চল বা একটি ধরনের নিরাপত্তা কার্যক্রমে সীমাবদ্ধ নয়। দেশের গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা, বিমানবন্দর, বিশেষ নিরাপত্তা, সরকার ঘোষিত স্থাপনা, দুর্গম এলাকা, রোহিঙ্গা শরণার্থী শিবির, সন্ত্রাস ও সংঘবদ্ধ অপরাধ মোকাবিলায় সহায়তা, মানবপাচার ও মাদকবিরোধী কার্যক্রম এবং অন্যান্য আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে সহায়তা করার মতো বহুমাত্রিক দায়িত্ব এ বাহিনীর ওপর রয়েছে।
সব মিলিয়ে এপিবিএন এখন বাংলাদেশের বহুমাত্রিক নিরাপত্তা কাঠামোর একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
বিমানবন্দর ও রোহিঙ্গা ক্যাম্প: দায়িত্বের নতুন বাস্তবতা
বিমানবন্দর কোনো সাধারণ স্থাপনা নয়। এটি একটি দেশের প্রবেশদ্বার, অর্থনীতি ও যোগাযোগের গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র এবং একই সঙ্গে উচ্চমাত্রার নিরাপত্তা সংবেদনশীল এলাকা।
অন্যদিকে কক্সবাজার ও অন্যান্য স্থানে রোহিঙ্গা শরণার্থী শিবির বাংলাদেশের জন্য দীর্ঘমেয়াদি মানবিক ও নিরাপত্তা বাস্তবতা তৈরি করেছে।
এই ধরনের বিশাল ও জটিল নিরাপত্তা দায়িত্ব পালনে প্রয়োজন শুধু সদস্য সংখ্যা নয়। প্রয়োজন প্রশিক্ষিত জনবল, আধুনিক যানবাহন, উন্নত যোগাযোগ ব্যবস্থা, নজরদারি প্রযুক্তি, সুরক্ষা সরঞ্জাম, আবাসন ও চিকিৎসা সুবিধা, পর্যাপ্ত লজিস্টিক সহায়তা এবং সর্বোপরি দক্ষ ও দায়িত্বশীল নেতৃত্ব।
২০২৬: পুরোনো অধ্যাদেশ থেকে নতুন আইনের পথে
এপিবিএনের ইতিহাসে ২০২৬ সাল একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক।
২৪ আগস্ট ২০২৬ প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত মন্ত্রিসভার বৈঠকে আর্মড পুলিশ ব্যাটালিয়ন আইন, ২০২৬ এর খসড়ায় নীতিগত ও চূড়ান্ত অনুমোদন দেওয়া হয়। নতুন কাঠামোর অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দিক ছিল এপিবিএনকে আরও জনবান্ধব করা এবং ফৌজদারি অপরাধ তদন্ত ও সংশ্লিষ্ট কার্যক্রম পরিচালনার ক্ষমতা দেওয়া।
এরপর ১০ সেপ্টেম্বর জাতীয় সংসদে বিলটি পাস হয় এবং ১৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬ সরকারি গেজেটে আর্মড পুলিশ ব্যাটালিয়ন আইন, ২০২৬ হিসেবে প্রকাশিত হয়।
অর্থাৎ ১৯৭৯ সালের অধ্যাদেশের মাধ্যমে যে বাহিনীর আইনগত ভিত্তি তৈরি হয়েছিল, ২০২৬ সালে এসে সেই কাঠামো নতুন বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ একটি পূর্ণাঙ্গ আইনের রূপ পেল।
এটি শুধু আইনের পরিবর্তন নয়। এটি দায়িত্বের পরিবর্তন, সক্ষমতার পরিবর্তন এবং জবাবদিহির নতুন প্রত্যাশাও।
তদন্তের ক্ষমতা: ক্ষমতার সঙ্গে বাড়বে দায়িত্বও
নতুন আইন এপিবিএনকে ফৌজদারি অপরাধ তদন্ত ও সংশ্লিষ্ট কার্যক্রম পরিচালনার ক্ষমতা দিয়েছে। একই সঙ্গে এ দায়িত্ব ফৌজদারি কার্যবিধি ও প্রচলিত আইনের অধীন পরিচালনার কথা বলা হয়েছে।
এই পরিবর্তন এপিবিএনের জন্য যেমন নতুন সুযোগ, তেমনি নতুন দায়িত্বও।
কারণ তদন্ত মানে শুধু আসামি গ্রেপ্তার নয়। তদন্ত মানে তথ্য সংগ্রহ, প্রমাণ সংরক্ষণ, সাক্ষ্য যাচাই, আইনগত প্রক্রিয়া অনুসরণ, নিরপেক্ষতা বজায় রাখা, মানবাধিকারের প্রতি শ্রদ্ধাশীল থাকা এবং আদালতে গ্রহণযোগ্য একটি সুষ্ঠু তদন্ত প্রতিবেদন তৈরি করা।
অতএব এপিবিএনের তদন্তক্ষমতার সঙ্গে তদন্ত কর্মকর্তাদের বিশেষায়িত প্রশিক্ষণ, ফরেনসিক সক্ষমতা, সাইবার অপরাধ তদন্তের দক্ষতা, তথ্যপ্রযুক্তি, ডেটা বিশ্লেষণ এবং পর্যাপ্ত লজিস্টিক সহায়তা সমানভাবে জরুরি।
ক্ষমতা যত বাড়বে, জবাবদিহিও তত বাড়তে হবে।
আজিজুল হক থেকে হাসিব আজিজ: ইতিহাসের বিরল প্রজন্মান্তর
এখানেই এপিবিএনের ইতিহাস একটি ভিন্ন মাত্রা পায়।
আজিজুল হক ছিলেন এপিবিএনের প্রারম্ভিক সময়ের সঙ্গে যুক্ত একজন কর্মকর্তা। কয়েক দশক পর তাঁর সন্তান অতিরিক্ত আইজিপি হাসিব আজিজ এপিবিএনের প্রধানের দায়িত্ব গ্রহণ করেন।
১৬ মার্চ ২০২৬ সালের সরকারি সিদ্ধান্তের বিষয়ে বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থা জানিয়েছে, তৎকালীন চট্টগ্রাম মহানগর পুলিশ কমিশনার অতিরিক্ত আইজিপি হাসিব আজিজকে এপিবিএনের প্রধান হিসেবে পদায়ন করা হয়।
এ যেন একই প্রতিষ্ঠানের ইতিহাসে সময়ের দুই প্রান্তের মিলন।
এক প্রজন্ম দেখেছে প্রতিষ্ঠার শুরুর দিন। পরবর্তী প্রজন্ম দায়িত্ব নিয়েছে পরিবর্তিত ও বিস্তৃত নিরাপত্তা বাস্তবতার একটি বাহিনীর।
বাবার সময়ের এপিবিএন আর সন্তানের সময়ের এপিবিএন এক নয়। তখন ছিল প্রতিষ্ঠার সময়, এখন আধুনিকায়নের সময়। তখন ছিল সীমিত প্রযুক্তি, এখন ডিজিটাল নিরাপত্তা, সাইবার অপরাধ, আধুনিক নজরদারি ও দ্রুত প্রতিক্রিয়ার যুগ। তখন ছিল একটি নতুন বিশেষায়িত বাহিনীকে দাঁড় করানোর চ্যালেঞ্জ, এখন সেই প্রতিষ্ঠানকে আরও দক্ষ, আধুনিক, জবাবদিহিমূলক ও জনমুখী করে তোলার চ্যালেঞ্জ।
হাসিব আজিজের সামনে নতুন অধ্যায়
হাসিব আজিজের এপিবিএন নেতৃত্বের সময়টি তাই শুধু একটি পদায়নের ঘটনা হিসেবে দেখলে এর বৃহত্তর তাৎপর্য ধরা পড়বে না।
তাঁর সামনে রয়েছে একটি ঐতিহাসিক বাহিনীকে নতুন বাস্তবতার সঙ্গে এগিয়ে নেওয়ার দায়িত্ব। তদন্তক্ষমতার নতুন আইনগত কাঠামো বাস্তবায়ন, গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনার নিরাপত্তা জোরদার, বিমানবন্দরের নিরাপত্তা ব্যবস্থাকে আরও সক্ষম করা, রোহিঙ্গা শিবিরে নিরাপত্তা ও জনসম্পৃক্ততা বাড়ানো, সন্ত্রাস, মাদক, মানবপাচার ও সংঘবদ্ধ অপরাধ মোকাবিলায় বিশেষায়িত সক্ষমতা বৃদ্ধি, আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার, সদস্যদের প্রশিক্ষণ উন্নত করা এবং একই সঙ্গে এপিবিএনকে আরও জনবান্ধব বাহিনী হিসেবে গড়ে তোলার দায়িত্ব তাঁর নেতৃত্বের সময়ের গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।
এই জায়গাতেই প্রয়োজন জনবল বৃদ্ধি ও পর্যাপ্ত লজিস্টিক সহায়তা।
কারণ দায়িত্ব যদি বাড়ে, সক্ষমতাও বাড়াতে হয়।
একটি বাহিনীকে দিয়ে যদি বিমানবন্দর থেকে রোহিঙ্গা শিবির, গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা থেকে বিশেষ নিরাপত্তা, অপরাধ দমন থেকে তদন্ত পর্যন্ত বিস্তৃত দায়িত্ব পালন করাতে হয়, তাহলে সেই বাহিনীর সদস্যদের জন্য পর্যাপ্ত জনবল, যানবাহন, অস্ত্র ও সুরক্ষা সরঞ্জাম, যোগাযোগব্যবস্থা, প্রযুক্তি, আবাসন, চিকিৎসা এবং প্রশিক্ষণ সুবিধা নিশ্চিত করা জরুরি।
এটি কোনো অতিরিক্ত সুবিধা নয়। এটি দায়িত্ব পালনের অবকাঠামো।
এপিবিএনের সাফল্যের গল্প: নীরব দায়িত্বের মহাকাব্য
এপিবিএনের সাফল্যের গল্প সবসময় সংবাদপত্রের শিরোনামে আসে না।
