Home Blog Page 16

দুপুরের মধ্যে ৬ জেলায় ৬০ কিমি বেগে ঝড়ের আভাস

0

দেশের ছয়টি অঞ্চলের ওপর দিয়ে দুপুরের মধ্যে ঘণ্টায় সর্বোচ্চ ৬০ কিলোমিটার বেগে দমকা বা ঝোড়ো হাওয়া বয়ে যেতে পারে। একই সঙ্গে হতে পারে অস্থায়ী বৃষ্টি ও বজ্রবৃষ্টি। এমন পূর্বাভাস দিয়েছে আবহাওয়া অধিদপ্তর। সোমবার (৩১ আগস্ট) ভোর ৫টা থেকে দুপুর ১টা পর্যন্ত দেশের অভ্যন্তরীণ নদীবন্দরগুলোর জন্য দেওয়া পূর্বাভাসে এ তথ্য জানানো হয়েছে। পূর্বাভাস অনুযায়ী, খুলনা, বরিশাল, পটুয়াখালী, নোয়াখালী, চট্টগ্রাম ও কক্সবাজার অঞ্চলের ওপর দিয়ে দক্ষিণ অথবা দক্ষিণ-পূর্ব দিক থেকে ঘণ্টায় ৪৫ থেকে ৬০ কিলোমিটার বেগে দমকা বা ঝোড়ো হাওয়া বয়ে যেতে পারে। এ সময় এসব এলাকায় অস্থায়ীভাবে বৃষ্টি অথবা বজ্রসহ বৃষ্টি হতে পারে। ঝোড়ো হাওয়ার সম্ভাবনার কারণে সংশ্লিষ্ট এলাকার নদীবন্দরগুলোকে ১ নম্বর সতর্কসংকেত দেখাতে বলা হয়েছে।

আজ বিশ্ব গুম প্রতিরোধ দিবস—আজও আমার ভাই ফিরে আসেনি

কিছু অপেক্ষার কোনো শেষ নেই।
কিছু প্রশ্নের কোনো উত্তর নেই।
আর কিছু শোক মানুষকে মৃত্যুর আগ পর্যন্ত তাড়িয়ে বেড়ায়।
আজ বিশ্ব গুম প্রতিরোধ দিবস।
এই দিনটি পৃথিবীর অসংখ্য নিখোঁজ মানুষের স্বজনদের বেদনা নতুন করে জাগিয়ে তোলে। এ দিনে আমারও মনে পড়ে আমার ছোট ভাই আকতার উদ্দিনের কথা।
১৯৯৭ সালের ১১ আগস্ট চট্টগ্রামের কালুরঘাট কামাল বাজার এলাকা থেকে আমার ভাই আকতারকে অজ্ঞাতপরিচয় ব্যক্তিরা তুলে নিয়ে যায়। এরপর থেকে আজ পর্যন্ত তার কোনো সন্ধান পাওয়া যায়নি।
সেদিনের সেই ভাইটি আজ কোথায়?
সে কি বেঁচে আছে?
নাকি তাকে নির্মমভাবে হত্যা করে তার মরদেহ গুম করা হয়েছে?
২৯ বছর পেরিয়ে গেছে।
ক্যালেন্ডারের অসংখ্য পাতা বদলেছে, বহু সরকার এসেছে ও বিদায় নিয়েছে, পৃথিবী থেকে বহু মানুষ হারিয়ে গেছে—কিন্তু আমাদের অপেক্ষার অবসান হয়নি।
আমি তখন চান্দগাঁও ও বোয়ালখালী থানায় সাধারণ ডায়েরি করেছিলাম। পুলিশ সদর দপ্তরেও একাধিকবার অভিযোগ জানিয়েছি। বছরের পর বছর প্রশাসনের বিভিন্ন দপ্তরে যোগাযোগ করেছি, লিখেছি, প্রতিবাদ জানিয়েছি এবং জবাব চেয়েছি। কিন্তু আজও আমার ভাই জীবিত না মৃত—সে বিষয়ে আমরা কোনো নির্ভরযোগ্য তথ্য পাইনি।
আমার দৃঢ় বিশ্বাস, তৎকালীন প্রশাসনের রহস্যজনক ভূমিকার কারণে আমার ভাইকে খুঁজে বের করা সম্ভব হয়নি। দীর্ঘদিন ধরে আমাদের সন্দেহ, তাকে হত্যা করে তার মরদেহ গুম করা হয়ে থাকতে পারে। আমি চাই, এই ঘটনার পূর্ণাঙ্গ তদন্তের মাধ্যমে সত্য উদঘাটিত হোক এবং প্রকৃত ঘটনা জাতির সামনে প্রকাশ করা হোক।
সবচেয়ে বেদনাদায়ক বিষয় হলো—
আমার মা এই অপেক্ষা সহ্য করতে পারেননি।
নিখোঁজ সন্তানের শোকে তিনি ধীরে ধীরে মানসিকভাবে ভেঙে পড়েছিলেন। প্রতিটি দরজায়, প্রতিটি পরিচিত মুখে এবং প্রতিটি অচেনা ফোনকলে তিনি হয়তো তাঁর আকতারকে খুঁজে বেড়াতেন।
“আমার আকতার কি ফিরবে?”
এই প্রশ্নটি যেন প্রতিদিন তাঁর হৃদয়ে নতুন করে বেদনা জাগিয়ে তুলত।
শেষ পর্যন্ত ২০০১ সালের ২ আগস্ট আমার মা আমাদের ছেড়ে চিরবিদায় নেন।
নিখোঁজ সন্তানের মরদেহটুকুও তিনি দেখতে পাননি।
তাকে দাফন করতে পারেননি।
শেষবারের মতো ছেলের মুখে হাত রেখে বলতে পারেননি—
“বাবা, তুই আমাকে ছেড়ে কোথায় গেলি?”
একজন মায়ের জন্য এর চেয়ে বড় বেদনা আর কী হতে পারে?
মা চলে গেছেন।
কিন্তু তাঁর সেই প্রশ্ন আজও আমাদের ঘরে ঘরে প্রতিধ্বনিত হয়।
আকতার কোথায়?
আজ আমি কোনো প্রতিশোধ চাই না।
আমি কারও বিরুদ্ধে ভিত্তিহীন অভিযোগও করতে চাই না।
আমি শুধু সত্য জানতে চাই।
আমার ভাই যদি বেঁচে থাকে, তাকে আমাদের কাছে ফিরিয়ে দেওয়া হোক।
আর যদি সে আর পৃথিবীতে না থাকে, তবে তার পরিণতির সত্য আমাদের জানানো হোক এবং তার মরদেহের সন্ধান দেওয়া হোক। যারা দায়ী, নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে তাদের আইনের আওতায় আনা হোক।
আমরা জানি, এত বছর পর হয়তো আকতার আর আমাদের দরজায় এসে দাঁড়াবে না।
তবুও একজন ভাই হিসেবে আমার হৃদয়ে যে প্রশ্নটি এত বছর ধরে অনুত্তরিত রয়েছে, তার উত্তর পাওয়ার অধিকার আমার আছে।
একজন স্বজনের দীর্ঘ অপেক্ষারও ন্যায়বিচার প্রাপ্য।
২৯ বছর ধরে আমি অপেক্ষা করছি।
২৯ বছর ধরে লিখছি।
২৯ বছর ধরে প্রশ্ন করে চলেছি।
আজ বিশ্ব গুম প্রতিরোধ দিবসে সেই প্রশ্নই আবার রাষ্ট্র, প্রশাসন এবং বিবেকবান মানুষের কাছে তুলে ধরতে চাই—
আমার ভাই আকতার উদ্দিন কোথায়?
আমি আমার ভাইকে ফিরে পেতে চাই—
জীবিত হলে জীবিত, মৃত হলে অন্তত সত্যসহ।
এই সত্য উদঘাটন ও ন্যায়বিচারের প্রত্যাশায় আমি আমার ভাইয়ের গুম হওয়ার ঘটনায় আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছি। ইনশাআল্লাহ।
কারণ, সময় অনেক কিছু মুছে দিতে পারে—
কিন্তু একজন মায়ের কান্না, একজন ভাইয়ের অপেক্ষা এবং সত্যের দাবি কখনো মুছে দিতে পারে না।
আজও আমার হৃদয়ের গভীর থেকে একটি কথাই উচ্চারিত হয়—
“আকতার, তুই যেখানে থাকিস—তোর ভাই তোকে আজও খুঁজছে।”
আর আমার প্রয়াত মায়ের আত্মার কাছে আমার একটাই অঙ্গীকার—
“মা, তোমার আকতারের সত্য আমি খুঁজে বের করব। যতদিন বেঁচে আছি, এই লড়াই থামবে না।”
আল্লাহ আমার ভাইকে রহম করুন, সত্য প্রকাশ করুন এবং আমাদের ন্যায়বিচার পাওয়ার তাওফিক দিন। আমিন।

