Home Blog Page 5

বিশেষ প্রতিবেদন দি টুরিস্ট ও চট্রল চিত্র বিশ্ব পর্যটন দিবস উপলক্ষে চেয়ারম্যান মো. সামীমুজ্জামানের নতুন স্বপ্ন বিশ্ব পর্যটনের মানচিত্রে বাংলাদেশকে নতুন উচ্চতায় নিতে চান তিনি কক্সবাজার থেকে সুন্দরবন, চট্টগ্রামের পাহাড় থেকে বঙ্গোপসাগর, কর্ণফুলী থেকে সিলেটের চা বাগান, পর্যটনকে অর্থনীতি, কর্মসংস্থান, বিনিয়োগ ও আন্তর্জাতিক পরিচিতির শক্তিতে রূপ দেওয়ার প্রত্যয় মো. কামাল উদ্দিন ২৭ সেপ্টেম্বর বিশ্ব পর্যটন দিবস। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে নানা কর্মসূচির মধ্য দিয়ে প্রতিবছর এই দিবস পালিত হয়। পর্যটন যে শুধু মানুষের অবকাশযাপন কিংবা বিনোদনের মাধ্যম নয়, বরং একটি দেশের অর্থনীতি, কর্মসংস্থান, বিনিয়োগ, সংস্কৃতি, পরিবেশ এবং আন্তর্জাতিক পরিচিতির সঙ্গে গভীরভাবে সম্পর্কিত একটি গুরুত্বপূর্ণ শিল্প, বিশ্ব পর্যটন দিবস সেই বার্তাই সামনে নিয়ে আসে। বাংলাদেশের জন্য বিশ্ব পর্যটন দিবসের তাৎপর্য আরও গভীর। কারণ প্রকৃতির অপার সৌন্দর্য, নদী, সমুদ্র, পাহাড়, বন, দ্বীপ, হাওর, জীববৈচিত্র্য, ইতিহাস, ঐতিহ্য, প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন, লোকসংস্কৃতি এবং মানুষের আন্তরিক আতিথেয়তায় বাংলাদেশ একটি অসাধারণ পর্যটনভূমি। একদিকে কক্সবাজারের বিশাল সমুদ্রসৈকত, অন্যদিকে সুন্দরবনের গহিন অরণ্য। কোথাও পার্বত্য চট্টগ্রামের মেঘঢাকা পাহাড়, কোথাও সিলেটের সবুজ চা বাগান। কোথাও কুয়াকাটার সমুদ্র, কোথাও হাওরের বিস্তীর্ণ জলরাশি। আবার দেশের বিভিন্ন প্রান্তে ছড়িয়ে আছে হাজার বছরের ইতিহাস, ঐতিহ্য ও সভ্যতার নানা নিদর্শন। এই বিশাল সম্ভাবনাকে আধুনিক পরিকল্পনা, দক্ষ ব্যবস্থাপনা, বিশ্বমানের সেবা এবং আন্তর্জাতিক প্রচারণার মাধ্যমে কাজে লাগাতে পারলে বাংলাদেশের পর্যটন শিল্প দেশের অর্থনীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ শক্তিতে পরিণত হতে পারে। বাংলাদেশ পর্যটন করপোরেশনের চেয়ারম্যান মো. সামীমুজ্জামান বাংলাদেশের পর্যটনকে সেই বৃহত্তর দৃষ্টিভঙ্গিতেই দেখতে চান। তাঁর পর্যটন ভাবনায় পর্যটন শুধু ভ্রমণ কিংবা বিনোদনের বিষয় নয়। পর্যটন হতে পারে কর্মসংস্থানের বড় ক্ষেত্র, দেশি ও বিদেশি বিনিয়োগের নতুন দ্বার, বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের একটি সম্ভাবনাময় খাত এবং বিশ্ব দরবারে বাংলাদেশের ইতিবাচক পরিচয় তুলে ধরার অন্যতম শক্তিশালী মাধ্যম। বিশ্ব পর্যটন দিবসে চেয়ারম্যান মো. সামীমুজ্জামানের পর্যটন ভাবনা চেয়ারম্যান মো. সামীমুজ্জামানের ভাবনার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো বাংলাদেশের পর্যটনকে প্রচলিত ধারণার সীমাবদ্ধতা থেকে বের করে একটি আধুনিক, নিরাপদ, পরিচ্ছন্ন, রুচিসম্মত, প্রযুক্তিনির্ভর এবং আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন পর্যটন ব্যবস্থায় রূপান্তর করা। একটি পর্যটনকেন্দ্র শুধু সুন্দর হলেই পর্যটন উন্নত হয় না। সেখানে যাওয়ার যোগাযোগ ব্যবস্থা ভালো হতে হবে। পর্যটকের থাকার জন্য মানসম্মত আবাসন থাকতে হবে। নিরাপদ খাবার, পরিচ্ছন্ন পরিবেশ, উন্নত স্যানিটেশন, জরুরি চিকিৎসা, পর্যটন তথ্যকেন্দ্র, দক্ষ গাইড, নিরাপত্তা ব্যবস্থা এবং সহজ ডিজিটাল সেবা নিশ্চিত করতে হবে। একজন পর্যটক কোনো দেশে এসে কী অভিজ্ঞতা নিয়ে ফিরে যাচ্ছেন, সেটিই শেষ পর্যন্ত সেই দেশের পর্যটন ব্যবস্থার প্রকৃত পরিচয় হয়ে ওঠে। কক্সবাজারকে আন্তর্জাতিক পর্যটনের নতুন উচ্চতায় নিতে হবে বাংলাদেশের পর্যটন মানচিত্রে কক্সবাজারের গুরুত্ব অনস্বীকার্য। বিশাল সমুদ্রসৈকতের পাশাপাশি কক্সবাজারের রয়েছে পাহাড়, দ্বীপ, সামুদ্রিক জীববৈচিত্র্য, স্থানীয় সংস্কৃতি, রাখাইন ঐতিহ্য, স্থানীয় খাবার এবং মানুষের জীবনযাপনের বৈচিত্র্য। কক্সবাজারকে শুধু দেশীয় পর্যটকদের জনপ্রিয় গন্তব্য হিসেবে রাখলে চলবে না। আন্তর্জাতিক পর্যটন বাজারেও কক্সবাজারের সম্ভাবনাকে নতুনভাবে তুলে ধরতে হবে। একজন বিদেশি পর্যটক কক্সবাজারে এসে শুধু সমুদ্রসৈকত দেখে ফিরে যাবেন না। তিনি যেন পাহাড়ে যেতে পারেন, দ্বীপ ভ্রমণ করতে পারেন, স্থানীয় সংস্কৃতির সঙ্গে পরিচিত হতে পারেন, স্থানীয় খাবারের স্বাদ নিতে পারেন এবং বাংলাদেশের মানুষের আতিথেয়তা অনুভব করতে পারেন, সেই ধরনের সমন্বিত পর্যটন প্যাকেজ তৈরি করা প্রয়োজন। কক্সবাজারকে কেন্দ্র করে কয়েক দিনের পর্যটন প্যাকেজ তৈরি করা গেলে একজন পর্যটকের বাংলাদেশে অবস্থানের সময়ও বাড়ানো সম্ভব। চট্টগ্রাম হতে পারে বাংলাদেশের পর্যটনের অন্যতম প্রবেশদ্বার বাংলাদেশের পর্যটন উন্নয়নের কথা বলতে গেলে চট্টগ্রামকে বিশেষ গুরুত্ব দিতে হবে। চট্টগ্রাম একদিকে দেশের প্রধান সমুদ্রবন্দর, অন্যদিকে পাহাড়, সমুদ্র, নদী, দ্বীপ, উপকূল, ইতিহাস ও ঐতিহ্যের অনন্য সমন্বয়। কর্ণফুলী নদী, পতেঙ্গা সমুদ্রসৈকত, সীতাকুণ্ড, চন্দ্রনাথ, মিরসরাইয়ের পাহাড় ও জলপ্রপাত, বাঁশখালীর উপকূল, আনোয়ারা, সন্দ্বীপ এবং বৃহত্তর চট্টগ্রামের বিস্তৃত প্রাকৃতিক বৈচিত্র্যকে সমন্বিত করে একটি বড় পর্যটন অঞ্চল গড়ে তোলার সুযোগ রয়েছে। চট্টগ্রামকে শুধু শিল্প ও বাণিজ্যের শহর হিসেবে নয়, বাংলাদেশের পর্যটনের একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রবেশদ্বার হিসেবেও নতুন করে ভাবতে হবে। কর্ণফুলী নদীকে ঘিরে পর্যটনের নতুন সম্ভাবনা কর্ণফুলী শুধু একটি নদী নয়। এটি চট্টগ্রামের ইতিহাস, অর্থনীতি, সংস্কৃতি ও মানুষের জীবনযাত্রার সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত। এই নদীকে কেন্দ্র করে পরিকল্পিত নৌভ্রমণ, নদীর তীরের সৌন্দর্যায়ন, সাংস্কৃতিক আয়োজন, স্থানীয় খাবার এবং চট্টগ্রামের ইতিহাসকে পর্যটনের সঙ্গে যুক্ত করা গেলে কর্ণফুলী নিজেই একটি আকর্ষণীয় পর্যটন পণ্যে পরিণত হতে পারে। একজন বিদেশি পর্যটক কর্ণফুলীতে নৌভ্রমণ করবেন, চট্টগ্রামের ইতিহাস জানবেন, বন্দর দেখবেন, স্থানীয় খাবারের স্বাদ নেবেন এবং পাহাড় ও সমুদ্রের সৌন্দর্য উপভোগ করবেন। এমন একটি সমন্বিত পর্যটন অভিজ্ঞতা চট্টগ্রামের জন্য নতুন সম্ভাবনার দ্বার খুলে দিতে পারে। পার্বত্য চট্টগ্রাম হতে পারে প্রকৃতি ও সংস্কৃতি পর্যটনের অন্যতম কেন্দ্র রাঙামাটি, খাগড়াছড়ি ও বান্দরবান বাংলাদেশের পর্যটন সম্পদের অন্যতম বড় ভাণ্ডার। পাহাড়, মেঘ, ঝরনা, লেক, বন, পাহাড়ি জনগোষ্ঠীর জীবনযাপন, ঐতিহ্যবাহী খাবার, পোশাক, সংস্কৃতি ও উৎসব সব মিলিয়ে পার্বত্য চট্টগ্রামকে আন্তর্জাতিক মানের প্রকৃতি ও সংস্কৃতিনির্ভর পর্যটন অঞ্চলে পরিণত করা সম্ভব। তবে পাহাড়ি পর্যটনের ক্ষেত্রে পরিবেশ ও স্থানীয় জনগোষ্ঠীর সংস্কৃতির প্রতি সর্বোচ্চ সম্মান দেখাতে হবে। পর্যটনের নামে পাহাড় ও প্রকৃতি ধ্বংস নয়, বরং প্রকৃতিকে রক্ষা করেই পর্যটনের বিকাশ ঘটাতে হবে। সুন্দরবন বাংলাদেশের অমূল্য পর্যটন সম্পদ সুন্দরবন বাংলাদেশের অন্যতম বড় প্রাকৃতিক সম্পদ। বিশ্বের বৃহত্তম ম্যানগ্রোভ বন হিসেবে সুন্দরবনের আন্তর্জাতিক গুরুত্ব রয়েছে। বাঘ, হরিণ, কুমির, পাখি, নদী, খাল, গাছপালা এবং জোয়ারভাটার অনন্য জীবন সুন্দরবনকে একটি অসাধারণ পর্যটন গন্তব্যে পরিণত করেছে। সুন্দরবনে পর্যটনের বিকাশের সঙ্গে পরিবেশ সংরক্ষণের বিষয়টি অবশ্যই সর্বোচ্চ গুরুত্ব পেতে হবে। পর্যটকের সংখ্যা, নৌযান চলাচল, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, শব্দদূষণ এবং বন্যপ্রাণীর নিরাপত্তার বিষয় বিবেচনায় রেখে পরিবেশবান্ধব পর্যটন পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করতে হবে। সিলেটের চা বাগান ও হাওরেও রয়েছে বিপুল সম্ভাবনা বাংলাদেশের পর্যটন সম্ভাবনা সমুদ্র ও পাহাড়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। সিলেটের চা বাগান, জাফলং, রাতারগুল এবং হাওরাঞ্চল প্রকৃতিপ্রেমীদের জন্য অনন্য আকর্ষণ হতে পারে। বর্ষায় হাওরের বিশাল জলরাশি এবং শুষ্ক মৌসুমে তার পরিবর্তিত রূপ পর্যটকদের জন্য ভিন্ন ভিন্ন অভিজ্ঞতা তৈরি করে। নৌভ্রমণ, স্থানীয় খাবার, লোকসংস্কৃতি এবং গ্রামীণ জীবনযাপনের সঙ্গে পর্যটকদের পরিচিত করা গেলে হাওরভিত্তিক পর্যটন একটি নতুন সম্ভাবনাময় খাতে পরিণত হতে পারে। ইতিহাস ও ঐতিহ্যকে পর্যটনের সঙ্গে যুক্ত করতে হবে বাংলাদেশের ইতিহাস অত্যন্ত সমৃদ্ধ। দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে ছড়িয়ে থাকা প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন, ঐতিহাসিক স্থাপনা, প্রাচীন মসজিদ, মন্দির, বৌদ্ধবিহার, জমিদারবাড়ি এবং অন্যান্য ঐতিহ্যবাহী স্থাপনা পর্যটনের গুরুত্বপূর্ণ সম্পদ হতে পারে। পাহাড়পুর, মহাস্থানগড়, বাগেরহাটসহ ঐতিহাসিক স্থানগুলোকে আন্তর্জাতিক পর্যটন প্যাকেজের সঙ্গে যুক্ত করা প্রয়োজন। একজন বিদেশি পর্যটক শুধু একটি পুরোনো স্থাপনা দেখতে চান না। তিনি জানতে চান সেই স্থাপনার ইতিহাস, নির্মাণের গল্প, মানুষের জীবন এবং সেই সভ্যতার সঙ্গে বর্তমান বাংলাদেশের সম্পর্ক। তাই পর্যটনে গল্প বলার সংস্কৃতি গড়ে তোলা জরুরি। স্থানীয় খাবারও হতে পারে বাংলাদেশের পর্যটন ব্র্যান্ড বাংলাদেশের খাবারের বৈচিত্র্য বিশ্ব পর্যটনের একটি আকর্ষণীয় সম্পদ হতে পারে। চট্টগ্রামের মেজবানি, কালাভুনা, শুঁটকি ও সামুদ্রিক খাবার, পাহাড়ি জনগোষ্ঠীর ঐতিহ্যবাহী খাবার, সিলেটের বিভিন্ন খাবার, ঢাকার ঐতিহ্যবাহী খাবার, বাংলাদেশের মিষ্টি এবং বিভিন্ন অঞ্চলের স্থানীয় কৃষিপণ্যকে পর্যটনের অংশ করা সম্ভব। পর্যটক একটি দেশকে শুধু চোখ দিয়ে দেখেন না, অনেক সময় খাবারের স্বাদের মধ্য দিয়েও একটি দেশকে মনে রাখেন। তাই বাংলাদেশের স্থানীয় খাবারকে পরিচ্ছন্নতা, মান এবং নান্দনিক পরিবেশনার মাধ্যমে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে তুলে ধরা প্রয়োজন। পর্যটনের সুফল পৌঁছাতে হবে স্থানীয় মানুষের ঘরে পর্যটন উন্নয়নের সবচেয়ে বড় শর্ত হলো স্থানীয় জনগণকে এর অংশীদার করা। একটি পর্যটনকেন্দ্রে হোটেল তৈরি হলো, রাস্তা হলো, পর্যটক এলেন, কিন্তু স্থানীয় মানুষ যদি অর্থনৈতিকভাবে উপকৃত না হন, তাহলে সেই পর্যটন উন্নয়ন পূর্ণাঙ্গ অর্থে টেকসই হবে না। স্থানীয় তরুণদের পর্যটন গাইড হিসেবে প্রশিক্ষণ দেওয়া যেতে পারে। স্থানীয় নারীদের হস্তশিল্প, খাবার, হোমস্টে এবং ক্ষুদ্র পর্যটন ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত করা যেতে পারে। স্থানীয় কৃষক, জেলে, মাঝি, কারিগর এবং ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের পর্যটন অর্থনীতির সঙ্গে যুক্ত করা গেলে পর্যটনের সুফল প্রত্যন্ত অঞ্চলেও পৌঁছে যাবে। তরুণরাই হতে পারেন পর্যটনের নতুন দূত বাংলাদেশের তরুণ জনগোষ্ঠী পর্যটন শিল্পের বড় শক্তি। বিদেশি ভাষা, পর্যটন ব্যবস্থাপনা, গাইডিং, ডিজিটাল মার্কেটিং, ফটোগ্রাফি, ভিডিও নির্মাণ এবং আতিথেয়তা বিষয়ে প্রশিক্ষণ দিয়ে তরুণদের পর্যটন শিল্পে যুক্ত করা গেলে ব্যাপক কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হতে পারে। একজন দক্ষ পর্যটন গাইড শুধু একজন গাইড নন। তিনি একই সঙ্গে বাংলাদেশের ইতিহাস, সংস্কৃতি ও মানুষের জীবনযাত্রার একজন দূত। নারীর জন্যও খুলে যেতে পারে নতুন কর্মসংস্থানের দরজা পর্যটন শিল্পে নারীর অংশগ্রহণ বাড়ানোর বড় সুযোগ রয়েছে। হস্তশিল্প, স্থানীয় খাবার, হোমস্টে, পর্যটন গাইড, সাংস্কৃতিক পরিবেশনা, অনলাইন পর্যটন ব্যবসা এবং ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা হিসেবে নারীদের যুক্ত করা সম্ভব। বিশেষ করে গ্রামীণ ও প্রত্যন্ত অঞ্চলের নারীদের পর্যটনকেন্দ্রিক উদ্যোক্তা হিসেবে গড়ে তুলতে পারলে পর্যটন শুধু অর্থনীতিকে শক্তিশালী করবে না, নারীর অর্থনৈতিক ক্ষমতায়নেও ভূমিকা রাখবে। পর্যটনকে বিনিয়োগের আকর্ষণীয় খাতে পরিণত করতে হবে আধুনিক হোটেল, রিসোর্ট, রেস্তোরাঁ, বিনোদনকেন্দ্র, নৌপর্যটন, অ্যাডভেঞ্চার ট্যুরিজম, ইকো ট্যুরিজম, ওয়েলনেস পর্যটন এবং সম্মেলন পর্যটনে দেশি ও বিদেশি বিনিয়োগের সম্ভাবনা রয়েছে। সরকারি উদ্যোগের পাশাপাশি বেসরকারি খাতকে আরও কার্যকরভাবে সম্পৃক্ত করতে হবে। বিনিয়োগকারীদের জন্য সহজ প্রক্রিয়া, দীর্ঘমেয়াদি নীতি, প্রয়োজনীয় অবকাঠামো এবং নিরাপদ বিনিয়োগ পরিবেশ তৈরি করা গেলে পর্যটন শিল্পে নতুন বিনিয়োগের সুযোগ বাড়বে। ডিজিটাল পর্যটন হবে আগামী দিনের বাস্তবতা বিশ্বের পর্যটন ব্যবস্থা দ্রুত ডিজিটাল হচ্ছে। বাংলাদেশকেও এই পরিবর্তনের সঙ্গে তাল মিলিয়ে এগোতে হবে। একজন বিদেশি পর্যটক বাংলাদেশে আসার আগেই যেন মোবাইল ফোনের মাধ্যমে জানতে পারেন কোথায় যাবেন, কোথায় থাকবেন, কীভাবে যাবেন, কোথায় খাবেন, কত খরচ হবে এবং জরুরি প্রয়োজনে কোথায় যোগাযোগ করবেন, সেই ব্যবস্থা তৈরি করা প্রয়োজন। অনলাইন বুকিং, ডিজিটাল পেমেন্ট, ডিজিটাল ম্যাপ, বহুভাষিক ওয়েবসাইট, পর্যটন অ্যাপ এবং ভার্চুয়াল পর্যটন নির্দেশনা বাংলাদেশের পর্যটন ব্যবস্থাকে আরও সহজ ও আধুনিক করতে পারে। নিরাপত্তা ও পরিচ্ছন্নতাই পর্যটনের ভিত্তি পর্যটন যতই সুন্দর হোক, নিরাপত্তা ও পরিচ্ছন্নতার অভাব থাকলে পর্যটকের অভিজ্ঞতা পূর্ণতা পায় না। পর্যটনকেন্দ্রে পর্যটকবান্ধব আইনশৃঙ্খলা ব্যবস্থা, জরুরি চিকিৎসা, উদ্ধার ব্যবস্থা, তথ্য সহায়তা, নারী ও শিশুদের নিরাপত্তা এবং পরিচ্ছন্ন স্যানিটেশন নিশ্চিত করা প্রয়োজন। পর্যটকের কাছে বাংলাদেশের সৌন্দর্যের পাশাপাশি বাংলাদেশের মানুষের আচরণ ও সেবার মানও দেশের পরিচয়ের অংশ হয়ে উঠবে। পরিবেশ রক্ষা ছাড়া পর্যটনের ভবিষ্যৎ নেই বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় পর্যটন সম্পদ হচ্ছে প্রকৃতি। তাই পর্যটনের নামে পাহাড় কাটা, নদী দখল, বন ধ্বংস, সৈকত দূষণ কিংবা জীববৈচিত্র্য নষ্ট করা যাবে না। পরিবেশবান্ধব পর্যটনকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিতে হবে। প্রকৃতি থাকবে, পর্যটক আসবেন, স্থানীয় মানুষ উপকৃত হবেন এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মও একই সৌন্দর্য উপভোগ করবে, এমন ভারসাম্যপূর্ণ পর্যটন ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে। নদী ও জলভিত্তিক পর্যটনে নতুন সম্ভাবনা নদীমাতৃক বাংলাদেশকে নদীভিত্তিক পর্যটনের দেশ হিসেবেও বিশ্বের সামনে তুলে ধরা সম্ভব। কর্ণফুলী, পদ্মা, মেঘনা, যমুনা, সুরমা, কুশিয়ারা এবং দেশের অসংখ্য নদী ও জলাভূমিকে কেন্দ্র করে পরিকল্পিত নৌভ্রমণ, নদীকেন্দ্রিক পর্যটন এবং স্থানীয় জীবনযাপনের সঙ্গে পর্যটকদের পরিচিত করার সুযোগ রয়েছে। বিশেষ করে কর্ণফুলী নদীকে কেন্দ্র করে চট্টগ্রামের একটি আধুনিক নদী পর্যটন পরিকল্পনা গ্রহণ করা গেলে এটি দেশি ও বিদেশি পর্যটকদের কাছে নতুন আকর্ষণ সৃষ্টি করতে পারে। মেডিকেল, ওয়েলনেস ও সম্মেলন পর্যটনের সম্ভাবনা পর্যটনের নতুন ক্ষেত্র হিসেবে মেডিকেল ও ওয়েলনেস পর্যটনকে গুরুত্ব দেওয়া যেতে পারে। একইভাবে আন্তর্জাতিক সম্মেলন, ব্যবসায়িক সভা, প্রদর্শনী ও করপোরেট আয়োজনের সঙ্গে পর্যটনকে যুক্ত করা সম্ভব। একজন ব্যবসায়ী বা সম্মেলনের অতিথি বাংলাদেশে এসে যদি একই সফরে কক্সবাজার, চট্টগ্রাম, সুন্দরবন কিংবা অন্য কোনো পর্যটনকেন্দ্র ভ্রমণ করেন, তাহলে ব্যবসা ও পর্যটন উভয় ক্ষেত্রেই অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড তৈরি হবে। পর্যটন সার্কিট গড়ে তুলতে হবে বাংলাদেশের পর্যটনের বড় সম্ভাবনা রয়েছে আন্তঃআঞ্চলিক পর্যটন সার্কিট গড়ে তোলার মধ্যে। চট্টগ্রাম থেকে কক্সবাজার। কক্সবাজার থেকে বান্দরবান। বান্দরবান থেকে রাঙামাটি। চট্টগ্রাম থেকে সীতাকুণ্ড ও মিরসরাই। খুলনা থেকে সুন্দরবন ও বাগেরহাট। সিলেট থেকে জাফলং, রাতারগুল ও হাওর। ঢাকা থেকে কুমিল্লা, চট্টগ্রাম ও কক্সবাজার। এভাবে একাধিক পর্যটনকেন্দ্রকে একটি প্যাকেজে যুক্ত করা গেলে পর্যটকের বাংলাদেশে অবস্থানের সময় বাড়বে এবং দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে পর্যটনের অর্থনৈতিক সুফল ছড়িয়ে পড়বে। আন্তর্জাতিক ব্র্যান্ডিংয়ে নতুন বাংলাদেশ বাংলাদেশকে বিশ্বের সামনে শুধু সস্তা পর্যটন গন্তব্য হিসেবে উপস্থাপন করা যথেষ্ট নয়। বাংলাদেশকে তুলে ধরতে হবে বৈচিত্র্যের দেশ হিসেবে। এটি নদীর দেশ। এটি সমুদ্রের দেশ। এটি পাহাড়ের দেশ। এটি সুন্দরবনের দেশ। এটি হাজার বছরের ইতিহাস ও ঐতিহ্যের দেশ। এটি বৈচিত্র্যময় সংস্কৃতির দেশ। এটি অতিথিপরায়ণ মানুষের দেশ। এই গল্পকে আধুনিক তথ্যপ্রযুক্তি, আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এবং বিশ্ব পর্যটন মেলার মাধ্যমে বিশ্বের মানুষের কাছে পৌঁছে দিতে হবে। গণমাধ্যমের ভূমিকা আরও বাড়াতে হবে বাংলাদেশের পর্যটন উন্নয়নে গণমাধ্যম গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে। সংবাদপত্র, টেলিভিশন, অনলাইন সংবাদমাধ্যম, তথ্যচিত্র, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এবং ডিজিটাল কনটেন্টের মাধ্যমে বাংলাদেশের পর্যটন সম্ভাবনা বিশ্বের সামনে তুলে ধরা প্রয়োজন। বিশেষ করে স্থানীয় পর্যটন সাংবাদিকতার বিকাশ ঘটাতে হবে। কারণ স্থানীয় সাংবাদিকরা তাঁদের এলাকার প্রকৃতি, ইতিহাস, সমস্যা ও সম্ভাবনাকে গভীরভাবে তুলে ধরতে পারেন। পর্যটন উন্নয়নে গবেষণা প্রয়োজন কোন দেশের পর্যটক বাংলাদেশে আসতে চান? তাঁরা কী দেখতে চান? কতদিন থাকতে চান? কত টাকা ব্যয় করতে আগ্রহী? কোন পর্যটনকেন্দ্র তাঁদের বেশি আকর্ষণ করে? কেন অনেক বিদেশি পর্যটক বাংলাদেশে এসে অল্প সময়ের মধ্যে ফিরে যান? এসব প্রশ্নের উত্তর গবেষণার মাধ্যমে খুঁজে বের করতে হবে। পর্যটন উন্নয়নে নিয়মিত পর্যটক জরিপ, বাজার গবেষণা এবং আন্তর্জাতিক পর্যটন প্রবণতা বিশ্লেষণের প্রয়োজন রয়েছে। সামনে যে বাংলাদেশের স্বপ্ন চেয়ারম্যান মো. সামীমুজ্জামানের পর্যটন ভাবনায় একটি আধুনিক বাংলাদেশের স্বপ্ন রয়েছে। যেখানে কক্সবাজার হবে আন্তর্জাতিক সমুদ্র পর্যটনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ গন্তব্য। সুন্দরবন হবে প্রকৃতি ও জীববৈচিত্র্যপ্রেমীদের আকর্ষণের কেন্দ্র। পার্বত্য চট্টগ্রাম হবে প্রকৃতি, অ্যাডভেঞ্চার ও সংস্কৃতিনির্ভর পর্যটনের অন্যতম ক্ষেত্র। সিলেট হবে চা, প্রকৃতি ও সংস্কৃতির অনন্য গন্তব্য। চট্টগ্রাম হবে পাহাড়, সমুদ্র, নদী, বন্দর ও ঐতিহ্যের সমন্বিত পর্যটন প্রবেশদ্বার। দেশের প্রতিটি অঞ্চল তার নিজস্ব ইতিহাস, ঐতিহ্য, সংস্কৃতি ও প্রাকৃতিক বৈশিষ্ট্য নিয়ে বিশ্ব পর্যটনের সামনে নিজস্ব পরিচয় তুলে ধরবে। প্রয়োজন সম্মিলিত জাতীয় উদ্যোগ বাংলাদেশের পর্যটনকে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে নিয়ে যাওয়া কোনো একক ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের কাজ নয়। প্রয়োজন সংশ্লিষ্ট সরকারি প্রতিষ্ঠান, বাংলাদেশ পর্যটন করপোরেশন, বাংলাদেশ ট্যুরিজম বোর্ড, স্থানীয় প্রশাসন, ট্যুরিস্ট পুলিশ, বেসরকারি বিনিয়োগকারী, পর্যটন ব্যবসায়ী, হোটেল রেস্তোরাঁ শিল্প, পরিবহন খাত, স্থানীয় জনগণ এবং গণমাধ্যমের সমন্বিত উদ্যোগ। পর্যটনের জন্য প্রয়োজন একটি দীর্ঘমেয়াদি জাতীয় পরিকল্পনা। প্রয়োজন পরিকল্পনার ধারাবাহিক বাস্তবায়ন। প্রয়োজন পর্যটনকে জাতীয় অর্থনীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ শিল্প হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা। বিশ্ব দরবারে বাংলাদেশের নতুন পরিচয় বাংলাদেশের পর্যটনের সম্ভাবনা নিয়ে নতুন করে ভাবার সময় এসেছে। আমাদের সম্পদ তৈরি করতে হবে না। প্রকৃতি আমাদের সম্পদ দিয়েছে। আমাদের রয়েছে সমুদ্র। আমাদের রয়েছে পাহাড়। আমাদের রয়েছে নদী। আমাদের রয়েছে সুন্দরবন। আমাদের রয়েছে দ্বীপ। আমাদের রয়েছে হাওর। আমাদের রয়েছে ইতিহাস। আমাদের রয়েছে ঐতিহ্য। আমাদের রয়েছে সংস্কৃতি। আমাদের রয়েছে জীববৈচিত্র্য। আর রয়েছে মানুষের আন্তরিক আতিথেয়তা। এখন প্রয়োজন এই সম্পদকে আধুনিক পরিকল্পনা, বিশ্বমানের অবকাঠামো, নিরাপদ ও পরিচ্ছন্ন পরিবেশ, দক্ষ জনবল, প্রযুক্তি এবং আন্তর্জাতিক প্রচারণার সঙ্গে যুক্ত কর