কোনো গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনায় রাত জেগে পাহারা দেওয়া একজন সদস্যের গল্প সংবাদ হয় না। বিমানবন্দরের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ঘণ্টার পর ঘণ্টা দায়িত্ব পালন করা সদস্যের ক্লান্ত চোখও সংবাদ হয় না। রোহিঙ্গা ক্যাম্পের জটিল পরিবেশে দায়িত্ব পালন করা সদস্যের প্রতিদিনের ঝুঁকিও অনেক সময় অদৃশ্য থেকে যায়।
কিন্তু রাষ্ট্রের নিরাপত্তা অনেক সময় এমনই।
সাফল্য তখনই সবচেয়ে বড়, যখন সাধারণ মানুষ নিরাপদে ঘুমাতে পারে। একটি গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা নির্বিঘ্নে চালু থাকে। একজন বিদেশি অতিথি নিরাপদে দেশে প্রবেশ করেন। একটি ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা নিয়ন্ত্রণে থাকে। একটি অপরাধী চক্রের বিরুদ্ধে অভিযান সফল হয়। একটি শিশুর নিরাপত্তা নিশ্চিত হয়। একজন সাধারণ মানুষ পুলিশের কাছে গিয়ে আস্থার সঙ্গে কথা বলতে পারেন।
সেই অদৃশ্য নিরাপত্তার দেয়াল নির্মাণ করেন ইউনিফর্ম পরা মানুষগুলো।
জনবান্ধব এপিবিএন: ভবিষ্যতের সবচেয়ে বড় প্রত্যাশা
একটি আধুনিক বিশেষায়িত বাহিনীর শক্তি শুধু অস্ত্রে নয়। মানুষের আস্থায়।
এপিবিএনকে যদি আগামী দিনের আরও জনমুখী বাহিনী হিসেবে গড়ে তোলা যায়, তাহলে আইন প্রয়োগের পাশাপাশি মানুষের সঙ্গে সম্পর্কও তার শক্তিতে পরিণত হবে।
মানুষ যেন এপিবিএনের সদস্যকে শুধু অস্ত্রধারী নিরাপত্তাকর্মী হিসেবে না দেখে। দেখে রাষ্ট্রের একজন দায়িত্বশীল সেবক হিসেবে, যে মানুষের কথা শুনবে, বিপদে পাশে দাঁড়াবে, আইন মেনে দায়িত্ব পালন করবে, অন্যায় প্রতিরোধ করবে, দুর্বল মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করবে এবং ক্ষমতার প্রয়োগের পাশাপাশি মানবিকতার পরিচয় দেবে।
নতুন ২০২৬ সালের আইনেও এপিবিএনকে অধিক জনবান্ধব করার লক্ষ্যকে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
এই লক্ষ্য বাস্তবায়নই হতে পারে নতুন যুগের এপিবিএনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পরিচয়।
সামনে আরও জনবল, আরও প্রযুক্তি, আরও সক্ষমতা
এপিবিএনের দায়িত্বের বিস্তৃতি বিবেচনায় ভবিষ্যতে জনবল ও লজিস্টিক সক্ষমতা বৃদ্ধির বিষয়টি গুরুত্ব পাওয়ার দাবি রাখে।
কারণ আধুনিক নিরাপত্তা ব্যবস্থা শুধু জনবল দিয়ে চলে না। প্রয়োজন আধুনিক প্রযুক্তি, দ্রুতগামী যান, উন্নত যোগাযোগ ব্যবস্থা, সিসিটিভি ও নজরদারি প্রযুক্তি, সাইবার ও ডিজিটাল ফরেনসিক সক্ষমতা, প্রশিক্ষণ কেন্দ্র এবং আধুনিক অস্ত্র ও সুরক্ষা সরঞ্জাম।
এর পাশাপাশি সদস্যদের পরিবার ও কল্যাণের বিষয়টিও বিবেচনায় নেওয়া প্রয়োজন।
একজন সদস্য যখন নিশ্চিন্তে জানবেন তাঁর পরিবার নিরাপদ, চিকিৎসা সুবিধা আছে, আবাসন আছে এবং সন্তানদের ভবিষ্যৎ নিয়ে ন্যূনতম নিশ্চয়তা আছে, তখন দায়িত্ব পালনের মানসিক শক্তিও বাড়ে।
রাষ্ট্রের নিরাপত্তা রক্ষাকারী মানুষের নিরাপত্তাও রাষ্ট্রের দায়িত্বের অংশ।
একটি পরিবারের গল্প থেকে একটি প্রতিষ্ঠানের ইতিহাস
আজিজুল হক থেকে হাসিব আজিজের গল্প শুনতে পারিবারিক উত্তরাধিকারের গল্প মনে হতে পারে। কিন্তু এর গভীরে রয়েছে আরও বড় একটি ইতিহাস।
একজন কর্মকর্তা ছিলেন প্রতিষ্ঠার সময়ের সঙ্গে যুক্ত। তাঁর সন্তান কয়েক দশক পর সেই একই প্রতিষ্ঠানের নেতৃত্বে।
এখানে রক্তের সম্পর্কের চেয়েও বড় হয়ে ওঠে প্রতিষ্ঠানের সময়ের ব্যবধান।
বাবার সময়ের দায়িত্ব ছিল একরকম। সন্তানের সময়ের দায়িত্ব সম্পূর্ণ ভিন্ন। তবু একটি জায়গায় মিল আছে।
দায়িত্ব।
রাষ্ট্রের প্রতি দায়িত্ব, মানুষের প্রতি দায়িত্ব, আইনের প্রতি দায়িত্ব এবং প্রতিষ্ঠানের প্রতি দায়িত্ব।
এই জায়গাতেই দুই প্রজন্ম যেন ইতিহাসের দুই তীর হয়ে দাঁড়ায়।
জিয়াউর রহমান থেকে আজকের এপিবিএন
১৯৭৯ সালের অধ্যাদেশ ছিল একটি প্রাতিষ্ঠানিক সূচনা। আজ ২০২৬ সালে এসে নতুন আইন হলো সেই যাত্রার একটি নতুন অধ্যায়।
মাঝখানে কেটে গেছে প্রায় অর্ধশতাব্দী।
দেশ বদলেছে। সমাজ বদলেছে। অপরাধ বদলেছে। প্রযুক্তি বদলেছে। নিরাপত্তার সংজ্ঞা বদলেছে।
কিন্তু রাষ্ট্রের মানুষের নিরাপত্তার প্রয়োজন বদলায়নি। বরং দায়িত্ব আরও বেড়েছে।
আর সেই দায়িত্বের সঙ্গে তাল মিলিয়ে এপিবিএনের আইনগত কাঠামোও এখন নতুন রূপ পেয়েছে।
এ যেন পুরোনো বৃক্ষের নতুন পাতা।
শিকড় ১৯৭৯ সালে।
কাণ্ড কয়েক দশকের অভিজ্ঞতায় শক্ত।
আর ২০২৬ সালে নতুন আইনের মাধ্যমে ভবিষ্যতের দিকে আরও একটি নতুন শাখা বিস্তারের সুযোগ।
ইতিহাসের সেতু
জিয়াউর রহমানের রাষ্ট্র পরিচালনার সময় এপিবিএনের আইনগত প্রাতিষ্ঠানিক ভিত্তি তৈরি হয়েছিল।
আজিজুল হক ছিলেন সেই প্রারম্ভিক সময়ের সঙ্গে যুক্ত একটি গুরুত্বপূর্ণ নাম।
আর কয়েক দশক পর তাঁর সন্তান হাসিব আজিজ এপিবিএনের নেতৃত্বে এসে দাঁড়িয়েছেন।
এক প্রান্তে প্রতিষ্ঠার সময়।
অন্য প্রান্তে আধুনিকায়নের সময়।
একদিকে অতীতের অভিজ্ঞতা।
অন্যদিকে ভবিষ্যতের চ্যালেঞ্জ।
মাঝখানে বাংলাদেশের কয়েক দশকের রাষ্ট্রীয় ও সামাজিক পরিবর্তনের ইতিহাস।
এ কারণেই “জিয়াউর রহমান থেকে আজিজুল হক, আজিজুল হক থেকে হাসিব আজিজ” শুধু একটি শিরোনাম নয়।
এটি একটি সময়ের প্রতিচ্ছবি।
এটি একটি প্রতিষ্ঠানের প্রজন্মান্তরের স্মৃতি।
এটি দায়িত্বের ধারাবাহিকতার প্রতীক।
শেষ কথা
একটি বাহিনী জন্ম নেয় আইনের মাধ্যমে।
তারপর সেই বাহিনী বড় হয়ে ওঠে মানুষের দায়িত্ব পালন করতে করতে।
তার পরিচয় তৈরি হয় সদস্যদের কর্মে।
তার মর্যাদা তৈরি হয় পেশাদারিত্বে।
তার শক্তি তৈরি হয় জনগণের আস্থায়।
আর তার ইতিহাস লেখা হয় সময়ের পরতে পরতে।
১৯৭৯ সালের অধ্যাদেশ থেকে ২০২৬ সালের নতুন আইন।
দুর্গম পাহাড় থেকে বিমানবন্দর।
গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা থেকে রোহিঙ্গা শিবির।
বিশেষ নিরাপত্তা থেকে অপরাধ তদন্ত।
পুরোনো প্রযুক্তি থেকে আধুনিক প্রযুক্তি।
এক প্রজন্ম থেকে আরেক প্রজন্ম।
আজিজুল হক থেকে হাসিব আজিজ।
এই দীর্ঘ যাত্রায় এপিবিএনের সামনে এখন নতুন দায়িত্ব, নতুন ক্ষমতা এবং নতুন প্রত্যাশা।
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন সরকারের সময়ে ২০২৬ সালের নতুন আইনের মাধ্যমে এপিবিএনের আইনগত কাঠামো নতুন বাস্তবতার সঙ্গে যুক্ত হয়েছে।
আর সেই নতুন অধ্যায়ের বাস্তবায়নের দায়িত্ব মাঠে যাঁদের কাঁধে, তাঁদের অন্যতম এপিবিএনের প্রধান অতিরিক্ত আইজিপি হাসিব আজিজ। ২০২৬ সালের মার্চে তাঁকে এপিবিএনের প্রধান হিসেবে পদায়ন করা হয়।
তাঁর সামনে তাই শুধু একটি বাহিনী পরিচালনার দায়িত্ব নয়।
সামনে একটি ইতিহাস।