‘ওরা আমাকে মেরে ফেলবে’, পরে মা ও নবজাতকের মৃত্যু

ভারতের মধ্যপ্রদেশের রেওয়া জেলার একটি সরকারি হাসপাতালে সন্তান জন্ম দেওয়ার পর এক নারী ও তার নবজাতক শিশুর মৃত্যু হয়েছে। মৃত্যুর আগে ওই নারীর কান্না ও অসহায় অবস্থার একটি ভিডিও প্রকাশ্যে এসেছে। সেখানে তাকে বলতে শোনা যায়, ‘এভাবে চিকিৎসা চলতে থাকলে ওরা আমাকে মেরে ফেলবে।’ ভারতীয় সংবাদমাধ্যম এনডিটিভি এ খবর প্রকাশ করেছে। ২৫ বছর বয়সী ওই নারীর নাম কল্পনা মিশ্র। প্রথম সন্তান জন্ম দিতে গত ২৫ আগস্ট রাতে তাকে রেওয়ার সঞ্জয় গান্ধী মেমোরিয়াল হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। পরদিন রাত সাড়ে ৮টার দিকে অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে তিনি একটি সন্তানের জন্ম দেন। এর কিছুক্ষণ পরই কল্পনা ও তার নবজাতক শিশুর মৃত্যু হয়। মৃত্যুর আগে ধারণ করা ভিডিওতে কল্পনাকে হাসপাতালের নারী ওয়ার্ডে কাঁদতে ও চিৎকার করতে দেখা যায়। তিনি স্বজনদের কাছে যেতে চাইছিলেন এবং হাসপাতাল থেকে বের হওয়ার চেষ্টা করছিলেন। কয়েকজন নার্স তাকে আটকে রাখার চেষ্টা করছিলেন। ভিডিওতে কল্পনাকে বলতে শোনা যায়, ‘এভাবে চিকিৎসা চলতে থাকলে ওরা আমাকে মেরে ফেলবে। আমি বাঁচব না। দয়া করে আমাকে বাঁচান, আমার জীবন ঝুঁকিতে।’ পরিবারের অভিযোগ, কল্পনার শারীরিক অবস্থার অবনতি হলেও চিকিৎসকরা যথেষ্ট গুরুত্ব দেননি। তার বাবা রামশরণ মিশ্রের দাবি, তিনি বারবার চিকিৎসকদের কাছে মেয়েকে দেখার ও তার অবস্থা পর্যবেক্ষণের অনুরোধ করেছিলেন; কিন্তু সেই অনুরোধ যথাযথভাবে গুরুত্ব দেওয়া হয়নি। পরিবারের পক্ষ থেকে আরও অভিযোগ করা হয়েছে, অ্যানেসথেসিয়া দেওয়ার পর কল্পনার আর জ্ঞান ফেরেনি। অতিরিক্ত মাত্রায় অ্যানেসথেসিয়া দেওয়া হয়েছিল কি না, তা নিয়েও তারা সন্দেহ প্রকাশ করেছেন। মেয়ের মৃত্যুর জন্য দায়ীদের বিরুদ্ধে মামলা করার দাবি জানিয়েছেন কল্পনার বাবা। তিনি চিকিৎসায় অবহেলার অভিযোগ তুলে দায়িত্বে থাকা চিকিৎসক ও কর্মীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি করেন। ঘটনার পর কল্পনার স্বজনরা হাসপাতালের প্রধান ফটকের সামনে অবস্থান নেন। তারা চিকিৎসায় অবহেলার অভিযোগ তুলে দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানান। প্রায় চার ঘণ্টা হাসপাতাল এলাকায় উত্তেজনা ছিল। পরে হাসপাতালের ডিন সুনীল আগরওয়াল ও হাসপাতাল সুপার রাহুল মিশ্র ঘটনাস্থলে যান। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ ও পরিবারের মধ্যে প্রায় দুই ঘণ্টা বৈঠকের পর মরদেহের ময়নাতদন্তে সম্মতি দেয় পরিবার। এরপর দায়িত্বে থাকা দুই নার্স সাধনা ভার্মা ও সীমা মুজালদেকে সাময়িকভাবে বরখাস্ত করা হয়। পুরো ঘটনা তদন্তে একটি উচ্চপর্যায়ের কমিটিও গঠন করা হয়েছে। তদন্তে কেউ দায়ী প্রমাণিত হলে তার বিরুদ্ধে আরও ব্যবস্থা নেওয়ার কথা জানিয়েছে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ। হাসপাতালের ডিন সুনীল আগরওয়াল বলেন, মা ও শিশুর মৃত্যু অত্যন্ত দুঃখজনক ঘটনা। পরিবারের অভিযোগগুলো তদন্ত করে দেখা হবে। অ্যানেসথেসিয়া দেওয়ার পর কেন কল্পনার জ্ঞান ফেরেনি, সেটিও তদন্তের অংশ। তবে চিকিৎসকদের বিরুদ্ধে অবহেলার অভিযোগ অস্বীকার করেছেন হাসপাতালের সুপার রাহুল মিশ্র। তিনি বলেন, কল্পনাকে চিকিৎসার নিয়ম মেনেই চিকিৎসা দেওয়া হয়েছে। চিকিৎসকদের পক্ষ থেকে কোনো অবহেলা হয়নি। তবে পরিবারের অভিযোগ তদন্ত করে দেখা হচ্ছে। এই ঘটনার পেছনে মধ্যপ্রদেশের সরকারি স্বাস্থ্যব্যবস্থার জনবল সংকটের বিষয়টিও সামনে এসেছে। ২০২৫-২৬ সালের সরকারি তথ্য অনুযায়ী, রাজ্যটিতে অনুমোদিত বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের প্রায় ৭২ শতাংশ পদই খালি। রাজ্যে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের ৫ হাজার ৪৪৩টি পদ থাকলেও কর্মরত আছেন মাত্র ১ হাজার ৪৯৫ জন। খালি রয়েছে ৩ হাজার ৯৪৮টি পদ। চিকিৎসক সংকট শুধু বিশেষজ্ঞ পর্যায়েই নয়। মেডিকেল অফিসারের ৬ হাজার ৫১৩টি অনুমোদিত পদের মধ্যে ২ হাজার ৬৮৯টি পদও খালি।