বিশেষ প্রতিবেদন :
মো. কামাল উদ্দিন
২৭ সেপ্টেম্বর বিশ্ব পর্যটন দিবস। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে নানা কর্মসূচির মধ্য দিয়ে প্রতিবছর এই দিবস পালিত হয়। পর্যটন যে শুধু মানুষের অবকাশযাপন কিংবা বিনোদনের মাধ্যম নয়, বরং একটি দেশের অর্থনীতি, কর্মসংস্থান, বিনিয়োগ, সংস্কৃতি, পরিবেশ এবং আন্তর্জাতিক পরিচিতির সঙ্গে গভীরভাবে সম্পর্কিত একটি গুরুত্বপূর্ণ শিল্প, বিশ্ব পর্যটন দিবস সেই বার্তাই সামনে নিয়ে আসে।
বাংলাদেশের জন্য বিশ্ব পর্যটন দিবসের তাৎপর্য আরও গভীর। কারণ প্রকৃতির অপার সৌন্দর্য, নদী, সমুদ্র, পাহাড়, বন, দ্বীপ, হাওর, জীববৈচিত্র্য, ইতিহাস, ঐতিহ্য, প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন, লোকসংস্কৃতি এবং মানুষের আন্তরিক আতিথেয়তায় বাংলাদেশ একটি অসাধারণ পর্যটনভূমি।
একদিকে কক্সবাজারের বিশাল সমুদ্রসৈকত, অন্যদিকে সুন্দরবনের গহিন অরণ্য। কোথাও পার্বত্য চট্টগ্রামের মেঘঢাকা পাহাড়, কোথাও সিলেটের সবুজ চা বাগান। কোথাও কুয়াকাটার সমুদ্র, কোথাও হাওরের বিস্তীর্ণ জলরাশি। আবার দেশের বিভিন্ন প্রান্তে ছড়িয়ে আছে হাজার বছরের ইতিহাস, ঐতিহ্য ও সভ্যতার নানা নিদর্শন।
এই বিশাল সম্ভাবনাকে আধুনিক পরিকল্পনা, দক্ষ ব্যবস্থাপনা, বিশ্বমানের সেবা এবং আন্তর্জাতিক প্রচারণার মাধ্যমে কাজে লাগাতে পারলে বাংলাদেশের পর্যটন শিল্প দেশের অর্থনীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ শক্তিতে পরিণত হতে পারে।
বাংলাদেশ পর্যটন করপোরেশনের চেয়ারম্যান মো. সামীমুজ্জামান বাংলাদেশের পর্যটনকে সেই বৃহত্তর দৃষ্টিভঙ্গিতেই দেখতে চান। তাঁর পর্যটন ভাবনায় পর্যটন শুধু ভ্রমণ কিংবা বিনোদনের বিষয় নয়। পর্যটন হতে পারে কর্মসংস্থানের বড় ক্ষেত্র, দেশি ও বিদেশি বিনিয়োগের নতুন দ্বার, বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের একটি সম্ভাবনাময় খাত এবং বিশ্ব দরবারে বাংলাদেশের ইতিবাচক পরিচয় তুলে ধরার অন্যতম শক্তিশালী মাধ্যম।
বিশ্ব পর্যটন দিবসে চেয়ারম্যান মো. সামীমুজ্জামানের পর্যটন ভাবনা
চেয়ারম্যান মো. সামীমুজ্জামানের ভাবনার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো বাংলাদেশের পর্যটনকে প্রচলিত ধারণার সীমাবদ্ধতা থেকে বের করে একটি আধুনিক, নিরাপদ, পরিচ্ছন্ন, রুচিসম্মত, প্রযুক্তিনির্ভর এবং আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন পর্যটন ব্যবস্থায় রূপান্তর করা।
একটি পর্যটনকেন্দ্র শুধু সুন্দর হলেই পর্যটন উন্নত হয় না। সেখানে যাওয়ার যোগাযোগ ব্যবস্থা ভালো হতে হবে। পর্যটকের থাকার জন্য মানসম্মত আবাসন থাকতে হবে। নিরাপদ খাবার, পরিচ্ছন্ন পরিবেশ, উন্নত স্যানিটেশন, জরুরি চিকিৎসা, পর্যটন তথ্যকেন্দ্র, দক্ষ গাইড, নিরাপত্তা ব্যবস্থা এবং সহজ ডিজিটাল সেবা নিশ্চিত করতে হবে।
একজন পর্যটক কোনো দেশে এসে কী অভিজ্ঞতা নিয়ে ফিরে যাচ্ছেন, সেটিই শেষ পর্যন্ত সেই দেশের পর্যটন ব্যবস্থার প্রকৃত পরিচয় হয়ে ওঠে।
কক্সবাজারকে আন্তর্জাতিক পর্যটনের নতুন উচ্চতায় নিতে হবে
বাংলাদেশের পর্যটন মানচিত্রে কক্সবাজারের গুরুত্ব অনস্বীকার্য। বিশাল সমুদ্রসৈকতের পাশাপাশি কক্সবাজারের রয়েছে পাহাড়, দ্বীপ, সামুদ্রিক জীববৈচিত্র্য, স্থানীয় সংস্কৃতি, রাখাইন ঐতিহ্য, স্থানীয় খাবার এবং মানুষের জীবনযাপনের বৈচিত্র্য।
কক্সবাজারকে শুধু দেশীয় পর্যটকদের জনপ্রিয় গন্তব্য হিসেবে রাখলে চলবে না। আন্তর্জাতিক পর্যটন বাজারেও কক্সবাজারের সম্ভাবনাকে নতুনভাবে তুলে ধরতে হবে।
একজন বিদেশি পর্যটক কক্সবাজারে এসে শুধু সমুদ্রসৈকত দেখে ফিরে যাবেন না। তিনি যেন পাহাড়ে যেতে পারেন, দ্বীপ ভ্রমণ করতে পারেন, স্থানীয় সংস্কৃতির সঙ্গে পরিচিত হতে পারেন, স্থানীয় খাবারের স্বাদ নিতে পারেন এবং বাংলাদেশের মানুষের আতিথেয়তা অনুভব করতে পারেন, সেই ধরনের সমন্বিত পর্যটন প্যাকেজ তৈরি করা প্রয়োজন।
কক্সবাজারকে কেন্দ্র করে কয়েক দিনের পর্যটন প্যাকেজ তৈরি করা গেলে একজন পর্যটকের বাংলাদেশে অবস্থানের সময়ও বাড়ানো সম্ভব।
চট্টগ্রাম হতে পারে বাংলাদেশের পর্যটনের অন্যতম প্রবেশদ্বার
বাংলাদেশের পর্যটন উন্নয়নের কথা বলতে গেলে চট্টগ্রামকে বিশেষ গুরুত্ব দিতে হবে।
চট্টগ্রাম একদিকে দেশের প্রধান সমুদ্রবন্দর, অন্যদিকে পাহাড়, সমুদ্র, নদী, দ্বীপ, উপকূল, ইতিহাস ও ঐতিহ্যের অনন্য সমন্বয়।
কর্ণফুলী নদী, পতেঙ্গা সমুদ্রসৈকত, সীতাকুণ্ড, চন্দ্রনাথ, মিরসরাইয়ের পাহাড় ও জলপ্রপাত, বাঁশখালীর উপকূল, আনোয়ারা, সন্দ্বীপ এবং বৃহত্তর চট্টগ্রামের বিস্তৃত প্রাকৃতিক বৈচিত্র্যকে সমন্বিত করে একটি বড় পর্যটন অঞ্চল গড়ে তোলার সুযোগ রয়েছে।
চট্টগ্রামকে শুধু শিল্প ও বাণিজ্যের শহর হিসেবে নয়, বাংলাদেশের পর্যটনের একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রবেশদ্বার হিসেবেও নতুন করে ভাবতে হবে।
কর্ণফুলী নদীকে ঘিরে পর্যটনের নতুন সম্ভাবনা
কর্ণফুলী শুধু একটি নদী নয়। এটি চট্টগ্রামের ইতিহাস, অর্থনীতি, সংস্কৃতি ও মানুষের জীবনযাত্রার সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত।
এই নদীকে কেন্দ্র করে পরিকল্পিত নৌভ্রমণ, নদীর তীরের সৌন্দর্যায়ন, সাংস্কৃতিক আয়োজন, স্থানীয় খাবার এবং চট্টগ্রামের ইতিহাসকে পর্যটনের সঙ্গে যুক্ত করা গেলে কর্ণফুলী নিজেই একটি আকর্ষণীয় পর্যটন পণ্যে পরিণত হতে পারে।
একজন বিদেশি পর্যটক কর্ণফুলীতে নৌভ্রমণ করবেন, চট্টগ্রামের ইতিহাস জানবেন, বন্দর দেখবেন, স্থানীয় খাবারের স্বাদ নেবেন এবং পাহাড় ও সমুদ্রের সৌন্দর্য উপভোগ করবেন। এমন একটি সমন্বিত পর্যটন অভিজ্ঞতা চট্টগ্রামের জন্য নতুন সম্ভাবনার দ্বার খুলে দিতে পারে।
পার্বত্য চট্টগ্রাম হতে পারে প্রকৃতি ও সংস্কৃতি পর্যটনের অন্যতম কেন্দ্র
রাঙামাটি, খাগড়াছড়ি ও বান্দরবান বাংলাদেশের পর্যটন সম্পদের অন্যতম বড় ভাণ্ডার।
পাহাড়, মেঘ, ঝরনা, লেক, বন, পাহাড়ি জনগোষ্ঠীর জীবনযাপন, ঐতিহ্যবাহী খাবার, পোশাক, সংস্কৃতি ও উৎসব সব মিলিয়ে পার্বত্য চট্টগ্রামকে আন্তর্জাতিক মানের প্রকৃতি ও সংস্কৃতিনির্ভর পর্যটন অঞ্চলে পরিণত করা সম্ভব।
তবে পাহাড়ি পর্যটনের ক্ষেত্রে পরিবেশ ও স্থানীয় জনগোষ্ঠীর সংস্কৃতির প্রতি সর্বোচ্চ সম্মান দেখাতে হবে। পর্যটনের নামে পাহাড় ও প্রকৃতি ধ্বংস নয়, বরং প্রকৃতিকে রক্ষা করেই পর্যটনের বিকাশ ঘটাতে হবে।
সুন্দরবন বাংলাদেশের অমূল্য পর্যটন সম্পদ
সুন্দরবন বাংলাদেশের অন্যতম বড় প্রাকৃতিক সম্পদ। বিশ্বের বৃহত্তম ম্যানগ্রোভ বন হিসেবে সুন্দরবনের আন্তর্জাতিক গুরুত্ব রয়েছে।
বাঘ, হরিণ, কুমির, পাখি, নদী, খাল, গাছপালা এবং জোয়ারভাটার অনন্য জীবন সুন্দরবনকে একটি অসাধারণ পর্যটন গন্তব্যে পরিণত করেছে।
সুন্দরবনে পর্যটনের বিকাশের সঙ্গে পরিবেশ সংরক্ষণের বিষয়টি অবশ্যই সর্বোচ্চ গুরুত্ব পেতে হবে। পর্যটকের সংখ্যা, নৌযান চলাচল, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, শব্দদূষণ এবং বন্যপ্রাণীর নিরাপত্তার বিষয় বিবেচনায় রেখে পরিবেশবান্ধব পর্যটন পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করতে হবে।
সিলেটের চা বাগান ও হাওরেও রয়েছে বিপুল সম্ভাবনা
বাংলাদেশের পর্যটন সম্ভাবনা সমুদ্র ও পাহাড়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়।
সিলেটের চা বাগান, জাফলং, রাতারগুল এবং হাওরাঞ্চল প্রকৃতিপ্রেমীদের জন্য অনন্য আকর্ষণ হতে পারে।
বর্ষায় হাওরের বিশাল জলরাশি এবং শুষ্ক মৌসুমে তার পরিবর্তিত রূপ পর্যটকদের জন্য ভিন্ন ভিন্ন অভিজ্ঞতা তৈরি করে।
নৌভ্রমণ, স্থানীয় খাবার, লোকসংস্কৃতি এবং গ্রামীণ জীবনযাপনের সঙ্গে পর্যটকদের পরিচিত করা গেলে হাওরভিত্তিক পর্যটন একটি নতুন সম্ভাবনাময় খাতে পরিণত হতে পারে।
ইতিহাস ও ঐতিহ্যকে পর্যটনের সঙ্গে যুক্ত করতে হবে
বাংলাদেশের ইতিহাস অত্যন্ত সমৃদ্ধ। দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে ছড়িয়ে থাকা প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন, ঐতিহাসিক স্থাপনা, প্রাচীন মসজিদ, মন্দির, বৌদ্ধবিহার, জমিদারবাড়ি এবং অন্যান্য ঐতিহ্যবাহী স্থাপনা পর্যটনের গুরুত্বপূর্ণ সম্পদ হতে পারে।
পাহাড়পুর, মহাস্থানগড়, বাগেরহাটসহ ঐতিহাসিক স্থানগুলোকে আন্তর্জাতিক পর্যটন প্যাকেজের সঙ্গে যুক্ত করা প্রয়োজন।
একজন বিদেশি পর্যটক শুধু একটি পুরোনো স্থাপনা দেখতে চান না। তিনি জানতে চান সেই স্থাপনার ইতিহাস, নির্মাণের গল্প, মানুষের জীবন এবং সেই সভ্যতার সঙ্গে বর্তমান বাংলাদেশের সম্পর্ক।
তাই পর্যটনে গল্প বলার সংস্কৃতি গড়ে তোলা জরুরি।
স্থানীয় খাবারও হতে পারে বাংলাদেশের পর্যটন ব্র্যান্ড
বাংলাদেশের খাবারের বৈচিত্র্য বিশ্ব পর্যটনের একটি আকর্ষণীয় সম্পদ হতে পারে।
চট্টগ্রামের মেজবানি, কালাভুনা, শুঁটকি ও সামুদ্রিক খাবার, পাহাড়ি জনগোষ্ঠীর ঐতিহ্যবাহী খাবার, সিলেটের বিভিন্ন খাবার, ঢাকার ঐতিহ্যবাহী খাবার, বাংলাদেশের মিষ্টি এবং বিভিন্ন অঞ্চলের স্থানীয় কৃষিপণ্যকে পর্যটনের অংশ করা সম্ভব।
পর্যটক একটি দেশকে শুধু চোখ দিয়ে দেখেন না, অনেক সময় খাবারের স্বাদের মধ্য দিয়েও একটি দেশকে মনে রাখেন।
তাই বাংলাদেশের স্থানীয় খাবারকে পরিচ্ছন্নতা, মান এবং নান্দনিক পরিবেশনার মাধ্যমে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে তুলে ধরা প্রয়োজন।
পর্যটনের সুফল পৌঁছাতে হবে স্থানীয় মানুষের ঘরে
পর্যটন উন্নয়নের সবচেয়ে বড় শর্ত হলো স্থানীয় জনগণকে এর অংশীদার করা।
একটি পর্যটনকেন্দ্রে হোটেল তৈরি হলো, রাস্তা হলো, পর্যটক এলেন, কিন্তু স্থানীয় মানুষ যদি অর্থনৈতিকভাবে উপকৃত না হন, তাহলে সেই পর্যটন উন্নয়ন পূর্ণাঙ্গ অর্থে টেকসই হবে না।
স্থানীয় তরুণদের পর্যটন গাইড হিসেবে প্রশিক্ষণ দেওয়া যেতে পারে। স্থানীয় নারীদের হস্তশিল্প, খাবার, হোমস্টে এবং ক্ষুদ্র পর্যটন ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত করা যেতে পারে।
স্থানীয় কৃষক, জেলে, মাঝি, কারিগর এবং ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের পর্যটন অর্থনীতির সঙ্গে যুক্ত করা গেলে পর্যটনের সুফল প্রত্যন্ত অঞ্চলেও পৌঁছে যাবে।
তরুণরাই হতে পারেন পর্যটনের নতুন দূত
বাংলাদেশের তরুণ জনগোষ্ঠী পর্যটন শিল্পের বড় শক্তি।
বিদেশি ভাষা, পর্যটন ব্যবস্থাপনা, গাইডিং, ডিজিটাল মার্কেটিং, ফটোগ্রাফি, ভিডিও নির্মাণ এবং আতিথেয়তা বিষয়ে প্রশিক্ষণ দিয়ে তরুণদের পর্যটন শিল্পে যুক্ত করা গেলে ব্যাপক কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হতে পারে।
একজন দক্ষ পর্যটন গাইড শুধু একজন গাইড নন। তিনি একই সঙ্গে বাংলাদেশের ইতিহাস, সংস্কৃতি ও মানুষের জীবনযাত্রার একজন দূত।
নারীর জন্যও খুলে যেতে পারে নতুন কর্মসংস্থানের দরজা
পর্যটন শিল্পে নারীর অংশগ্রহণ বাড়ানোর বড় সুযোগ রয়েছে।
হস্তশিল্প, স্থানীয় খাবার, হোমস্টে, পর্যটন গাইড, সাংস্কৃতিক পরিবেশনা, অনলাইন পর্যটন ব্যবসা এবং ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা হিসেবে নারীদের যুক্ত করা সম্ভব।
বিশেষ করে গ্রামীণ ও প্রত্যন্ত অঞ্চলের নারীদের পর্যটনকেন্দ্রিক উদ্যোক্তা হিসেবে গড়ে তুলতে পারলে পর্যটন শুধু অর্থনীতিকে শক্তিশালী করবে না, নারীর অর্থনৈতিক ক্ষমতায়নেও ভূমিকা রাখবে।
পর্যটনকে বিনিয়োগের আকর্ষণীয় খাতে পরিণত করতে হবে
আধুনিক হোটেল, রিসোর্ট, রেস্তোরাঁ, বিনোদনকেন্দ্র, নৌপর্যটন, অ্যাডভেঞ্চার ট্যুরিজম, ইকো ট্যুরিজম, ওয়েলনেস পর্যটন এবং সম্মেলন পর্যটনে দেশি ও বিদেশি বিনিয়োগের সম্ভাবনা রয়েছে।
সরকারি উদ্যোগের পাশাপাশি বেসরকারি খাতকে আরও কার্যকরভাবে সম্পৃক্ত করতে হবে।
বিনিয়োগকারীদের জন্য সহজ প্রক্রিয়া, দীর্ঘমেয়াদি নীতি, প্রয়োজনীয় অবকাঠামো এবং নিরাপদ বিনিয়োগ পরিবেশ তৈরি করা গেলে পর্যটন শিল্পে নতুন বিনিয়োগের সুযোগ বাড়বে।
ডিজিটাল পর্যটন হবে আগামী দিনের বাস্তবতা
বিশ্বের পর্যটন ব্যবস্থা দ্রুত ডিজিটাল হচ্ছে। বাংলাদেশকেও এই পরিবর্তনের সঙ্গে তাল মিলিয়ে এগোতে হবে।
একজন বিদেশি পর্যটক বাংলাদেশে আসার আগেই যেন মোবাইল ফোনের মাধ্যমে জানতে পারেন কোথায় যাবেন, কোথায় থাকবেন, কীভাবে যাবেন, কোথায় খাবেন, কত খরচ হবে এবং জরুরি প্রয়োজনে কোথায় যোগাযোগ করবেন, সেই ব্যবস্থা তৈরি করা প্রয়োজন।
অনলাইন বুকিং, ডিজিটাল পেমেন্ট, ডিজিটাল ম্যাপ, বহুভাষিক ওয়েবসাইট, পর্যটন অ্যাপ এবং ভার্চুয়াল পর্যটন নির্দেশনা বাংলাদেশের পর্যটন ব্যবস্থাকে আরও সহজ ও আধুনিক করতে পারে।
নিরাপত্তা ও পরিচ্ছন্নতাই পর্যটনের ভিত্তি
পর্যটন যতই সুন্দর হোক, নিরাপত্তা ও পরিচ্ছন্নতার অভাব থাকলে পর্যটকের অভিজ্ঞতা পূর্ণতা পায় না।
পর্যটনকেন্দ্রে পর্যটকবান্ধব আইনশৃঙ্খলা ব্যবস্থা, জরুরি চিকিৎসা, উদ্ধার ব্যবস্থা, তথ্য সহায়তা, নারী ও শিশুদের নিরাপত্তা এবং পরিচ্ছন্ন স্যানিটেশন নিশ্চিত করা প্রয়োজন।
পর্যটকের কাছে বাংলাদেশের সৌন্দর্যের পাশাপাশি বাংলাদেশের মানুষের আচরণ ও সেবার মানও দেশের পরিচয়ের অংশ হয়ে উঠবে।
পরিবেশ রক্ষা ছাড়া পর্যটনের ভবিষ্যৎ নেই
বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় পর্যটন সম্পদ হচ্ছে প্রকৃতি।
তাই পর্যটনের নামে পাহাড় কাটা, নদী দখল, বন ধ্বংস, সৈকত দূষণ কিংবা জীববৈচিত্র্য নষ্ট করা যাবে না।
পরিবেশবান্ধব পর্যটনকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিতে হবে।
প্রকৃতি থাকবে, পর্যটক আসবেন, স্থানীয় মানুষ উপকৃত হবেন এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মও একই সৌন্দর্য উপভোগ করবে, এমন ভারসাম্যপূর্ণ পর্যটন ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে।
নদী ও জলভিত্তিক পর্যটনে নতুন সম্ভাবনা
নদীমাতৃক বাংলাদেশকে নদীভিত্তিক পর্যটনের দেশ হিসেবেও বিশ্বের সামনে তুলে ধরা সম্ভব।
কর্ণফুলী, পদ্মা, মেঘনা, যমুনা, সুরমা, কুশিয়ারা এবং দেশের অসংখ্য নদী ও জলাভূমিকে কেন্দ্র করে পরিকল্পিত নৌভ্রমণ, নদীকেন্দ্রিক পর্যটন এবং স্থানীয় জীবনযাপনের সঙ্গে পর্যটকদের পরিচিত করার সুযোগ রয়েছে।
বিশেষ করে কর্ণফুলী নদীকে কেন্দ্র করে চট্টগ্রামের একটি আধুনিক নদী পর্যটন পরিকল্পনা গ্রহণ করা গেলে এটি দেশি ও বিদেশি পর্যটকদের কাছে নতুন আকর্ষণ সৃষ্টি করতে পারে।
মেডিকেল, ওয়েলনেস ও সম্মেলন পর্যটনের সম্ভাবনা
পর্যটনের নতুন ক্ষেত্র হিসেবে মেডিকেল ও ওয়েলনেস পর্যটনকে গুরুত্ব দেওয়া যেতে পারে।
একইভাবে আন্তর্জাতিক সম্মেলন, ব্যবসায়িক সভা, প্রদর্শনী ও করপোরেট আয়োজনের সঙ্গে পর্যটনকে যুক্ত করা সম্ভব।
একজন ব্যবসায়ী বা সম্মেলনের অতিথি বাংলাদেশে এসে যদি একই সফরে কক্সবাজার, চট্টগ্রাম, সুন্দরবন কিংবা অন্য কোনো পর্যটনকেন্দ্র ভ্রমণ করেন, তাহলে ব্যবসা ও পর্যটন উভয় ক্ষেত্রেই অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড তৈরি হবে।
পর্যটন সার্কিট গড়ে তুলতে হবে
বাংলাদেশের পর্যটনের বড় সম্ভাবনা রয়েছে আন্তঃআঞ্চলিক পর্যটন সার্কিট গড়ে তোলার মধ্যে।
চট্টগ্রাম থেকে কক্সবাজার।
কক্সবাজার থেকে বান্দরবান।
বান্দরবান থেকে রাঙামাটি।
চট্টগ্রাম থেকে সীতাকুণ্ড ও মিরসরাই।
খুলনা থেকে সুন্দরবন ও বাগেরহাট।
সিলেট থেকে জাফলং, রাতারগুল ও হাওর।
ঢাকা থেকে কুমিল্লা, চট্টগ্রাম ও কক্সবাজার।
এভাবে একাধিক পর্যটনকেন্দ্রকে একটি প্যাকেজে যুক্ত করা গেলে পর্যটকের বাংলাদেশে অবস্থানের সময় বাড়বে এবং দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে পর্যটনের অর্থনৈতিক সুফল ছড়িয়ে পড়বে।
আন্তর্জাতিক ব্র্যান্ডিংয়ে নতুন বাংলাদেশ
বাংলাদেশকে বিশ্বের সামনে শুধু সস্তা পর্যটন গন্তব্য হিসেবে উপস্থাপন করা যথেষ্ট নয়।
বাংলাদেশকে তুলে ধরতে হবে বৈচিত্র্যের দেশ হিসেবে।
এটি নদীর দেশ।
এটি সমুদ্রের দেশ।
এটি পাহাড়ের দেশ।
এটি সুন্দরবনের দেশ।
এটি হাজার বছরের ইতিহাস ও ঐতিহ্যের দেশ।
এটি বৈচিত্র্যময় সংস্কৃতির দেশ।
এটি অতিথিপরায়ণ মানুষের দেশ।
এই গল্পকে আধুনিক তথ্যপ্রযুক্তি, আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এবং বিশ্ব পর্যটন মেলার মাধ্যমে বিশ্বের মানুষের কাছে পৌঁছে দিতে হবে।
গণমাধ্যমের ভূমিকা আরও বাড়াতে হবে
বাংলাদেশের পর্যটন উন্নয়নে গণমাধ্যম গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে।
সংবাদপত্র, টেলিভিশন, অনলাইন সংবাদমাধ্যম, তথ্যচিত্র, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এবং ডিজিটাল কনটেন্টের মাধ্যমে বাংলাদেশের পর্যটন সম্ভাবনা বিশ্বের সামনে তুলে ধরা প্রয়োজন।
বিশেষ করে স্থানীয় পর্যটন সাংবাদিকতার বিকাশ ঘটাতে হবে। কারণ স্থানীয় সাংবাদিকরা তাঁদের এলাকার প্রকৃতি, ইতিহাস, সমস্যা ও সম্ভাবনাকে গভীরভাবে তুলে ধরতে পারেন।
পর্যটন উন্নয়নে গবেষণা প্রয়োজন
কোন দেশের পর্যটক বাংলাদেশে আসতে চান?
তাঁরা কী দেখতে চান?
কতদিন থাকতে চান?
কত টাকা ব্যয় করতে আগ্রহী?
কোন পর্যটনকেন্দ্র তাঁদের বেশি আকর্ষণ করে?
কেন অনেক বিদেশি পর্যটক বাংলাদেশে এসে অল্প সময়ের মধ্যে ফিরে যান?
এসব প্রশ্নের উত্তর গবেষণার মাধ্যমে খুঁজে বের করতে হবে।
পর্যটন উন্নয়নে নিয়মিত পর্যটক জরিপ, বাজার গবেষণা এবং আন্তর্জাতিক পর্যটন প্রবণতা বিশ্লেষণের প্রয়োজন রয়েছে।
সামনে যে বাংলাদেশের স্বপ্ন
চেয়ারম্যান মো. সামীমুজ্জামানের পর্যটন ভাবনায় একটি আধুনিক বাংলাদেশের স্বপ্ন রয়েছে।
যেখানে কক্সবাজার হবে আন্তর্জাতিক সমুদ্র পর্যটনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ গন্তব্য।
সুন্দরবন হবে প্রকৃতি ও জীববৈচিত্র্যপ্রেমীদের আকর্ষণের কেন্দ্র।
পার্বত্য চট্টগ্রাম হবে প্রকৃতি, অ্যাডভেঞ্চার ও সংস্কৃতিনির্ভর পর্যটনের অন্যতম ক্ষেত্র।
সিলেট হবে চা, প্রকৃতি ও সংস্কৃতির অনন্য গন্তব্য।
চট্টগ্রাম হবে পাহাড়, সমুদ্র, নদী, বন্দর ও ঐতিহ্যের সমন্বিত পর্যটন প্রবেশদ্বার।
দেশের প্রতিটি অঞ্চল তার নিজস্ব ইতিহাস, ঐতিহ্য, সংস্কৃতি ও প্রাকৃতিক বৈশিষ্ট্য নিয়ে বিশ্ব পর্যটনের সামনে নিজস্ব পরিচয় তুলে ধরবে।
প্রয়োজন সম্মিলিত জাতীয় উদ্যোগ
বাংলাদেশের পর্যটনকে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে নিয়ে যাওয়া কোনো একক ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের কাজ নয়।
প্রয়োজন সংশ্লিষ্ট সরকারি প্রতিষ্ঠান, বাংলাদেশ পর্যটন করপোরেশন, বাংলাদেশ ট্যুরিজম বোর্ড, স্থানীয় প্রশাসন, ট্যুরিস্ট পুলিশ, বেসরকারি বিনিয়োগকারী, পর্যটন ব্যবসায়ী, হোটেল রেস্তোরাঁ শিল্প, পরিবহন খাত, স্থানীয় জনগণ এবং গণমাধ্যমের সমন্বিত উদ্যোগ।
পর্যটনের জন্য প্রয়োজন একটি দীর্ঘমেয়াদি জাতীয় পরিকল্পনা।
প্রয়োজন পরিকল্পনার ধারাবাহিক বাস্তবায়ন।
প্রয়োজন পর্যটনকে জাতীয় অর্থনীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ শিল্প হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা।
বিশ্ব দরবারে বাংলাদেশের নতুন পরিচয়
বাংলাদেশের পর্যটনের সম্ভাবনা নিয়ে নতুন করে ভাবার সময় এসেছে।
আমাদের সম্পদ তৈরি করতে হবে না। প্রকৃতি আমাদের সম্পদ দিয়েছে।
আমাদের রয়েছে সমুদ্র।
আমাদের রয়েছে পাহাড়।
আমাদের রয়েছে নদী।
আমাদের রয়েছে সুন্দরবন।
আমাদের রয়েছে দ্বীপ।
আমাদের রয়েছে হাওর।
আমাদের রয়েছে ইতিহাস।
আমাদের রয়েছে ঐতিহ্য।
আমাদের রয়েছে সংস্কৃতি।
আমাদের রয়েছে জীববৈচিত্র্য।
আর রয়েছে মানুষের আন্তরিক আতিথেয়তা।
এখন প্রয়োজন এই সম্পদকে আধুনিক পরিকল্পনা, বিশ্বমানের অবকাঠামো, নিরাপদ ও পরিচ্ছন্ন পরিবেশ, দক্ষ জনবল, প্রযুক্তি এবং আন্তর্জাতিক প্রচারণার সঙ্গে যুক্ত কর