বৃহত্তর চট্টগ্রাম নাগরিক ফোরামের মহানগর কমিটির প্রথম সাংগঠনিক সভা অনুষ্ঠিত কালুরঘাট সেতু নির্মাণ, সিটি করপোরেশন নির্বাচন, জলাবদ্ধতা ও যানজট নিরসনসহ ১০ দফা নাগরিক ইস্যুতে কর্মসূচি গ্রহণের সিদ্ধান্ত

বৃহত্তর চট্টগ্রাম নাগরিক ফোরামের চট্টগ্রাম মহানগর কমিটি গঠনের পর প্রথম সাংগঠনিক সভা অনুষ্ঠিত হয়েছে। সভায় চট্টগ্রাম মহানগরীর দীর্ঘদিনের নাগরিক সংকট চিহ্নিত করে তা সমাধানে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সঙ্গে ধারাবাহিক মতবিনিময়, গোলটেবিল বৈঠক এবং নিয়মতান্ত্রিক সাংগঠনিক কর্মসূচি গ্রহণের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। ২২ শে সেপ্টেম্বর মঙ্গলবার বেলা ১২টায় চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ক্যান্টিনে বৃহত্তর চট্টগ্রাম নাগরিক ফোরামের চট্টগ্রাম মহানগর কমিটির এ সাংগঠনিক সভা অনুষ্ঠিত হয়। সভায় সভাপতিত্ব করেন বৃহত্তর চট্টগ্রাম নাগরিক ফোরামের চট্টগ্রাম মহানগর সভাপতি হামিদ হোসাইন। সভায় মহানগর কমিটির সাংগঠনিক কার্যক্রমের বিভিন্ন দিক তুলে ধরে প্রস্তাবনা উপস্থাপন করেন মহানগর সাধারণ সম্পাদক দুলাল কান্তি বড়ুয়া। সভায় প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন বৃহত্তর চট্টগ্রাম নাগরিক ফোরামের কেন্দ্রীয় মহাসচিব মো. কামাল উদ্দিন। বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন কেন্দ্রীয় সাংগঠনিক সম্পাদক সৈয়দ মোহাম্মদ সেলিম।
নাগরিক সংকট চিহ্নিত করে কর্মসূচি সভায় বক্তারা বলেন, চট্টগ্রাম বাংলাদেশের অর্থনীতি, বন্দর, পর্যটন, শিল্প ও বাণিজ্যের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র হলেও নগরবাসী দীর্ঘদিন ধরে জলাবদ্ধতা, যানজট, ফুটপাত দখল, অপরিকল্পিত নগর ব্যবস্থাপনা, গ্যাস, পানি ও বিদ্যুৎ সংকটসহ নানা নাগরিক সমস্যার মুখোমুখি হচ্ছেন। এসব সমস্যা শুধু আলোচনা সভার মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে সুনির্দিষ্টভাবে চিহ্নিত করে সংশ্লিষ্ট সরকারি সংস্থা ও সরকারের কাছে তুলে ধরার ওপর গুরুত্বারোপ করা হয়। বক্তারা বলেন, নাগরিক ফোরাম কোনো রাজনৈতিক দলের বিকল্প নয়। নাগরিকদের ন্যায্য অধিকার, নগরীর উন্নয়ন এবং বৃহত্তর চট্টগ্রামের স্বার্থে নিয়মতান্ত্রিক ও শান্তিপূর্ণভাবে জনমত গড়ে তোলাই সংগঠনের অন্যতম লক্ষ্য। কালুরঘাট সেতু নির্মাণে কর্মসূচি
সভায় চট্টগ্রামের দীর্ঘদিনের গুরুত্বপূর্ণ দাবি কালুরঘাট সেতু দ্রুত নির্মাণের বিষয়ে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়। বক্তারা বলেন, কালুরঘাট সেতু শুধু একটি যোগাযোগ অবকাঠামো নয়, এটি দক্ষিণ চট্টগ্রাম ও বৃহত্তর চট্টগ্রামের মানুষের অর্থনৈতিক ও সামাজিক যোগাযোগের সঙ্গে সরাসরি সম্পৃক্ত। তাই সেতু নির্মাণের দাবিতে বৃহত্তর চট্টগ্রাম নাগরিক ফোরামের পক্ষ থেকে ধারাবাহিক কর্মসূচি গ্রহণ করা হবে। এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়, বিভাগ, প্রশাসন, জনপ্রতিনিধি, বিশেষজ্ঞ ও সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে মতবিনিময়ের পাশাপাশি প্রয়োজনে ঢাকায় গোলটেবিল বৈঠক আয়োজনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। দ্রুত সিটি করপোরেশন নির্বাচনের দাবি সভায় চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন নির্বাচন দ্রুত ঘোষণার দাবিও গুরুত্বের সঙ্গে আলোচনা করা হয়। বক্তারা বলেন, দীর্ঘদিন ধরে নির্বাচিত কাউন্সিলর না থাকায় নগরীর বিভিন্ন ওয়ার্ডে জনগণের স্থানীয় পর্যায়ের প্রতিনিধিত্ব ও নাগরিক সমস্যা তুলে ধরার ক্ষেত্রে ঘাটতি তৈরি হয়েছে। নগরবাসীর প্রত্যাশা ও নাগরিক সেবা নিশ্চিত করতে দ্রুত নির্বাচনের মাধ্যমে নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদের দায়িত্ব দেওয়ার দাবি জানানো হয়। জলাবদ্ধতা নিরসন প্রকল্প দ্রুত শেষ করার দাবি চট্টগ্রামের জলাবদ্ধতা নিরসনে চলমান প্রকল্পের কাজ দ্রুত ও সমন্বিতভাবে সম্পন্ন করার ওপর সভায় গুরুত্বারোপ করা হয়। বক্তারা বলেন, প্রতিবছর বর্ষা মৌসুমে নগরীর বিভিন্ন এলাকা পানিতে তলিয়ে গিয়ে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রা ব্যাহত হচ্ছে। জলাবদ্ধতার স্থায়ী সমাধানের জন্য প্রকল্পের কাজের অগ্রগতি পর্যালোচনা, খাল ও নালা পরিষ্কার রাখা এবং পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থার কার্যকর সমন্বয়ের প্রয়োজন রয়েছে। যানজট ও ফুটপাত দখলমুক্ত করার উদ্যোগ
সভায় চট্টগ্রাম মহানগরের যানজট নিরসনে সমন্বিত পরিকল্পনার দাবি জানানো হয়। একই সঙ্গে নগরীর বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ সড়ক ও ফুটপাত দখলমুক্ত করে পথচারীদের নিরাপদ চলাচল নিশ্চিত করার বিষয়েও কর্মসূচি গ্রহণের সিদ্ধান্ত হয়। বক্তারা বলেন, ফুটপাত পথচারীদের জন্য হলেও বিভিন্ন স্থানে দখলের কারণে নগরবাসী বাধ্য হয়ে সড়কে চলাচল করছেন। এতে যানজটের পাশাপাশি দুর্ঘটনার ঝুঁকিও বাড়ছে। তাই সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন। গ্যাস, পানি ও বিদ্যুৎ সমস্যা নিয়ে গোলটেবিল চট্টগ্রাম মহানগর ও বৃহত্তর চট্টগ্রামের গ্যাস, পানি ও বিদ্যুৎ সরবরাহের বিভিন্ন সমস্যা নিয়ে সংশ্লিষ্ট সংস্থার প্রতিনিধিদের সঙ্গে পৃথক মতবিনিময়ের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। সভায় এসব সমস্যা নিয়ে সংশ্লিষ্ট সরকারি সংস্থা, জনপ্রতিনিধি, প্রকৌশলী, বিশেষজ্ঞ, নাগরিক প্রতিনিধি ও গণমাধ্যমকর্মীদের অংশগ্রহণে ঢাকায় একটি গোলটেবিল বৈঠক আয়োজনের প্রস্তাব গৃহীত হয়। গোলটেবিল বৈঠকে বৃহত্তর চট্টগ্রামের গুরুত্বপূর্ণ নাগরিক সমস্যাগুলো তুলে ধরে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে বাস্তবভিত্তিক সুপারিশ উপস্থাপন করা হবে। থানা ও ওয়ার্ড পর্যায়ে সংগঠন বিস্তারের সিদ্ধান্ত সভায় বৃহত্তর চট্টগ্রাম নাগরিক ফোরামের সাংগঠনিক কার্যক্রম আরও গতিশীল করার বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়। চট্টগ্রাম মহানগরের প্রতিটি থানা ও ওয়ার্ড পর্যায়ে কমিটি গঠন, সদস্য সংগ্রহ, নাগরিক সমস্যা চিহ্নিতকরণ এবং স্থানীয় পর্যায়ে নিয়মিত সাংগঠনিক সভা করার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়। বক্তারা বলেন, নাগরিক ফোরামের শক্তি হবে তৃণমূলের সাধারণ মানুষ। তাই প্রতিটি থানা ও ওয়ার্ডে সংগঠনকে সক্রিয় করে নাগরিকদের মতামত ও সমস্যা কেন্দ্রীয় পর্যায়ে তুলে আনার ব্যবস্থা করতে হবে। বৃহত্তর চট্টগ্রামকে সাংগঠনিক আওতায় আনার উদ্যোগ সভায় বলা হয়, ২০১৫ সালে চট্টগ্রাম উন্নয়ন আন্দোলনের ধারাবাহিকতায় গঠিত চট্টগ্রাম নাগরিক ফোরামকে সময়ের প্রয়োজন অনুযায়ী বৃহত্তর পরিসরে রূপ দেওয়া হয়েছে। এর মাধ্যমে শুধু চট্টগ্রাম মহানগর নয়, চট্টগ্রাম উত্তর ও দক্ষিণ জেলা, কক্সবাজার, রাঙামাটি, খাগড়াছড়ি ও বান্দরবান জেলার নাগরিকদেরও বৃহত্তর চট্টগ্রামের নাগরিক স্বার্থের অভিন্ন প্ল্যাটফর্মে সম্পৃক্ত করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। বক্তারা বলেন, বৃহত্তর চট্টগ্রামের উন্নয়ন, যোগাযোগ, পর্যটন, পরিবেশ, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, শিল্প, বন্দর ও নাগরিক অধিকার সংশ্লিষ্ট বিষয়গুলোকে সমন্বিতভাবে সামনে আনতে একটি বিস্তৃত নাগরিক প্ল্যাটফর্মের প্রয়োজন ছিল। সাংগঠনিক কাঠামো পুনর্বিন্যাস সভায় সংগঠনের সাংগঠনিক কাঠামো পুনর্বিন্যাসের বিষয়টিও আলোচনা করা হয়। বক্তারা জানান, বৃহত্তর চট্টগ্রাম নাগরিক ফোরামের সাংগঠনিক কার্যক্রমকে আরও গতিশীল ও কার্যকর করার লক্ষ্যে কক্সবাজার ক্লাব লিমিটেডের সভাপতি আবু সৈয়দকে চেয়ারম্যান এবং সাবেক সহকারী পুলিশ কমিশনার মাহফুজুর রহমানকে কার্যকরী সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। সভায় বলা হয়, বৃহত্তর চট্টগ্রামের বিভিন্ন জেলা ও মহানগরের নাগরিক স্বার্থকে সমন্বিতভাবে সামনে রেখে সংগঠনের কার্যক্রম পরিচালনা করাই বর্তমান সাংগঠনিক কাঠামোর অন্যতম লক্ষ্য। নিয়মতান্ত্রিক কর্মসূচির মাধ্যমে নাগরিক আন্দোলন
সভায় সংগঠনের পক্ষ থেকে ভবিষ্যৎ কর্মসূচির বিষয়ে আলোচনা করে বলা হয়, বৃহত্তর চট্টগ্রামের নাগরিক সমস্যা নিয়ে ধারাবাহিকভাবে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সঙ্গে মতবিনিময় করা হবে। প্রয়োজন অনুযায়ী স্মারকলিপি প্রদান, গোলটেবিল বৈঠক, সংবাদ সম্মেলন, নাগরিক মতবিনিময় এবং অন্যান্য শান্তিপূর্ণ ও নিয়মতান্ত্রিক কর্মসূচি গ্রহণ করা হবে। সভায় বক্তারা বলেন, নাগরিক ফোরাম কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে নয়; বরং নাগরিক সমস্যা সমাধান ও বৃহত্তর চট্টগ্রামের উন্নয়নকে সামনে রেখে কাজ করতে চায়। উপস্থিতিতের মধ্যে বক্তব্য রাখেন- সভায় বৃহত্তর চট্টগ্রাম নাগরিক ফোরামের চট্টগ্রাম মহানগর সিনিয়র সহসভাপতি লায়ন জিল্লুর রহমান শাকিল, ওয়াহিদুল আলম মাস্টার, মহসিন মিয়া, মহানগর সাধারণ সম্পাদক দুলাল কান্তি বড়ুয়া, বিপ্লব বড়ুয়া, মোহাম্মদ শামসুল আলম রানা, লায়ন মিনহাজুর রহমান, সাজু তালুকদার, লায়ন ফরহাদ মোস্তফা, মোহাম্মদ বেলাল হোসেন, মোহাম্মদ ওমর ফারুক, মুজিবুর রহমান চৌধুরী, মোহাম্মদ আলম, মোহাম্মদ ওসমান ও আব্দুল মান্নানসহ মহানগর ও কেন্দ্রীয় পর্যায়ের নেতৃবৃন্দ উপস্থিত ছিলেন। সভা শেষে বৃহত্তর চট্টগ্রামের নাগরিক স্বার্থে ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করার এবং সংগঠনের ঘোষিত কর্মসূচি বাস্তবায়নে নেতৃবৃন্দকে নিজ নিজ অবস্থান থেকে সক্রিয় ভূমিকা পালনের আহ্বান জানানো হয়।

