
-মো.কামাল উদ্দিনঃ
আজকের এই দিনে জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা ও কৃতজ্ঞতা রেখেই এই ছোট্ট লেখায় বসা। এটি কোনো রাজনৈতিক পক্ষ নেওয়ার লেখা নয়, কোনো উত্তেজনামূলক বক্তব্যও নয়। একজন সাংবাদিক ও লেখক হিসেবে ইতিহাসের দায়, বিবেকের ডাক এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের প্রতি দায়িত্ববোধ থেকেই এই নিরপেক্ষ কথাগুলো তুলে ধরার চেষ্টা।
সম্প্রতি একটি সংবাদ আমাকে ব্যথিত করেছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নামে যে ছাত্রাবাস বা হলটি রয়েছে, তার নাম পরিবর্তন করে শহীদ ওসমান হাদী হল করার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। প্রথমেই স্পষ্ট করে বলা প্রয়োজন—ওসমান হাদীর নামে একটি হল হওয়া নিয়ে আমার, কিংবা সাধারণ মানুষের, কোনো আপত্তি থাকার কথা নয়। তিনি এই সময়ের আত্মপ্রতিবাদী, সাহসী তারুণ্যের এক উজ্জ্বল প্রতীক। অল্প সময়ের আন্দোলন সংগ্রামেও তিনি যে দৃঢ়তা, প্রতিবাদ আর আত্মত্যাগের দৃষ্টান্ত রেখে গেছেন, তা ইতিহাসে গুরুত্বসহকারে স্মরণ করার মতো। আমি শহীদ ওসমান হাদীর সব আন্দোলনের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। তাকে যেভাবে নির্মমভাবে হত্যা করা হয়েছে, তার নিন্দা জানানোর ভাষা সত্যিই আমার জানা নেই। এই বীর সন্তানের প্রতি সম্মান জানিয়ে, তার হত্যাকারীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবিতে আমি অতীতে একাধিক লেখা লিখেছি, তথ্যভিত্তিক ভিডিওচিত্র নির্মাণ করেছি। আজও তার বিদায়ী আত্মার প্রতি সম্মান রেখেই এই লেখা—কোনো দ্বিধা বা সংকোচ ছাড়াই। তবু প্রশ্নটি থেকে যায়—শ্রদ্ধা জানাবার পথটি কি সঠিক হচ্ছে? বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান এই দেশের জন্মের জনক। তিনি কেবল একজন রাজনৈতিক নেতা নন; তিনি একটি জাতির অস্তিত্ব, একটি মানচিত্র, একটি স্বাধীন পরিচয়ের নাম। তিনি যদি এই দেশটি আমাদের দিয়ে না যেতেন, তাহলে আজ আমরা যারা কথা বলছি, লিখছি, প্রতিবাদ করছি—এমনকি ওসমান হাদীর মতো সাহসী সন্তানের জন্মও কি এই ইতিহাসে সম্ভব হতো? এই সত্য অস্বীকার করার সুযোগ নেই। শেখ হাসিনার সরকারের বিরুদ্ধে বহু অভিযোগ রয়েছে—দমননীতি, দুর্নীতি, ক্ষমতার অপব্যবহার নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে, উঠছেও। এসব বিষয়ে বিচার হওয়া দরকার, জবাবদিহি হওয়া দরকার—এই কথায় আমি একমত। কিন্তু শেখ হাসিনা এবং বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান এক জিনিস নন। এই পার্থক্যটি স্পষ্টভাবে বোঝা জরুরি। ব্যক্তি সরকারের ভুলের দায় ইতিহাসের জনকের ওপর চাপিয়ে দিলে আমরা নিজেরাই ইতিহাসের সঙ্গে অবিচার করি। বঙ্গবন্ধুর নামে থাকা একটি হলের নাম পরিবর্তন করে অন্য এক শহীদের নামে নামকরণ—উদ্দেশ্য যতই মহৎ হোক, তা সৌন্দর্য