“বিশ্ব পর্যটন দিবস: চট্টগ্রামকে কেন্দ্র করেই বাংলাদেশের পর্যটনের নতুন দিগন্ত-

মো. কামাল উদ্দিন
সাংবাদিক, লেখক ও গবেষক
যুগ্ম সম্পাদক, দৈনিক ভোরের আওয়াজ
ডেপুটি এডিটর, দি টুরিস্ট
সাধারণ সম্পাদক, চট্টগ্রাম সিনিয়র’স প্রেসক্লাব
২৭ সেপ্টেম্বর বিশ্ব পর্যটন দিবস। বিশ্বের অসংখ্য দেশে নানা আয়োজনের মধ্য দিয়ে দিনটি পালিত হয়। পর্যটনের অর্থনৈতিক, সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও পরিবেশগত গুরুত্ব সম্পর্কে মানুষকে সচেতন করাই এই দিবসের অন্যতম উদ্দেশ্য।
কিন্তু বাংলাদেশের জন্য বিশ্ব পর্যটন দিবসের তাৎপর্য আরও গভীর।
কারণ প্রকৃতি যেন বাংলাদেশকে পর্যটনের জন্য বিশেষভাবে সাজিয়েছে। নদী, সমুদ্র, পাহাড়, বন, দ্বীপ, হাওর, ঐতিহাসিক স্থাপনা, ধর্মীয় নিদর্শন, লোকজ সংস্কৃতি এবং মানুষের সহজাত আতিথেয়তা মিলিয়ে বাংলাদেশ একটি বৈচিত্র্যময় পর্যটনভূমি।
আর বাংলাদেশের এই পর্যটন সম্ভাবনার সবচেয়ে বড় দরজাগুলোর একটি হলো চট্টগ্রাম।
চট্টগ্রামকে বাদ দিয়ে বাংলাদেশের পর্যটন উন্নয়নের পূর্ণাঙ্গ পরিকল্পনা করা কঠিন। কারণ চট্টগ্রাম শুধু একটি জেলা বা একটি নগরী নয়, এটি বাংলাদেশের দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলের একটি বিশাল পর্যটন প্রবেশদ্বার। সরকারি পর্যটন তথ্যেও চট্টগ্রাম বিভাগকে একাধিক বৈচিত্র্যময় পর্যটন গন্তব্যের সমন্বিত অঞ্চল হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে।
চট্টগ্রাম কেন বাংলাদেশের পর্যটনের কেন্দ্র হতে পারে?
একদিকে বঙ্গোপসাগর, অন্যদিকে কর্ণফুলী নদী, তার সঙ্গে পাহাড়, বন, দ্বীপ, ঐতিহাসিক স্থাপনা ও বহুমাত্রিক সংস্কৃতি।
চট্টগ্রামের ভৌগোলিক বৈশিষ্ট্যই তাকে বাংলাদেশের অন্যান্য অঞ্চলের চেয়ে আলাদা একটি পর্যটন সম্ভাবনা দিয়েছে।
চট্টগ্রাম নগরীর পতেঙ্গা সমুদ্রসৈকত থেকে শুরু করে ফয়েজ লেক, বাটালী হিল, জাতিতাত্ত্বিক জাদুঘর, চট্টগ্রাম কমনওয়েলথ ওয়ার সিমেট্রি, বায়েজিদ বোস্তামীর মাজার, ঐতিহাসিক কোর্ট বিল্ডিং, লালদীঘি ও ভাটিয়ারী পর্যন্ত বিস্তৃত হয়েছে পর্যটনের নানা উপাদান। সরকারি জেলা পোর্টালেও এসব স্থান পর্যটন স্পট হিসেবে তালিকাভুক্ত রয়েছে।
কিন্তু এখানেই শেষ নয়।
চট্টগ্রামকে কেন্দ্র করে একটু দক্ষিণ ও পূর্ব দিকে তাকালেই খুলে যায় আরও বিশাল একটি পর্যটনভূমি।
একদিকে কক্সবাজারের সমুদ্র। অন্যদিকে বান্দরবানের পাহাড়। রাঙামাটির কাপ্তাই হ্রদ। খাগড়াছড়ির পাহাড়ি প্রকৃতি। সীতাকুণ্ড ও মিরসরাইয়ের পাহাড়, ঝরনা ও উপকূলীয় সৌন্দর্য। বাঁশখালীর সমুদ্র ও পাহাড়। সন্দ্বীপের দ্বীপজীবন। মহেশখালীর ঐতিহ্য। রামুর বৌদ্ধ ঐতিহ্য। টেকনাফের পাহাড়, বন ও সমুদ্র।
অর্থাৎ চট্টগ্রামকে কেন্দ্র করে বাংলাদেশের একটি বিশাল সমুদ্র, পাহাড়, বন, নদী ও সংস্কৃতিনির্ভর পর্যটন বলয় গড়ে তোলার বাস্তব সুযোগ রয়েছে।
চট্টগ্রাম শুধু যাত্রাপথ নয়, নিজেই একটি গন্তব্য
দুঃখজনক হলেও সত্য, অনেক সময় চট্টগ্রামকে কক্সবাজার বা পার্বত্য চট্টগ্রামে যাওয়ার পথ হিসেবে দেখা হয়। অথচ চট্টগ্রাম নিজেই একটি পূর্ণাঙ্গ পর্যটন গন্তব্য হওয়ার যোগ্যতা রাখে।
পতেঙ্গার সমুদ্র, কর্ণফুলীর মোহনা, পাহাড়ের সবুজ, ভাটিয়ারীর লেক, ফয়েজ লেকের সৌন্দর্য, বাটালী হিলের দৃশ্য, ঐতিহাসিক স্থাপনা এবং নৃ-সংস্কৃতির পরিচয় বহনকারী জাদুঘর—সব মিলিয়ে একটি পর্যটকের জন্য চট্টগ্রামে কয়েক দিনের পর্যটন পরিকল্পনা তৈরি করা সম্ভব।
বাংলাদেশ পর্যটন বোর্ডের পর্যটন তথ্যেও চট্টগ্রামের সঙ্গে সমুদ্রসৈকত, ঐতিহ্য, পাহাড়, দ্বীপ ও জলভিত্তিক বিভিন্ন গন্তব্যকে একই বৃহত্তর পর্যটন অঞ্চলের অংশ হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে।
তাহলে প্রশ্ন আসে, এই বিপুল সম্ভাবনাকে আমরা কতটা কাজে লাগাতে পেরেছি?
চট্টগ্রামের পর্যটন নিয়ে নতুন করে ভাবতে হবে
চট্টগ্রামের পর্যটন উন্নয়ন বলতে শুধু পতেঙ্গায় কিছু সৌন্দর্যবর্ধন কিংবা কয়েকটি বিনোদনকেন্দ্র নির্মাণকে বোঝালে চলবে না।
প্রয়োজন একটি সমন্বিত চট্টগ্রাম পর্যটন মহাপরিকল্পনা।
এই পরিকল্পনায় নগর পর্যটন, সমুদ্র পর্যটন, পাহাড়ি পর্যটন, নদী পর্যটন, দ্বীপ পর্যটন, ঐতিহাসিক পর্যটন, ধর্মীয় পর্যটন, সাংস্কৃতিক পর্যটন, গ্রামীণ পর্যটন এবং পরিবেশবান্ধব পর্যটনকে একই কাঠামোর মধ্যে আনতে হবে।
চট্টগ্রাম নগরীকে হতে হবে সেই পরিকল্পনার কেন্দ্রবিন্দু।
পতেঙ্গা থেকে কর্ণফুলী: সমুদ্র ও নদী পর্যটনের সম্ভাবনা
পতেঙ্গা শুধু একটি সমুদ্রসৈকত নয়। কর্ণফুলী নদী যেখানে বঙ্গোপসাগরের সঙ্গে মিলিত হয়েছে, সেই ভূপ্রকৃতিই এখানে একটি বিশেষ পর্যটন অভিজ্ঞতা তৈরি করেছে।
কিন্তু পতেঙ্গাকে আন্তর্জাতিক মানের পর্যটনকেন্দ্রে পরিণত করতে হলে শুধু দোকান ও মানুষের ভিড় বাড়ালেই হবে না।
প্রয়োজন পরিচ্ছন্ন সৈকত, পরিকল্পিত হাঁটার পথ, পর্যাপ্ত বসার স্থান, আধুনিক গণশৌচাগার, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, নিরাপত্তা, আলোকসজ্জা, পর্যটন তথ্যকেন্দ্র এবং নদী ও সমুদ্রভিত্তিক নিরাপদ বিনোদনের ব্যবস্থা।
কর্ণফুলী নদীকেও পর্যটনের সঙ্গে যুক্ত করা যায়।
নিরাপদ নদীভ্রমণ, ঐতিহ্যবাহী নৌযান, নদীর তীরভিত্তিক সাংস্কৃতিক আয়োজন এবং কর্ণফুলীকে কেন্দ্র করে পর্যটন অবকাঠামো তৈরি করা গেলে চট্টগ্রামের পর্যটন অভিজ্ঞতা আরও সমৃদ্ধ হতে পারে।
সীতাকুণ্ড ও মিরসরাই: প্রকৃতির আরেক স্বর্গ
চট্টগ্রামের উত্তরাঞ্চলও পর্যটনের জন্য অসাধারণ সম্ভাবনাময়।
সীতাকুণ্ডের পাহাড়, ঝরনা, বন ও পরিবেশগত বৈচিত্র্য এবং মিরসরাইয়ের বিস্তৃত পাহাড়ি ও উপকূলীয় অঞ্চলকে পরিকল্পিতভাবে পর্যটনের আওতায় আনা গেলে চট্টগ্রামের পর্যটন মানচিত্র আরও বড় হবে।
এখানে সবচেয়ে জরুরি বিষয় হলো পরিবেশ রক্ষা।
পাহাড় কেটে পর্যটন তৈরি করা যাবে না। ঝরনার পানি দূষিত করে পর্যটন করা যাবে না। প্লাস্টিকের বোতল ও পলিথিনে পাহাড়-ঝরনা ভরে ফেলে পর্যটন উন্নয়ন সম্ভব নয়।
প্রকৃতি ধ্বংস করে পর্যটন নয়, প্রকৃতি রক্ষা করেই পর্যটন।
এই নীতিই হতে হবে চট্টগ্রামের পর্যটন উন্নয়নের মূল দর্শন।
সন্দ্বীপ: দ্বীপ পর্যটনের নতুন সম্ভাবনা
চট্টগ্রামের সন্দ্বীপ বাংলাদেশের দ্বীপভিত্তিক পর্যটনের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ সম্ভাবনা।
দ্বীপের মানুষের জীবন, সমুদ্র, নদী, চর, সূর্যাস্ত, নৌযাত্রা এবং স্থানীয় সংস্কৃতি—সবকিছু মিলে সন্দ্বীপকে একটি আলাদা পর্যটন গন্তব্য হিসেবে বিকশিত করা যেতে পারে।
পরিকল্পিত যোগাযোগব্যবস্থা, নিরাপদ নৌযান, আবাসন, স্থানীয় খাদ্য, গাইড ও পরিবেশবান্ধব পর্যটন সুবিধা তৈরি করা গেলে সন্দ্বীপে নতুন ধরনের পর্যটনের দ্বার খুলতে পারে।
বৃহত্তর চট্টগ্রাম: একসঙ্গে সমুদ্র ও পাহাড়
চট্টগ্রামের সবচেয়ে বড় শক্তি এখানেই।
বাংলাদেশের অনেক পর্যটন এলাকায় হয় পাহাড়, নয়তো সমুদ্র। কিন্তু চট্টগ্রাম অঞ্চলকে কেন্দ্র করে একজন পর্যটক একই ভ্রমণ পরিকল্পনায় সমুদ্র, পাহাড়, বন, নদী, দ্বীপ এবং সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্য উপভোগ করতে পারেন।
চট্টগ্রাম থেকে কক্সবাজারের সমুদ্র, বান্দরবানের পাহাড়, রাঙামাটির কাপ্তাই হ্রদ, খাগড়াছড়ির পাহাড়ি প্রকৃতি—সবকিছুকে একটি সমন্বিত পর্যটন সার্কিটের আওতায় আনা সম্ভব।
বাংলাদেশ পর্যটন বোর্ডের তালিকাতেও চট্টগ্রাম বিভাগের পর্যটন আকর্ষণের মধ্যে কক্সবাজার, বান্দরবান, রাঙামাটি ও খাগড়াছড়ির বিভিন্ন গন্তব্য অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।
এটিই হতে পারে বাংলাদেশের একটি অনন্য পর্যটন ব্র্যান্ড।
“চট্টগ্রাম থেকে সমুদ্র, পাহাড় ও সংস্কৃতির বাংলাদেশ”।
কক্সবাজারকে চট্টগ্রামের পর্যটন করিডোরের অংশ হিসেবে দেখতে হবে
কক্সবাজার বাংলাদেশের সবচেয়ে পরিচিত পর্যটন গন্তব্যগুলোর একটি। সরকারি তথ্য অনুযায়ী কক্সবাজার সমুদ্রসৈকত প্রায় ১২০ কিলোমিটার দীর্ঘ এবং কক্সবাজার জেলার বিভিন্ন স্থানে সমুদ্র, দ্বীপ, পাহাড়, বন ও ঐতিহাসিক স্থাপনার সমন্বিত পর্যটন সম্ভাবনা রয়েছে।
কক্সবাজারকে শুধু আলাদা একটি পর্যটন শহর হিসেবে দেখলে সম্ভাবনার একটি বড় অংশ অপূর্ণ থেকে যায়।
চট্টগ্রাম থেকে কক্সবাজার এবং কক্সবাজার থেকে টেকনাফ, মহেশখালী, কুতুবদিয়া ও অন্যান্য উপকূলীয় গন্তব্যকে একটি পর্যটন করিডোরের মধ্যে আনা দরকার।
এতে পর্যটক একটি জায়গায় এসে অন্য জায়গায় চলে যাবেন না; বরং কয়েক দিন ধরে বৃহত্তর চট্টগ্রাম অঞ্চলে অবস্থান করার সুযোগ পাবেন।
এটি স্থানীয় অর্থনীতির জন্যও গুরুত্বপূর্ণ।
পর্যটন মানেই কর্মসংস্থান
চট্টগ্রামের লাখ লাখ তরুণকে পর্যটনের সঙ্গে যুক্ত করার সুযোগ রয়েছে।
প্রশিক্ষিত ট্যুর গাইড, হোটেল ও রেস্টুরেন্ট কর্মী, পর্যটন পরিবহন, নৌযান পরিচালনা, ফটোগ্রাফি, ভিডিও নির্মাণ, অনলাইন পর্যটন প্রচার, হস্তশিল্প, স্থানীয় খাবার, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান এবং ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা হিসেবে তরুণরা নিজেদের প্রতিষ্ঠিত করতে পারেন।
পর্যটন উন্নয়ন তাই শুধু পর্যটনকেন্দ্র নির্মাণ নয়, এটি মানুষের জীবনের অর্থনৈতিক পরিবর্তনেরও একটি সম্ভাবনা।
চট্টগ্রামের স্থানীয় খাবারও পর্যটনের সম্পদ
পর্যটনের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হলো খাবার।
চট্টগ্রামের মেজবান, কালাভুনা, সামুদ্রিক মাছ, শুঁটকি, নানা ধরনের আঞ্চলিক রান্না এবং উপকূলীয় খাবারকে পর্যটনের ব্র্যান্ডিংয়ের অংশ করা যেতে পারে।
একজন পর্যটক যখন কোনো জায়গায় যান, তখন তিনি শুধু দৃশ্য দেখতে চান না, সেই এলাকার স্বাদও নিতে চান।
তাই “চট্টগ্রামের খাবার” হতে পারে পর্যটনের একটি আলাদা পরিচয়।
ইতিহাস ও ঐতিহ্যকে পর্যটনের সঙ্গে যুক্ত করতে হবে
চট্টগ্রামের ইতিহাস অত্যন্ত সমৃদ্ধ।
বন্দরনগরীর ইতিহাস, মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের স্মারক, ঔপনিবেশিক স্থাপত্য, ধর্মীয় ঐতিহ্য এবং বিভিন্ন জাতিগোষ্ঠীর সাংস্কৃতিক পরিচয়—সবকিছু পর্যটনের অংশ হতে পারে।
বিশেষ করে ইতিহাসভিত্তিক হাঁটা ভ্রমণ বা হেরিটেজ ওয়াক চালু করা যেতে পারে।
পুরোনো চট্টগ্রামকে নতুন প্রজন্মের সামনে তুলে ধরার জন্য একটি পরিকল্পিত ঐতিহ্য পর্যটন ব্যবস্থা গড়ে তোলা প্রয়োজন।
পর্যটন ও পরিবেশ: চট্টগ্রামের সবচেয়ে বড় সতর্কবার্তা
চট্টগ্রামের পাহাড়, নদী, সমুদ্র ও বন রক্ষা না করে পর্যটন উন্নয়ন করলে ভবিষ্যতে পর্যটনের ভিত্তিই দুর্বল হয়ে যাবে।
পাহাড় কাটা বন্ধ করতে হবে।
নদী ও জলাশয় রক্ষা করতে হবে।
সমুদ্রসৈকতকে প্লাস্টিকমুক্ত রাখতে হবে।
ঝরনা ও পাহাড়ি পর্যটনকেন্দ্রে ধারণক্ষমতার সীমা নির্ধারণ করতে হবে।
যেখানে পরিবেশগতভাবে অতিরিক্ত পর্যটক প্রবেশ ক্ষতিকর, সেখানে নিয়ন্ত্রিত পর্যটন ব্যবস্থা চালু করতে হবে।
কারণ পর্যটনকেন্দ্র যত জনপ্রিয় হবে, তার ওপর চাপও তত বাড়বে।
পর্যটকের নিরাপত্তা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ
চট্টগ্রাম অঞ্চলে পর্যটন বাড়াতে হলে নিরাপত্তার বিষয়টি সর্বোচ্চ গুরুত্ব পেতে হবে।
পর্যটনকেন্দ্রে পর্যাপ্ত নিরাপত্তা, প্রশিক্ষিত উদ্ধারকারী দল, চিকিৎসা সুবিধা, জরুরি যোগাযোগ ব্যবস্থা এবং পর্যটক সহায়তা কেন্দ্র থাকা প্রয়োজন।
পাহাড়ি ঝরনায় দুর্ঘটনা, সমুদ্রসৈকতে সাঁতারের ঝুঁকি, নৌযাত্রার নিরাপত্তা এবং পাহাড়ি পথে চলাচলের বিষয়েও কঠোর নিরাপত্তা মানদণ্ড থাকা দরকার।
একজন পর্যটক নিরাপদ বোধ করলেই তিনি আবার ফিরে আসবেন এবং অন্যদেরও আসতে উৎসাহিত করবেন।
চট্টগ্রামকে আন্তর্জাতিক পর্যটন প্রবেশদ্বার হিসেবে গড়ে তুলতে হবে
চট্টগ্রাম আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর, সমুদ্রবন্দর, মহাসড়ক ও রেল যোগাযোগের কারণে বাংলাদেশের একটি গুরুত্বপূর্ণ যোগাযোগকেন্দ্র।
এই সুবিধাকে পর্যটনের সঙ্গে আরও কার্যকরভাবে যুক্ত করা দরকার।
বিদেশি পর্যটক চট্টগ্রামে এসে যাতে সহজে কক্সবাজার, পার্বত্য অঞ্চল, সীতাকুণ্ড, মিরসরাই কিংবা দ্বীপাঞ্চলে যেতে পারেন, সে জন্য সমন্বিত পর্যটন পরিবহনব্যবস্থা গড়ে তোলা প্রয়োজন।
একটি শহরকে শুধু শিল্প ও বাণিজ্যের কেন্দ্র হিসেবে দেখলে তার সম্ভাবনার একটি অংশই দেখা হয়।
চট্টগ্রাম একই সঙ্গে হতে পারে বাণিজ্যের নগরী, সমুদ্রের নগরী এবং পর্যটনের প্রবেশদ্বার।
চট্টগ্রামভিত্তিক পর্যটন সার্কিটের প্রস্তাব
আমার দৃষ্টিতে বৃহত্তর চট্টগ্রামের জন্য কয়েকটি পর্যটন সার্কিট তৈরি করা যেতে পারে।
প্রথম সার্কিট: চট্টগ্রাম নগরী, পতেঙ্গা, কর্ণফুলী, ফয়েজ লেক, বাটালী হিল, ঐতিহাসিক স্থাপনা।
দ্বিতীয় সার্কিট: চট্টগ্রাম, সীতাকুণ্ড, মিরসরাই, পাহাড় ও ঝরনা।
তৃতীয় সার্কিট: চট্টগ্রাম, কক্সবাজার, ইনানী, হিমছড়ি, রামু, মহেশখালী।
চতুর্থ সার্কিট: চট্টগ্রাম, বান্দরবান, পাহাড় ও ঝরনা।
পঞ্চম সার্কিট: চট্টগ্রাম, রাঙামাটি, কাপ্তাই হ্রদ ও পাহাড়ি সংস্কৃতি।
ষষ্ঠ সার্কিট: চট্টগ্রাম, খাগড়াছড়ি, আলুটিলা ও পাহাড়ি পর্যটন।
সপ্তম সার্কিট: চট্টগ্রাম, সন্দ্বীপ ও উপকূলীয় দ্বীপ পর্যটন।
এগুলো শুধু ভ্রমণপথ নয়। প্রতিটি সার্কিটের সঙ্গে স্থানীয় অর্থনীতি, কর্মসংস্থান, সংস্কৃতি ও পরিবেশ সংরক্ষণকে যুক্ত করা যেতে পারে।
প্রয়োজন চট্টগ্রাম পর্যটন কর্তৃপক্ষ বা শক্তিশালী সমন্বয় ব্যবস্থা
চট্টগ্রামের পর্যটন সম্ভাবনা এত বিস্তৃত যে বিচ্ছিন্নভাবে কয়েকটি প্রকল্প গ্রহণ করে এর পূর্ণ বিকাশ সম্ভব নয়।
চট্টগ্রাম অঞ্চলকে কেন্দ্র করে পর্যটন উন্নয়নে একটি শক্তিশালী সমন্বয় ব্যবস্থা প্রয়োজন।
সরকারি পর্যটন সংস্থা, স্থানীয় প্রশাসন, জেলা পরিষদ, সিটি করপোরেশন, বেসরকারি পর্যটন উদ্যোক্তা, পরিবেশবিদ, গণমাধ্যম, স্থানীয় জনগোষ্ঠী এবং পর্যটন বিশেষজ্ঞদের সমন্বয়ে একটি দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা গ্রহণ করা যেতে পারে।
গণমাধ্যমকে আরও দায়িত্ব নিতে হবে
চট্টগ্রামের পর্যটন নিয়ে আরও অনুসন্ধানী ও তথ্যভিত্তিক সাংবাদিকতা প্রয়োজন।
শুধু পর্যটনকেন্দ্রের সৌন্দর্যের ছবি প্রকাশ করলেই হবে না।
কোথায় সমস্যা, কোথায় সম্ভাবনা, কোথায় অবকাঠামোর ঘাটতি, কোথায় পরিবেশ ধ্বংস হচ্ছে, কোথায় নতুন পর্যটন সম্ভাবনা তৈরি হচ্ছে—এসবও তুলে ধরতে হবে।
পর্যটন সাংবাদিকতা হতে পারে পর্যটন উন্নয়নের অন্যতম শক্তিশালী হাতিয়ার।
বিশ্ব পর্যটন দিবসে চট্টগ্রামের দাবি
বিশ্ব পর্যটন দিবসে তাই চট্টগ্রামের পক্ষ থেকে আমাদের একটি সুস্পষ্ট দাবি থাকা উচিত।
চট্টগ্রামকে শুধু বাংলাদেশের বাণিজ্যিক রাজধানী হিসেবে নয়, বাংলাদেশের পর্যটন প্রবেশদ্বার হিসেবেও স্বীকৃতি দিয়ে একটি সমন্বিত পর্যটন মহাপরিকল্পনা গ্রহণ করতে হবে।
চট্টগ্রাম নগরীকে পরিকল্পিত পর্যটন নগরী হিসেবে গড়ে তুলতে হবে।
পতেঙ্গা ও কর্ণফুলীকে ঘিরে আন্তর্জাতিক মানের নদী ও সমুদ্র পর্যটন ব্যবস্থা তৈরি করতে হবে।
সীতাকুণ্ড ও মিরসরাইয়ের পাহাড় ও ঝরনা রক্ষা করে পরিবেশবান্ধব পর্যটন গড়ে তুলতে হবে।
সন্দ্বীপকে দ্বীপ পর্যটনের নতুন গন্তব্য হিসেবে উন্নত করতে হবে।
চট্টগ্রাম থেকে কক্সবাজার, বান্দরবান, রাঙামাটি ও খাগড়াছড়িকে যুক্ত করে সমন্বিত পর্যটন সার্কিট গড়ে তুলতে হবে।
স্থানীয় মানুষকে পর্যটনের অংশীদার করতে হবে।
আর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, উন্নয়নের নামে চট্টগ্রামের প্রকৃতি যেন ধ্বংস না হয়।
শেষ কথা
বিশ্ব পর্যটন দিবস আমাদের শুধু ভ্রমণের কথা বলে না। এটি আমাদের নিজেদের দেশকে নতুন চোখে দেখার আহ্বান জানায়।
আর যখন বাংলাদেশের পর্যটনের কথা বলি, তখন চট্টগ্রামকে সামনে রেখেই কথা বলতে হয়।
কারণ চট্টগ্রামের আছে সমুদ্র।
চট্টগ্রামের আছে পাহাড়।
চট্টগ্রামের আছে নদী।
চট্টগ্রামের আছে দ্বীপ।
চট্টগ্রামের আছে বন।
চট্টগ্রামের আছে ইতিহাস।
চট্টগ্রামের আছে সংস্কৃতি।
চট্টগ্রামের আছে বন্দর।
চট্টগ্রামের আছে মানুষের আতিথেয়তা।
আর সবচেয়ে বড় কথা, চট্টগ্রামের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত হয়েছে কক্সবাজারের সমুদ্র, পার্বত্য চট্টগ্রামের পাহাড় এবং দক্ষিণ-পূর্ব বাংলাদেশের বিস্তৃত প্রকৃতি ও সংস্কৃতি।
এই সমন্বিত বৈচিত্র্য বাংলাদেশের আর কোনো অঞ্চলের পর্যটন পরিকল্পনায় এত ঘনভাবে পাওয়া কঠিন।
তাই সময় এসেছে চট্টগ্রামকে নতুন করে দেখার।
চট্টগ্রাম শুধু বাণিজ্যের রাজধানী নয়, চট্টগ্রাম হতে পারে বাংলাদেশের পর্যটনের মহাদ্বার।
পতেঙ্গার সমুদ্র থেকে বান্দরবানের পাহাড়, কর্ণফুলীর বুক থেকে কাপ্তাই হ্রদ, সীতাকুণ্ডের ঝরনা থেকে কক্সবাজারের বালুকাবেলা, সন্দ্বীপের দ্বীপজীবন থেকে রাঙামাটি ও খাগড়াছড়ির পাহাড়ি সংস্কৃতি—সবকিছুকে একটি সুতোয় গেঁথে যদি আমরা একটি সমন্বিত পর্যটন বলয় তৈরি করতে পারি, তাহলে চট্টগ্রাম শুধু বাংলাদেশের পর্যটন মানচিত্রে নয়, দক্ষিণ এশিয়ার পর্যটন মানচিত্রেও আরও গুরুত্বপূর্ণ অবস্থান তৈরি করতে পারে।
বিশ্ব পর্যটন দিবসে তাই আমাদের অঙ্গীকার হোক—
চট্টগ্রামের প্রকৃতি রক্ষা করব।
চট্টগ্রামের ইতিহাস সংরক্ষণ করব।
চট্টগ্রামের সংস্কৃতিকে বিশ্বে তুলে ধরব।
স্থানীয় মানুষকে পর্যটনের অংশীদার করব।
আর চট্টগ্রামকে গড়ে তুলব বাংলাদেশের পর্যটনের প্রবেশদ্বার হিসেবে।
কারণ,
চট্টগ্রামকে বুঝতে হলে শুধু একটি শহরকে দেখতে হবে না;
দেখতে হবে সমুদ্র, পাহাড়, নদী, দ্বীপ, ইতিহাস ও মানুষের এক অপূর্ব মিলনভূমিকে।
আর সেই মিলনভূমিই হতে পারে বাংলাদেশের পর্যটনের আগামী দিনের সবচেয়ে বড় শক্তি।