চট্টগ্রাম মেডিকেলে ইউনিট-২ চালুসহ ডেঙ্গু চিকিৎসা নিশ্চিতের দাবি পরিচালকের সঙ্গে বৃহত্তর চট্টগ্রাম নাগরিক ফোরামের মতবিনিময় রোগী হয়রানি ও দালালচক্র বন্ধ, জনবল বৃদ্ধি এবং চিকিৎসা সরঞ্জাম সচলের ওপর জোর

চট্টগ্রাম প্রতিনিধি:
চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ইউনিট-২ চালু, ডেঙ্গু রোগীদের চিকিৎসা নিশ্চিত করতে বিশেষ ব্যবস্থা গ্রহণ, পৃথক ডেঙ্গু ওয়ার্ড গঠন, রোগী ও স্বজনদের হয়রানি বন্ধ, দালালচক্রের দৌরাত্ম্য নিয়ন্ত্রণ, জনবল বৃদ্ধি এবং চিকিৎসা সরঞ্জাম সচল রাখাসহ হাসপাতালের সার্বিক সেবার মান উন্নয়নের দাবি জানিয়েছে বৃহত্তর চট্টগ্রাম নাগরিক ফোরাম।
এ বিষয়ে সোমবার ২১ সেপ্টেম্বর বেলা ১১টায় চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল তসলিম উদ্দিনের সঙ্গে মতবিনিময় করেন বৃহত্তর চট্টগ্রাম নাগরিক ফোরামের মহাসচিব মো. কামাল উদ্দিনের নেতৃত্বে একটি প্রতিনিধি দল।
মতবিনিময় সভায় চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের বর্তমান চিকিৎসাসেবা, রোগীদের বিভিন্ন সমস্যা, ডেঙ্গু পরিস্থিতি এবং হাসপাতালের অবকাঠামোগত ও জনবল সংকটসহ নানা বিষয় নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়।
প্রশ্নের মুখে হাসপাতালের নানা সমস্যা
সভায় নাগরিক ফোরামের মহাসচিব মো. কামাল উদ্দিন হাসপাতালের বিভিন্ন সমস্যা ও নাগরিকদের প্রত্যাশার বিষয়গুলো একে একে প্রশ্ন আকারে পরিচালকের সামনে উপস্থাপন করেন।
তিনি জানতে চান, চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ইউনিট-২ চালুর অগ্রগতি কতদূর, ডেঙ্গু রোগীদের জন্য পর্যাপ্ত চিকিৎসা ও শয্যা নিশ্চিত করতে কী ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে, পৃথক ডেঙ্গু ওয়ার্ড গঠনের পরিকল্পনা রয়েছে কি না এবং রোগীর চাপ সামাল দিতে প্রয়োজনীয় চিকিৎসক, নার্স ও অন্যান্য জনবল বৃদ্ধি করা হবে কি না।
একই সঙ্গে হাসপাতালের বিভিন্ন বিভাগে রোগী ও স্বজনদের হয়রানির অভিযোগ, দালালদের দৌরাত্ম্য, পরীক্ষা-নিরীক্ষার ক্ষেত্রে ভোগান্তি, এক্স-রে মেশিনসহ গুরুত্বপূর্ণ চিকিৎসা সরঞ্জাম সচল রাখা, রোগীদের সঠিক তথ্য ও দ্রুত সেবা প্রদান এবং হাসপাতালের সার্বিক ব্যবস্থাপনা আরও উন্নত করার বিষয়গুলোও তুলে ধরেন তিনি।
ডেঙ্গু রোগীর চিকিৎসা নিশ্চিত করার আহ্বান
মতবিনিময় সভায় সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব পায় ডেঙ্গু রোগীদের চিকিৎসা নিশ্চিত করার বিষয়টি।
নাগরিক ফোরামের পক্ষ থেকে বলা হয়, ডেঙ্গু আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা বাড়লে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে রোগীর চাপও বাড়বে। তাই আগে থেকেই প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি, পর্যাপ্ত শয্যা, চিকিৎসক-নার্স, পরীক্ষা-নিরীক্ষার ব্যবস্থা এবং পৃথক চিকিৎসা ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করা প্রয়োজন।
এ সময় বিশেষ ডেঙ্গু ওয়ার্ড গঠন এবং ডেঙ্গু রোগীদের জন্য প্রয়োজনীয় চিকিৎসা সুবিধা নিশ্চিত করার দাবি জানানো হয়, যাতে কোনো রোগী চিকিৎসা পেতে এসে অব্যবস্থাপনা বা শয্যা সংকটের কারণে ভোগান্তির শিকার না হন।
পরিচালকের আন্তরিক জবাব
নাগরিক ফোরামের মহাসচিব মো. কামাল উদ্দিনের উত্থাপিত প্রতিটি প্রশ্ন মনোযোগ দিয়ে শুনে তার জবাব দেন হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল তসলিম উদ্দিন।
তিনি হাসপাতালের বিভিন্ন সমস্যা, সীমাবদ্ধতা ও চলমান কার্যক্রম সম্পর্কে প্রতিনিধিদলকে অবহিত করেন। একই সঙ্গে হাসপাতালের চিকিৎসাসেবার মান আরও উন্নত করতে তাঁর বিভিন্ন পরিকল্পনার কথাও তুলে ধরেন।
ব্রিগেডিয়ার জেনারেল তসলিম উদ্দিন বলেন, চট্টগ্রামের সন্তান হিসেবে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের প্রতি তাঁর আলাদা দায়বদ্ধতা রয়েছে। এই হাসপাতালকে আরও উন্নত চিকিৎসা ও জনবান্ধব সেবার প্রতিষ্ঠানে পরিণত করতে তিনি আন্তরিকভাবে কাজ করছেন।
তিনি বিশেষ করে ডেঙ্গু রোগীদের চিকিৎসা নিশ্চিত করা, প্রয়োজনীয় বিশেষ ব্যবস্থা গ্রহণ, ডেঙ্গু রোগীদের জন্য পৃথক ওয়ার্ডের ব্যবস্থা, রোগী হয়রানি বন্ধ এবং দালালদের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়ার বিষয়ে গুরুত্বারোপ করেন।
হাসপাতালের বিভিন্ন সীমাবদ্ধতা পর্যায়ক্রমে চিহ্নিত করে সমাধানের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে বলেও তিনি জানান।
দালালমুক্ত হাসপাতাল চান নাগরিক নেতারা
মতবিনিময় সভায় হাসপাতালকেন্দ্রিক দালালচক্রের বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে তুলে ধরা হয়।
নাগরিক ফোরামের নেতৃবৃন্দ বলেন, চিকিৎসার জন্য দূর-দূরান্ত থেকে আসা সাধারণ রোগী ও স্বজনরা অনেক সময় হাসপাতালের ভেতর-বাইরে বিভিন্ন ধরনের মধ্যস্বত্বভোগীর খপ্পরে পড়েন। ফলে তাঁরা আর্থিক ও মানসিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার পাশাপাশি প্রয়োজনীয় চিকিৎসাসেবা পেতেও সমস্যায় পড়েন।
তাই হাসপাতালকে দালালমুক্ত ও হয়রানিমুক্ত চিকিৎসাসেবার নিরাপদ স্থান হিসেবে গড়ে তোলার দাবি জানানো হয়।
চিকিৎসা সরঞ্জাম সচল রাখার দাবি
সভায় এক্স-রে মেশিনসহ প্রয়োজনীয় চিকিৎসা সরঞ্জাম নিয়মিত সচল রাখার ওপরও গুরুত্ব দেওয়া হয়।
নাগরিক ফোরামের নেতারা বলেন, একজন রোগী হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে এসে যদি প্রয়োজনীয় পরীক্ষা করাতে বাইরে যেতে বাধ্য হন, তাহলে তার চিকিৎসা ব্যাহত হওয়ার পাশাপাশি রোগী ও স্বজনদের অতিরিক্ত অর্থ ও সময় ব্যয় হয়। তাই হাসপাতালের নিজস্ব পরীক্ষা-নিরীক্ষা ব্যবস্থা আরও কার্যকর করা প্রয়োজন।
জনবল বৃদ্ধির বিষয়েও আলোচনা
চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে প্রতিদিন বিপুলসংখ্যক রোগীর চিকিৎসা হয়। রোগীর চাপের তুলনায় চিকিৎসক, নার্স, টেকনিশিয়ান ও অন্যান্য সহায়ক জনবল পর্যাপ্ত কি না—সে বিষয়েও আলোচনা করেন নাগরিক ফোরামের নেতৃবৃন্দ।
তাঁরা বলেন, আধুনিক চিকিৎসা অবকাঠামোর পাশাপাশি পর্যাপ্ত দক্ষ জনবল ছাড়া কাঙ্ক্ষিত সেবা নিশ্চিত করা সম্ভব নয়। তাই প্রয়োজন অনুযায়ী জনবল বৃদ্ধি এবং কর্মরতদের কর্মপরিবেশ উন্নয়নের বিষয়েও গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন।
কামাল উদ্দিন: অভিযোগ নয়, সমাধানের পথ খুঁজতেই এই মতবিনিময়
বৃহত্তর চট্টগ্রাম নাগরিক ফোরামের মহাসচিব মো. কামাল উদ্দিন বলেন, চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল বৃহত্তর চট্টগ্রামের কোটি মানুষের চিকিৎসার অন্যতম প্রধান আশ্রয়স্থল। এই হাসপাতালকে ঘিরে মানুষের প্রত্যাশাও অনেক বেশি।
তিনি বলেন, নাগরিক ফোরাম কোনো প্রতিষ্ঠান বা ব্যক্তির বিরুদ্ধে অভিযোগ উত্থাপন করতেই এই মতবিনিময় করেনি; বরং সমস্যা চিহ্নিত করে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সঙ্গে সরাসরি আলোচনা এবং বাস্তবসম্মত সমাধানের পথ খুঁজে বের করাই এই উদ্যোগের উদ্দেশ্য।
তিনি আরও বলেন, বিশেষ করে ডেঙ্গু পরিস্থিতিতে কোনো রোগী যেন চিকিৎসার অভাবে ভোগান্তিতে না পড়েন, তা নিশ্চিত করা জরুরি। একই সঙ্গে হাসপাতালের সেবাব্যবস্থাকে আরও স্বচ্ছ, সহজ, দ্রুত ও হয়রানিমুক্ত করার জন্য নাগরিক সমাজের পক্ষ থেকে সহযোগিতা অব্যাহত থাকবে।
নাগরিক ফোরামের নেতৃবৃন্দের উপস্থিতি
মতবিনিময় সভায় আরও উপস্থিত ছিলেন বৃহত্তর চট্টগ্রাম নাগরিক ফোরামের মহানগর সভাপতি হামিদ হোসাইন, কেন্দ্রীয় সাংগঠনিক সম্পাদক সৈয়দ সলিম, মহানগর সিনিয়র সহসভাপতি লায়ন জিল্লুর রহমান শাকিল, ওয়াহিদুল আলম মাস্টার, মহসিন মিয়া, সাধারণ সম্পাদক দুলাল বড়ুয়া, বিপ্লব বড়ুয়া, মোহাম্মদ শাসুল আলম রানা, লায়ন মিনহাজুর রহমান, সাজু তালুকদার, লায়ন ফরহাদ মোস্তফা, মোহাম্মদ বেলাল হোসেন, মোহাম্মদ ওমর ফারুক, মোহাম্মদ আলম, মোহাম্মদ ওসমান ও আব্দুল মান্নান।
সভায় উপস্থিত নেতৃবৃন্দ হাসপাতালের বিভিন্ন সমস্যা ও নাগরিক প্রত্যাশার কথা তুলে ধরেন এবং চিকিৎসাসেবার মানোন্নয়নে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের সঙ্গে সমন্বিতভাবে কাজ করার আগ্রহ প্রকাশ করেন।
মানুষের আস্থা ও প্রত্যাশার কেন্দ্র চট্টগ্রাম মেডিকেল
চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল শুধু একটি চিকিৎসাপ্রতিষ্ঠান নয়—বৃহত্তর চট্টগ্রামের অসংখ্য মানুষের কাছে এটি জীবন ও আশার শেষ ঠিকানা। প্রতিদিন এখানে চিকিৎসার জন্য ছুটে আসেন হাজারো মানুষ।
তাই হাসপাতালের চিকিৎসাসেবা হতে হবে আরও সহজ, দ্রুত, স্বচ্ছ, মানবিক ও হয়রানিমুক্ত—এমন প্রত্যাশা নাগরিক সমাজের।
মতবিনিময় সভার মধ্য দিয়ে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ ও নাগরিক সমাজের মধ্যে যে সংলাপের সূচনা হয়েছে, তা ভবিষ্যতে আরও কার্যকর উদ্যোগে রূপ নেবে—এমন প্রত্যাশা ব্যক্ত করেন বৃহত্তর চট্টগ্রাম নাগরিক ফোরামের নেতৃবৃন্দ।