জরাজীর্ণ ভবন জঙ্গলে ঢাকা স্বাস্থ্যকেন্দ্র যেন ভূতের বাড়ি

কুমিল্লার নাঙ্গলকোট উপজেলার সাতবাড়িয়া ইউনিয়ন স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ কেন্দ্রটি যেন এখন ভূতের বাড়িতে রূপান্তরিত হয়েছে। প্রথম দেখায় মনে হবে, এটি শত বছরের পুরোনো কোনো পরিত্যক্ত বাড়ি। অথচ বাস্তবে এটি একটি স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ কেন্দ্র। সম্প্রতি সরেজমিন দেখা যায়, ভবনের ছাদে বড় ফাটল, স্যাঁতসেঁতে পরিবেশ এবং চারপাশে গজিয়ে ওঠা বন-জঙ্গলে স্বাস্থ্যকেন্দ্রটির স্বাভাবিক পরিবেশ হারিয়ে গেছে। এ ছাড়াও স্বাস্থ্যকেন্দ্রে নেই বিদ্যুৎ সংযোগ। দরজা-জানালাও ভাঙা। বৃষ্টির পানি জমে বড় বড় গর্তের সৃষ্টি হয়েছে। এসব গর্তে বিষাক্ত সাপের বিচরণ বলে শঙ্কা স্থানীয়দের। এ ছাড়া স্বাস্থ্যকেন্দ্রে কোনো ওষুধও নেই বলে অভিযোগ রয়েছে। একজন উপসহকারী কমিউনিটি মেডিকেল অফিসার থাকলেও তিনি সপ্তাহে মাত্র দুদিন স্বাস্থ্যকেন্দ্রে আসেন। স্থানীয় ব্যবসায়ী জাহাঙ্গীর হোসেন বলেন, প্রায় ৩৫ বছর ধরে আমি এখানে ব্যবসা করছি। এর মধ্যে ৩০ বছর ধরে হাসপাতালটি ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় রয়েছে। বর্তমানে হাসপাতালের নিজেরই সেবার প্রয়োজন। রোগীরা সেবা নিতে আসতে ভয় পান। হাসপাতালের ভেতরে পানি পড়ছে। বিদ্যুৎ সংযোগও নেই। ডাক্তারও মাঝে মধ্যে আসেন। স্থানীয় ইউপি সদস্য ইয়াকুব বলেন, হাসপাতালের অবস্থা খুবই ঝুঁকিপূর্ণ। তাই এটি বন্ধ না করলে যে কোনো সময় বড় ধরনের দুর্ঘটনা ঘটতে পারে। উপসহকারী কমিউনিটি মেডিকেল অফিসার মো. সাইফুল ইসলাম বলেন, এখানে সেবা দিতে আসতে ভয় লাগে। হাসপাতালের আশপাশে অনেক গর্ত রয়েছে। এসব গর্তে সাপ থাকারও সম্ভাবনা রয়েছে। চারদিকে বন-জঙ্গল থাকায় ডেঙ্গু মশার বিস্তারও রয়েছে। এতে আমি অসুস্থ হয়ে পড়েছি। ঝুঁকিপূর্ণ ভবনের বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানিয়েছি। স্বাস্থ্যসেবা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, রোগীদের ওষুধ দেওয়া হচ্ছে। তবে শুধু আয়রন ট্যাবলেট ও শিশুদের কন্ট্রাসেপটিভ ডিভাইস রয়েছে। এলাকার মানুষের জন্য স্বাস্থ্যসেবা চালু রাখতে হলে পাশেই একটি বহুতল আশ্রয়কেন্দ্র রয়েছে। সেখানে দুটি কক্ষ বরাদ্দ দেওয়া হলে স্বাস্থ্যসেবা কার্যক্রম চালিয়ে যাওয়া সম্ভব। উপজেলা পরিবার পরিকল্পনাবিষয়ক কর্মকর্তা মো. জাকারিয়া বলেন, বিষয়টি সম্পর্কে অবগত রয়েছি। ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানিয়েছি। এরই মধ্যে হাসপাতালের পুনর্নির্মাণের জন্য তালিকাভুক্ত হয়ে অনুমোদন হয়েছে। অল্প সময়ের মধ্যেই এর কার্যক্রম শুরু হবে।