হাটহাজারীতে বিদেশি পিস্তল ও ওয়ান শুটারগানসহ গ্রেপ্তার ১

চট্টগ্রামের হাটহাজারীতে পুলিশের বিশেষ অভিযানে বিদেশি পিস্তল, ওয়ান শুটারগান, ম্যাগাজিন ও ১১ রাউন্ড গুলি-কার্তুজসহ মো. নাছির উদ্দীন (৪৩) নামে এক ব্যক্তিকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। পুলিশ জানায়, ২৫ সেপ্টেম্বর রাত আড়াইটার দিকে ধলই ইউনিয়নের এনায়েতপুর বাজার এলাকায় বিশেষ অভিযান চলাকালে গোপন সংবাদের ভিত্তিতে পশ্চিম ধলই এলাকার কদল মোহল চৌধুরী বাড়িতে নাছির উদ্দীনের বসতঘরে অবৈধ অস্ত্র মজুদের তথ্য পাওয়া যায়। পরে হাটহাজারী সার্কেলের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার কাজী মো. তারেক আজিজ এবং হাটহাজারী মডেল থানার অফিসার ইনচার্জ মো. জাহিদুর রহমানের নেতৃত্বে পুলিশের একটি দল রাত আনুমানিক ৩টা ১০ মিনিটে ওই বাড়িতে অভিযান চালিয়ে নাছির উদ্দীনকে গ্রেপ্তার করে। পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী, পরে তার বসতঘরে তল্লাশি চালিয়ে শয়নকক্ষের স্টিলের ওয়ারড্রপের ড্রয়ার থেকে একটি বিদেশি পিস্তল, দুটি ম্যাগাজিন ও চার রাউন্ড ৭ দশমিক ৬৫ মিমি পিস্তলের গুলি উদ্ধার করা হয়। একই কক্ষে থাকা স্টিলের আলমারির নিচের ড্রয়ার থেকে একটি ওয়ান শুটারগান এবং সাত রাউন্ড শটগানের কার্তুজ উদ্ধার করা হয়। পুলিশ জানায়, উদ্ধার করা কার্তুজগুলোর গায়ে ‘SHAKTIMAN EXPRESS MADE IN INDIA’ লেখা রয়েছে। জিজ্ঞাসাবাদে নাছির উদ্দীন দাবি করেন, তার বন্ধু রাউজানের বাসিন্দা মো. তৈয়ব প্রায় তিন থেকে চার মাস আগে বিদেশে যাওয়ার সময় অস্ত্র ও গোলাবারুদগুলো তার হেফাজতে রেখে যান। দেশে ফিরে তৈয়ব সেগুলো নিয়ে যাওয়ার কথা ছিল বলে তিনি পুলিশকে জানান। এ ঘটনায় নাছির উদ্দীন ও পলাতক তৈয়বের বিরুদ্ধে The Arms Act, 1878-এর 19A/19(f) ধারায় হাটহাজারী মডেল থানায় মামলা করা হয়েছে। পুলিশ জানিয়েছে, পলাতক তৈয়বকে গ্রেপ্তার এবং উদ্ধার করা অস্ত্রের উৎস ও এর সঙ্গে জড়িত অন্যদের শনাক্ত করতে অভিযান অব্যাহত রয়েছে। পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, গ্রেপ্তার নাছির উদ্দীন ধলই ইউনিয়ন স্বেচ্ছাসেবক লীগের সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন।

জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধিতে বাজারে বাড়ছে পণ্যের দাম, দুশ্চিন্তায় মানুষ

0

দীর্ঘদিনের উচ্চ মূল্যস্ফীতিতে এমনিতেই চাপে নিম্ন ও সীমিত আয়ের মানুষ। এর মধ্যে এক ধাক্কায় সব ধরনের জ্বালানি তেলের দাম লিটারপ্রতি ২০ টাকা বাড়ানোয় বাজারে নতুন করে মূল্যস্ফীতি বাড়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। ইতোমধ্যে নিত্যপণ্যের বাজারে জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধির প্রভাব পড়তে শুরু করেছে। আটা, তেল, সবজি, চাল, ডিমসহ বেশ কিছু পণ্যের দাম বেড়েছে। ফলে সীমিত আয়ের মানুষের মাসিক বাজেট সামলানো আরও কঠিন হয়ে পড়েছে। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, আগস্টে দেশে সার্বিক মূল্যস্ফীতি কমে ৮ দশমিক ২৬ শতাংশে দাঁড়িয়েছে, যা জুলাইয়ে ছিল ৮ দশমিক ৩২ শতাংশ। একই সময়ে খাদ্য মূল্যস্ফীতি ৭ দশমিক ১৬ শতাংশ থেকে কমে ৭ দশমিক ০২ শতাংশে নেমেছে। এর আগে জুনে সার্বিক মূল্যস্ফীতি ছিল ৯ দশমিক ১৬ শতাংশ এবং খাদ্য মূল্যস্ফীতি ৮ দশমিক ৬০ শতাংশ। মে মাসে এ হার ছিল যথাক্রমে ৯ দশমিক ৪২ ও ৯ দশমিক ০৬ শতাংশ। মূল্যস্ফীতির হার কয়েক মাস ধরে কমলেও গত ২১ সেপ্টেম্বর থেকে ডিজেল, অকটেন, পেট্রোল ও কেরোসিনের দাম লিটারপ্রতি ২০ টাকা করে বাড়ানো হয়েছে। অর্থনীতিবিদ ও বাজার বিশ্লেষকদের আশঙ্কা, জ্বালানির এই মূল্যবৃদ্ধি উৎপাদন ও পরিবহন ব্যয় বাড়িয়ে বিভিন্ন পণ্যের দামে প্রভাব ফেলতে পারে। সম্প্রতি বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আবদুল মুক্তাদির বলেছেন, জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধির কারণে নিত্যপণ্যের বাজারে বড় ধরনের প্রভাব পড়বে না। মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ এবং পণ্যের সরবরাহ স্বাভাবিক রাখতে সরকার সরবরাহব্যবস্থা সচল রাখার ওপর গুরুত্ব দিচ্ছে বলেও জানান তিনি। তবে রাজধানীর বাজারের চিত্রে এরই মধ্যে কিছুটা ভিন্নতা দেখা যাচ্ছে। ব্যবসায়ীদের দাবি, জ্বালানির দাম বাড়ার পর পণ্য পরিবহনে বাড়তি ভাড়া গুনতে হচ্ছে। সেই অতিরিক্ত খরচ পণ্যের দামের সঙ্গে যুক্ত হচ্ছে। সপ্তাহের ব্যবধানে রাজধানীর বাজারে সবজির দাম কেজিতে ১০ থেকে ২০ টাকা পর্যন্ত বেড়েছে। বেগুন বিক্রি হচ্ছে সর্বোচ্চ ১৬০ টাকা কেজিতে। আগে ৮০ টাকায় বিক্রি হওয়া অনেক সবজি এখন ১০০ টাকার আশপাশে বিক্রি হচ্ছে। কাঁচামরিচের দামও বেড়ে কেজিতে ১৬০ থেকে ১৮০ টাকা হয়েছে। চালের বাজারেও বেড়েছে দাম। বিশেষ করে মাঝারি মানের চালের কেজিতে ২ থেকে ৩ টাকা পর্যন্ত বৃদ্ধি পেয়েছে। খোলা আটা-ময়দার দাম বেড়েছে কেজিতে প্রায় ৫ টাকা। খোলা সয়াবিন ও পাম তেলও বাড়তি দামে বিক্রি হচ্ছে। পাশাপাশি বাজারে বোতলজাত সয়াবিন তেলের সরবরাহ কমেছে বলে জানিয়েছেন ব্যবসায়ীরা। ডিমের দামও বেড়েছে। ১৪৫ টাকা দরের এক ডজন ফার্মের বাদামি ডিম এখন বিক্রি হচ্ছে প্রায় ১৫০ টাকায়। এছাড়া বেসরকারি কোম্পানিগুলো তরল দুধের দাম লিটারে ১০ টাকা বাড়িয়েছে। ফলে এক লিটার দুধের দাম দাঁড়িয়েছে ১১০ টাকা। সরকারি বিপণন সংস্থা ট্রেডিং করপোরেশন অব বাংলাদেশের (টিসিবি) প্রতিবেদনেও সপ্তাহের ব্যবধানে বেশ কিছু পণ্যের দাম বাড়ার তথ্য উঠে এসেছে। এর মধ্যে রয়েছে খোলা পাম ও পাম সুপার তেল, এক ও দুই লিটারের বোতলজাত সয়াবিন তেল, খোলা আটা-ময়দা, মাঝারি মানের চাল, বড় দানার মসুর ডাল, বেগুন, কাঁচামরিচ ও ডিম। বাজারে নতুন করে দাম বাড়ায় বিপাকে পড়েছেন সাধারণ ক্রেতারা। বেসরকারি চাকরিজীবী মো. মোস্তাক আহমেদ বলেন, চাল, ডাল, তেল ও মসলার দাম বেড়ে যাওয়ায় মাসিক বাজেটে চাপ তৈরি হয়েছে। মাছ-মাংস আগেই কমিয়ে দিয়েছেন। এখন ডিম ও দুধের দামও বাড়ায় সংসারের খরচ সামলানো কঠিন হয়ে পড়েছে। কদমতলীর দিনমজুর মোতাহার মিয়াও বলেন, দাম বাড়তে থাকায় একের পর এক প্রয়োজনীয় পণ্য কেনা কমাতে হচ্ছে। আয় দিয়ে নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিস কেনাই কঠিন হয়ে পড়েছে। ভোক্তা অধিকার সংগঠন কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) সহসভাপতি এস এম নাজের হোসাইন বলেন, অসাধু ব্যবসায়ীরা বিভিন্ন অজুহাতে আগেই পণ্যের দাম বাড়াচ্ছিলেন। জ্বালানির দাম বৃদ্ধির ফলে তারা নতুন একটি অজুহাত পেয়েছেন। বাজারে নজরদারি আরও জোরদার করা প্রয়োজন। উৎপাদন থেকে ভোক্তা পর্যায় পর্যন্ত প্রতিটি ধাপে তদারকি বাড়ানোর পাশাপাশি সরবরাহব্যবস্থা শক্তিশালী করার পরামর্শ দেন তিনি। সেন্টার ফর পলিসি ডায়লগের (সিপিডি) সম্মাননীয় ফেলো ড. ফাহমিদা খাতুন বলেন, দুর্বল অর্থনীতি ও উচ্চ জীবনযাত্রার ব্যয়ের মধ্যে জ্বালানির দাম একবারে এতটা বাড়ানোয় সাধারণ মানুষের ওপর বাড়তি চাপ তৈরি হবে। তার মতে, জ্বালানি আমদানির কর সাময়িকভাবে কমানো, অপচয় ও ব্যবস্থাপনাগত ব্যয় নিয়ন্ত্রণ এবং পরিবহন ভাড়া ও বাজার তদারকি জোরদারের মাধ্যমে পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন। অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ হোসেনের মতে, জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি একটি পণ্যের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না; এর প্রভাব ধীরে ধীরে অন্যান্য পণ্য ও সেবায় ছড়িয়ে পড়তে পারে। তাই অযৌক্তিক মূল্যবৃদ্ধি ঠেকাতে সরকারের কঠোর নজরদারি প্রয়োজন। তিনি আরও বলেন, সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির পরিধি বাড়ানোর সুযোগ সীমিত হলেও বিদ্যমান কর্মসূচি ও বরাদ্দ যেন প্রকৃত সুবিধাভোগীদের কাছে পৌঁছায়, তা নিশ্চিত করা জরুরি।

চট্টগ্রাম রেঞ্জে আবদুল কুদ্দুস চৌধুরী অপরাধের অন্ধকারে আলোর সন্ধান, মাঠে নেমেই কঠোরতার বার্তা

মো. কামাল উদ্দিন
ডেপুটি এডিটর, দি টুরিস্ট
নির্বাহী সম্পাদক, চট্রল চিত্র
সাধারণ সম্পাদক, চট্টগ্রাম সিনিয়র’স প্রেসক্লাব
চট্টগ্রামের মাটি যেমন সমুদ্রের বিশালতা ধারণ করে, তেমনি ধারণ করে পাহাড়ের নীরবতা, সীমান্তের সংবেদনশীলতা, বন্দরের ব্যস্ততা এবং কোটি মানুষের জীবন ও জীবিকার অসংখ্য গল্প। এই জনপদের নিরাপত্তা ব্যবস্থাপনা তাই অন্য যেকোনো এলাকার চেয়ে আলাদা। এখানে অপরাধের চরিত্র বহুমাত্রিক, সামাজিক বাস্তবতা জটিল এবং আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের দায়িত্বও বহুগুণ বেশি। এমন এক গুরুত্বপূর্ণ সময়ে চট্টগ্রাম রেঞ্জের নতুন ডিআইজি হিসেবে দায়িত্ব নিয়েছেন আবদুল কুদ্দুস চৌধুরী, পিপিএম। গত ২১ জুলাই ২০২৬ তারিখে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের জননিরাপত্তা বিভাগের এক প্রজ্ঞাপনে তাঁকে সিলেট মেট্রোপলিটন পুলিশের কমিশনারের দায়িত্ব থেকে চট্টগ্রাম রেঞ্জের ডিআইজি হিসেবে পদায়ন করা হয়। একজন পুলিশ কর্মকর্তার সবচেয়ে বড় পরিচয় তাঁর পদবি নয়, তাঁর বক্তব্যও নয়। সময়ের সঙ্গে তাঁর নেওয়া সিদ্ধান্ত, মাঠপর্যায়ের কর্মকাণ্ড, অধীনস্থদের নেতৃত্ব দেওয়ার ক্ষমতা এবং সাধারণ মানুষের সঙ্গে তাঁর আচরণই শেষ পর্যন্ত তাঁর পেশাগত পরিচয় তৈরি করে। সেই জায়গা থেকেই আবদুল কুদ্দুস চৌধুরীর চট্টগ্রাম রেঞ্জে আগমনকে দেখলে তাঁর পূর্ববর্তী কর্মপরিধি এবং সাম্প্রতিক মাঠপর্যায়ের কর্মকাণ্ড বিশেষভাবে আলোচনায় আসে। দায়িত্বের পরিধি যেমন বিশাল, চ্যালেঞ্জও তেমনি বহুমাত্রিক চট্টগ্রাম রেঞ্জ বাংলাদেশের আইনশৃঙ্খলা ব্যবস্থাপনার একটি গুরুত্বপূর্ণ অঞ্চল। সমুদ্রবন্দর, সীমান্ত, পাহাড়ি এলাকা, পর্যটন অঞ্চল, শিল্পাঞ্চল, নগর ও গ্রামীণ জনপদ মিলিয়ে এই অঞ্চলের নিরাপত্তা বাস্তবতা অত্যন্ত বৈচিত্র্যময়। মাদক, চোরাচালান, সন্ত্রাস, অস্ত্র, কিশোর অপরাধ, ভূমি দখল, চাঁদাবাজি এবং সংঘবদ্ধ অপরাধের পাশাপাশি সাধারণ মানুষের পুলিশি সেবা পাওয়ার প্রশ্নও এখানে গুরুত্বপূর্ণ। ফলে একজন রেঞ্জ ডিআইজির দায়িত্ব শুধু অপরাধী গ্রেপ্তার করা কিংবা অভিযান পরিচালনার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না। তাঁকে একই সঙ্গে মাঠপর্যায়ের পুলিশকে সক্রিয় রাখতে হয়, তদন্তের মান উন্নত করতে হয়, জনগণের আস্থা ধরে রাখতে হয় এবং পুলিশ সদস্যদের জবাবদিহির মধ্যেও রাখতে হয়। এই বাস্তবতায় আবদুল কুদ্দুস চৌধুরীর সামনে সবচেয়ে বড় পরীক্ষা হবে তাঁর নেতৃত্বকে কতটা কার্যকরভাবে মাঠপর্যায়ে বাস্তবায়ন করা যায়। সিলেট থেকে চট্টগ্রাম, অভিজ্ঞতার একটি নতুন অধ্যায় চট্টগ্রাম রেঞ্জে আসার আগে আবদুল কুদ্দুস চৌধুরী সিলেট মেট্রোপলিটন পুলিশের কমিশনার হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। তিনি ২০২৫ সালের ১০ সেপ্টেম্বর সিলেটে দায়িত্ব গ্রহণ করেন। এর আগে তিনি খুলনা পুলিশ ট্রেনিং সেন্টারের কমান্ড্যান্ট ও ডিআইজি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। সিলেটে দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকেই তিনি নিরাপদ, আধুনিক ও প্রযুক্তিনির্ভর নগর পুলিশিংয়ের কথা বলেছেন। নাগরিকদের দ্রুত পুলিশি সহায়তা দেওয়ার জন্য প্রযুক্তিনির্ভর অ্যাপ চালুর উদ্যোগও তাঁর দায়িত্বকালের আলোচিত বিষয়গুলোর একটি। বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থার প্রতিবেদনে তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, প্রযুক্তির মাধ্যমে জরুরি পুলিশি সহায়তা, অবস্থান জানানো, অভিযোগের অগ্রগতি অনুসরণসহ বিভিন্ন সেবা দেওয়ার পরিকল্পনা ছিল।