যেসব কারণে বাড়ল জ্বালানি তেলের দাম

0

মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত ও রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের প্রভাব পড়েছে বাংলাদেশের জ্বালানি খাতেও। এরই মধ্যে দেশে পেট্রোল, ডিজেল, কেরোসিন ও অকটেনের দাম লিটারপ্রতি ২০ টাকা করে বাড়িয়েছে সরকার। কয়েক মাস আগেও আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের দাম ১০০ ডলারের ওপরে উঠেছিল। তবে তখন দেশে এতটা দাম বাড়ানো হয়নি। ফলে এবার হঠাৎ করে কেন জ্বালানি তেলের দাম এতটা বাড়ানো হলো, তা নিয়ে জনমনে প্রশ্ন উঠেছে।

সরকারের ব্যাখ্যা অনুযায়ী, গত মার্চ থেকে মধ্যপ্রাচ্যে চলমান সংঘাতের কারণে আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের দাম ও পরিবহন ব্যয় বা ফ্রেইট চার্জ উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। আন্তর্জাতিক বাজারে দাম দ্বিগুণের বেশি বাড়লেও জনস্বার্থ বিবেচনায় বাংলাদেশে সে অনুযায়ী জ্বালানির দাম সমন্বয় করা হয়নি। এতে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন—বিপিসি বড় ধরনের লোকসানে পড়েছে। এই পরিস্থিতিতে লোকসান কমাতে জ্বালানি তেলের দাম বাড়ানো হয়েছে বলে জানিয়েছে সরকার।

অর্থাৎ, দেশে নতুন দাম নির্ধারণের দিন আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম কিছুটা কমলেও শুধু ওই দিনের বাজারদর বিবেচনায় নিয়ে সিদ্ধান্তটি নেওয়া হয়নি। গত কয়েক মাসের আন্তর্জাতিক বাজারদর, যুদ্ধের কারণে পরিবহন ব্যয় বৃদ্ধি এবং বিপিসির পুঞ্জীভূত লোকসান—সবকিছু বিবেচনায় নিয়েই দাম সমন্বয় করা হয়েছে।

আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারে সাম্প্রতিক অস্থিরতার পেছনে একাধিক ভূরাজনৈতিক সংকট কাজ করছে। রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের কারণে রাশিয়ার তেল শোধনাগার ও জ্বালানি অবকাঠামোয় হামলা এবং সরবরাহ ব্যবস্থায় বিঘ্নের প্রভাব পড়েছে পরিশোধিত জ্বালানি তেলের বাজারে।

অন্যদিকে, ইরানকে ঘিরে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল সংঘাত মধ্যপ্রাচ্যের গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি সরবরাহপথ ও সমুদ্রপথে অনিশ্চয়তা তৈরি করেছে।

বিশেষ করে বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ তেল পরিবহনপথ হরমুজ প্রণালিকে ঘিরে উত্তেজনার কারণে জাহাজ চলাচলে বিঘ্ন ঘটেছে। একই সঙ্গে ইয়েমেনের হুতিদের হামলায় সৌদি আরবের ইস্ট-ওয়েস্ট তেল পাইপলাইন ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় বিকল্প পরিবহনপথের ওপর চাপ বেড়েছে। এতে তেল পরিবহনে সময় ও ব্যয়—দুটিই বেড়েছে।

জ্বালানি বিশ্লেষকদের মতে, রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ এবং মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত একসঙ্গে বিশ্ববাজারে অপরিশোধিত তেল, ডিজেল ও জাহাজের জ্বালানি সরবরাহে চাপ তৈরি করছে। বিশেষ করে পরিবহন ব্যয় বেড়ে গেলে আমদানিনির্ভর দেশগুলোর জন্য তা বাড়তি ব্যয়ের কারণ হয়ে দাঁড়ায়।

বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদ মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, মার্চ থেকে আগস্ট পর্যন্ত বিপিসির লোকসানের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে প্রায় ২২ হাজার ৮৭৫ কোটি ৬৬ লাখ টাকা।

সরকারের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, আন্তর্জাতিক বাজারে বাড়তি ব্যয় এবং বিপিসির পুঞ্জীভূত লোকসান সমন্বয়ের অংশ হিসেবেই দেশে জ্বালানি তেলের দাম বাড়ানো হয়েছে।

নতুন দাম অনুযায়ী, ডিজেলের দাম লিটারপ্রতি ১১৫ টাকা থেকে বেড়ে ১৩৫ টাকা হয়েছে। কেরোসিনের দাম ১৩৫ থেকে বেড়ে ১৫৫ টাকা, পেট্রোল ১৪০ থেকে বেড়ে ১৬০ টাকা এবং অকটেন ১৪৫ থেকে বেড়ে ১৬৫ টাকা হয়েছে।

জ্বালানি বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, প্রতি লিটার ডিজেলের দাম ভারতে—বিশেষ করে কলকাতায়—১৩৪ দশমিক ৭৬ টাকা। মিয়ানমারে ১৬৪ দশমিক ৮৩ টাকা, নেপালে ১৬১ দশমিক ২৪ টাকা, শ্রীলঙ্কায় ১৭৯ দশমিক ৪২ টাকা, থাইল্যান্ডে ১৫১ দশমিক ২২ টাকা, ভিয়েতনামে ১৩৭ টাকা, মালদ্বীপে ১৪০ দশমিক ৭১ টাকা, ফিলিপাইনে ১৬৮ দশমিক ৫৩ টাকা, পাকিস্তানে ১৮৫ দশমিক ৪৮ টাকা এবং সংযুক্ত আরব আমিরাতে ১৪৪ দশমিক ৭৯ টাকা।

দেশে জ্বালানি তেলের দাম তুলনামূলক কম থাকায় প্রতিবেশী দেশগুলোতে জ্বালানি পাচারের ঝুঁকি তৈরি হয়েছে বলেও দাবি করেছে জ্বালানি বিভাগ।

এ ছাড়া এলএনজি বাজারে যুদ্ধের প্রভাব থাকা সত্ত্বেও বিদ্যুৎ ও গ্যাস সরবরাহ স্বাভাবিক রাখতে সরকার উল্লেখযোগ্য পরিমাণ ভর্তুকি দিচ্ছে। সরকারের সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি সচল রাখা এবং জ্বালানি পাচার ঠেকাতেও দাম সমন্বয়ের প্রয়োজন রয়েছে বলে জানিয়েছে জ্বালানি বিভাগ।