রেলের হুইসেল বাজায় সিন্ডিকেট, ঘুরেফিরে কয়েকটি নাম

চট্টগ্রামের পাহাড়তলী থেকে পার্বতীপুরের কেলোকা, সিআরবির রেলভূমি থেকে ঢাকার কমলাপুর—রেলওয়ের উন্নয়ন প্রকল্প, যন্ত্রাংশ মেরামত, বাণিজ্যিক দোকান ও সরকারি জমি বরাদ্দের নানা নথিপত্রে ঘুরেফিরে নির্দিষ্ট কিছু প্রভাবশালী ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের নাম সামনে আসছে। অভিযোগ উঠেছে, একটি সংঘবদ্ধ বলয়ের মাধ্যমে রেলের গুরুত্বপূর্ণ খাতগুলো নিয়ন্ত্রিত হচ্ছে। এই প্রক্রিয়ায় যাদের নাম সবচেয়ে বেশি আলোচনায় এসেছে, তাদের মধ্যে রয়েছেন বাংলাদেশ রেলওয়ের মহাপরিচালক প্রকৌশলী মো. আফজাল হোসেন, ঠিকাদার আনিসুর রহমান টিপু ওরফে ‘পার্কিং টিপু’ এবং রাজশাহী মহানগর আওয়ামী লীগের সাবেক সহসাধারণ সম্পাদক আফসার আলী বিশ্বাস। একই সময়ে প্রকৌশলী মো. আফজাল হোসেন প্রকল্প পরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পালনকালে পদ্মা সেতু রেল সংযোগ প্রকল্পে ১৩ হাজার ৩৬১ কোটি ৫২ লাখ টাকার অডিট আপত্তি ওঠায় রেলের সামগ্রিক অর্থ ব্যবস্থাপনা ও স্বচ্ছতা নিয়ে বড় ধরনের প্রশ্ন তৈরি হয়েছে। চট্টগ্রামের পাহাড়তলীতে এই সিন্ডিকেট ও অনিয়মের বিষয়টি নতুন মাত্রা পেয়েছে দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) অনুসন্ধানের মাধ্যমে। ট্রাকশন মোটর মেরামতের পাঁচটি চুক্তি-সংক্রান্ত তথ্য, সংশ্লিষ্ট নথি ও সার্বিক কার্যক্রমের বিবরণ চেয়ে চলতি বছরের ৮ মার্চ রেলের প্রধান সরঞ্জাম নিয়ন্ত্রকের কার্যালয়ে আনুষ্ঠানিক চিঠি পাঠায় দুদক। উপপরিচালক ও অনুসন্ধান দলের প্রধান মো. জাহাঙ্গীর আলমের স্বাক্ষরিত ওই স্মারকে চুক্তিগুলোর বিস্তারিত বিবরণ চাওয়া হয়।  এই অনুসন্ধানে পার্বতীপুর কেন্দ্রীয় লোকোমোটিভ কারখানার (কেলোকা) যন্ত্রাংশ সরবরাহে অনিয়মের তথ্য উঠে এসেছে। সংশ্লিষ্টদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, কেলোকায় আফসার আলী বিশ্বাসের স্বত্বাধিকারী প্রতিষ্ঠানগুলো প্রায় ৮০টি কাজ বাগিয়ে নিয়েছে। নতুন যন্ত্রাংশ সরবরাহের টেন্ডার থাকলেও কোনো কোনো ক্ষেত্রে সরবরাহ করা হয়েছে পুরোনো মেরামত করা যন্ত্রাংশ। পরে ব্যবহারে ত্রুটি দেখা দেওয়ার বিষয়টি সংশ্লিষ্টরা নিশ্চিত করেছেন। ৩০০০ সিরিজের লোকোমোটিভের ট্রাকশন মেইন বিয়ারিং কেনাকাটাও রয়েছে আলোচনায়।  যন্ত্রাংশ সরবরাহের পাশাপাশি রেলের নতুন কেনা কোচ ও ইঞ্জিনের মান নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। ৬৫৮ কোটি টাকা ব্যয়ে কেনা এসব কোচ ও ইঞ্জিনে গুরুতর ত্রুটি ধরা পড়ার পর তা তদন্ত করছে রেলপথ মন্ত্রণালয়। গত ২ জুলাই প্রেরিত এক তদন্তপত্রে সংশ্লিষ্টদের যাবতীয় প্রমাণসহ শুনানিতে উপস্থিত হওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়। যুগ্ম সচিব ও তদন্ত কর্মকর্তা খালেদা আখতারের স্বাক্ষরিত সেই পত্রে শুনানির সময় নির্ধারণ করা হয়েছিল ৬ জুলাই ২০২৬, সকাল ১১টা ৩০ মিনিট। চট্টগ্রামে রেলের মালিকানাধীন ভূমির হিসাব পর্যালোচনায় আরেকটি নথির তথ্য মিলেছে। এস এম এ মোসাব্বিরের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে সিআরবি থেকে পাহাড়তলীর এসআরভি স্টেশনের পশ্চিম-উত্তর পাশে সাড়ে ৪ হাজার বর্গফুট রেলভূমি বরাদ্দ দেওয়া হয়। ২০২৫ সালের ৫ অক্টোবরের সেই পত্রে চিফ কমার্শিয়াল ম্যানেজার (পূর্ব) জসিম উদ্দিন ভূঁইয়া ও এসিসিএম (আব) (পূর্ব) স্বাক্ষর করেন। সংশ্লিষ্টদের হিসাবে ওই ভূমির বর্তমান বাজারমূল্য প্রায় ২০ কোটি টাকা। রেলের বাণিজ্যিক সম্পদ ব্যবস্থাপনার পুরোনো নীতিও এখানে গুরুত্বপূর্ণ। ভেন্ডিং নীতিমালা অনুযায়ী পূর্বাঞ্চলের ঢাকা বিভাগে ৯২৬টি এবং চট্টগ্রাম বিভাগে ৩৫২টি দোকান বরাদ্দ রয়েছে। ২০১৫ সালের ১৩ অক্টোবর তৎকালীন মহাপরিচালক মো. আমজাল হোসেনের স্বাক্ষরিত ইউও নোটে নতুন দোকান বরাদ্দ না দেওয়া এবং পুরোনো বরাদ্দের মেয়াদ না বাড়িয়ে পর্যায়ক্রমে সংখ্যা কমানোর নির্দেশ ছিল। সেই নির্দেশনার পরও কমলাপুর রেলস্টেশনের পাবলিক টয়লেটের পূর্ব-দক্ষিণ পাশে ৪৮০ বর্গফুট জায়গায় ফাস্টফুডের দোকান বরাদ্দ দেওয়া হয়। ৪ জুন ২০২৬-এর নথিতে দেখা যায়, আনিসুর রহমান টিপু, স্বত্বাধিকারী সিকদার কনস্ট্রাকশনের আবেদনের ভিত্তিতে বরাদ্দের প্রক্রিয়া সম্পন্ন হয়েছে। চিফ কমার্শিয়াল ম্যানেজার (পূর্ব) সিআরবি ও এসিসিএম (আর) (পূর্ব) ওই পত্রে স্বাক্ষর করেন। সরেজমিন ওই জায়গায় বড় দোকান নির্মাণের চিত্রও পাওয়া গেছে। জায়গাটির বাজারমূল্য শতকোটি টাকার কাছাকাছি বলে দাবি করা হলেও এ মূল্যায়নের স্বাধীন যাচাই মেলেনি। পাবলিক টয়লেটের পাশে খাদ্যপণ্যের দোকান স্থাপন নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। বিষয়টি বরাদ্দের নথিতে সীমাবদ্ধ না থেকে মন্ত্রণালয় পর্যন্ত গড়ায়। রেলপথ মন্ত্রণালয় এই বরাদ্দ প্রক্রিয়া যাচাইয়ে ২০২৬ সালের ১৪ জুলাই জারি করা অফিস আদেশে অতিরিক্ত সচিব মো. রুপম আনোয়ারকে আহ্বায়ক করে তিন সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করে। কমলাপুরের এই বরাদ্দের বাইরে টিপুর প্রতিষ্ঠান ঘিরে আরও কাজের তথ্য পাওয়া গেছে। ঢাকা বিমানবন্দর, টঙ্গী, জয়দেবপুর, ময়মনসিংহ, জামালপুর ও ইসলামপুর স্টেশনের গণশৌচাগারের কাজ বরাদ্দেও তার নাম রয়েছে। গত বছরের ডিসেম্বর থেকে চলতি বছরের মার্চ পর্যন্ত প্রধান প্রকৌশলী (পূর্ব) দপ্তরের ১৬টি দরপত্রের মধ্যে আটটির কাজ সিকদার এন্টারপ্রাইজ পেয়েছে বলে তথ্য পাওয়া গেছে। ঢাকা বিভাগের ডিইএন-১, ডিইএন-২ ও ডিইএন-৩ দপ্তরেরও উল্লেখযোগ্য সংখ্যক কাজ তার প্রতিষ্ঠান পেয়েছে বলে সংশ্লিষ্টদের দাবি। অন্যদিকে আফসার আলী বিশ্বাসের বিরুদ্ধে একাধিক প্রতিষ্ঠান ব্যবহার করে কাজ চালানোর তথ্য মিলেছে। মেসার্স বাঁধন এন্টারপ্রাইজ, রুপিতা এন্টারপ্রাইজ, শ্রীজা মেটাল ও বিশ্বাস কনস্ট্রাকশন—এই চারটি প্রতিষ্ঠান ঢাকার বিজয়নগরের আকরাম টাওয়ারের ১২ তলা, সুইট-১৮ থেকে পরিচালিত হয় বলে জানা গেছে। রেলের কর্মকর্তা ও ঠিকাদারদের সেখানে নিয়মিত যাতায়াত রয়েছে এবং কাজের বিষয়ে আলোচনা হয় বলে সংশ্লিষ্টদের দাবি। আফসার বিশ্বাসের বিরুদ্ধে ঢাকার চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে একটি মামলাও রয়েছে। ২০২৪ সালের ২৮ অক্টোবর মো. আব্দুল বারিক শেখের করা মামলায় মোট ১০৯ জনকে আসামি করা হয়। অভিযোগের