
বিপ্লব দাশ গুপ্তঃ বাংলাদেশের রাজনীতিতে ব্যক্তি, মতাদর্শ এবং ইতিহাসকে ঘিরে বিতর্ক নতুন কিছু নয়। তবে সাম্প্রতিক সময়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের বিস্তারের ফলে অনেক ক্ষেত্রে সত্যের চেয়ে গুজব দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে ঘায়েল করতে কিংবা ব্যক্তিগত আক্রোশ চরিতার্থ করতে অপপ্রচার এখন একটি নিয়মিত কৌশলে পরিণত হয়েছে। সেই বাস্তবতায় সাংবাদিক, গবেষক, লেখক ও টেলিভিশন উপস্থাপক মো. কামাল উদ্দিনকে ঘিরেও নানা ধরনের আলোচনা ও বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছে। কেউ তাকে আওয়ামী লীগের দোসর বলছেন, কেউ আবার ফ্যাসিবাদের সহযোগী হিসেবে আখ্যায়িত করছেন। অন্যদিকে, শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর তার ধারাবাহিক সমালোচনামূলক লেখালেখির কারণে আরেকটি পক্ষ তাকে বিএনপির ঘনিষ্ঠ বলারও চেষ্টা করছে। বাস্তবে এই দুই বিপরীত অভিযোগই প্রমাণ করে—একজন স্বাধীন লেখককে রাজনৈতিক পরিচয়ে সীমাবদ্ধ করার চেষ্টা চলছে। মো. কামাল উদ্দিনের রাজনৈতিক জীবনের ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, আশির দশকে তিনি বিএনপির ছাত্ররাজনীতির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। সে সময় বিএনপি বিভক্ত হলে তিনি মহাসচিব কে. এম. ওবায়দুর রহমানের নেতৃত্বাধীন বাংলাদেশ ছাত্রদলের চট্টগ্রাম মহানগর কমিটির সাধারণ সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। এরশাদবিরোধী আন্দোলনে তিনি সক্রিয় ভূমিকা রাখেন। পরে দলীয় রাজনীতি থেকে সরে এসে লেখালেখি, সাংবাদিকতা, গবেষণা ও সামাজিক আন্দোলনকে জীবনের প্রধান কর্মক্ষেত্র হিসেবে গ্রহণ করেন। এরপর তিনি ছাত্র সংগ্রাম কমিটির কেন্দ্রীয় সভাপতি, বাংলাদেশ বেকার পুনর্বাসন সংগ্রাম পরিষদের সভাপতি, বৃহত্তর চট্টগ্রাম উন্নয়ন সংগ্রাম কমিটির অন্যতম সংগঠক এবং চট্টগ্রাম নাগরিক ফোরামের প্রতিষ্ঠাতা মহাসচিব হিসেবে দীর্ঘদিন কাজ করেছেন। তার লেখার মূল বিষয় ছিল দুর্নীতিবিরোধী আন্দোলন, নাগরিক অধিকার, উন্নয়ন বৈষম্য, শিক্ষা, পরিবেশ এবং সামাজিক ন্যায়বিচার। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে নিয়ে তার গবেষণা ও লেখালেখি দীর্ঘদিনের। বঙ্গবন্ধুর জীবন, মুক্তিযুদ্ধ এবং বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাস নিয়ে তিনি বহু প্রবন্ধ লিখেছেন। একইভাবে শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান, মওলানা ভাসানীসহ বিভিন্ন জাতীয় নেতাকেও তিনি গবেষণার বিষয় হিসেবে তুলে ধরেছেন। একজন গবেষকের কাছে ইতিহাস কোনো দলীয় সম্পত্তি নয়; বরং জাতির যৌথ ঐতিহ্য। এই প্রেক্ষাপটে বঙ্গবন্ধু সৈনিক লীগের সঙ্গে তার সম্পৃক্ততা ছিল অস্থায়ী এবং সম্মেলন আয়োজনের লক্ষ্যে। তাকে তিন মাসের জন্য আহ্বায়কের দায়িত্ব দেওয়া হলেও পরে সংগঠনের কেন্দ্রীয় সিদ্ধান্তে সেই কমিটি বাতিল হয়ে নতুন পূর্ণাঙ্গ কমিটি অনুমোদিত হয়। ফলে বর্তমানে তিনি ওই সংগঠনের কোনো পদে নেই। তারপরও তাকে সেই পরিচয়ে আক্রমণ করা হচ্ছে, যা বাস্তবতার সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ নয়। শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর তিনি ক্ষমতার অপব্যবহার, দুর্নীতি, অর্থপাচার এবং প্রশাসনিক অনিয়ম নিয়ে ধারাবাহিকভাবে লিখেছেন। তিনি নিজেই বলেছেন, ক্ষমতায় থাকাকালে অনেক বিষয়ে স্বাধীনভাবে লেখা সম্ভব ছিল না। রাজনৈতিক ও আইনি বাস্তবতা তখন ভিন্ন ছিল। সরকার পরিবর্তনের পর তিনি যেসব তথ্য ও বিশ্লেষণ তুলে ধরছেন, তা তার স্বাধীন মতপ্রকাশের অংশ। সম্প্রতি মাননীয় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের আমন্ত্রণে একটি নৈশভোজে অংশগ্রহণকে কেন্দ্র করেও কিছু মহল বিতর্ক সৃষ্টি করার চেষ্টা করেছে। কিন্তু একটি রাজনৈতিক বা রাষ্ট্রীয় অনুষ্ঠানে আমন্ত্রিত অতিথি হিসেবে উপস্থিত থাকা মানেই কোনো রাজনৈতিক দলের সদস্য হওয়া নয়। গণতান্ত্রিক সমাজে ভিন্নমতের মানুষের সঙ্গে সংলাপ, মতবিনিময় কিংবা সৌজন্য সাক্ষাৎ একটি স্বাভাবিক রাজনৈতিক সংস্কৃতি। মো. কামাল উদ্দিন নিজেই স্পষ্টভাবে বলেছেন, তিনি বিতর্ক সৃষ্টি করতে চান না। ব্যক্তি বা দলকে ঘিরে অন্ধ সমর্থনের পরিবর্তে তিনি নীতিনির্ভর রাজনীতিতে বিশ্বাস করেন। দেশের গণতন্ত্র, সুশাসন, দুর্নীতিমুক্ত প্রশাসন, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা এবং রাষ্ট্র সংস্কারের যে কর্মসূচিগুলো জনগণের কল্যাণে ভূমিকা রাখবে, সেগুলোর প্রতি তিনি ইতিবাচক অবস্থান নেবেন। তিনি আরও উল্লেখ করেছেন যে, জোটের শরিক অবিশেষ গণদলের মাধ্যমে ঘোষিত রাষ্ট্র সংস্কারের ৩১ দফা বাস্তবায়নে তিনি কাজ করতে আগ্রহী। তবে সেটি কোনো ব্যক্তিপূজা বা ক্ষমতার রাজনীতির অংশ হিসেবে নয়; বরং নাগরিক দায়বদ্ধতা এবং রাষ্ট্রের উন্নয়নের প্রশ্নে।
একজন লেখক, সাংবাদিক ও গবেষকের সবচেয়ে বড় শক্তি তার স্বাধীনতা। দলীয় পদ-পদবি অনেক সময় সেই স্বাধীনতাকে সীমাবদ্ধ করে দেয়। কামাল উদ্দিন নিজেও স্বীকার করেছেন যে, সাংবাদিকদের সক্রিয় দলীয় পদে থাকা অনেক ক্ষেত্রে বিতর্ক সৃষ্টি করে এবং নিরপেক্ষতার প্রশ্ন তোলে। তাই ভবিষ্যতে তিনি লেখালেখি, গবেষণা, সামাজিক আন্দোলন এবং জনস্বার্থ সংশ্লিষ্ট কাজকে অধিক গুরুত্ব দিতে চান। বর্তমান সময়ে বাংলাদেশে রাজনৈতিক সহনশীলতা আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে বেশি প্রয়োজন। মতের ভিন্নতা থাকতেই পারে, কিন্তু মিথ্যা প্রচার, অপবাদ ও চরিত্রহনন কোনো গণতান্ত্রিক সংস্কৃতির অংশ হতে পারে না। একজন মানুষের কয়েক দশকের কর্মজীবনকে একটি মাত্র রাজনৈতিক ঘটনার মধ্যে সীমাবদ্ধ করে বিচার করাও ন্যায়সঙ্গত নয়।
মো. কামাল উদ্দিনের দীর্ঘ পথচলা প্রমাণ করে, তিনি কখনো ছাত্ররাজনীতির কর্মী, কখনো সামাজিক আন্দোলনের সংগঠক, কখনো গবেষক, কখনো সাংবাদিক, আবার কখনো ইতিহাস অনুসন্ধানী লেখক হিসেবে কাজ করেছেন। তার লেখায় যেমন বঙ্গবন্ধু আছেন, তেমনি জিয়াউর রহমানও আছেন; যেমন শেখ হাসিনার ইতিবাচক কাজের মূল্যায়ন আছে, তেমনি তার সরকারের সমালোচনাও আছে। এটাই একজন স্বাধীন লেখকের পরিচয়। ইতিহাস শেষ পর্যন্ত দলীয় প্রচারণা দিয়ে নয়, সত্য, তথ্য ও সময়ের নিরপেক্ষ বিচারে মূল্যায়িত হয়। তাই ব্যক্তিকে নয়, তার বক্তব্য ও কাজকে তথ্য-প্রমাণের আলোকে বিচার করাই হবে একটি সুস্থ গণতান্ত্রিক সমাজের বৈশিষ্ট্য।