প্রজ্ঞাপনের তথ্য অনুযায়ী, বর্তমান আন্তর্জাতিক বাজারদরে ডিজেলে প্রতি লিটারে বিপিসির লোকসান প্রায় ৮৯ টাকা। এতে প্রতিদিন ডিজেলে লোকসানের পরিমাণ দাঁড়াচ্ছে প্রায় ১০৯ কোটি টাকা।

শুধু ডিজেলেই বছরে প্রায় ৪০ হাজার কোটি টাকা লোকসান হতে পারে বলে প্রজ্ঞাপনে উল্লেখ করা হয়েছে।

লিটারপ্রতি ২০ টাকা দাম বাড়ানোর ফলে বছরে বিপিসির লোকসান প্রায় ১০ হাজার কোটি টাকা কমানো সম্ভব হবে বলেও প্রজ্ঞাপনে বলা হয়েছে।

এর আগে গত ১৯ এপ্রিল ডিজেলের দাম লিটারপ্রতি ১৫ টাকা বাড়িয়ে ১১৫ টাকা করা হয়েছিল। একই সময়ে কেরোসিনের দাম ১৮ টাকা, পেট্রোলের দাম ১৯ টাকা এবং অকটেনের দাম ২০ টাকা বাড়ানো হয়। পরে জুনে কেরোসিন, পেট্রোল ও অকটেনের দাম আরও ৫ টাকা করে বাড়ানো হয়। জুলাই, আগস্ট ও সেপ্টেম্বরের প্রথম দিক পর্যন্ত এসব জ্বালানির দাম অপরিবর্তিত ছিল।

সোমবার বাংলাদেশে নতুন জ্বালানি তেলের দাম কার্যকর হওয়ার দিন আন্তর্জাতিক বাজারে ছিল কিছুটা ভিন্ন চিত্র। সৌদি আরবের গুরুত্বপূর্ণ ইস্ট-ওয়েস্ট তেল পাইপলাইনে ক্ষয়ক্ষতি এবং মধ্যপ্রাচ্যের উত্তেজনা অব্যাহত থাকলেও প্রত্যাশার তুলনায় সরবরাহ পরিস্থিতি শক্তিশালী থাকায় বিশ্ববাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম কমেছে।

সিএনবিসির প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, সোমবার ব্রেন্ট ক্রুডের দাম ১ দশমিক ৬৬ শতাংশ কমে ব্যারেলপ্রতি ১০২ দশমিক ১৫ ডলারে নেমে আসে। একই সময়ে ওয়েস্ট টেক্সাস ইন্টারমিডিয়েট—ডব্লিউটিআইয়ের দাম ১ দশমিক ৮৩ শতাংশ কমে ৯৮ দশমিক ৪৬ ডলারে দাঁড়ায়।

তবে আন্তর্জাতিক বাজারে এক দিনের দামের ওঠানামা এবং দীর্ঘমেয়াদি আমদানি ব্যয়ের পরিবর্তন এক বিষয় নয়। সৌদি আরবের তেল সরবরাহপথে বিঘ্ন ঘটলেও সেপ্টেম্বরের মাঝামাঝি সময়ে দেশটি হরমুজ প্রণালি দিয়ে রপ্তানি বাড়িয়েছে। এতে সরবরাহ পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ কিছুটা কমেছে।

বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি পরিবহনপথ হরমুজ প্রণালিকে ঘিরে সংঘাত অব্যাহত থাকায় আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম এখনও ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে। স্বাভাবিক সময়ে এই প্রণালি দিয়ে বিপুল পরিমাণ বৈশ্বিক তেল ও গ্যাস পরিবহন করা হয়। সংঘাতের কারণে জাহাজ চলাচল কমে গেলে সরবরাহ ও পরিবহন ব্যয়ের ওপর আরও চাপ তৈরি হতে পারে।

অন্যদিকে, রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের কারণে রাশিয়ার শোধনাগারগুলোতে হামলা এবং ইউরোপের জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থায় পরিবর্তনও ডিজেলের বাজারকে প্রভাবিত করছে।

ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে শুধু অপরিশোধিত তেলের দাম নয়, পরিশোধিত জ্বালানি এবং পরিবহন ব্যয়ের পরিবর্তনও বাংলাদেশের মতো আমদানিনির্ভর দেশগুলোর জন্য গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

হামের উপসর্গে আরও ৬ শিশুর মৃত্যু, নতুন আক্রান্ত ১ হাজার ৩০৫

দেশে গত ২৪ ঘণ্টায় হামের উপসর্গ নিয়ে আরও ছয় শিশুর মৃত্যু হয়েছে। তবে এ সময়ে নিশ্চিত হামে কারও মৃত্যুর তথ্য পাওয়া যায়নি। একই সময়ে নতুন করে এক হাজার ৩০৫ জনের শরীরে হাম ও হামের উপসর্গ শনাক্ত হয়েছে। সোমবার (২১ সেপ্টেম্বর) স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের প্রকাশিত নিয়মিত হামবিষয়ক প্রতিবেদনে এসব তথ্য জানানো হয়। প্রতিবেদন অনুযায়ী, চলতি বছরের ১৫ মার্চ থেকে এখন পর্যন্ত দেশে হাম ও হামের উপসর্গে মোট এক হাজার ৬৩ জনের মৃত্যু হয়েছে। এর মধ্যে নিশ্চিত হামে মারা গেছেন ১০১ জন। আর হামের উপসর্গ নিয়ে মৃত্যু হয়েছে ৯৬২ জনের। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য বলছে, ১৫ মার্চ থেকে এ পর্যন্ত দেশে এক লাখ ৮১ হাজার ৩৫ জনের মধ্যে সন্দেহজনক হাম বা হামের উপসর্গ শনাক্ত হয়েছে। একই সময়ে নিশ্চিতভাবে হাম শনাক্ত হয়েছে ২০ হাজার ৬৪৬ জনের শরীরে। এদিকে, একই সময়ের মধ্যে দেশের বিভিন্ন হাসপাতালে হামের উপসর্গ নিয়ে মোট এক লাখ ৫৯ হাজার ৮০৪ জন ভর্তি হয়েছেন। তাদের মধ্যে চিকিৎসা শেষে এক লাখ ৫৩ হাজার ৪৪৮ জন সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরেছেন।

“ইউনিফর্মের আড়ালে যে মানুষটিকে আমি দেখেছি জাহিদুল কবির—কঠোর দায়িত্বের ভেতরে নরম এক হৃদয়ের গল্প-