বিষয়ে জানতে আফসার আলী বিশ্বাসের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তার সাড়া পাওয়া যায়নি। ২০১৬ সালে একনেক সভায় পদ্মা রেল সেতু প্রকল্পের প্রাথমিক ব্যয় ধরা হয়েছিল ৩৪ হাজার ৯৮৯ কোটি টাকা। তবে অনুমোদনের মাত্র দুই বছর পর ২০১৮ সালে প্রকল্প ব্যয় এক লাফে ৪ হাজার ২৫৭ কোটি টাকা বাড়িয়ে ৩৯ হাজার ২৪৭ কোটি টাকা করা হয়। অভিযোগ রয়েছে, প্রকল্পটির সম্ভাব্যতা যাচাই, ডিপিপি প্রস্তুত, ঠিকাদার নিয়োগ এবং বাস্তবায়নের প্রায় সব পর্যায়ে চীনা প্রতিষ্ঠানগুলোর একচ্ছত্র প্রভাব ছিল। দরপত্র যাচাই ছাড়াই চীনা ঠিকাদারদের কাজ দেওয়া হয় বলেও অভিযোগ রয়েছে। এতে প্রকল্প ব্যয়ের যৌক্তিকতা যাচাইয়ের সুযোগও সীমিত হয়ে পড়ে। তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও তার বোন শেখ রেহানার রাজনৈতিক প্রভাবের সুযোগ নিয়ে চীনা ঠিকাদারদের সঙ্গে সমঝোতার মাধ্যমে ব্যয় বৃদ্ধি করা হয় বলেও অভিযোগ রয়েছে। সরকারি নিরীক্ষা প্রতিবেদন (২০২৩-২৪ অর্থবছর) অনুযায়ী, পদ্মা রেল সেতু প্রকল্পে মোট ১৩ হাজার ৩৬১ কোটি ৫২ লাখ টাকার অনিয়ম শনাক্ত হয়েছে। এর মধ্যে প্রায় ৯ হাজার ৬৯৩ কোটি টাকার অনিয়মকে ‘গুরুতর’ ও ‘মীমাংসাযোগ্য নয়’ বলে বিবেচনা করা হয়েছে। অডিটে যেসব অনিয়মের কথা উল্লেখ করা হয়েছে, তার মধ্যে রয়েছে মূল চুক্তির বাইরে অতিরিক্ত ব্যয় দেখিয়ে ৫৫৬ কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগ; কম উচ্চতায় মাটি ভরাট করে অতিরিক্ত বিলের মাধ্যমে ২ হাজার ১৩০ কোটি টাকার ক্ষতিসাধনের অভিযোগ; বালুর স্তর কম ব্যবহার করে ২১৬ কোটি ৭৯ লাখ টাকা অতিরিক্ত বিল প্রদান; প্রকৃত কাজের চেয়ে বেশি দেখিয়ে ১ হাজার ১১ কোটি টাকা বিল পরিশোধ; এবং ‘বিশেষায়িত কাজ’ দেখিয়ে ১৭.১৫ শতাংশ উচ্চমূল্যে ইপিসি/টার্নকি চুক্তির মাধ্যমে ৩ হাজার ৬০৬ কোটি ৮৮ লাখ টাকা অতিরিক্ত ব্যয়। ফরিদপুরের ভাঙ্গা রেলস্টেশন নির্মাণ নিয়েও বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছে। যেখানে সর্বোচ্চ ৫ কোটি টাকায় এটি নির্মাণ সম্ভব ছিল, সেখানে ১৫০ কোটি টাকার বেশি ব্যয় করা হয়। অভিযোগ রয়েছে, তৎকালীন প্রকল্প পরিচালক মো. আফজাল হোসেন কৌশলে এই প্রকল্প অন্তর্ভুক্ত করেন। ব্যয়ের তুলনামূলক চিত্রে দেখা যায়, ঢাকা থেকে যশোর পর্যন্ত ১৭২ কিলোমিটার রেলপথে কিলোমিটারপ্রতি গড় ব্যয় হয়েছে ২২৫ থেকে ২২৮ কোটি টাকা (প্রায় ২০.৪ মিলিয়ন ডলার)। অথচ আন্তর্জাতিক উন্মুক্ত দরপত্রের মাধ্যমে নির্মিত চট্টগ্রাম-কক্সবাজার রেললাইনে কিলোমিটারপ্রতি ব্যয় ছিল ৪৪.৭১ কোটি টাকা। সেই হিসাবে পদ্মা রেল সংযোগে প্রতি কিলোমিটারে প্রায় পাঁচ গুণ বেশি খরচ করা হয়েছে। শেখ হাসিনা সরকারের আমলে পদ্মা সেতু রেল সংযোগ প্রকল্পের পরিচালক ছিলেন প্রকৌশলী মো. আফজাল হোসেন। ওই সময় আওয়ামী লীগের প্রভাবশালী মহলের সঙ্গে সখ্য রেখে কর্মকর্তা পদায়ন, কাজ বণ্টন ও অর্থ পরিচালনায় প্রভাব বিস্তারের অভিযোগ ওঠে তার বিরুদ্ধে। শেখ রেহানার ঘনিষ্ঠজন পরিচয়ে আফজাল নিজের পছন্দমতো ব্যক্তিদের গুরুত্বপূর্ণ পদে আনেন; যার মধ্যে তার ফরিদপুরের শ্বশুরালয়ের আত্মীয় ও কথিত শ্যালিকাসহ কয়েকজন নারী কর্মকর্তা ছিলেন। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পরও আফজালের অবস্থানে ব্যাঘাত ঘটেনি। ২০২৪ সালের ২৮ নভেম্বরের সরকারি প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী ৮ ডিসেম্বর ২০২৪ তিনি বাংলাদেশ রেলওয়ের মহাপরিচালক হিসেবে দায়িত্ব নেন। এর মাধ্যমে ১৩ হাজার ৩৬১ কোটি ৫২ লাখ টাকার অডিট আপত্তিতে জড়িত প্রকল্পের প্রধান কর্মকর্তার পুরো রেলের সর্বোচ্চ পদে আসীন হওয়া নিয়ে প্রশাসনিক প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। পদ্মা প্রকল্পের ভূমি অধিগ্রহণেও অর্থের হিসাব নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। মুন্সীগঞ্জ, শরীয়তপুর ও মাদারীপুরে জমি অধিগ্রহণে ভুয়া নথিপত্র ও ক্ষমতার অপব্যবহারের মাধ্যমে অর্থ আত্মসাতের অভিযোগ রয়েছে। মাদারীপুরে পদ্মা সেতু প্রকল্পের ভূমি অধিগ্রহণের প্রায় ১০ কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগে দুদকের মামলা হওয়ার তথ্যও মিলেছে। প্রকল্পে আফজালের সঙ্গে দায়িত্ব পালন করা কয়েকজন কর্মকর্তার নামও এসেছে। বর্তমান প্রকল্প পরিচালক নাজনীন আরা কেয়া আগে অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী ও প্রধান প্রকৌশলী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। তাকে আফজালের ঘনিষ্ঠ সহযোগী হিসেবে উল্লেখ করে প্রকল্পের বিভিন্ন কর্মকাণ্ড নিয়ে প্রশ্ন তোলা হয়েছে। একই সঙ্গে উপপরিচালক শামীমা নাসরিন (বীথি), ফারহানা সুলতানা, যুগ্ম সচিব মীর আলমগীর হোসেন, উপসচিব হোসনে আরা ও পুনর্বাসন কর্মকর্তা মাহবুবুর রহমানের নামও এসেছে। দুদকের চট্টগ্রাম কার্যালয়ের উপপরিচালক মো. আল-আমিন বলেন, ‘যে কোনো সরকারি প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে পাওয়া অভিযোগ যাচাই করে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হয়। গুরুত্বপূর্ণ অভিযোগগুলোকে অগ্রাধিকার দিয়ে অনুসন্ধান ও তদন্ত করা হয়। কোনো মামলায় চার্জশিট আদালতে দাখিলের পর এর বিচারিক প্রক্রিয়া আদালতের এখতিয়ারে চলে যায়। তখন মামলার পরবর্তী সিদ্ধান্ত আদালতই গ্রহণ করেন।’ রেলের কর্মীরা জানান, আফজালের দায়িত্বকালে টিপু ও আফসারকে ঘিরে একটি প্রভাববলয় তৈরি হয়। কাজের তালিকা, বাণিজ্যিক বরাদ্দ এবং রেলসম্পদ ব্যবহারের নথিগুলো পাশাপাশি রাখলে একই নাম ও প্রতিষ্ঠানের পুনরাবৃত্তি চোখে পড়ে। শাহীনুর রহমান নামের এক অভিযোগকারী জানান, রেলের অনেক কাজই একই বলয়ের লোকজন পাচ্ছেন। দীর্ঘদিন ধরে এমন পরিস্থিতি চললেও সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে কথা বলার সাহস অনেকের নেই। অন্য কর্মীরাও সব খাতের নথিপত্র পূর্ণাঙ্গ পর্যালোচনার দাবি জানান। অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে বাংলাদেশ রেলওয়ের মহাপরিচালক প্রকৌশলী মো. আফজাল হোসেন তার বিরুদ্ধে ওঠা যাবতীয় অভিযোগ অস্বীকার করেন। তিনি বলেন, ‘এসব আমার বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র। রেলকে প্রশ্নবিদ্ধ করার জন্য একটি চক্র উঠেপড়ে লেগেছে। তবে আইনের বাইরে কিছুই হচ্ছে না।’