এখানে একটি বিষয় লক্ষণীয়। আধুনিক পুলিশিং শুধু অস্ত্র, ইউনিফর্ম কিংবা অভিযাননির্ভর নয়। আধুনিক পুলিশিংয়ের সঙ্গে প্রযুক্তি, নাগরিক যোগাযোগ, দ্রুত সেবা এবং আস্থার সম্পর্কও জড়িয়ে আছে। আবদুল কুদ্দুস চৌধুরীর প্রকাশ্য কর্মকাণ্ডে এই ধারণার প্রতিফলন দেখা যায়। অপরাধের শিকড় খুঁজে আঘাত করার কথা বলেছেন চট্টগ্রাম রেঞ্জে দায়িত্ব নেওয়ার পর তাঁর বক্তব্য ও মাঠপর্যায়ের কার্যক্রমে মাদকবিরোধী অবস্থান বিশেষভাবে সামনে এসেছে। গত ২০ আগস্ট লক্ষ্মীপুরে আয়োজিত মাদকবিরোধী সমাবেশে তিনি চট্টগ্রাম বিভাগ থেকে মাদক নির্মূলের প্রত্যয় ব্যক্ত করেন। তাঁর বক্তব্যে শুধু মাদকসেবী নয়, মাদক ব্যবসার সঙ্গে জড়িত ডিলার, অর্থের জোগানদাতা, পাইকারি ও খুচরা বিক্রেতাসহ পুরো সরবরাহ ব্যবস্থাকে আইনের আওতায় আনার কথা উঠে আসে। এটি গুরুত্বপূর্ণ একটি দৃষ্টিভঙ্গি। কারণ মাদককে শুধু একজন সেবনকারীর ব্যক্তিগত অপরাধ হিসেবে দেখলে সমস্যার মূল জায়গায় পৌঁছানো যায় না। মাদকের পেছনে অর্থের প্রবাহ, সরবরাহকারী, পরিবেশক এবং স্থানীয় নেটওয়ার্ক থাকে। সেই জায়গায় আঘাত করতে না পারলে অভিযান সাময়িক ফল দিতে পারে, কিন্তু সমস্যার স্থায়ী সমাধান কঠিন। এই বাস্তবতা বিবেচনায় মাদকবিরোধী অভিযানে সরবরাহ ব্যবস্থার পাশাপাশি অর্থের উৎস শনাক্ত করার যে কথা তিনি বলেছেন, সেটি মাঠপর্যায়ের আইনশৃঙ্খলা ব্যবস্থাপনায় একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক। জঙ্গল সলিমপুরে সরেজমিনে উপস্থিতি চট্টগ্রামের জঙ্গল সলিমপুর দীর্ঘদিন ধরেই আইনশৃঙ্খলা, ভূমি দখল, পাহাড় কাটা এবং বিভিন্ন ধরনের অপরাধ নিয়ে আলোচনায় থাকা একটি এলাকা। দায়িত্ব গ্রহণের পর সেখানে সরেজমিনে গিয়ে পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করেছেন ডিআইজি আবদুল কুদ্দুস চৌধুরী। ৪ আগস্ট তিনি জঙ্গল সলিমপুরের বিভিন্ন পুলিশ ক্যাম্প পরিদর্শন করেন এবং নিরাপত্তা পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করেন। জঙ্গল সলিমপুরের মতো এলাকায় একজন ঊর্ধ্বতন পুলিশ কর্মকর্তার সরেজমিনে উপস্থিতির আলাদা তাৎপর্য রয়েছে। কারণ মাঠের বাস্তবতা কাগজের প্রতিবেদনের চেয়ে অনেক সময় ভিন্ন হয়। একটি এলাকার ভৌগোলিক অবস্থান, মানুষের চলাচল, অপরাধের ধরন, পুলিশের সক্ষমতা এবং স্থানীয় বাস্তবতা নিজের চোখে দেখা নেতৃত্বের সিদ্ধান্ত গ্রহণকে আরও বাস্তবভিত্তিক করতে পারে। সেখানে তাঁর বক্তব্যে সন্ত্রাস, চাঁদাবাজি এবং অপরাধের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থানের বার্তা উঠে আসে। এই বার্তা কতটা ধারাবাহিকভাবে বাস্তবায়িত হয়, সেটিই এখন দেখার বিষয়। শুধু অভিযান নয়, মানবিক পুলিশিংয়ের কথাও এসেছে পুলিশের কাজের সবচেয়ে কঠিন জায়গাগুলোর একটি হলো কঠোরতা এবং মানবিকতার মধ্যে ভারসাম্য তৈরি করা।
অপরাধীর বিরুদ্ধে আইন প্রয়োগ করতে হবে কঠোরভাবে। কিন্তু একই সঙ্গে নিরপরাধ মানুষ যেন হয়রানির শিকার না হন, সেটিও নিশ্চিত করতে হবে। কারণ পুলিশ জনগণের নিরাপত্তার জন্যই নিয়োজিত একটি রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান। সিলেটে দায়িত্ব পালনকালে আবদুল কুদ্দুস চৌধুরী মানবিক পুলিশিং এবং জনগণের সঙ্গে আস্থার সম্পর্ক তৈরির কথা বলেছেন। বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থার প্রতিবেদনে তাঁকে বলতে দেখা যায়, অপরাধের ধরন পরিবর্তনের সঙ্গে পুলিশকেও পরিবর্তিত হতে হবে এবং নাগরিক ও পুলিশের মধ্যে আস্থার সেতু গড়ে তোলা প্রয়োজন। এই ধারণাটি চট্টগ্রাম রেঞ্জের জন্যও গুরুত্বপূর্ণ। কারণ একটি থানায় সাধারণ মানুষ অভিযোগ করতে এসে যদি নিজেকে নিরাপদ ও সম্মানিত মনে করেন, তাহলে পুলিশের সঙ্গে জনগণের সম্পর্ক শক্তিশালী হয়। আবার অপরাধী যদি মনে করে আইনের হাত তার নাগালের বাইরে, তাহলে রাষ্ট্রের প্রতি মানুষের আস্থা দুর্বল হয়। পুলিশি কঠোরতা যেন হয় আইনের ভিতরে আবদুল কুদ্দুস চৌধুরী নোয়াখালীতে অপরাধ দমন ও শাস্তির কার্যকারিতা নিয়েও বক্তব্য দিয়েছেন। সেখানে তিনি এমন শাস্তির প্রয়োজনীয়তার কথা বলেন, যার মাধ্যমে সমাজে অপরাধের বিরুদ্ধে একটি কার্যকর বার্তা যায়। একই সঙ্গে তিনি বিচারিক প্রক্রিয়ার বাস্তবতাও তুলে ধরেছেন। পুলিশ গ্রেপ্তার করতে পারে, তদন্ত করতে পারে, কিন্তু চূড়ান্ত বিচারিক সিদ্ধান্ত আদালতের। এই বক্তব্যের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো আইন প্রয়োগকারী সংস্থা এবং বিচার বিভাগের ভূমিকার সীমারেখা স্বীকার করা। একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে পুলিশি ক্ষমতা যতটা প্রয়োজনীয়, সেই ক্ষমতার আইনি সীমারেখাও ততটাই গুরুত্বপূর্ণ। তাই চট্টগ্রাম রেঞ্জে তাঁর নেতৃত্বের একটি বড় পরীক্ষা হবে অপরাধ দমনে কঠোরতা বজায় রেখেও আইনের যথাযথ প্রক্রিয়া এবং নাগরিক অধিকারকে সম্মান করা। একজন কর্মকর্তাকে মূল্যায়নের আসল জায়গা মাঠ কোনো পুলিশ কর্মকর্তাকে শুধু তাঁর বক্তব্য দিয়ে মূল্যায়ন করা যায় না। তাঁর দায়িত্বকালে অপরাধের প্রবণতা কীভাবে পরিবর্তিত হলো, তদন্তের মান কতটা বাড়ল, মামলা নিষ্পত্তির গতি কেমন হলো, সাধারণ মানুষ পুলিশের কাছ থেকে কতটা দ্রুত সেবা পেলেন এবং পুলিশ সদস্যরা কতটা
জবাবদিহির মধ্যে থাকলেন, এসব বিষয়ই গুরুত্বপূর্ণ।
আবদুল কুদ্দুস চৌধুরীর ক্ষেত্রেও একই কথা প্রযোজ্য।
তাঁর সামনে এখন একটি বিশাল কর্মক্ষেত্র। চট্টগ্রাম থেকে কক্সবাজার, কুমিল্লা থেকে নোয়াখালী, ফেনী থেকে লক্ষ্মীপুর, পার্বত্য চট্টগ্রামের পাহাড়ি অঞ্চল থেকে সীমান্তবর্তী জনপদ, প্রতিটি এলাকার অপরাধের ধরন আলাদা। কোথাও মাদক বড় সমস্যা, কোথাও চোরাচালান, কোথাও ভূমি ও পাহাড়কেন্দ্রিক বিরোধ, কোথাও কিশোর অপরাধ, আবার কোথাও রাজনৈতিক বা সামাজিক বিরোধ থেকে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি ঘটতে পারে। একজন রেঞ্জ ডিআইজির নেতৃত্বের সাফল্য তাই একটি অভিযানের সাফল্যে মাপা যায় না। সামগ্রিক পুলিশ ব্যবস্থাপনার ধারাবাহিক উন্নতিই সেখানে আসল মাপকাঠি। মাঠপর্যায়ের পুলিশ সদস্যরাই তাঁর নেতৃত্বের মূল শক্তি একজন ডিআইজি যতই দক্ষ পরিকল্পনা করুন, থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা, তদন্ত কর্মকর্তা, পুলিশ পরিদর্শক, উপপরিদর্শক এবং কনস্টেবল পর্যায়ের সদস্যরা সেই পরিকল্পনা বাস্তবায়ন না করলে কাঙ্ক্ষিত ফল পাওয়া সম্ভব নয়। সুতরাং আবদুল কুদ্দুস চৌধুরীর জন্য শুধু অপরাধীদের বিরুদ্ধে কঠোর হওয়ার চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হবে তাঁর অধীনস্থ পুলিশ সদস্যদের পেশাদারিত্ব, শৃঙ্খলা, সততা এবং জনবান্ধব আচরণ নিশ্চিত করা। একজন ভালো নেতৃত্বের পরিচয় অনেক সময় নিজের বক্তব্যে নয়, অধীনস্থদের আচরণে প্রকাশ পায়। একজন নাগরিক থানায় গিয়ে কী ব্যবহার পেলেন, একজন ভুক্তভোগীর অভিযোগ কত দ্রুত নেওয়া হলো, তদন্ত কতটা নিরপেক্ষ হলো এবং একজন সাধারণ মানুষ পুলিশের কাছ থেকে কতটা সহযোগিতা পেলেন, সেখানেই নেতৃত্বের বাস্তব প্রতিফলন ঘটে। অভিজ্ঞতার সঙ্গে যুক্ত হয়েছে আন্তর্জাতিক কর্মপরিধি আবদুল কুদ্দুস চৌধুরীর পেশাগত জীবনে দেশীয় দায়িত্বের পাশাপাশি আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতাও রয়েছে। জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা কার্যক্রমের সঙ্গে তাঁর কাজের অভিজ্ঞতা তাঁর পেশাগত পরিসরকে আরও বিস্তৃত করেছে। আন্তর্জাতিক শান্তিরক্ষা কার্যক্রমে কাজ করা একজন পুলিশ কর্মকর্তার জন্য শৃঙ্খলা, বহুজাতিক পরিবেশে কাজ করার সক্ষমতা, নিরাপত্তা ব্যবস্থাপনা এবং সমন্বয়ের মতো বিষয়গুলো গুরুত্বপূর্ণ অভিজ্ঞতা হিসেবে বিবেচিত হয়। চট্টগ্রাম রেঞ্জের মতো বহুমাত্রিক একটি অঞ্চলে এই অভিজ্ঞতা তাঁর প্রশাসনিক ও নেতৃত্বের কাজে কতটা কার্যকর হয়, সেটিও সময়ের সঙ্গে স্পষ্ট হবে।
চট্টগ্রামবাসীর প্রত্যাশা এখন কর্মে চট্টগ্রামের মানুষ পুলিশের কাছে শুধু অভিযান চায় না। তারা নিরাপদ সড়ক চায়, মাদকমুক্ত পরিবেশ চায়, চাঁদাবাজমুক্ত ব্যবসার পরিবেশ চায়, পাহাড় ও ভূমি দখল থেকে নিরাপত্তা চায়, নারী ও শিশুর নিরাপত্তা চায় এবং সর্বোপরি চায় থানায় গিয়ে সম্মানের সঙ্গে কথা বলার অধিকার। এই প্রত্যাশার জায়গা থেকেই নতুন ডিআইজির প্রতি মানুষের আগ্রহ তৈরি হয়েছে।
দায়িত্ব গ্রহণের পর তাঁর বক্তব্যে মাদক ও অপরাধের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান স্পষ্ট হয়েছে। মাঠপর্যায়ে তাঁর উপস্থিতিও দেখা যাচ্ছে। কিন্তু প্রশাসনের যেকোনো নতুন নেতৃত্বের ক্ষেত্রে প্রাথমিক বার্তার চেয়ে দীর্ঘমেয়াদি বাস্তবায়নই শেষ পর্যন্ত বেশি গুরুত্বপূর্ণ। কারণ মানুষ প্রতিশ্রুতি শুনে আশাবাদী হয়, কিন্তু ফলাফল দেখে আস্থা তৈরি করে। সামনে সবচেয়ে বড় পরীক্ষা
চট্টগ্রাম রেঞ্জে আবদুল কুদ্দুস চৌধুরীর সামনে তাই একদিকে যেমন কঠিন অপরাধ দমনের চ্যালেঞ্জ রয়েছে, অন্যদিকে রয়েছে মানবিক পুলিশিং প্রতিষ্ঠার সুযোগ।
অপরাধীর বিরুদ্ধে কঠোরতা থাকতে হবে, কিন্তু নিরপরাধ মানুষের প্রতি থাকতে হবে সংবেদনশীলতা। মাদক ব্যবসায়ীর বিরুদ্ধে অভিযান চলবে, কিন্তু মাদকাসক্ত একজন তরুণকে সমাজে ফিরিয়ে আনার পথও ভাবতে হবে। চাঁদাবাজের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে হবে, আবার ব্যবসায়ী ও সাধারণ মানুষের নিরাপত্তাও নিশ্চিত করতে হবে। সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রের শক্ত অবস্থান থাকতে হবে, কিন্তু সেই শক্তি অবশ্যই আইনের কাঠামোর মধ্যেই প্রয়োগ করতে হবে। এই ভারসাম্যই একজন পুলিশ নেতার সবচেয়ে বড় পরীক্ষা।
সময়ই বলবে কর্মের হিসাব আবদুল কুদ্দুস চৌধুরীর চট্টগ্রাম রেঞ্জ অধ্যায় এখনো শুরুর পর্যায়ে। তাই তাঁর নেতৃত্বের চূড়ান্ত মূল্যায়নের সময় এখনো আসেনি। তবে দায়িত্ব গ্রহণের পর মাদকবিরোধী অবস্থান, জঙ্গল সলিমপুরের মতো সংবেদনশীল এলাকায় সরেজমিনে উপস্থিতি এবং বিভিন্ন জেলায় আইনশৃঙ্খলা ও অপরাধ দমন নিয়ে তাঁর বক্তব্য তাঁর অগ্রাধিকার সম্পর্কে একটি প্রাথমিক ধারণা দেয়। এখন প্রয়োজন সেই অগ্রাধিকারকে ধারাবাহিক কর্মপরিকল্পনায় রূপ দেওয়া।
চট্টগ্রাম রেঞ্জের মানুষ দেখতে চায়, অপরাধের বড় নামের পাশাপাশি ছোট অপরাধীও আইনের আওতায় আসছে কি না। তারা দেখতে চায়, মাদকের বিরুদ্ধে অভিযান শুধু বক্তৃতার মঞ্চে সীমাবদ্ধ থাকছে, নাকি মাদকের অর্থের উৎস ও সরবরাহ ব্যবস্থায়ও আঘাত হানছে। তারা দেখতে চায়, পুলিশ সদস্যদের অনিয়মের বিরুদ্ধেও একই কঠোরতা প্রয়োগ হচ্ছে কি না। তারা দেখতে চায়, থানায় সাধারণ মানুষের অভিযোগ কতটা গুরুত্ব পাচ্ছে।
শেষ পর্যন্ত একজন পুলিশ কর্মকর্তার সবচেয়ে বড় পরিচয় তাঁর পদবি নয়, তাঁর বক্তব্য নয়, তাঁর কর্মফল।
চট্টগ্রাম রেঞ্জের নতুন ডিআইজি আবদুল কুদ্দুস চৌধুরীর সামনে এখন সেই কর্মফল নির্মাণের সময়। বিশাল এই রেঞ্জের সমুদ্র, পাহাড়, সীমান্ত, নগর ও জনপদের নিরাপত্তার দায়িত্ব তাঁর কাঁধে। মানুষের প্রত্যাশা একটাই, অপরাধীর জন্য আইনের কঠোরতা এবং সাধারণ মানুষের জন্য পুলিশের মানবিক হাত যেন একই সঙ্গে দৃশ্যমান হয়। চট্টগ্রাম এখন তাঁর বক্তব্য শুনেছে। এবার চট্টগ্রাম দেখতে চায় তাঁর কর্ম। সময়ই সেই কর্মের সবচেয়ে নিরপেক্ষ সাক্ষী হবে।