-মো. কামাল উদ্দিনঃ
মানুষকে চেনা যায় না শুধু তার পোশাকে, পদবিতে কিংবা পরিচয়ের খাতায়। মানুষকে চিনতে হলে কখনো কখনো তার পাশে বসতে হয়, তার কথার ভেতরের নীরবতা শুনতে হয়, তার চোখের ভাষা পড়তে হয়। তখনই বোঝা যায়—বাহ্যিক পরিচয়ের আড়ালে মানুষটি আসলে কেমন।
পুলিশের পোশাকের দিকে তাকালে প্রথমেই চোখে পড়ে দায়িত্ব, কর্তৃত্ব, শৃঙ্খলা আর কঠোরতা। কিন্তু সেই পোশাক খুলে যখন একজন পুলিশ কর্মকর্তা বন্ধুর পাশে বসেন, এক কাপ চায়ে দীর্ঘ আড্ডায় হারিয়ে যান, সাহিত্য নিয়ে কথা বলেন, মানুষের দুঃখ-কষ্ট নিয়ে ভাবেন—তখন আবিষ্কার করা যায় সম্পূর্ণ অন্য একজন মানুষকে।
পুলিশ পরিদর্শক জাহিদুল কবির আমার কাছে ঠিক তেমনই একজন মানুষ।
তাঁকে আমি আজকের অবস্থান থেকে চিনি না। তাঁর পুলিশি জীবনের শুরু থেকেই তাঁকে দেখেছি, চিনেছি এবং সময়ের সঙ্গে সঙ্গে তাঁর পেশাগত পথচলার অনেকটা পথ কাছ থেকে দেখার সুযোগ হয়েছে।
চকবাজার থানার অফিসার ইনচার্জ হিসেবে দায়িত্ব পালন করতে দেখেছি তাঁকে। এরপর চান্দগাঁও থানায় দায়িত্ব পালন করেছেন। পরে বায়েজিদ থানার দায়িত্বও সামলেছেন। কর্মজীবনের নানা বাঁক পেরিয়ে বর্তমানে তিনি বাকলিয়া থানার অফিসার ইনচার্জ হিসেবে দায়িত্ব পালন করে আসছেন।
থানা বদলেছে, দায়িত্বের পরিধি বদলেছে, চারপাশের মানুষ বদলেছে—কিন্তু তাঁর সঙ্গে আমার পরিচয়ের জায়গাটিতে একটি বিষয় কখনো বদলায়নি; সেটি হলো তাঁর সহজ-সরল মানবিক আচরণ।
একটি রাতের চা-আড্ডা
কিছু কিছু রাত থাকে, যেগুলো ক্যালেন্ডারের পাতায় তারিখ হয়ে থাকে না—স্মৃতির ভেতর আলাদা একটি ঘর বানিয়ে নেয়।
বাকলিয়া থানায় সেদিনের রাতটিও আমার কাছে তেমনই একটি রাত।
ব্যস্ত থানার পরিবেশ। চারপাশে দায়িত্বের ব্যস্ততা। কোথাও ফোনের শব্দ, কোথাও পুলিশের আনাগোনা, কোথাও মানুষের অভিযোগ-অভিমান। অথচ সেই ব্যস্ততার মধ্যেই তাঁর টেবিলের পাশে বসে এক কাপ চা হাতে শুরু হলো আমাদের দীর্ঘ আড্ডা।
কথা শুরু হয়েছিল খুব সাধারণভাবে। কিন্তু কখন যে কথার স্রোত সাহিত্য থেকে সমাজে, সমাজ থেকে অপরাধে, অপরাধ থেকে আইন-আদালতে, আর সেখান থেকে মানুষের মনোজগতে গিয়ে পৌঁছাল—টেরই পেলাম না।
আমি তখন আবারও উপলব্ধি করলাম—এই মানুষটিকে শুধু পুলিশ অফিসার হিসেবে দেখলে তাঁকে পুরোপুরি দেখা হয় না।
তিনি পুলিশের দায়িত্ব বোঝেন, কিন্তু মানুষের মনও বোঝার চেষ্টা করেন।
তিনি অপরাধ দেখেন, কিন্তু অপরাধের পেছনের গল্পটিও জানতে চান।
তিনি আইন প্রয়োগ করেন, কিন্তু আইনের পাশাপাশি মানবিকতার জায়গাটিও ভুলে যেতে চান না।
পুলিশের পোশাকের ভেতরে একজন পাঠক
আমার লেখালেখির কথা তিনি প্রায়ই বলেন। আমার লেখা পড়েন। কখনো প্রশংসা করেন, কখনো প্রশ্ন করেন। সেদিনও কথার এক ফাঁকে হেসে বললেন—
“কামাল ভাই, আপনি এত লেখেন কীভাবে? কখন লেখেন?”
আমি হাসলাম।
বললাম—“এটা আমার কাছে লেখালেখি নয়, এক ধরনের সাধনা।”
তিনি চুপ করে শুনলেন।
তাঁর চোখে তখন যে কৌতূহল দেখেছিলাম, সেটি কোনো পুলিশ কর্মকর্তার কৌতূহল নয়—একজন পাঠকের কৌতূহল।
তখন মনে হলো, কঠিন পুলিশিংয়ের ভেতরেও এই মানুষটি কোথাও না কোথাও শব্দের কাছে আশ্রয় খোঁজেন।
সাহিত্য হয়তো তাঁর পেশা নয়; কিন্তু সাহিত্যের প্রতি তাঁর ভালোবাসা আছে। আর মানুষের জীবন, অপরাধ, সমাজ ও রাষ্ট্রের নানা অসঙ্গতি নিয়ে তাঁর যে চিন্তা—সেটি একজন লেখকের চিন্তার সঙ্গে অনেকটাই মিলে যায়।
একটি কথার মধ্যে লুকিয়ে থাকা স্বপ্ন
সেদিনের আড্ডার সবচেয়ে স্মরণীয় মুহূর্তটি এসেছিল হঠাৎ।
তিনি আমাকে বললেন—
“কামাল ভাই, আমি আপনাকে নিয়ে একটি গবেষণামূলক লেখা লিখতে চাই। তবে পুলিশের ভাষায় নয়—একজন সাধারণ মানুষের দৃষ্টিতে। অপরাধ ও অপরাধী, আইন ও আদালত, মানবাধিকার আর সমাজের অসঙ্গতিগুলোকে নিয়ে লিখতে চাই। এমনভাবে লিখতে চাই, যাতে সেটা শুধু লেখা না হয়ে মানুষের জন্য একটা মেসেজ হয়।”
কথাটি শুনে আমি কিছুক্ষণ চুপ করে ছিলাম।
একজন পুলিশ কর্মকর্তা নিজের দায়িত্বের অভিজ্ঞতাকে শুধু চাকরির ফাইলে আটকে রাখতে চান না—কলমের মাধ্যমে মানুষের কাছে পৌঁছে দিতে চান—এটি আমার কাছে নিঃসন্দেহে আনন্দের বিষয়।
আমি তাঁকে বলেছিলাম—
“আপনি লিখুন। আপনার দেখা সমাজের গল্প অন্যদের দেখা গল্পের মতো হবে না।”
কারণ একজন পুলিশ কর্মকর্তা মানুষের জীবনের যে অন্ধকার দিকটি কাছ থেকে দেখেন, একজন সাধারণ মানুষ হয়তো তার সামান্য অংশও দেখতে পান না।
কঠোরতার ভেতরে কোমলতা
জাহিদুল কবিরের আরেকটি দিক আমাকে সবসময় ভাবায়।
পুলিশের দায়িত্বে তাঁকে কঠোর হতে হয়। অপরাধের সঙ্গে আপস করার সুযোগ নেই। আইন প্রয়োগের ক্ষেত্রে ব্যক্তিগত আবেগকে দূরে রাখতে হয়। একজন পেশাদার পুলিশ কর্মকর্তার কাছে দায়িত্বই প্রথম কথা।
কিন্তু সেই কঠোরতার ভেতরেও আমি দেখেছি একজন সহজ মানুষকে।
মানুষের কথা মন দিয়ে শোনার চেষ্টা করেন তিনি। সমাজের দুর্বল মানুষের কথা ভাবেন। অপরাধ দমনকে শুধু শাস্তির বিষয় হিসেবে না দেখে অপরাধ প্রতিরোধ ও সংশোধনের দিকটিও গুরুত্ব দিয়ে ভাবেন।
এই জায়গাটিই হয়তো তাঁর ব্যক্তিত্বের সবচেয়ে সুন্দর দিক।
কারণ কঠোর হওয়া সহজ; কঠোর দায়িত্ব পালন করেও মানবিক থাকা কঠিন।
পেকুয়ার মাটির মানুষ
কক্সবাজার জেলার চকরিয়া উপজেলার পেকুয়ার সন্তান জাহিদুল কবির।
গ্রামের মাটি, মানুষের সহজ সম্পর্ক, শৈশবের স্মৃতি—এসব মানুষের চরিত্রে কোথাও না কোথাও থেকে যায়। আমার মনে হয়, তাঁর ভেতরের এই সরলতার শিকড়ও সেই মাটির কাছেই।
পুলিশের দীর্ঘ চাকরি, শহুরে ব্যস্ততা, অপরাধের কঠিন বাস্তবতা—সবকিছুর মধ্যেও তাঁর কথাবার্তায় সেই সহজ মানুষটির ছায়া পাওয়া যায়।
সম্ভবত এ কারণেই তিনি মানুষের গল্প শুনতে পারেন।
সম্ভবত এ কারণেই সাহিত্য তাঁকে টানে।
সম্ভবত এ কারণেই একজন অপরাধীর মধ্যেও তিনি শুধু অপরাধীকে নয়, তার পেছনে থাকা মানুষটিকেও দেখতে চান।
আমার চোখে জাহিদুল কবির
আমি তাঁকে নিয়ে লিখতে বসে তাঁর পদবি দিয়ে শুরু করতে চাইনি।
কারণ তিনি আমার কাছে শুধু একজন অফিসার ইনচার্জ নন।
তিনি একজন পরিচিত মানুষ। একজন আড্ডার সঙ্গী। একজন সাহিত্যপ্রেমী পাঠক। একজন চিন্তাশীল পুলিশ কর্মকর্তা। একজন দায়িত্বশীল পেশাজীবী।
চকবাজার থেকে চান্দগাঁও, চান্দগাঁও থেকে বায়েজিদ, আর এখন বাকলিয়া—তাঁর এই পথচলার প্রতিটি অধ্যায়ে আমি একজন পুলিশ কর্মকর্তার দায়িত্বশীলতার পাশাপাশি একজন মানুষের বিবর্তনও দেখতে পাই।
তাঁর কর্মজীবনের মূল্যায়ন করার মতো কোনো আনুষ্ঠানিক অবস্থানে আমি নেই। কিন্তু একজন দীর্ঘদিনের পরিচিত মানুষ হিসেবে এতটুকু বলতে পারি—দায়িত্ব, সততা, ন্যায়বোধ ও পেশাদারিত্বের সঙ্গে মানবিকতাকে ধরে রাখার চেষ্টা তাঁর ব্যক্তিত্বের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক।
একদিন হয়তো তিনি লিখবেন
আমি বিশ্বাস করি, একদিন জাহিদুল কবির সত্যিই লিখবেন।
লিখবেন থানার ভেতরের গল্প।
লিখবেন অপরাধীর চোখে দেখা সমাজের গল্প।
লিখবেন অসহায় মানুষের কান্নার গল্প।
লিখবেন আইন ও মানুষের দূরত্বের গল্প।
লিখবেন পুলিশের দায়িত্বের গল্প।
আর হয়তো লিখবেন এমন কিছু মানুষের গল্প, যাদের জীবন আমরা প্রতিদিন পাশ কাটিয়ে চলে যাই।
সেদিন তাঁর লেখা শুধু সাহিত্য হবে না; হয়ে উঠতে পারে তাঁর দেখা সময়ের একটি মূল্যবান দলিল।
কারণ যে মানুষ অপরাধকে খুব কাছ থেকে দেখেছে, সে যদি মানুষের গল্প লিখে—সেই গল্পের গভীরতা অন্যরকম হবেই।
শেষ কথাটি
জাহিদুল কবিরকে আমি যখন পুলিশের পোশাকে দেখি, তখন দেখি একজন দায়িত্বশীল পুলিশ কর্মকর্তাকে।
আর যখন চায়ের কাপ হাতে তাঁর পাশে বসি, তখন দেখি অন্য একজন জাহিদুলকে।
সেখানে কোনো ইউনিফর্ম নেই, কোনো পদমর্যাদার দূরত্ব নেই—আছে শুধু একজন মানুষ, যিনি সাহিত্য নিয়ে কথা বলেন, সমাজ নিয়ে ভাবেন, মানুষের কথা শুনতে চান এবং নিজের দেখা জীবনকে একদিন হয়তো শব্দে বন্দী করতে চান।
এই দুই জাহিদুলকে মিলিয়েই আমার কাছে তাঁর সম্পূর্ণ পরিচয়।
আইনের কাছে তিনি একজন পুলিশ কর্মকর্তা;
সহকর্মীদের কাছে একজন দায়িত্বশীল অফিসার;
আর আমার কাছে—ইউনিফর্মের আড়ালে লুকিয়ে থাকা একজন সাহিত্যপ্রেমী, মানবিক ও সহজ-সরল মানুষ।
সময়ের সঙ্গে মানুষের পদ বদলায়, কর্মস্থল বদলায়, দায়িত্ব বদলায়। কিন্তু কিছু মানুষ তাঁদের আচরণ দিয়ে স্মৃতিতে থেকে যান।
জাহিদুল কবিরও তেমন একজন।
চকবাজারের দিন থেকে চান্দগাঁও, বায়েজিদ পেরিয়ে আজকের বাকলিয়া—থানার ঠিকানা বদলেছে; কিন্তু মানুষটি আমার স্মৃতিতে একই রয়ে গেছেন।
একজন পুলিশ কর্মকর্তা হিসেবে তাঁর হাতে আইন; আর একজন মানুষ হিসেবে তাঁর হৃদয়ে মানুষের জন্য জায়গা—এই দুইয়ের সমন্বয়ই হয়তো তাঁর সবচেয়ে সুন্দর পরিচয়।
আর সেই কারণেই তাঁকে নিয়ে আমার এই স্মৃতিচারণ—একজন পুলিশ অফিসারকে নিয়ে নয়, একজন মানুষের গল্প।