ফটিকছড়িতে ৫ হাজার চারা রোপণ ও বিতরণ করবে গ্রীণ চট্টগ্রাম এ্যালায়েন্স

চট্টগ্রাম: ‘গাছ লাগাই, পরিবেশ ও প্রকৃতি বাঁচাই’—এই প্রতিপাদ্যকে সামনে রেখে ফটিকছড়িতে পাঁচ হাজার চারা রোপণ ও বিতরণ কর্মসূচি অনুষ্ঠিত হবে। গ্রীণ চট্টগ্রাম এ্যালায়েন্স ও আঞ্জুমানে মোত্তাবেয়ীনে গাউছে মাইজভাণ্ডারী (শাহ এমদাদিয়া)-এর যৌথ উদ্যোগে আগামীকাল ৩০ সেপ্টেম্বর ফটিকছড়ি উপজেলার দুটি ইউনিয়নে এ কর্মসূচি আয়োজন করা হয়েছে। সকাল ১০টায় জাহানপুর ইউনিয়নের জাহানপুর আমজাদ আলী আবদুল হাদী ইনস্টিটিউশনে এবং বিকেল ৩টায় ভূজপুর ইউনিয়নের চিকনছড়া উচ্চ বিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীদের অংশগ্রহণে চারা রোপণ ও বিতরণ করা হবে। কর্মসূচির উদ্বোধন করবেন দারুল ইরফান রিসার্চ ইন্সটিটিউটের ম্যানেজিং ট্রাস্টি ও মাইজভাণ্ডারী ফাউন্ডেশনের চেয়ারম্যান, আওলাদে রাসুল (স.), নায়েবে সাজ্জাদানশীন, দরবারে গাউছুল আজম সৈয়দ ইরফানুল হক মাইজভাণ্ডারী (ম.জি.আ.)। এতে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়, চট্টগ্রাম বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় ও ফটিকছড়ি সরকারি কলেজের পরিবেশবিদ শিক্ষকসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতৃবৃন্দ এবং পেশাজীবীরা উপস্থিত থাকবেন। কর্মসূচিতে সংশ্লিষ্ট সবাইকে এবং সংগঠনের কর্মকর্তা ও সদস্যদের উপস্থিত থাকার আহ্বান জানিয়েছেন গ্রীণ চট্টগ্রাম এ্যালায়েন্সের প্রতিষ্ঠাতা ও পরিবেশ সংগঠক স ম জিয়াউর রহমান এবং আঞ্জুমানে মোত্তাবেয়ীনে গাউছে মাইজভাণ্ডারী (শাহ এমদাদিয়া)-এর প্রচার সমন্বয়ক মহিউদ্দিন এনায়েত।