ও ভারসাম্যের প্রশ্ন তোলে। শ্রদ্ধা কখনো প্রতিস্থাপনের মধ্য দিয়ে পূর্ণতা পায় না। এই দিনটি হয়তো আবেগের দিন, কিন্তু সময় বদলায়, প্রেক্ষাপট বদলায়। সামনে আরও দিন আসবে। তখন আজ আমরা যে সম্মান শহীদ ওসমান হাদীকে দিতে চাইছি, তা কি একইভাবে অটুট থাকবে? নাকি এই সিদ্ধান্তই একদিন নতুন বিতর্কের জন্ম দেবে? আমার আশঙ্কা এখানেই—শহীদ ওসমান হাদীকে সম্মান জানাতে গিয়ে আমরা হয়তো অজান্তেই তাকে একটি অপ্রয়োজনীয় ঐতিহাসিক দ্বন্দ্বের মুখে ঠেলে দিচ্ছি। তার নামকে স্থায়ী ও সম্মানজনক করে রাখতে হলে, তার নামে স্বতন্ত্র একটি হল, একটি প্রতিষ্ঠান, একটি স্মারক কিংবা গবেষণা কেন্দ্র প্রতিষ্ঠা করা যেত। তাতে তাকে আজীবন শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করা যেত, কোনো তুলনা বা প্রতিস্থাপনের প্রশ্ন ছাড়াই। এই কথাগুলো শহীদ ওসমান হাদীকে ছোট করার জন্য নয়। বরং তাকে ইতিহাসের আলোয় যথাযথ উচ্চতায় স্থাপন করার দায়বদ্ধতা থেকেই বলা। একই সঙ্গে একটি সতর্ক বার্তাও এখানে জরুরি—শেখ হাসিনা যে ভুলগুলো করেছেন, আজ যারা ক্ষমতায় আছেন তারা যদি সেই একই পথে হাঁটেন, তাহলে একদিন ইতিহাসের কাছে তাদেরও জবাবদিহি করতে হবে। ইতিহাস কাউকে স্থায়ী ছাড় দেয় না। একজন সাংবাদিক ও লেখক হিসেবে আমার দায়িত্ব প্রশ্ন তোলা, কিন্তু দায়িত্বশীলভাবে। বঙ্গবন্ধুকে তার প্রাপ্য ঐতিহাসিক মর্যাদায় রেখে, শহীদ ওসমান হাদীকে তার প্রাপ্য সম্মানে স্মরণ করে, ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য একটি ভারসাম্যপূর্ণ ইতিহাস রেখে যাওয়াই হোক আমাদের লক্ষ্য। সেই প্রত্যাশা ও বিবেকের তাগিদ থেকেই এই লেখা। চলুন বঙ্গবন্ধুর কিছু কথা শুনে আসি- “As a man, what concerns mankind concerns me. As a Bangalee , I am deeply involved in all that concerns Bangalees. This abiding involvement is born of and nourished by love, enduring love, which gives meaning to my politics and to my very being.” ৩ মে ১৯৭৩ সালে ব্যক্তিগত নোটবইয়ে স্বহস্তে লিখিত এবং স্বাক্ষরিত এই ইংরেজি বক্তব্যে বঙ্গবন্ধুর জীবন এবং রাজনীতির ঘোষিত লক্ষ্য বিধৃত হয়েছে। পাকিস্তানি ঔপনিবেশিক শাসনের বিরুদ্ধে দীর্ঘ দুই যুগ সফল সংগ্রামের পর এবং একটি রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের মাধ্যমে চ‚ড়ান্ত বিজয় অর্জনের পর একটি স্বাধীন, সার্বভৌম রাষ্ট্র গঠনের বন্ধুর পথ পরিক্রমায় জীবন ও রাজনীতি সর্ম্পকে বঙ্গবন্ধুর যে গভীর উপলব্ধি, তা এই অমর বাণীতে প্রতিফলিত হয়েছে। একজন মানুষ হিসেবে সমগ্র মাবনজাতিকে যা ভাবায় তাঁকেও তা ভাবিত করে। যা বাঙালিদের সাঙ্গে সর্ম্পকিত, একজন বাঙাল হিসেবে তা তাকে গভীরভাবে সম্পৃক্ত করে। আর এই নিরন্তর সম্পৃক্ততার ভালবাসা, অনি:শেষ ভালবাসা থেকে জাত এবং এর দ্বারা লালিত, যা তাঁর