রাউজানে মানব কল্যাণে ধম্মকথার ১ম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উদযাপন

‘ধম্মচর্চা ও মানবতায় গড়ে উঠুক মানবিক বৌদ্ধ সমাজ’ এই প্রত্যয়ে চট্টগ্রামের রাউজানে নানা আয়োজনের মধ্য দিয়ে ‘মানব কল্যাণে ধম্মকথা’র ১ম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উদযাপন করা হয়েছে। একই সঙ্গে ধম্মশিক্ষা ও প্রজ্ঞাচর্চা প্রতিযোগিতার পুরস্কার বিতরণী, সংবর্ধনা এবং রক্তের গ্রুপ নির্ণয় কর্মসূচি অনুষ্ঠিত হয়।
শুক্রবার (২৫ সেপ্টেম্বর) রাউজানের আধার মানিক বোধি নিকেতন বিহার, বৈল্যার দীঘির পাড়ে আয়োজিত অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন বোধি নিকেতন বিহারের অধ্যক্ষ ভদন্ত সত্যশ্রী ভিক্ষু। অনুষ্ঠানের উদ্বোধন করেন উত্তর রাঙ্গুনিয়া ডিগ্রি কলেজের ইংরেজি বিভাগের অধ্যাপক ও বাংলাদেশ কলেজ বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক সমিতির শিক্ষা ও গবেষণা সম্পাদক অধ্যাপক রাজু বড়ুয়া। বিশেষ অতিথি ছিলেন লায়ন্স ক্লাব অব চিটাগাং কর্ণফুলী এলিটের ভাইস প্রেসিডেন্ট লায়ন উজ্জল কান্তি বড়ুয়া এবং দীপঙ্কর প্রজ্ঞাবার্তার প্রতিষ্ঠাতা সম্পাদক প্রণব বড়ুয়া। সম্মানিত অতিথি ছিলেন যীশু চৌধুরী, সুমন বড়ুয়া ও বিধান বড়ুয়া।
অনুষ্ঠানে সংগঠনের উপদেষ্টা উৎফল বড়ুয়াকে বাংলাদেশ বৌদ্ধ যুব পরিষদ জাতীয় কমিটির প্রচার ও প্রকাশনা সচিব মনোনীত হওয়ায় আন্তরিক সংবর্ধনা প্রদান করা হয়। পাশাপাশি সমাজকল্যাণে অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ পাঁচটি মানবিক সংগঠন- রাউজান ব্লাড ব্যাংক, আর্য্য সংঘ, করুণা সংঘ, ছন্দক এবং বৈল্যার দিঘির পাড় পল্লী উন্নয়ন সংঘকে সংবর্ধনা এবং ধম্মশিক্ষা ও প্রজ্ঞাচর্চা প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণকারী ১৫০ জন শিক্ষার্থীর মাঝে সার্টিফিকেট, ক্রেস্ট ও শিক্ষা সামগ্রী প্রদান করা হয়।
পবিত্র ত্রিপিটক থেকে বুদ্ধবাণী পাঠ করেন জ্ঞানরক্ষিত শ্রমণ। মানব কল্যাণে ধম্মকথার সহ-সভাপতি একান্ত বড়ুয়া বাপ্পির সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে সাধারণ সম্পাদকের প্রতিবেদন উপস্থাপন করেন শ্রবণ বড়ুয়া আকাশ। স্বাগত বক্তব্য দেন উদযাপন পরিষদের আহ্বায়ক সুপ্রিয়াল বড়ুয়া। সংগঠনের সভাপতি অভি বড়ুয়া অসুস্থতাজনিত কারণে অনুষ্ঠানে উপস্থিত হতে না পারলেও ভিডিও কলে যুক্ত হয়ে শুভেচ্ছা ও ধন্যবাদ জ্ঞাপন করেন। অনুষ্ঠান সঞ্চালনা করেন অশ্মি বড়ুয়া ও প্রারম্ভ বড়ুয়া।
প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে আয়োজিত রক্তের গ্রুপ নির্ণয় কর্মসূচিতে সার্বিক সহযোগিতা করে রাউজান ব্লাড ব্যাংক। কর্মসূচি ও অনুষ্ঠান আয়োজনে সহযোগিতা করেন অন্তু বড়ুয়া (১), সনজিত বড়ুয়া বিকি, অন্তু বড়ুয়া (২), সুমেধ চৌধুরী, সৌমিক বড়ুয়া, হৃদয় চৌধুরী, অর্পন বড়ুয়া, বিজয় বড়ুয়া, সুস্ময় বড়ুয়া, চিনময় বড়ুয়া, বিকি বড়ুয়া, তমাল বড়ুয়া, রবিন বড়ুয়া, শিপন বড়ুয়া, সুমিত বড়ুয়া ও সাগর বড়ুয়া।
বক্তারা বলেন, ধম্মচর্চা ব্যক্তি ও সমাজজীবনে নৈতিকতা, মানবিকতা, সহমর্মিতা ও প্রজ্ঞার বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। তরুণ প্রজন্মকে মানবিক মূল্যবোধে উদ্বুদ্ধ করে শান্তিপূর্ণ ও সহনশীল সমাজ গড়ে তোলার লক্ষ্যে ‘মানব কল্যাণে ধম্মকথা’ প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। ভবিষ্যতেও ধম্মশিক্ষা, প্রজ্ঞাচর্চা ও মানবসেবামূলক কার্যক্রম অব্যাহত রাখার প্রত্যয় ব্যক্ত করেন আয়োজকরা।

বোয়ালখালী সিরাজুল ইসলাম ডিগ্রি কলেজ জাতীয়করণ এখন সময়ের দাবি ৫৬ বছরের ঐতিহ্য, হাজারো শিক্ষার্থীর ভবিষ্যৎ এবং বোয়ালখালীবাসীর প্রত্যাশা