আন্তর্জাতিক বিশ্বতানের আকাশ নীলা উৎসব ২০২৬ অনুষ্ঠিত

নিজস্ব প্রতিবেদক, চট্টগ্রাম:
চট্টগ্রাম জেলা শিল্পকলা একাডেমীর অডিটরিয়ামে উৎসব মূখর পরিবেশে আন্তর্জাতিক বিশ্বতানের “আকাশ নীলা” উৎসব-২০২৬ অনুষ্ঠিত হয়েছে। ২৮ আগস্ট শুক্রবার সকালে রবীন্দ্র-নজরুল জয়ন্তী,
অনলাইন প্রতিযোগিতার পুরস্কার বিতরণী ও মনোমুগ্ধকর সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের মধ্য দিয়ে এই উৎসব অনুষ্ঠিত হয়। অনুষ্ঠানে চট্টগ্রাম আয়কর আইনজীবী সমিতির সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হওয়ার গৌরব অর্জন করায় বিশিষ্ট আইনজীবী এ্যাডভোকেট আসাদুজ্জামান সাগরকে আন্তর্জাতিক বিশ্বতানের পক্ষ থেকে বিশেষ সংবর্ধনা প্রদান করা হয়। বাংলাদেশ টেলিভিশন ও বাংলাদেশ বেতারের জনপ্রিয় উপস্থাপিকা নাহিদা নাজুর সাবলীল সঞ্চালনায় অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন, বিশিষ্ট মানবিক ও ব্যবসায়িক সংগঠক এবং আন্তর্জাতিক বিশ্বতানের অনুষ্ঠান উদযাপন কমিটির আহ্বায়ক লায়ন মোঃ জাহাঙ্গীর আলম। উৎসবের আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করেন রিড্ হোল্ডিংস লিমিটেডের প্রতিষ্ঠাতা ও উপ-ব্যবস্থাপনা পরিচালক দেবাশীষ বড়ুয়া। অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন কুমিল্লা জেলা সমিতি, চট্টগ্রাম এর সভাপতি, বীর মুক্তিযোদ্ধা গোলাম মহিউদ্দিন বাবুল। প্রধান বক্তা হিসেবে উপস্থিত ছিলেন, জেনারেন সি এন্ড এফ সার্ভিস লিমিটেড এর ব্যবস্থাপনা পরিচালক
লায়ন আব্দুর রহমান খোকন। বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন, বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক শ্রেষ্ঠ করদাতা ও শেখ ফাউন্ডেশনের প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান সি আই পি শেখ নবী এবং হাটহাজারী গাউছিয়া আহমদিয়া হাফেজখানা ও এতিমখানার সাধারণ সম্পাদক মোঃ হাছান তারেক চৌধুরী। এছাড়া সংগঠনের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি নরেন সাহা, বর্তমান সভাপতি অপর্ণা চৌধুরী, সাধারণ সম্পাদক আনিকা বড়ুয়াসহ চট্টগ্রামের বিভিন্ন সামাজিক ও সাংস্কৃতিক ব্যক্তিবর্গ অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন। দিনব্যাপী এই আয়োজনে রবীন্দ্র-নজরুলের সৃষ্টিকর্ম, বাবা দিবস ও অনলাইন প্রতিযোগিতার বিজয়ীদের মাঝে পুরস্কার বিতরণ এবং মনোমুগ্ধকর এক সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান অনুষ্ঠিত হয়।

ডেঙ্গুতে আরও ২ জনের মৃত্যু, ২৪ ঘণ্টায় হাসপাতালে ভর্তি ৯৯৪

0

দেশে ডেঙ্গু পরিস্থিতি উদ্বেগজনক হয়ে উঠছে। গত ২৪ ঘণ্টায় ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে আরও দুইজনের মৃত্যু হয়েছে। একই সময়ে দেশের বিভিন্ন হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন ৯৯৪ জন। শনিবার (২৯ আগস্ট) স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের ডেঙ্গুবিষয়ক নিয়মিত বুলেটিনে এ তথ্য জানানো হয়। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছর এখন পর্যন্ত ডেঙ্গুতে মোট ৯০ জনের মৃত্যু হয়েছে। এর মধ্যে শুধু আগস্ট মাসেই মারা গেছেন ৩৬ জন। এছাড়া জুলাইয়ে ৩৬, জুনে ১৩, মে মাসে একজন এবং জানুয়ারি ও ফেব্রুয়ারিতে দুইজন করে ডেঙ্গু রোগীর মৃত্যু হয়েছে। বুলেটিনে বলা হয়েছে, শুক্রবার (২৮ আগস্ট) সকাল ৮টা থেকে শনিবার সকাল ৮টা পর্যন্ত ২৪ ঘণ্টায় হাসপাতালে ভর্তি হওয়া ৯৯৪ জনকে নিয়ে চলতি বছর ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি রোগীর সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৩৩ হাজার ৫৮৬ জনে। এদিকে, গত ২৪ ঘণ্টায় হাসপাতাল থেকে সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরেছেন ৯৭৫ জন। এ নিয়ে চলতি বছর ডেঙ্গু থেকে সুস্থ হয়ে হাসপাতাল ছেড়েছেন ৩১ হাজার ৩৯৭ জন। অঞ্চলভিত্তিক হিসাবে, গত ২৪ ঘণ্টায় সবচেয়ে বেশি রোগী ভর্তি হয়েছেন ঢাকা বিভাগে—৩৯১ জন। এছাড়া খুলনা বিভাগে ২৬৩, বরিশালে ১৩৪, চট্টগ্রামে ১০৩, ময়মনসিংহে ৪৫ এবং রাজশাহীতে ৩৬ জন ডেঙ্গু রোগী হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, দেশের বিভিন্ন এলাকায় ডেঙ্গু আক্রান্তের সংখ্যা বাড়তে থাকায় পরিস্থিতি মোকাবিলায় সতর্ক থাকার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।

মুরাদপুরে মিছিলের প্রস্তুতিকালে নিষিদ্ধ সংগঠনের ১৪ নেতা-কর্মী গ্রেপ্তার

চট্টগ্রাম নগরীর পাঁচলাইশ মডেল থানা পুলিশের বিশেষ অভিযানে কার্যক্রম নিষিদ্ধ সংগঠন বাংলাদেশ আওয়ামী যুবলীগ ও ছাত্রলীগের ১৪ নেতা-কর্মীকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। পুলিশ জানায়, ২৮ জুলাই ২০২৬ দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে পাঁচলাইশ থানাধীন মুরাদপুর ১ নম্বর রেলগেট এলাকার পাকা সড়কে মিছিল করার প্রস্তুতিকালে গোপন সংবাদের ভিত্তিতে অভিযান চালানো হয়। পাঁচলাইশ মডেল থানার অফিসার ইনচার্জ মোজাম্মেল হক ও পরিদর্শক (তদন্ত) অমিতাভ দত্তের নেতৃত্বে এসআই মো. সাজ্জাদ হোসেনসহ পুলিশের একটি দল এ অভিযান পরিচালনা করে। এসময় মিছিলের প্রস্তুতি নেওয়া অবস্থায় মো. কামরুল হাসান, হুমায়ুন কবির, মো. ইমরান হোসেন, নাজমুস সালেহীন নাঈম, মো. এমরান হোসেন, তানিম হাসান, মেহেদী হাসান শুভ, মো. ফরহাদ উল্ল্যাহ, মো. আরাফাত, মো. ইফাত রহমান, মো. পারভেজ, মো. হায়দার, মো. নয়ন হোসেন ইমন ও মো. আব্দুল্লাহ আরমানকে গ্রেপ্তার করা হয়। পুলিশের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, গ্রেপ্তার ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে পাঁচলাইশ মডেল থানায় ২৯ আগস্ট ২০২৬ তারিখে একটি মামলা করা হয়েছে। মামলাটি সন্ত্রাসবিরোধী আইন ২০০৯-এর সংশোধিত বিভিন্ন ধারায় দায়ের করা হয়েছে। গ্রেপ্তার আসামিদের যথাযথ আইনানুগ প্রক্রিয়া শেষে বিজ্ঞ আদালতে সোপর্দ করা হয়েছে বলে জানিয়েছে পুলিশ।

একজন মহান ভাষাবিজ্ঞানীর স্মৃতিতে অধ্যাপক ড. মনিরুজ্জামান—আমার লেখকজীবনের এক অমলিন আলোকবর্তিকা