রাজনীতি এবং একান্ত অস্তিত্বকে অর্থপূর্ণ করে তোলে। কি অসাধারণ উপলদ্ধি! বঙ্গবন্ধুর জীবন ও রাজনীতি নিয়ে ভাবতে গেলে তারই লিখনিতে উদ্বৃত এই উপলব্ধি উল্লেখ না করলে বিষয়টি অসম্পূর্ণই থেকে যাবে। বঙ্গবন্ধুর জীবন ও রাজনীতিকে অর্থপূর্ণ করে তুলেছে দুটো জিনিস, প্রথমত বাঙালি সমাজের সাথে সম্পৃক্ততা এবং দ্বিতীয়ত, মাবনজীবনের সঙ্গে সম্পৃক্ততা। বঙ্গবন্ধু তাঁর দীর্ঘ রাজনীতির মধ্য দিয়ে ইতিহাসের গতিপথ পরিবর্তন করেন, বিশ্বমানচিত্রে একটি নতুন দেশ সংযুক্ত করেন এবং বাঙালিদের জন্য একটি জাতি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করেন। একটি পতাকা দেন। একটি জাতীয় সংগীত দেন। বাংলাদেশ নামটিও বঙ্গবন্ধুর দেয়া। ১৯৬৯ সালের ৫ ডিসেম্বর এক জনসমাবেশে বঙ্গবন্ধু পূর্ব বাংলাকে বাংলাদেশ হিসেবে ঘোষণা দেন। বাঙালিরা বস্তুত কখনোই স্বাধীন ছিলো না। বং থেকে বাংলা কিংবা গঙ্গারিদ্দি থেকে বাংলাদেশের দীর্ঘ রাজনৈতিক ইতিহাস ঘাটলে দেখা যাবে প্রকৃত অর্থে স্বাধীনতা বঙ্গবন্ধুর হাত ধরে একাত্তরের ২৬ মার্চেই এসেছে। বিশ্ব কবির সোনার বাংলা, নজরুলের বাংলাদেশ এবং জীবনানন্দের রূপসী বাংলাকে এক মূর্তিমান প্রজাতন্ত্র হিসেবে অত্মপ্রকাশ করান বঙ্গবন্ধু। কবিদের কাব্যিক স্বপ্নকে রাজনৈতিক বাস্তবতা দেন বঙ্গবন্ধু। কোটি বাঙালির সহস্র বছরের স্বপ্ন যেন মুহূর্তেই সত্য হয়ে ওঠে যখন ৭ মার্চ রেসকোর্সের জনসমুদ্রে গর্জে ওঠেন মুজিব “ এবারের সংগ্রাম, আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম।” বাংলা ভাষায় সকল কবিতা, শত কোটি মানুষের দীর্ঘ লালিত বাসনা একটি বজ্রকন্ঠে উচ্চারিত হয়, একটি তর্জনীতে নির্দেশিত হয়। মানুষটি হয়ে ওঠেন রাজনীতির কবি (Poet of politics)। যথার্থই বলেছেন উনিশ শতকের মার্কিন কবি এমারসন, ভাষাই শক্তি, ভাষা প্রভাবিত করে, ভাষা পরিবর্তিত করে, ভাষা বাধ্য করে। বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ভাষা সাড়ে সাত কোটি মানুষকে প্রভাবিত করেছে মুক্তির সংগ্রামে, স্বাধীনতার সংগ্রামে। সাড়ে সাত কোটি নিরীহ নিরস্ত্র মানুষকে রূপান্তরিত করে সাহসী যোদ্ধা করেছে এবং বাধ্য করেছে স্বাধীনতা সূর্য ছিনিয়ে আনতে। সেই ভাষা হয়ে উঠেছে বাঙালির শ্রেষ্ট কবিতা- এবং তার স্বীকৃতি স্বরূপ ইন্টারন্যাশনাল নিউজউইক ম্যাগাজিন তার ৫ এপ্রিল ১৯৭১ সংখ্যার প্রচ্ছদ কাহিনীতে বঙ্গবন্ধুকে ‘Poet of politics’ হিসেবে আখ্যায়িত করে। এটাই বঙ্গবন্ধুর রাজনীতি। তাঁর মানুষের রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, সাংস্কৃতিক ভাষা বোঝা এবং নিজের ভিতরে ধারণ করে সময়মতো প্রকাশ করা। আর এটা সম্ভব হয়েছে মানুষের প্রতি তাঁর প্রবল ভালোবাসা থেকে। ১৯৭২ সালের ১৮ জানুয়ারি প্রখ্যাত ইংরেজ সাংবাদিক ডেভিড ফ্রস্টের সাথে এক আলাপচারিতায় ফ্রস্ট বঙ্গবন্ধুর যোগ্যতা কি জানতে চাইলে