মো. কামাল উদ্দিনঃ
একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান কখনো শুধু ইট, বালু, সিমেন্ট আর শ্রেণিকক্ষের সমষ্টি নয়। একটি কলেজের সঙ্গে জড়িয়ে থাকে একটি জনপদের স্বপ্ন, হাজারো পরিবারের আশা, অসংখ্য শিক্ষার্থীর ভবিষ্যৎ এবং একটি সমাজের পরিবর্তনের ইতিহাস।
বোয়ালখালী সিরাজুল ইসলাম ডিগ্রি কলেজ সেই অর্থে শুধু একটি কলেজ নয়। ১৯৭০ সালে প্রতিষ্ঠার পর দীর্ঘ ৫৬ বছরের পথচলায় প্রতিষ্ঠানটি বোয়ালখালী ও আশপাশের এলাকার শিক্ষার্থীদের উচ্চশিক্ষার সুযোগ দিয়ে আসছে। কলেজটির EIIN নম্বর ১০৪১৫৫। কলেজের নিজস্ব তথ্যেও ১৯৭০ সালে প্রতিষ্ঠার বিষয়টি উল্লেখ রয়েছে।
আজ যখন শিক্ষার ব্যয় ক্রমেই বাড়ছে এবং মধ্যবিত্ত ও নিম্নমধ্যবিত্ত পরিবারের সন্তানদের উচ্চশিক্ষা গ্রহণ অনেক পরিবারের জন্য কঠিন হয়ে উঠছে, তখন বোয়ালখালী সিরাজুল ইসলাম ডিগ্রি কলেজকে জাতীয়করণের বিষয়টি নতুন করে গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা প্রয়োজন।
আমি একজন বোয়ালখালীর সন্তান হিসেবে এই বিষয়টিকে শুধু একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের দাবি হিসেবে দেখি না। আমি মনে করি, এটি বোয়ালখালীর ভবিষ্যৎ প্রজন্মের শিক্ষার অধিকার ও সুযোগের সঙ্গে সম্পর্কিত একটি গুরুত্বপূর্ণ জনস্বার্থের বিষয়।
আমার দাবি হোক তথ্য ও যুক্তির ভিত্তিতে
আমি মনে করি, বোয়ালখালী সিরাজুল ইসলাম ডিগ্রি কলেজ জাতীয়করণের বিষয়টি যথাযথ সরকারি নীতিমালা, শিক্ষার্থীর সংখ্যা, শিক্ষক ও কর্মচারীর কাঠামো, অবকাঠামো, জমির পরিমাণ, আর্থিক সক্ষমতা এবং এলাকার শিক্ষা চাহিদার আলোকে পরীক্ষা করা প্রয়োজন।
একটি কলেজ জাতীয়করণ শুধু প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত নয়। এর সঙ্গে রাষ্ট্রের আর্থিক দায়িত্ব, শিক্ষক ও কর্মচারীদের কাঠামো, শিক্ষার মান, অবকাঠামো উন্নয়ন এবং শিক্ষার্থীদের ভবিষ্যৎ জড়িত। তাই আবেগের পাশাপাশি প্রয়োজন পূর্ণাঙ্গ তথ্য ও বাস্তবসম্মত পরিকল্পনা।
যদি সরকারি যাচাই ও নির্ধারিত নীতিমালার আলোকে কলেজটি জাতীয়করণের উপযোগী প্রমাণিত হয়, তাহলে বিষয়টি যথাযথ কর্তৃপক্ষের কাছে গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনার দাবি রাখে।
১৯৭০ থেকে আজকের বোয়ালখালী
১৯৭০ সালে শিক্ষাপ্রেমী মানুষের উদ্যোগে বোয়ালখালী সিরাজুল ইসলাম ডিগ্রি কলেজের যাত্রা শুরু হয়। স্থানীয় শিক্ষানুরাগী ও পৃষ্ঠপোষকদের প্রচেষ্টায় প্রতিষ্ঠিত এই প্রতিষ্ঠানটি দীর্ঘ সময় ধরে বোয়ালখালীর শিক্ষার্থীদের উচ্চশিক্ষার সুযোগ দিয়ে আসছে।
সময়ের সঙ্গে শিক্ষার্থীর সংখ্যা বেড়েছে। বেড়েছে শিক্ষার চাহিদা। বদলেছে শিক্ষাব্যবস্থা। তথ্যপ্রযুক্তি ও কর্মমুখী শিক্ষার প্রয়োজনীয়তা এখন আগের যেকোনো সময়ের তুলনায় বেশি।
এই পরিবর্তিত বাস্তবতায় একটি ঐতিহ্যবাহী কলেজকে শুধু টিকিয়ে রাখাই যথেষ্ট নয়। সময়ের সঙ্গে তাল মিলিয়ে প্রতিষ্ঠানটিকে আরও আধুনিক ও শক্তিশালী করে গড়ে তোলাও প্রয়োজন।
শিক্ষার্থীর সংখ্যা একটি গুরুত্বপূর্ণ বাস্তবতা
প্রকাশিত শিক্ষা তথ্য অনুযায়ী ২০২৪ সালে কলেজটিতে প্রায় ৩ হাজার ২২০ জন শিক্ষার্থীর তথ্য পাওয়া যায়। একই সময়ে শিক্ষকসংখ্যা ছিল প্রায় ৩২ জন।
একটি উপজেলা পর্যায়ের কলেজে এত বিপুলসংখ্যক শিক্ষার্থী উচ্চশিক্ষার সঙ্গে যুক্ত থাকা নিঃসন্দেহে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।
এই শিক্ষার্থীদের বড় একটি অংশ স্থানীয় পরিবারের সন্তান। তাদের অনেকের জন্য চট্টগ্রাম শহরে গিয়ে নিয়মিত উচ্চশিক্ষা গ্রহণ করা আর্থিক ও সামাজিকভাবে কঠিন হতে পারে।
একজন কৃষকের সন্তান, একজন ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীর সন্তান, একজন চাকরিজীবীর সন্তান কিংবা একজন মধ্যবিত্ত পরিবারের সন্তান যখন নিজের এলাকার একটি কলেজে উচ্চশিক্ষার সুযোগ পায়, তখন সেই প্রতিষ্ঠানটি তার পরিবারের কাছে শুধু একটি কলেজ থাকে না। সেটি হয়ে ওঠে ভবিষ্যৎ গড়ার একটি গুরুত্বপূর্ণ আশ্রয়।
মধ্যবিত্ত পরিবারের স্বপ্নের সঙ্গে কলেজটির সম্পর্ক
আমাদের সমাজে উচ্চশিক্ষার সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জের একটি হলো ব্যয়।
একজন বাবা সারাজীবন পরিশ্রম করে সন্তানের শিক্ষার খরচ বহন করেন। একজন মা নিজের প্রয়োজন কমিয়ে সন্তানের পড়াশোনার জন্য অর্থ সঞ্চয় করেন। অনেক পরিবার আবার সন্তানের উচ্চশিক্ষার ব্যয় বহন করতে গিয়ে নিজেদের প্রয়োজনীয় অনেক কিছু থেকে বঞ্চিত হয়।
এই বাস্তবতায় নিজ উপজেলার একটি মানসম্মত ও শক্তিশালী সরকারি কলেজ একটি পরিবারের জন্য বড় ধরনের সহায়তা হতে পারে।
বোয়ালখালী সিরাজুল ইসলাম ডিগ্রি কলেজের জাতীয়করণের বিষয়টি তাই শুধু প্রশাসনিক কাঠামো পরিবর্তনের প্রশ্ন নয়। এর সঙ্গে স্থানীয় পরিবারের শিক্ষার ব্যয়, সুযোগের সমতা এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের উচ্চশিক্ষার সুযোগও জড়িত।
অবকাঠামো রয়েছে, এখন প্রয়োজন আরও উন্নয়ন
কলেজটির নিজস্ব তথ্য অনুযায়ী প্রতিষ্ঠানটিতে লাইব্রেরি, কম্পিউটার ল্যাব ও খেলার মাঠ রয়েছে। প্রকাশিত তথ্যসূত্রে কলেজটির জমির পরিমাণ প্রায় ৫ দশমিক ১ একর বলেও উল্লেখ পাওয়া যায়।
তবে বর্তমান যুগের উচ্চশিক্ষা শুধু শ্রেণিকক্ষ ও পাঠ্যবইয়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়।
বর্তমান প্রজন্মের শিক্ষার্থীদের জন্য প্রয়োজন আধুনিক বিজ্ঞানাগার, উন্নত কম্পিউটার ও তথ্যপ্রযুক্তি সুবিধা, সমৃদ্ধ লাইব্রেরি, ডিজিটাল শিক্ষাব্যবস্থা, ভাষা ও দক্ষতা উন্নয়ন, কর্মমুখী শিক্ষা, গবেষণার সুযোগ, খেলাধুলা, সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড এবং ক্যারিয়ার কাউন্সেলিং।
একটি জাতীয়করণ প্রক্রিয়ার সঙ্গে এসব উন্নয়ন পরিকল্পনাকে যুক্ত করা গেলে প্রতিষ্ঠানটি ভবিষ্যতে আরও কার্যকর শিক্ষাকেন্দ্রে পরিণত হতে পারে।
বৃহত্তর চট্টগ্রাম নাগরিক ফোরামেরও দাবি
আমি বৃহত্তর চট্টগ্রাম নাগরিক ফোরামের সঙ্গে যুক্ত একজন নাগরিককর্মী হিসেবে মনে করি, চট্টগ্রামের প্রতিটি জনপদের শিক্ষা, স্বাস্থ্য, যোগাযোগ ও নাগরিক উন্নয়নের বিষয়কে বৃহত্তর জনস্বার্থের আলোকে দেখা প্রয়োজন।
সেই বিবেচনায় বোয়ালখালী সিরাজুল ইসলাম ডিগ্রি কলেজ জাতীয়করণের বিষয়টিও বৃহত্তর চট্টগ্রাম নাগরিক ফোরামের জনস্বার্থভিত্তিক আলোচনার একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হওয়া উচিত।
বৃহত্তর চট্টগ্রাম নাগরিক ফোরামের পক্ষ থেকে কলেজটির জাতীয়করণের বিষয়ে একটি পূর্ণাঙ্গ তথ্যভিত্তিক প্রস্তাব তৈরি করা যেতে পারে। শিক্ষক, শিক্ষার্থী, সাবেক শিক্ষার্থী, অভিভাবক, শিক্ষাবিদ, স্থানীয় নাগরিক এবং সংশ্লিষ্ট জনপ্রতিনিধিদের মতামত নিয়ে সেই প্রস্তাব সরকারের কাছে উপস্থাপন করা যেতে পারে।
এতে দাবিটি কোনো ব্যক্তি বা সংগঠনের একক দাবি হিসেবে থাকবে না। বরং এটি বোয়ালখালীর শিক্ষার উন্নয়ন ও ভবিষ্যৎ প্রজন্মের স্বার্থে একটি প্রাতিষ্ঠানিক জনদাবি হিসেবে সামনে আসবে।
শওকতুল ইসলামের আহ্বান
বোয়ালখালী সিরাজুল ইসলাম ডিগ্রি কলেজের জাতীয়করণের দাবি সামনে এনে কলেজটির সাবেক ছাত্রদল সভাপতি শওকতুল ইসলাম বোয়ালখালীবাসীকে ঐক্যবদ্ধ হওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন বলে স্থানীয়ভাবে বক্তব্য এসেছে।
আমি মনে করি, এই উদ্যোগকে কোনো রাজনৈতিক পরিচয়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে শিক্ষার্থী, শিক্ষক, অভিভাবক, সাবেক শিক্ষার্থী, শিক্ষাবিদ, সামাজিক সংগঠন এবং সর্বস্তরের বোয়ালখালীবাসীর অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা প্রয়োজন।
কারণ একটি কলেজের ভবিষ্যৎ কোনো একক ব্যক্তি বা সংগঠনের বিষয় নয়। একটি কলেজের ভবিষ্যৎ একটি পুরো জনপদের ভবিষ্যতের সঙ্গে সম্পর্কিত।
দলমতের ঊর্ধ্বে শিক্ষার দাবি
রাজনীতিতে মতপার্থক্য থাকবে। নেতৃত্বের ভিন্নতা থাকবে। রাজনৈতিক চিন্তাভাবনায় পার্থক্য থাকবে। কিন্তু শিক্ষার প্রশ্নে একটি জনপদের দীর্ঘমেয়াদি স্বার্থকে অগ্রাধিকার দেওয়া জরুরি।
বোয়ালখালী সিরাজুল ইসলাম ডিগ্রি কলেজে বিভিন্ন রাজনৈতিক মত ও সামাজিক অবস্থানের পরিবারের সন্তানরা পড়াশোনা করেন। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের দরজা সবার জন্য উন্মুক্ত।
তাই জাতীয়করণের দাবিও হওয়া উচিত সবার জন্য।
এটি কোনো রাজনৈতিক দলের একক দাবি নয়। এটি হওয়া উচিত বোয়ালখালীর শিক্ষার্থী, অভিভাবক এবং সাধারণ মানুষের যৌক্তিক প্রত্যাশা।
প্রধানমন্ত্রীর দৃষ্টি আকর্ষণ
বোয়ালখালীবাসীর পক্ষ থেকে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের দৃষ্টি আকর্ষণ করছি।
বোয়ালখালী সিরাজুল ইসলাম ডিগ্রি কলেজের জাতীয়করণের দাবিটি সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ও কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে যথাযথভাবে যাচাই করা হোক।
কলেজটির শিক্ষার্থী সংখ্যা, শিক্ষক ও কর্মচারীর কাঠামো, জমি, অবকাঠামো, আর্থিক অবস্থা, শিক্ষা কার্যক্রম এবং বোয়ালখালী অঞ্চলের উচ্চশিক্ষার প্রয়োজনীয়তা বিবেচনা করে একটি পূর্ণাঙ্গ সম্ভাব্যতা যাচাই করা হোক।
জাতীয়করণের জন্য প্রচলিত সরকারি নীতিমালা ও যোগ্যতার সঙ্গে প্রতিষ্ঠানটির অবস্থান কতটা সামঞ্জস্যপূর্ণ, সেটিও নিরপেক্ষভাবে যাচাই করা প্রয়োজন।
যদি সবকিছু বিবেচনায় কলেজটি জাতীয়করণের উপযুক্ত প্রমাণিত হয়, তাহলে প্রয়োজনীয় প্রশাসনিক ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য সরকারের প্রতি আহ্বান জানাই।
প্রয়োজন একটি পূর্ণাঙ্গ জাতীয়করণ প্রস্তাব
আমার মতে, বোয়ালখালী সিরাজুল ইসলাম ডিগ্রি কলেজ জাতীয়করণের দাবি সামনে আনতে হলে একটি পূর্ণাঙ্গ প্রস্তাব তৈরি করা জরুরি।
সেখানে কলেজটির প্রতিষ্ঠার ইতিহাস, ১৯৭০ সাল থেকে শিক্ষাক্ষেত্রে অবদান, বর্তমান শিক্ষার্থী সংখ্যা, শিক্ষক ও কর্মচারীর সংখ্যা, শিক্ষার ফলাফল, জমি ও অবকাঠামো, লাইব্রেরি ও ল্যাব, আর্থিক কাঠামো, এমপিও সংক্রান্ত তথ্য, এলাকার শিক্ষা চাহিদা এবং জাতীয়করণ হলে সম্ভাব্য সুফলের বিস্তারিত তথ্য থাকা প্রয়োজন।
একই সঙ্গে সরকারের সম্ভাব্য আর্থিক ব্যয়, প্রশাসনিক কাঠামো এবং ভবিষ্যৎ উন্নয়ন পরিকল্পনাও তুলে ধরা প্রয়োজন।
তথ্য যত শক্তিশালী হবে, দাবির ভিত্তিও তত শক্তিশালী হবে।
সাবেক শিক্ষার্থীদের এগিয়ে আসতে হবে
একটি কলেজের সবচেয়ে বড় শক্তি তার সাবেক শিক্ষার্থীরা।
বোয়ালখালী সিরাজুল ইসলাম ডিগ্রি কলেজ থেকে শিক্ষা নিয়ে যারা দেশে ও বিদেশে বিভিন্ন পেশায় প্রতিষ্ঠিত হয়েছেন, তাদের একটি শক্তিশালী অ্যালামনাই নেটওয়ার্কের আওতায় আনা যেতে পারে।
শিক্ষক, চিকিৎসক, প্রকৌশলী, সাংবাদিক, আইনজীবী, সরকারি কর্মকর্তা, ব্যবসায়ী, উদ্যোক্তা এবং বিভিন্ন পেশায় প্রতিষ্ঠিত সাবেক শিক্ষার্থীরা কলেজের উন্নয়ন পরিকল্পনায় যুক্ত হতে পারেন।
জাতীয়করণের দাবি সফল হোক বা না হোক, কলেজের শিক্ষার মান উন্নয়নে সাবেক শিক্ষার্থীদের সম্পৃক্ততা দীর্ঘমেয়াদে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
আমার জন্মমাটির প্রতি দায়
আমি একজন বোয়ালখালীর সন্তান।
এই মাটির সঙ্গে আমার আবেগের সম্পর্ক রয়েছে। এই জনপদের মানুষের সুখ, দুঃখ, আশা এবং প্রত্যাশার সঙ্গে আমারও সম্পর্ক রয়েছে।
তাই বোয়ালখালীর কোনো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের উন্নয়নের প্রশ্নে আমি নীরব থাকতে চাই না।
আমার কাছে বোয়ালখালীর উন্নয়ন মানে শুধু রাস্তা, সেতু, ভবন কিংবা বাজারের উন্নয়ন নয়।
শিক্ষার উন্নয়নই একটি জনপদের সবচেয়ে বড় স্থায়ী উন্নয়ন।
আজকের একজন কলেজ শিক্ষার্থীই আগামী দিনের শিক্ষক হতে পারে। সে চিকিৎসক হতে পারে। সে প্রকৌশলী হতে পারে। সে সাংবাদিক হতে পারে। সে প্রশাসক হতে পারে। সে উদ্যোক্তা হতে পারে। সে দেশের একজন দায়িত্বশীল নাগরিক হতে পারে।
তাই একটি কলেজকে শক্তিশালী করা মানে একটি প্রজন্মকে শক্তিশালী করা।
বোয়ালখালীর ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য সিদ্ধান্ত চাই
বোয়ালখালী সিরাজুল ইসলাম ডিগ্রি কলেজ ১৯৭০ সালে যে শিক্ষার আলো জ্বালিয়েছিল, সেই আলো দীর্ঘ ৫৬ বছর ধরে জ্বলছে।
এখন আমাদের দায়িত্ব সেই আলোকে আরও বিস্তৃত করা।
জাতীয়করণ সেই আলোকে আরও শক্তিশালী করার একটি সম্ভাব্য পথ হতে পারে। তবে এর জন্য প্রয়োজন সঠিক তথ্য, সরকারি নীতিমালা অনুসরণ, আর্থিক বাস্তবতা যাচাই এবং সর্বস্তরের মানুষের অংশগ্রহণ।
একজন বোয়ালখালীর সন্তান হিসেবে আমার দাবি অত্যন্ত পরিষ্কার।
বোয়ালখালী সিরাজুল ইসলাম ডিগ্রি কলেজের জাতীয়করণের বিষয়টি যথাযথ গুরুত্ব দিয়ে সরকারি পর্যায়ে পরীক্ষা করা হোক।
বৃহত্তর চট্টগ্রাম নাগরিক ফোরামের পক্ষ থেকেও বিষয়টি জনস্বার্থের একটি গুরুত্বপূর্ণ দাবি হিসেবে বিবেচনা করা হোক।
শিক্ষক, শিক্ষার্থী, অভিভাবক, সাবেক শিক্ষার্থী এবং বোয়ালখালীবাসী দলমতের ঊর্ধ্বে উঠে তথ্যভিত্তিকভাবে বিষয়টি সামনে আনুন।
আর সরকারের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ প্রচলিত নীতিমালা ও জনস্বার্থের আলোকে বিষয়টি যাচাই করে প্রয়োজনীয় সিদ্ধান্ত গ্রহণ করুন।
কারণ একটি কলেজের ভবিষ্যৎ মানে শুধু একটি প্রতিষ্ঠানের ভবিষ্যৎ নয়।
একটি কলেজের ভবিষ্যৎ মানে একটি জনপদের ভবিষ্যৎ।
আর বোয়ালখালীর ভবিষ্যৎ প্রজন্মের শিক্ষার প্রশ্নে আমরা নীরব থাকতে পারি না।
বোয়ালখালী সিরাজুল ইসলাম ডিগ্রি কলেজ জাতীয়করণের দাবি হোক তথ্যভিত্তিক, ঐক্যবদ্ধ, জনস্বার্থমুখী এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য নিবেদিত।

কোতোয়ালী পুলিশের অভিযানে চুরি-ছিনতাইসহ একাধিক মামলার আসামি হেলালসহ গ্রেপ্তার ৩

চট্টগ্রাম নগরীর কোতোয়ালী থানা পুলিশের বিশেষ অভিযানে চুরি, ছিনতাই, ডাকাতি ও মাদকসহ একাধিক মামলার আসামি মো. হেলালসহ তিনজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। পুলিশ জানায়, গত ৪ জুলাই রাত পৌনে ৪টার দিকে এক ব্যবসায়ী দোকান বন্ধ করার সময় মোবাইল ফোন ও ব্যবসার নগদ ২ লাখ ১০ হাজার টাকা একটি ব্যাগে রেখে দোকানের ভেতরে যান। পরে দোকান বন্ধ করার সময় ব্যাগটি না পেয়ে সিসিটিভি ফুটেজ পর্যালোচনা করেন তিনি। ফুটেজে দেখা যায়, অটোরিকশায় আসা তিনজনের মধ্যে একজন কৌশলে ব্যাগটি নিয়ে দ্রুত চলে যায়। এ ঘটনায় কোতোয়ালী থানায় মামলা দায়েরের পর আসামিদের গ্রেপ্তারে অভিযান শুরু করে পুলিশ। এরই ধারাবাহিকতায় ২৪ সেপ্টেম্বর বাকলিয়া থানার মাস্টারপুল বউ বাজার এলাকায় অভিযান চালিয়ে মো. হেলাল ও মিজানুর রহমান প্রকাশ আলাউদ্দিনকে গ্রেপ্তার করা হয়। পুলিশের দাবি, জিজ্ঞাসাবাদে গ্রেপ্তার দুজন চোরাই মোবাইল ফোন মো. মনিরুজ্জামান মনুর কাছে বিক্রি করার কথা স্বীকার করেন। তাদের দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে একই রাতে পুরাতন রেলওয়ে স্টেশন এলাকায় অভিযান চালিয়ে মনিরুজ্জামান মনুকেও গ্রেপ্তার করা হয়। পুলিশ আরও জানায়, গ্রেপ্তার মো. হেলালের বিরুদ্ধে চুরি, ছিনতাই, ডাকাতি ও মাদকসহ বিভিন্ন অভিযোগে সাতটি মামলা আদালতে বিচারাধীন রয়েছে। গ্রেপ্তার তিনজনকে যথাযথ আইনি প্রক্রিয়া শেষে আদালতে সোপর্দ করা হয়েছে।

চট্টগ্রামের স্বার্থে একজন চেয়ারম্যানকে কাজ করতে দিন | নগর পরিকল্পনার কঠিন পথে বাধা নয়, চাই সত্য, প্রমাণ ও আইনের শাসন

0

মো. কামাল উদ্দিন:

চট্টগ্রামকে ভালোবাসি বললেই চট্টগ্রামের জন্য কাজ করা হয় না। চট্টগ্রামের জন্য কাজ করতে হলে অনেক সময় জনপ্রিয়তার পথ ছেড়ে কঠিন সিদ্ধান্তের পথে হাঁটতে হয়। কখনো সেই সিদ্ধান্তে কেউ খুশি হবে, কেউ ক্ষুব্ধ হবে, কেউ প্রশ্ন তুলবে, আবার কারও স্বার্থে আঘাত লাগলে প্রতিবাদের আড়ালে ব্যক্তিগত আক্রমণও আসতে পারে।
কিন্তু একটি প্রশ্ন আজ চট্টগ্রামবাসীর বিবেকের কাছে রেখে যেতে চাই— আমরা কি এমন একজন নগর প্রশাসক চাই, যিনি কারও বিরাগভাজন না হয়ে নিশ্চুপ থাকবেন, নাকি এমন একজন দায়িত্বশীল কর্তৃপক্ষ চাই, যিনি আইন, পরিকল্পনা ও জনস্বার্থের প্রশ্নে প্রয়োজনীয় সিদ্ধান্ত নেওয়ার সাহস দেখাবেন?
এই প্রশ্নটি আজ আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান প্রকৌশলী বেলায়েত হোসেনকে ঘিরে।
আমি কোনো ব্যক্তির অন্ধ প্রশংসা করতে চাই না। সরকারি কর্মকর্তা বা প্রতিষ্ঠানের চেয়ারম্যানের মূল্যায়নও ব্যক্তিগত সম্পর্কের ভিত্তিতে হওয়া উচিত নয়। কিন্তু চট্টগ্রামের স্বার্থে এটুকু অবশ্যই বলা যায়—একজন সরকারি কর্মকর্তার বিরুদ্ধে অভিযোগ থাকলে তার জবাব অভিযোগ, তথ্য ও প্রমাণের মাধ্যমে হতে হবে; ব্যক্তিগত জীবন, ছবি বা ভিডিওকে অস্ত্র বানিয়ে সামাজিক বিচারে কাউকে দোষী সাব্যস্ত করা কোনো সভ্য সমাজের পথ হতে পারে না। চট্টগ্রাম কি আবারও অপরিকল্পিত নগরীর বোঝা বহন করবে? চট্টগ্রামের বর্তমান বাস্তবতা কারও অজানা নয়।
জলাবদ্ধতা, খাল-নালা দখল, অপরিকল্পিত ভবন, অনুমোদনবহির্ভূত নির্মাণ, পাহাড় ও জলাশয়ের ওপর চাপ, অপরিকল্পিত ভূমি ব্যবহার, যানজট এবং নগর সম্প্রসারণের সঙ্গে প্রয়োজনীয় অবকাঠামোর সমন্বয়হীনতা—এসব সমস্যা একদিনে তৈরি হয়নি। তাই সমাধানও একদিনে সম্ভব নয়। এই বাস্তবতায় সিডিএর সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো—আজকের চট্টগ্রামকে সামলানোর পাশাপাশি আগামী ২০ থেকে ৩০ বছরের চট্টগ্রামের ভিত্তি তৈরি করা। সিডিএ বর্তমানে ২০২৫ থেকে ২০৫০ মেয়াদের নতুন মহাপরিকল্পনা নিয়ে কাজ করছে। খসড়া পরিকল্পনায় মহানগরের বাইরের আনোয়ারা, পটিয়া, বোয়ালখালী, রাউজান ও হাটহাজারীকে অন্তর্ভুক্ত করার প্রস্তাব রয়েছে। পরিকল্পনায় ভূমি ব্যবহার, পরিবহন, যোগাযোগ, জলাবদ্ধতা, আবাসন, পরিবেশ, পাহাড়, নদী, খাল, পুকুর, জলাশয়, শিল্প ও বাণিজ্যিক কার্যক্রমের মধ্যে সমন্বয়ের বিষয় রাখা হয়েছে। একই সঙ্গে নাগরিকদের মতামত, আপত্তি ও সংশোধনী প্রস্তাব গ্রহণের ব্যবস্থাও রাখা হয়েছে। এটি নিছক একটি প্রশাসনিক কাগজ নয়। এটি বাস্তবায়িত হলে আগামী প্রজন্মের চট্টগ্রাম কোন পথে এগোবে, তার একটি কাঠামো তৈরি হতে পারে। সুতরাং এই পরিকল্পনা নিয়ে বিতর্ক হতেই পারে। সমালোচনা হতেই পারে। নাগরিকের আপত্তি থাকতেই পারে। কিন্তু সেই আলোচনা হওয়া উচিত পরিকল্পনার তথ্য, মানচিত্র, ভূমি ব্যবহার, পরিবেশগত প্রভাব, পরিবহন ব্যবস্থা এবং বাস্তবায়নযোগ্যতার ওপর।
ব্যক্তিগত আক্রমণের ওপর নয়। কঠিন সিদ্ধান্তের জায়গাতেই একজন চেয়ারম্যানের পরীক্ষা। ২০২৬ সালের জুনে দায়িত্ব নেওয়ার পর সিডিএ চেয়ারম্যান প্রকৌশলী বেলায়েত হোসেন অবৈধ দখল, অনিয়ম ও দীর্ঘদিনের স্থবিরতার বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থানের কথা প্রকাশ্যে বলেছেন। তিনি সিডিএকে জনবান্ধব, জবাবদিহিমূলক ও গতিশীল প্রতিষ্ঠানে রূপান্তরের লক্ষ্য ব্যক্ত করেন। একই সময়ে জলাবদ্ধতা নিরসন প্রকল্পের বিভিন্ন খাল ও চলমান প্রকল্প পরিদর্শন করেন। জলাবদ্ধতা নিরসন প্রকল্পের আওতায় অবৈধ স্থাপনা ও দখল উচ্ছেদের প্রয়োজনীয়তার কথাও তিনি বলেছেন। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী প্রকল্পের ৩৬টি খালের মধ্যে ৩০টির কাজ সম্পন্ন হয়েছিল এবং অবশিষ্ট কাজও এগিয়ে নেওয়ার লক্ষ্য ছিল।
এখানেই প্রশ্ন আসে— যে অবৈধ স্থাপনা একটি খালের স্বাভাবিক প্রবাহ বন্ধ করে দেয়, সেটি যদি উচ্ছেদ করতে হয়, তাহলে কারও না কারও অসন্তোষ হবেই।
যে ভবন অনুমোদিত নকশার বাইরে নির্মিত হয়েছে বলে কর্তৃপক্ষের তদন্তে প্রমাণিত হয়, তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে গেলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির আপত্তি থাকতেই পারে।
যে দখল বছরের পর বছর ধরে চলে এসেছে, সেটি উচ্ছেদের উদ্যোগ নিলে স্বার্থসংশ্লিষ্ট মহলের চাপ আসতেই পারে। কিন্তু চাপ আসবে বলে কি নগর আইন প্রয়োগ বন্ধ থাকবে?
অবশ্যই নয়। আবার এর বিপরীত কথাটিও সমান গুরুত্বপূর্ণ— আইন প্রয়োগের নামে বৈধ নাগরিকের অধিকার ক্ষুণ্ন করা যাবে না। অর্থাৎ চট্টগ্রামের জন্য প্রয়োজন কঠোরতা ও ন্যায়সংগততার সমন্বয়। চেয়ারম্যানের কাজের সমালোচনা করুন, কিন্তু ব্যক্তিকে অপমান করবেন না আমি মনে করি, প্রকৌশলী বেলায়েত হোসেনের যেকোনো সিদ্ধান্ত নিয়ে প্রশ্ন তোলার অধিকার নাগরিকের আছে। সাংবাদিকের প্রশ্ন করার অধিকার আছে। নাগরিক সংগঠনের প্রতিবাদ করার অধিকার আছে। ভুক্তভোগীর আইনি প্রতিকার চাওয়ার অধিকার আছে।
আদালতে যাওয়ার অধিকার আছে। কিন্তু একটি গণতান্ত্রিক সমাজে কাজের সমালোচনা আর ব্যক্তিগত চরিত্রহনন এক বিষয় নয়। কোনো সরকারি কর্মকর্তার সিদ্ধান্ত ভুল মনে হলে সেই সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে তথ্য দিন। নথি দেখান। আইন দেখান। প্রমাণ উপস্থাপন করুন। প্রয়োজনে আদালতের দ্বারস্থ হন। কিন্তু ব্যক্তিগত ছবি বা ভিডিওকে সামাজিক বিচারের হাতিয়ার বানিয়ে দেওয়া কোনো সুস্থ নাগরিক আন্দোলনের ভাষা হতে পারে না। আইন কী বলে? বাংলাদেশের প্রচলিত দণ্ডবিধির ৪৯৯ ধারায় কোনো ব্যক্তির সুনাম ক্ষুণ্ন করার উদ্দেশ্যে বা এমন ক্ষতি হবে জেনেও কোনো অভিযোগ বা আরোপ প্রকাশ করাকে নির্দিষ্ট ব্যতিক্রম সাপেক্ষে মানহানির আওতায় বিবেচনা করা হয়েছে। একই আইনে সরকারি কর্মচারীর সরকারি দায়িত্ব পালনের বিষয়ে সৎ বিশ্বাসে মতামত প্রকাশের একটি ব্যতিক্রমও রয়েছে। অর্থাৎ জনস্বার্থে সমালোচনা এবং উদ্দেশ্যপ্রণোদিত মানহানি—দুটিকে আইন এক করে দেখে না। আরও গুরুত্বপূর্ণ হলো, বর্তমান আইনি কাঠামোতে সাইবার সুরক্ষা আইন, ২০২৬ কার্যকর রয়েছে। সরকারি আইনভান্ডারের তথ্য অনুযায়ী, এই আইন ১০ এপ্রিল ২০২৬ প্রণীত এবং ২১ মে ২০২৫ থেকে কার্যকর বলে গণ্য করা হয়েছে। এই আইনের ২৫ ধারায় ব্ল্যাকমেইলিং, যৌন হয়রানি, রিভেঞ্জ পর্ন, সেক্সটর্শনসহ নির্দিষ্ট উদ্দেশ্যে ক্ষতিকর ভিডিও, ছবি বা ডিজিটাল উপাত্ত প্রকাশ বা প্রচারের বিষয়কে অপরাধ হিসেবে নির্ধারণ করা হয়েছে। একই আইনে সাইবার স্পেসে প্রতারণা ও তথ্য বিকৃতির বিষয়েও বিধান রয়েছে। তবে একটি বিষয় পরিষ্কার রাখা জরুরি— প্রতিটি ব্যক্তিগত ছবি বা ভিডিও প্রকাশ স্বয়ংক্রিয়ভাবে একই অপরাধের মধ্যে পড়ে না। কীভাবে ভিডিওটি সংগ্রহ করা হয়েছে, কী উদ্দেশ্যে প্রচার করা হয়েছে, সেটি সম্পাদিত বা বিকৃত কি না, তাতে হুমকি বা ব্ল্যাকমেইলের উপাদান আছে কি না, কারও সুনাম ক্ষুণ্ন করার উদ্দেশ্য ছিল কি না—এসব বিষয় তদন্ত ও প্রমাণের মাধ্যমে নির্ধারণ করতে হবে। এ কারণেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের বিচার নয়, আইনের বিচার প্রয়োজন। অপপ্রচারের অভিযোগ থাকলে তদন্ত হোক—কিন্তু অভিযোগও হোক প্রমাণভিত্তিক কেউ যদি দাবি করেন যে চেয়ারম্যানকে হেয় করার উদ্দেশ্যে কোনো ভিডিও ছড়ানো হয়েছে, তাহলে সেই দাবিরও তদন্ত প্রয়োজন। কেউ যদি বলেন ভিডিওটি সম্পাদিত বা বিকৃত, তাহলে মূল ভিডিও, উৎস, প্রকাশের সময়, অ্যাকাউন্ট, ডিজিটাল ফরেনসিক তথ্য—সবকিছু পরীক্ষা করা যেতে পারে। আবার কেউ যদি চেয়ারম্যানের বিরুদ্ধে গুরুতর কোনো অভিযোগ করেন, সেই অভিযোগও একইভাবে তদন্তযোগ্য। কারণ আইনের শাসনের সৌন্দর্য এখানেই— আইন কারও পক্ষে নয়, কারও বিপক্ষেও নয়; আইন সত্য ও প্রমাণের পক্ষে।
চট্টগ্রামের স্বার্থে আমাদের অবস্থান কী হওয়া উচিত? আমার বিবেক বলে, চট্টগ্রামের মানুষকে এখন ব্যক্তি নিয়ে উত্তেজিত হওয়ার চেয়ে চট্টগ্রামের ভবিষ্যৎ নিয়ে বেশি কথা বলতে হবে। আমরা চাই— চট্টগ্রামের খালগুলো দখলমুক্ত হোক। জলাবদ্ধতার স্থায়ী সমাধান হোক।  নির্মাণ আইন কার্যকর হোক।  পাহাড় ও জলাশয় রক্ষা হোক।  নগরীর পরিবহনব্যবস্থা পরিকল্পিত হোক। অপরিকল্পিত ভবন নির্মাণ বন্ধ হোক।  নতুন আবাসিক ও বাণিজ্যিক এলাকা পরিকল্পনার আওতায় আসুক। উন্নয়ন প্রকল্পে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত হোক। এবং সর্বোপরি— চট্টগ্রামের ভবিষ্যৎ যেন ব্যক্তিগত স্বার্থের কাছে পরাজিত না হয়। এই কাজগুলো করতে গিয়ে সিডিএ চেয়ারম্যানের কোনো সিদ্ধান্ত ভুল হলে নাগরিক সমাজ তার সমালোচনা করবে। সাংবাদিকরা প্রশ্ন করবেন। বিশেষজ্ঞরা মত দেবেন। প্রয়োজনে আদালত সিদ্ধান্ত দেবে। কিন্তু যদি কোনো সিদ্ধান্ত আইনসম্মত ও জনস্বার্থসংশ্লিষ্ট হয়, তাহলে শুধুমাত্র ব্যক্তিগত আক্রমণ বা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের প্রচারণার কারণে সেই কাজ থেমে যাওয়া উচিত নয়। একজন চেয়ারম্যানকে দেবতা বানানোর দরকার নেই, আবার শত্রুও বানানোর দরকার নেই। আমাদের সমাজে একটি বিপজ্জনক প্রবণতা তৈরি হয়েছে—কোনো কর্মকর্তা ভালো সিদ্ধান্ত নিলে তাকে অতিরিক্ত প্রশংসা করা, আর কোনো সিদ্ধান্তে স্বার্থের সংঘাত তৈরি হলে তাকে ব্যক্তিগতভাবে আক্রমণ করা। দুটিই ভুল। চট্টগ্রামের একজন নাগরিক হিসেবে আমার প্রত্যাশা আরও সহজ— চেয়ারম্যান কাজ করুন, জনগণ দেখুক। চেয়ারম্যান সিদ্ধান্ত নিন, তথ্য প্রকাশ হোক। চেয়ারম্যানের বিরুদ্ধে অভিযোগ থাকুক, তদন্ত হোক। অভিযোগ সত্য হলে ব্যবস্থা হোক। অভিযোগ মিথ্যা হলে সেটিও পরিষ্কার হোক। কিন্তু চট্টগ্রামের উন্নয়ন যেন কোনোভাবেই থেমে না যায়। বেলায়েত হোসেনের আসল পরিচয় নির্ধারণ করবে তাঁর কাজ। প্রকৌশলী বেলায়েত হোসেনের সবচেয়ে বড় পরিচয় কোনো প্রশংসা, কোনো সমালোচনা, কোনো সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের ভিডিও কিংবা কোনো রাজনৈতিক পরিচয় হওয়া উচিত নয়। তাঁর সবচেয়ে বড় পরিচয় হওয়া উচিত—সিডিএ চেয়ারম্যান হিসেবে তিনি চট্টগ্রামের জন্য কী রেখে গেলেন। তিনি যদি নগর পরিকল্পনাকে কার্যকর করতে পারেন, উন্নয়ন প্রকল্পকে গতিশীল করতে পারেন, জলাবদ্ধতা নিরসনে স্থায়ী অগ্রগতি আনতে পারেন, নির্মাণ আইন প্রয়োগে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে পারেন এবং ২০২৫–২০৫০ মহাপরিকল্পনাকে বাস্তবভিত্তিক ও জনসম্পৃক্ত করতে পারেন, তাহলে চট্টগ্রামবাসী তার মূল্যায়ন করবে। আর কোথাও ভুল হলে নাগরিক সমাজ প্রশ্ন করবে। এটাই স্বাভাবিক। এটাই গণতান্ত্রিক পথ। চট্টগ্রামবাসীর প্রতি আমার আহ্বান। আসুন, আমরা কোনো ব্যক্তির পক্ষে অন্ধ হয়ে নয়—চট্টগ্রামের পক্ষে দাঁড়াই। কোনো চেয়ারম্যানের ব্যক্তিগত জীবনের পক্ষে বা বিপক্ষে নয়—তাঁর সরকারি দায়িত্ব ও সিদ্ধান্তের তথ্যভিত্তিক মূল্যায়নের পক্ষে দাঁড়াই। কোনো গোষ্ঠীর অপপ্রচারের পক্ষে নয়—সত্য, প্রমাণ ও আইনের পক্ষে দাঁড়াই। যারা চট্টগ্রামের উন্নয়ন চান, তারা প্রশ্ন করুন। যারা সিডিএর সিদ্ধান্তে অনিয়ম দেখেন, তারা তথ্য দিন। যারা অবৈধ নির্মাণের শিকার, তারা আইনগত প্রতিকার চান। যারা চেয়ারম্যানের সিদ্ধান্তকে ভুল মনে করেন, তারা যুক্তি দিন। কিন্তু ব্যক্তিগত ছবি, ভিডিও, গুজব, অর্ধসত্য ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের বিচারকে যেন আমরা সত্যের বিকল্প বানিয়ে না ফেলি। কারণ আজ যদি একজন সরকারি কর্মকর্তা জনস্বার্থে কঠিন সিদ্ধান্ত নেওয়ার সাহস হারান, আগামীকাল অন্য কোনো কর্মকর্তা আরও বড় জনস্বার্থের সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে দশবার ভাববেন। আর তার মূল্য দিতে হবে আমাদেরই। শেষ কথা- চট্টগ্রাম আজ একটি সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আছে। একদিকে অপরিকল্পিত নগরায়নের পুরোনো বোঝা, অন্যদিকে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য পরিকল্পিত নগর গড়ার সুযোগ। একদিকে দখল, অনিয়ম ও নকশাবহির্ভূত নির্মাণের অভিযোগ; অন্যদিকে আইন ও পরিকল্পনার ভিত্তিতে নগর ব্যবস্থাপনা শক্তিশালী করার প্রয়োজন।এই মুহূর্তে আমাদের সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন বিবেক, তথ্য, সাহস এবং আইনের শাসন। প্রকৌশলী বেলায়েত হোসেনের প্রতিটি পদক্ষেপের মূল্যায়ন হোক। প্রশ্ন থাকলে প্রশ্ন উঠুক।
অভিযোগ থাকলে তদন্ত হোক। ভুল হলে সংশোধন হোক। অন্যায় হলে ব্যবস্থা হোক। কিন্তু চট্টগ্রামের উন্নয়ন থামিয়ে দেওয়ার মতো কোনো ব্যক্তিগত অপপ্রচার, গুজব বা উদ্দেশ্যপ্রণোদিত প্রচারণা যেন জনস্বার্থের ওপর স্থান না পায়। চট্টগ্রাম কোনো ব্যক্তির নয়—চট্টগ্রাম চট্টগ্রামবাসীর। আর চট্টগ্রামের ভবিষ্যৎ রক্ষার দায়িত্বও আমাদের সবার। তাই আজ প্রয়োজন কাউকে অন্ধভাবে সমর্থন করা নয়; প্রয়োজন একজন দায়িত্বশীল নগর কর্তৃপক্ষকে তাঁর কাজ করার সুযোগ দেওয়া এবং একই সঙ্গে তাঁর কাজকে তথ্য, আইন, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহির কঠিন মানদণ্ডে বিচার করা।
চট্টগ্রামের স্বার্থে—ব্যক্তির বিরুদ্ধে নয়, অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়াই। অপপ্রচারের বিরুদ্ধে নয় শুধু, সত্যের পক্ষেও দাঁড়াই। কোনো ব্যক্তির জন্য নয়, চট্টগ্রামের ভবিষ্যতের জন্য কথা বলি।

লেখকঃ সাংবাদিক, লেখক ও গবেষক
সাধারণ সম্পাদক, চট্টগ্রাম সিনিয়র’স প্রেসক্লাব
মহাসচিব, বৃহত্তর চট্টগ্রাম নাগরিক ফোরাম

উৎপাদন বাড়লে হাতের নাগালে আসতে পারে ইলিশের দাম

ইলিশের উৎপাদন বাড়িয়ে সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতার মধ্যে মাছটির দাম নিয়ে আসার উদ্যোগ নিয়েছে মৎস্য গবেষকরা। চাঁদপুরের পদ্মা-মেঘনায় নদীর জলাশয়ের সর্বোচ্চ ব্যবহার, ইলিশের প্রজনন ও বিচরণক্ষেত্র সংরক্ষণ এবং নদীর পরিবেশগত সংকট মোকাবিলার মাধ্যমে উৎপাদন বাড়ানোর সম্ভাবনা দেখছেন সংশ্লিষ্টরা। বুধবার (২৩ সেপ্টেম্বর) বাংলাদেশ মৎস্য গবেষণা ইনস্টিটিউটের নদী কেন্দ্র, চাঁদপুরের প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ড. তায়েফা আহমেদ এসব তথ্য জানান। তিনি বলেন, দূষণ, নাব্যতা সংকট ও পানিপ্রবাহ বাধাগ্রস্ত হওয়ায় উজানের দিকে ইলিশের বিচরণ কমেছে। ডিম থেকে ফুটে বের হওয়ার পর রেণু ইলিশ বড় হওয়ার জন্য চাঁদপুরের নদী এলাকায় আসে। এসব জলাশয় কার্যকরভাবে ব্যবহার করে কীভাবে ইলিশের উৎপাদন বাড়ানো যায়, তা নিয়ে গবেষণা চলছে। ড. তায়েফা আহমেদ জানান, বর্তমানে চাঁদপুরে ছয়টি গবেষণা প্রকল্প চলছে। এর মধ্যে ‘পপুলেশন ডায়নামিকস অ্যান্ড স্টক অ্যাসেসমেন্ট অব টেনুয়ালোসা ইলিশা ইন বাংলাদেশ’ প্রকল্পের মাধ্যমে ইলিশের মজুত, বিচরণ ও উৎপাদন নিয়ে গবেষণা করা হচ্ছে। তার আশা, সঠিক ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে চাঁদপুরে আবারও ইলিশের প্রাচুর্য ফিরবে। গবেষকদের তথ্য অনুযায়ী, ২০২০-২১ অর্থবছরে দেশে ইলিশের উৎপাদন ছিল ৫ লাখ ৬৫ হাজার মেট্রিক টন। এর মধ্যে চাঁদপুরের পদ্মা-মেঘনায় উৎপাদন হয়েছিল ৩৩ হাজার ৯৯২ মেট্রিক টন। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে সারাদেশে ইলিশের উৎপাদন কমে প্রায় ৫ লাখ মেট্রিক টনে নামলেও চাঁদপুরে উৎপাদন বেড়ে দাঁড়ায় ৩৫ হাজার ৪৭২ মেট্রিক টনে। তবে ভবিষ্যৎ উৎপাদন নিয়ে উদ্বেগও রয়েছে। ২০২৪ সালে দেশে ইলিশের ডিম উৎপাদন হয়েছিল ৮ লাখ ৮৪ হাজার ৮০২ কেজি। ২০২৫ সালে তা কমে দাঁড়ায় ৭ লাখ ৯১ হাজার ৫৬৪ কেজিতে। গবেষণার হিসাবে, ডিম থেকে রেণু ও জাটকায় পরিণত হওয়ার পর বেঁচে থাকার হারও কমেছে। ইলিশের উৎপাদন কমে যাওয়ায় হতাশ চাঁদপুরের জেলেরাও। রাজরাজেশ্বরের জেলে বাচ্চু বেপারি বলেন, গতবারের তুলনায় এবার নদীতে ইলিশ অনেক কম পাওয়া যাচ্ছে। তেলের দামসহ অন্যান্য খরচ বেড়ে যাওয়ায় জেলেদের জীবনযাপনও কঠিন হয়ে পড়েছে। চাঁদপুরের বড়স্টেশন মাছঘাটেও কমেছে ইলিশের সরবরাহ। ব্যবসায়ীদের তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে এক কেজি ওজনের ইলিশ বিক্রি হচ্ছে প্রায় ২ হাজার ৪০০ থেকে ২ হাজার ৫০০ টাকায়। ৫০০ গ্রামের ইলিশের দাম প্রায় ১ হাজার ৭৫০ টাকা এবং ৭০০ থেকে ৮০০ গ্রামের ইলিশ বিক্রি হচ্ছে প্রায় ২ হাজার ২০০ টাকায়। ব্যবসায়ীদের দাবি, গত বছরের তুলনায় এবার কেজিতে দাম বেড়েছে প্রায় ৫০০ থেকে ৬০০ টাকা। চাঁদপুর মৎস্য বণিক সমবায় সমিতির সভাপতি আব্দুল বারি জমাদার মানিক বলেন, কয়েক বছর আগের তুলনায় ঘাটে ইলিশের সরবরাহ উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে। তার দাবি, ২০২২ সালে এই সময়ে ঘাটে প্রতিদিন প্রায় ৩ হাজার মণ ইলিশ এলেও বর্তমানে আসে ৪০০ থেকে ৫০০ মণ, কখনো তারও কম। তিনি ইলিশের উৎপাদন বাড়াতে সাগরে ট্রল জাল বন্ধ এবং নৌপথের ডুবোচর অপসারণ করে নাব্যতা ফিরিয়ে আনার ওপর গুরুত্ব দেন। এদিকে মা ইলিশ রক্ষায় ২০২৬ সালের প্রধান প্রজনন মৌসুমে আগামী ৮ অক্টোবর থেকে ২৯ অক্টোবর পর্যন্ত ২২ দিন ইলিশ ধরা, পরিবহন, মজুত, বাজারজাত ও কেনাবেচা নিষিদ্ধ থাকবে। নিষেধাজ্ঞা কার্যকর করতে চাঁদপুরের মতলব উত্তরের ষাটনল থেকে হাইমচরের চরভৈরবী পর্যন্ত প্রায় ৭০ কিলোমিটার পদ্মা-মেঘনা নদীতে বিশেষ অভিযান চালানো হবে। নিষেধাজ্ঞার সময়ে নিবন্ধিত জেলেদের খাদ্য সহায়তাও দেওয়া হবে। চাঁদপুর সদর, হাইমচর, মতলব উত্তর ও মতলব দক্ষিণের মোট ৪২ হাজার ৭৯০ জন জেলেকে ২৫ কেজি করে চাল দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। চাঁদপুর জেলা মৎস্য কর্মকর্তা মোহাম্মদ ফকরুল ইসলাম বলেন, ইলিশের দাম কমাতে হলে উৎপাদন বাড়ানোর বিকল্প নেই। তার তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে চাঁদপুরে ইলিশের উৎপাদন ছিল ৩৫ হাজার ৪৭২ মেট্রিক টন। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে তা কমে দাঁড়িয়েছে ২৮ হাজার ৬৫৪ মেট্রিক টনে। তিনি বলেন, ইলিশের উৎপাদন বাড়াতে মা ইলিশ ও জাটকা রক্ষায় অভিযানকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। পাশাপাশি নিষেধাজ্ঞার সময়ে জেলেরা যাতে আর্থিক সংকটে না পড়েন, সে বিষয়েও সহায়তার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। চাঁদপুর নৌ থানার ওসি মো. আজমগীর হোসাইন জানান, নিষেধাজ্ঞার সময়ে নদীতে কঠোর অভিযান চালানো হবে। নিষেধাজ্ঞা অমান্যকারীদের বিরুদ্ধে আইন অনুযায়ী জেল ও জরিমানার ব্যবস্থা নেওয়া হবে।