পাথরঘাটায় ছিনতাই: কোতোয়ালী পুলিশের অভিযানে গ্রেপ্তার ১, অটোরিকশা জব্দ

চট্টগ্রামের কোতোয়ালী থানাধীন পাথরঘাটায় অটোরিকশাযাত্রীকে ছোরার ভয় দেখিয়ে ছিনতাইয়ের ঘটনায় সংঘবদ্ধ চক্রের এক সদস্যকে গ্রেপ্তার করেছে কোতোয়ালী থানা পুলিশ। এ সময় ছিনতাই কাজে ব্যবহৃত ব্যাটারিচালিত একটি অটোরিকশা জব্দ করা হয়েছে। পুলিশ জানায়, গত ১৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬ সকাল ৬টা ৪০ মিনিটের দিকে পাথরঘাটার ১৬ নম্বর সতিশ বাবুর লেইনে মজিবুর রহমানের ছয়তলা ভবনের সামনে সড়কে এক অজ্ঞাতনামা অটোরিকশাযাত্রীকে গতিরোধ করে তিন ছিনতাইকারী। এ সময় ছোরার ভয় দেখিয়ে ওই যাত্রীর কাছ থেকে টাকা-পয়সা ছিনিয়ে নিয়ে পালিয়ে যায় তারা। ঘটনাটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমসহ বিভিন্ন মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে বিষয়টি পুলিশের নজরে আসে। ঘটনার পর সিএমপির দক্ষিণ বিভাগের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের নির্দেশনায় কোতোয়ালী জোনের সহকারী পুলিশ কমিশনারের তত্ত্বাবধানে এবং কোতোয়ালী থানার অফিসার ইনচার্জের নেতৃত্বে অভিযান শুরু করে পুলিশ। এরই ধারাবাহিকতায় ২০ সেপ্টেম্বর রাত ১টার দিকে বাকলিয়া থানা এলাকায় অভিযান চালিয়ে ছিনতাই চক্রের অন্যতম সদস্য মনির হোসেন (৩৮)-কে আটক করা হয়। পুলিশের দাবি, জিজ্ঞাসাবাদে মনির হোসেন ছিনতাইয়ের ঘটনায় জড়িত থাকার কথা স্বীকার করেন এবং তার সঙ্গে থাকা আরও দুই পলাতক সহযোগীর নাম-ঠিকানা প্রকাশ করেন। তার দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে ছিনতাইয়ে ব্যবহৃত ব্যাটারিচালিত অটোরিকশাটি উদ্ধার করে জব্দ করা হয়। এ ঘটনায় কোতোয়ালী থানায় মামলা নম্বর ৩৮, তারিখ ২০ সেপ্টেম্বর ২০২৬, পেনাল কোডের ৩৯২ ধারায় মামলা দায়ের করা হয়েছে। গ্রেপ্তার আসামিকে আদালতে প্রেরণ করা হয়েছে। পলাতক দুই আসামিকে গ্রেপ্তারে অভিযান অব্যাহত রয়েছে।

চট্টগ্রাম সিনিয়র’স প্রেস ক্লাবের নতুন কমিটি গঠন: সভাপতি ইস্কান্দার আলী চৌধুরী, সাধারণ সম্পাদক মো. কামাল উদ্দিন

চট্টগ্রামের প্রবীণ ও পেশাদার সাংবাদিকদের ঐক্য, মর্যাদা, কল্যাণ ও ন্যায্য অধিকার প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে গঠিত ‘Chattogram Senior’s Press Club Limited’-এর নতুন কমিটি গঠন করা হয়েছে। এতে সিনিয়র সাংবাদিক ইস্কান্দার আলী চৌধুরীকে সভাপতি এবং সাংবাদিক, লেখক ও টেলিভিশন উপস্থাপক মো. কামাল উদ্দিনকে সাধারণ সম্পাদক করা হয়েছে। শনিবার (উনিশ সেপ্টেম্বর) বিকেলে নগরীর মোমিন রোডস্থ দৈনিক পূর্বদেশ পত্রিকার গলিতে চট্টগ্রাম একাডেমি মিলনায়তনে অনুষ্ঠিত বিশেষ সাধারণ সভায় দীর্ঘ আলোচনা ও মতবিনিময়ের পর নতুন নেতৃত্ব ঘোষণা করা হয়। সভায় চট্টগ্রামের প্রবীণ ও অভিজ্ঞ সাংবাদিকরা সাংবাদিকদের পেশাগত মর্যাদা, পারস্পরিক ঐক্য, কল্যাণ এবং ন্যায্য অধিকার প্রতিষ্ঠায় একটি কার্যকর সাংগঠনিক প্ল্যাটফর্মের প্রয়োজনীয়তার ওপর গুরুত্বারোপ করেন।

সভায় বক্তারা বলেন, চট্টগ্রামের সাংবাদিকতায় দীর্ঘদিন ধরে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখে আসা প্রবীণ ও পেশাদার সাংবাদিকদের অভিজ্ঞতা ও অর্জনকে একটি সাংগঠনিক কাঠামোর আওতায় নিয়ে আসা সময়ের দাবি। নতুন এই সংগঠনের মাধ্যমে সিনিয়র সাংবাদিকদের মধ্যে পারস্পরিক যোগাযোগ ও সহযোগিতা বৃদ্ধি এবং পেশাগত মর্যাদা ও অধিকার রক্ষায় কার্যকর ভূমিকা রাখা সম্ভব হবে বলে তারা আশা প্রকাশ করেন। সভায় প্রধান বক্তা ছিলেন সিনিয়র সাংবাদিক ফারুক ইকবাল। তিনি চট্টগ্রামের সিনিয়র সাংবাদিকদের ঐক্যবদ্ধ হওয়ার প্রয়োজনীয়তার কথা তুলে ধরে সংগঠনটির ভবিষ্যৎ কার্যক্রমে সবার সক্রিয় অংশগ্রহণের আহ্বান জানান। ক্লাবের লক্ষ্য, উদ্দেশ্য, সাংগঠনিক কাঠামো ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা নিয়ে বিস্তারিত বক্তব্য দেন নবনির্বাচিত সাধারণ সম্পাদক মো. কামাল উদ্দিন। তিনি বলেন, সিনিয়র সাংবাদিকদের দীর্ঘ পেশাগত অভিজ্ঞতা, মর্যাদা ও অধিকারকে সামনে রেখে সংগঠনটিকে একটি কার্যকর ও কল্যাণমুখী প্ল্যাটফর্ম হিসেবে গড়ে তোলার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। সভায় সভাপতিত্ব করেন সংগঠনের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি শেখ নজরুল ইসলাম মাহমুদ। সভায় সাপ্তাহিক ‘অভিমুখ’-এর সম্পাদক বিপ্লব বড়ুয়া, খালিদ হোসেন, মাসুম আহমেদ, এম. আর. মিলন, ফয়সাল বিন নাসির, ফরহাদুল হাসান মোস্তফা, মোসলেম আলী রনি, আলমগীর চৌধুরী, সৈয়দ শিবলি সাদিক, জিল্লুর রহমান শাকিল, সৈয়দ মো. সেলিম, মো. সোলাইমান, কামাল উদ্দিন খোকন, দেব প্রসাদ দেবুসহ চট্টগ্রামের বিভিন্ন গণমাধ্যমের প্রবীণ ও পেশাদার সাংবাদিকরা উপস্থিত ছিলেন। অনুষ্ঠানের শুরুতে পবিত্র কোরআন তেলাওয়াত করেন নুসরাত জাহান।  উল্লেখ্য, ‘Chattogram Senior’s Press Club Limited’ কোম্পানিজ অ্যাক্ট, ১৯৯৪-এর অধীনে নিবন্ধিত একটি সংগঠন। সংগঠনটির রেজিস্ট্রেশন নম্বর CH-16724/2026 এবং নিবন্ধনের তারিখ ১২ জুলাই ২০২৬। সভায় নবগঠিত নেতৃত্বের মাধ্যমে চট্টগ্রামের সিনিয়র সাংবাদিকদের পেশাগত ঐক্য আরও সুদৃঢ় করা, সাংবাদিকদের কল্যাণে কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণ এবং মর্যাদা ও ন্যায্য অধিকার প্রতিষ্ঠায় সংগঠনটিকে এগিয়ে নেওয়ার প্রত্যয় ব্যক্ত করা হয়। নতুন নেতৃত্বে সভাপতি ইস্কান্দার আলী চৌধুরী ও সাধারণ সম্পাদক মো. কামাল উদ্দিনের নেতৃত্বে সংগঠনটি চট্টগ্রামের সিনিয়র সাংবাদিকদের পেশাগত ও কল্যাণমূলক কর্মকাণ্ডে আরও সক্রিয় ভূমিকা রাখবে বলে সভায় প্রত্যাশা ব্যক্ত করা হয়।

৯৯৯-এ ফোন পেয়ে চট্টগ্রামে মাদকাসক্ত বাবার কাছ থেকে ২০ মাসের শিশু উদ্ধার

চট্টগ্রামের সদরঘাট থানা এলাকায় জাতীয় জরুরি সেবা ৯৯৯-এ ফোন পেয়ে মাদকাসক্ত বাবার কাছ থেকে বিশ মাস বয়সী এক শিশুকে উদ্ধার করেছে পুলিশ। পরে শিশুটিকে তার মায়ের কাছে নিরাপদে হস্তান্তর করা হয়েছে। পুলিশ জানায়, কুমিল্লার দেবিদ্বার থানার ফতেয়াবাদ এলাকার বাসিন্দা সীমা, বয়স ছাব্বিশ বছর, বর্তমানে চট্টগ্রামের সদরঘাট থানাধীন পানির ট্যাংকি এলাকার বাচ্চু মিয়ার বাসায় বসবাস করেন। তার স্বামী লোকমান হোসেন সাগর, বয়স সাতাশ বছর, একজন মাদকাসক্ত ব্যক্তি বলে অভিযোগ করেন সীমা। সীমার অভিযোগ, গত উনিশ সেপ্টেম্বর রাত আনুমানিক দশটা দশ মিনিটে তার স্বামী লোকমান হোসেন সাগর মাদক সেবনের টাকা জোগাড়ের উদ্দেশ্যে তাদের বিশ মাস বয়সী কন্যাশিশু ফাতেমা আক্তারকে বিক্রি করে দেওয়ার জন্য বাসা থেকে নিয়ে বের হন। ঘটনাটি জানিয়ে সীমা জাতীয় জরুরি সেবা ৯৯৯-এ ফোন করেন। পরে ৯৯৯-এর মাধ্যমে বিষয়টি সদরঘাট থানায় জানানো হলে পুলিশ দ্রুত শিশুটিকে উদ্ধারে অভিযান শুরু করে। সদরঘাট থানার মোবাইল টহল ডিউটি স্পেশাল-২৪-এর নৈশকালীন কর্মকর্তা ও ফোর্স দীর্ঘ প্রায় দুই ঘণ্টা অভিযান চালিয়ে সদরঘাট থানাধীন পশ্চিম মাদারবাড়ি যুগী চাঁদ মসজিদ লেইন এলাকা থেকে শিশু ফাতেমা আক্তারকে উদ্ধার করে। উদ্ধারের পর শিশুটিকে তার মা সীমার কাছে বুঝিয়ে দেওয়া হয়। এ ঘটনায় শিশুটিকে কী উদ্দেশ্যে ওই এলাকা নিয়ে যাওয়া হয়েছিল এবং তাকে বিক্রি করার কোনো পরিকল্পনা ছিল কি না, তা খতিয়ে দেখছে পুলিশ।