কিছু মানুষ তাঁদের কর্ম দিয়ে শুধু একটি সময়কে সমৃদ্ধ করেন না, তাঁরা পরবর্তী প্রজন্মের চিন্তা, চেতনা ও সৃষ্টিশীলতার ভিতও নির্মাণ করে যান। তাঁদের চলে যাওয়া তাই নিছক একজন মানুষের প্রস্থান নয়; এটি জ্ঞান, মনন ও প্রজ্ঞার এক উজ্জ্বল অধ্যায়ের অবসান। কিন্তু তাঁদের সৃষ্টিকর্ম, উচ্চারণ ও ভালোবাসার স্মৃতি থেকে যায়—প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে। আজ ২৭ আগস্ট—শ্রদ্ধেয় অধ্যাপক ড. মনিরুজ্জামানের দ্বিতীয় মৃত্যুবার্ষিকী। গভীর শ্রদ্ধা, ভালোবাসা ও কৃতজ্ঞতার সঙ্গে স্মরণ করছি বাংলা ভাষা, সাহিত্য, লোকসংস্কৃতি ও ভাষাবিজ্ঞানের এই বরেণ্য মনীষীকে। তিনি ছিলেন শুধু একজন ভাষাবিজ্ঞানী নন; তিনি ছিলেন শিক্ষক, গবেষক, সাহিত্যিক, প্রাবন্ধিক এবং বাংলা ভাষার নিবেদিতপ্রাণ সাধক। তাঁর দীর্ঘ জ্ঞানচর্চা, গবেষণা ও সাহিত্যকর্ম বাংলা ভাষা ও সংস্কৃতির জগতে একটি সমৃদ্ধ উত্তরাধিকার রেখে গেছে। তবে তাঁর সঙ্গে আমার সম্পর্কের জায়গাটি আমার কাছে আরও ব্যক্তিগত, আরও আবেগের এবং আরও স্মৃতিময়। কারণ আমার লেখকজীবনের একটি গুরুত্বপূর্ণ সময়ে তিনি আমার মতো একজন সাধারণ লেখকের পাশে দাঁড়িয়েছিলেন, আমার লেখাকে মূল্যায়ন করেছিলেন এবং তাঁর মূল্যবান কথায় আমাকে নতুন করে লেখার সাহস জুগিয়েছিলেন।
‘নারী কথা’ ও মনিরুজ্জামান স্যারের সেই ঐতিহাসিক মূল্যায়ন ২০০৯ সাল। আমার লেখকজীবনের একটি স্মরণীয় সময়। সে সময় আমার লেখা দুটি বই একই সঙ্গে শৈলী প্রকাশন থেকে প্রকাশিত হয়েছিল—‘নারী কথা’ এবং ‘টক টক কথা’। এর মধ্যে ‘নারী কথা’ আমার কাছে শুধু একটি বই নয়; নারীজীবন, নারীর অধিকার, সমাজের বাস্তবতা ও নারীর প্রতি আমাদের দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে আমার ভাবনা ও পর্যবেক্ষণের একটি প্রকাশ ছিল। চট্টগ্রাম প্রেসক্লাবে অনুষ্ঠিত হয়েছিল ‘নারী কথা’ বইয়ের প্রকাশনা উৎসব। সেই অনুষ্ঠানের প্রধান আলোচক হিসেবে উপস্থিত ছিলেন বাংলাদেশের অন্যতম বরেণ্য ভাষাবিজ্ঞানী ও শিক্ষাবিদ অধ্যাপক ড. মনিরুজ্জামান। একজন সাধারণ লেখক হিসেবে আমার জন্য সেটি ছিল এক বিরাট সম্মানের মুহূর্ত। একদিকে একজন নবীন লেখকের বই, অন্যদিকে বাংলা ভাষা ও সাহিত্য গবেষণার একজন প্রতিষ্ঠিত মহীরুহ। স্বাভাবিকভাবেই তাঁর মূল্যায়নের প্রতি আমার ছিল গভীর আগ্রহ ও কৌতূহল।কিন্তু সেদিন তিনি যা বলেছিলেন, তা আমার প্রত্যাশার সীমাকেও অতিক্রম করেছিল। তিনি আমার লেখাকে মূল্যায়ন করতে গিয়ে আমাকে ‘অসাধারণ লেখক’ হিসেবে আখ্যায়িত করেছিলেন। আজও সেই শব্দগুলো আমার কাছে শুধু প্রশংসা নয়—একটি দায়িত্ব, একটি বিশ্বাস এবং একটি অনুপ্রেরণার নাম। একজন বড় মাপের ভাষাবিজ্ঞানী যখন একজন সাধারণ লেখকের সৃষ্টিকে এভাবে মূল্যায়ন করেন, তখন সেই প্রশংসা ব্যক্তিগত আনন্দের সীমায় থাকে না; তা হয়ে ওঠে লেখকজীবনের এক অমূল্য প্রেরণার উৎস। আমি আজও মনে করি, সেদিন ড. মনিরুজ্জামান শুধু আমার বইয়ের আলোচনা করেননি—তিনি একজন লেখকের আত্মবিশ্বাসকে স্পর্শ করেছিলেন। তাঁর একটি প্রশংসা—আমার কাছে আজও অমূল্য সম্পদ জীবনে অনেক প্রশংসা পাওয়া যায়, অনেক কথা শোনা যায়। সময়ের সঙ্গে সেসব কথার অধিকাংশই হারিয়ে যায়। কিন্তু কিছু কথা হৃদয়ে স্থায়ীভাবে বসে যায়। ড. মনিরুজ্জামান স্যারের সেই মূল্যায়ন আমার কাছে ঠিক তেমনই। আমি পেশায় সাংবাদিকতা করেছি, লিখেছি, গবেষণা করেছি, নানা বিষয়ে বই প্রকাশ করেছি; কিন্তু আমার লেখকজীবনের বহু অর্জনের ভিড়েও তাঁর সেই মূল্যায়নের স্মৃতি আজও আলাদা আলোয় জ্বলজ্বল করে। কারণ প্রশংসাটি এসেছিল এমন একজন মানুষের কাছ থেকে, যিনি বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের গভীরতর জগতের একজন প্রতিষ্ঠিত গবেষক ও ভাষাবিজ্ঞানী। তাঁর মতো একজন মনীষীর মুখে আমার মতো একজন সাধারণ লেখকের জন্য এমন মূল্যায়ন—এটি আমার কাছে নিঃসন্দেহে এক বিরল সৌভাগ্য। শুধু মঞ্চে নয়—দৈনিক আজাদীর পাতায়ও তিনি আমাকে মূল্যায়ন করেছিলেন ড. মনিরুজ্জামানের সঙ্গে আমার সেই স্মৃতি আরও গভীর হয়ে আছে আরেকটি কারণে। ‘নারী কথা’ প্রকাশনা অনুষ্ঠানে আলোচনার পাশাপাশি তিনি আমার বই ও লেখালেখিকে নিয়ে দৈনিক আজাদী পত্রিকায় একটি দীর্ঘ প্রবন্ধ লিখেছিলেন। একজন প্রতিষ্ঠিত ভাষাবিজ্ঞানী একজন সাধারণ লেখকের বই নিয়ে সংবাদপত্রে বড় পরিসরে লিখছেন—এটি আমার জন্য কতটা সম্মানের ও আনন্দের ছিল, তা ভাষায় প্রকাশ করা কঠিন। আজ যখন পেছনে ফিরে তাকাই, মনে হয়—সেটি শুধু একটি প্রবন্ধ ছিল না; আমার মতো একজন লেখকের প্রতি একজন মনীষীর আস্থা ও ভালোবাসার একটি দলিল ছিল। সেই সময়ের স্মৃতি আজও আমার লেখকসত্তাকে নাড়া দেয়।
‘টক টক কথা’ এবং আরেক মহান ভাষাবিজ্ঞানী ড. মাহবুবুল হক একই সময়ে প্রকাশিত আমার দ্বিতীয় বই ছিল ‘টক টক কথা’। এই বইকে ঘিরেও আমার জীবনে আরেকটি স্মরণীয় অধ্যায় তৈরি হয়েছিল। বইটির মূল আলোচক ছিলেন আরেকজন বরেণ্য ভাষাবিজ্ঞানী—অধ্যাপক ড. মাহবুবুল হক। একই সময়ে আমার দুটি বই—একটির আলোচনায় অধ্যাপক ড. মনিরুজ্জামান, অন্যটির আলোচনায় অধ্যাপক ড. মাহবুবুল হক। তখন হয়তো বুঝিনি, কিন্তু আজ উপলব্ধি করি—আমার লেখকজীবনের সেই সময়টি ছিল এক অসাধারণ সৌভাগ্যের অধ্যায়। দুই মহান ভাষাবিজ্ঞানীর সান্নিধ্য, তাঁদের মূল্যায়ন এবং তাঁদের কাছ থেকে পাওয়া উৎসাহ আমার লেখকজীবনের স্মৃতির ভাণ্ডারে আজও সবচেয়ে উজ্জ্বল অধ্যায়গুলোর একটি। সময় কত নির্মম! আজ সেই স্মৃতিগুলো মনে করতে গিয়ে হৃদয়ের ভেতর এক ধরনের শূন্যতা তৈরি হয়। যাঁদের সামনে বসে কথা শুনেছি, যাঁদের কণ্ঠে বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের গভীর ব্যাখ্যা শুনেছি, যাঁদের কাছ থেকে পেয়েছি উৎসাহ—আজ তাঁরা কেউই আমাদের মাঝে নেই। অধ্যাপক ড. মনিরুজ্জামান ২০২৪ সালের ২৭ আগস্ট আমাদের ছেড়ে চলে গেছেন। আজ তাঁর দ্বিতীয় মৃত্যুবার্ষিকী। দুই বছর কেটে গেছে। কিন্তু আমার কাছে মনে হয়, সময় যেন খুব বেশি দূরে যেতে পারেনি। চট্টগ্রাম প্রেসক্লাবের সেই অনুষ্ঠান, ‘নারী কথা’ বইয়ের প্রকাশনা, মঞ্চে তাঁর উপস্থিতি, তাঁর মূল্যায়নের সেই শব্দগুলো—সবকিছু যেন এখনো স্মৃতির পর্দায় জীবন্ত। মানুষের শারীরিক উপস্থিতি হারিয়ে যায়, কিন্তু কিছু মানুষের কণ্ঠস্বর হারায় না। তাঁদের বলা কিছু কথা আমাদের ভেতরে দীর্ঘদিন প্রতিধ্বনিত হতে থাকে।
ড. মনিরুজ্জামান স্যারের সেই প্রশংসার কথাও আমার কাছে তেমনই এক অমলিন প্রতিধ্বনি।
একজন লেখকের কাছে একজন শিক্ষকের মূল্যায়ন
একজন লেখকের জীবনে পাঠক গুরুত্বপূর্ণ, প্রকাশক গুরুত্বপূর্ণ, সহকর্মী গুরুত্বপূর্ণ—কিন্তু একজন গুণী মানুষের মূল্যায়ন কখনো কখনো তার চেয়েও বেশি শক্তিশালী হয়ে ওঠে।
কারণ সেই মূল্যায়ন লেখককে শুধু আনন্দ দেয় না, তাকে আরও ভালো লেখার দায়িত্বও দেয়।
ড. মনিরুজ্জামান স্যারের সেই মূল্যায়ন আমার কাছে আজও এক ধরনের নৈতিক দায়।
তিনি যখন আমার মতো একজন সাধারণ লেখকের মধ্যে সম্ভাবনা দেখেছিলেন, তখন তাঁর সেই বিশ্বাসকে সম্মান করার জন্য আরও বেশি লিখতে হয়েছে, আরও বেশি পড়তে হয়েছে, আরও গভীরে যেতে হয়েছে।
তাঁর প্রশংসা আমাকে অহংকার শেখায়নি; বরং শিখিয়েছে—একজন লেখকের পথ দীর্ঘ, আর সেই পথের শেষ নেই।
মনিরুজ্জামান স্যার—একটি প্রতিষ্ঠান
ড. মনিরুজ্জামান ছিলেন বাংলা ভাষা ও সাহিত্যচর্চার এক অনন্য প্রতিষ্ঠান।
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের অধ্যাপক ও চেয়ারম্যান হিসেবে তিনি অসংখ্য শিক্ষার্থীকে শিক্ষা দিয়েছেন। বাংলা বিভাগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের নেতৃত্ব, কলা অনুষদের ডিনের দায়িত্ব, নজরুল ইনস্টিটিউটের পরিচালকসহ বিভিন্ন দায়িত্ব পালন করে তিনি তাঁর বহুমাত্রিক প্রতিভার পরিচয় দিয়েছেন।
ভাষা, সাহিত্য ও লোকসংস্কৃতি নিয়ে তাঁর বিপুল গবেষণা ও প্রকাশনা বাংলা জ্ঞানচর্চাকে সমৃদ্ধ করেছে।
তাঁর প্রায় ৩৫টি গ্রন্থ এবং শতাধিক গবেষণাপ্রবন্ধ তাঁর দীর্ঘ সৃষ্টিশীল সাধনার সাক্ষ্য বহন করে।
*‘ভাষা ও সাহিত্য সাধনা’, ‘উপভাষা চর্চার ভূমিকা’, ‘বর্ণে বর্ণে নজরুল’, ‘ভাষা সমস্যা ও অন্যান্য প্রসঙ্গ’, ‘ভাষাতত্ত্ব অনুশীলন’*সহ তাঁর বহু গ্রন্থ বাংলা ভাষা ও সাহিত্য গবেষণার মূল্যবান সম্পদ।
তাঁর কর্মের স্বীকৃতিস্বরূপ তিনি বাংলা একাডেমি সাহিত্য পুরস্কার লাভ করেন এবং একুশে পদকেও ভূষিত হন।
কিন্তু একজন মানুষের সবচেয়ে বড় পরিচয় শুধু তাঁর পুরস্কারে নয়—তিনি কত মানুষের মনে আলো জ্বালাতে পেরেছেন, তার মধ্যেই তাঁর প্রকৃত মহত্ত্ব।
আমার জীবনে ড. মনিরুজ্জামান তেমনই একজন আলোকবর্তিকা।
শেষ কথায়—শ্রদ্ধা ও কৃতজ্ঞতা
স্যার, আপনি আজ নেই।
কিন্তু আপনার সঙ্গে আমার সেই স্মৃতি আছে।
‘নারী কথা’ বইয়ের সেই প্রকাশনা উৎসব আছে।
চট্টগ্রাম প্রেসক্লাবের সেই মঞ্চ আছে।
আপনার কণ্ঠে উচ্চারিত সেই প্রশংসার শব্দ আছে।
দৈনিক আজাদীর পাতায় আমার বই ও লেখালেখিকে নিয়ে আপনার লেখা সেই মূল্যবান প্রবন্ধের স্মৃতি আছে।
আর আছে একজন সাধারণ লেখকের হৃদয়ের গভীরে একজন মহান মানুষের প্রতি অসীম কৃতজ্ঞতা।
আজ আপনাকে স্মরণ করতে গিয়ে মনে হচ্ছে—মানুষের মৃত্যু হয়, কিন্তু মানুষের দেওয়া অনুপ্রেরণার মৃত্যু হয় না।
আপনি আমার জীবনে যে সামান্য আলো জ্বেলে দিয়েছিলেন, সেই আলো হয়তো আপনার কাছে ছিল একটি মুহূর্তের উচ্চারণ; কিন্তু আমার কাছে সেটি আজও দীর্ঘ লেখকজীবনের এক উজ্জ্বল প্রদীপ।
আজ একই সঙ্গে শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করছি আরেক মহান ভাষাবিজ্ঞানী অধ্যাপক ড. মাহবুবুল হককে—যিনি আমার ‘টক টক কথা’ বইয়ের আলোচনায় অংশ নিয়েছিলেন। সময়ের নির্মমতায় আজ দুই মহান ভাষাবিজ্ঞানীই আমাদের মাঝে নেই।
তবু তাঁরা হারিয়ে যাননি।
বাংলা ভাষার প্রতিটি শুদ্ধ উচ্চারণে, গবেষণার প্রতিটি পাতায়, সাহিত্যের প্রতিটি আলোকিত বাক্যে এবং তাঁদের স্পর্শ পাওয়া মানুষের স্মৃতিতে তাঁরা বেঁচে থাকবেন।
অধ্যাপক ড. মনিরুজ্জামান স্যারের দ্বিতীয় মৃত্যুবার্ষিকীতে জানাই বিনম্র শ্রদ্ধা ও গভীর কৃতজ্ঞতা।
হে মহান আল্লাহ, আমার শ্রদ্ধেয় দুই শিক্ষকতুল্য মনীষী—অধ্যাপক ড. মনিরুজ্জামান ও অধ্যাপক ড. মাহবুবুল হককে ক্ষমা করুন, তাঁদের কবরকে নূরে ভরে দিন এবং জান্নাতুল ফেরদৌস নসিব করুন। আমিন।
— মো. কামাল উদ্দিন
লেখক, সাংবাদিক ও গবেষক