তিনি তাৎক্ষনিকভাবে বলেন তিনি তাঁর জনগণকে ভালোবাসেন এবং পরের প্রশ্নে তাঁর অযোগ্যতা কি জানতে চাইলে স্মিত হাস্যে বলেন তিনি তাঁর জনগণকে অনেক বেশি ভালোবাসেন। বঙ্গবন্ধু অগণিত মানুষের নাম মনে রাখতেন অবলীলায়। তাঁর রাজনীতি মানুষকে নিয়ে, মানুষের দ্বারা এবং মানুষের জন্য। বঙ্গবন্ধু গণমানুষের রাজনীতিবিদ। গ্রীক দার্শনিক প্রোটাগোরাস বলেছিলেন “মানুষই সবকিছুর মাপকাঠি”। মধ্যযুগের বাঙালি কবি চন্ডীদাশের কাব্যে ফুটে উঠেছে “সবার উপরে মানুষ সত্য তাহার উপরে নাই”। বউল সম্রাট লালন ফকির তো সতর্ক বার্তা উচ্চারণ করেছেন “মানুষ ছাড়া ক্ষ্যাপারে তুই মূল হারাবি, মানুষ ভজলে সোনার মানুষ হবি।” বঙ্গবন্ধু তাঁর রাজনীতিতে মানুষকেই সবকিছুর মাপকাঠি হিসেবে বিবেচনা করেছেন; সবার উপরে মানুষকে সত্য হিসেবে জ্ঞান করেছেন এবং মানবসেবার মধ্যে দিয়ে নিজে সোনার মানুষ হয়ে উঠেছেন এবং সোনার বাংলা গড়ে তোলার চেষ্টা করেছেন। বঙ্গবন্ধুর রাজনীতির সবচাইতে উল্লেখযোগ্য দিক হলো তাঁর নেতৃত্ব। বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্ব ছিলো সিংহের মতো সাহসী। আয়ুব-ইয়াহিয়া জান্তা সাড়ে সাত কোটি বাঙালিকে ভয় পেতেন কারন তাদের নেতা ছিলেন শেখ মুজিব। ১৯৪৮-এর স্বাধীকার আন্দোলন থেকে ১৯৭১-এর স্বাধীনতা যুদ্ধ পর্যন্ত দীর্ঘ ২৩ বছর পাকিস্তান গোয়েন্দা সংস্থা কতৃক সংরক্ষিত ৪৭ টি ব্যক্তিগত নথি সূত্রে জানা যায়, এই সময় গোয়েন্দা সংস্থাটিকে প্রায় প্রতিদিন শেখ মুজিবের গতিবিধি পর্যবেক্ষন করতে হয়েছে। বস্তুত মুজিব একাই একটি পরাক্রমশালী রাষ্ট্রযন্ত্রকে তটস্থ করে রাখতেন। প্রধানমন্ত্রী জননেত্রী শেখ হাসিনা সম্পাদিত “Secret Documents of Intelligence Branch of Father of the Nation Bangabandhu Sheikh Mujibur Rahman ” শীর্ষক ১৪ খন্ডের সংকলটি পূর্ণাঙ্গ প্রকাশিত হলে বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্ব, জনমনে তাঁর প্রভাব এবং পশ্চিম পাকিস্তান সরকারের ওপর তার প্রতিক্রিয়ার নানামাত্রিক দিক ফুটে উঠবে। বস্তুত স্বাধীকার থেকে স্বাধীনতার পুরো সময়টা জুড়েই বঙ্গবন্ধু সর্বাধিক দায় এবং দক্ষতার সাথে নেতৃত্ব দিয়েছেন বাঙালি জাতিকে। বঙ্গবন্ধু বায়ান্নর ভাষা আন্দোলনের অন্যতম সংগঠক; বাষট্টির গণতান্ত্রিক আন্দোলনের অগ্রদূত; ছেষট্টির ছয়-দফা আন্দোলনের প্রধান পুরোহিত; উনসত্তুরের গণ অভ্যুত্থানের প্রাণপুরুষ; সত্তুরের নির্বাচনের নিরঙ্কুশ বিজেতা এবং সর্বোপরি একাত্তরের মহান মুক্তিযুদ্ধের মহানায়ক এবং স্বাধীন ও সার্বভৌম বাংলাদেশের স্থপতি, বাঙালির অবিসংবাদিত নেতা। তাঁর তুলনা বাংলাদেশের ইতিহাসে খুঁজে পাওয়া দুস্কর। তাঁর অগ্রজ রাজনীতিকেরা যেমন হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী, আবুল কাসেম ফজলুল হক, মওলানা ভাসানী বাঙ্গলার মানুষের মুক্তির জন্য রাজনীতি করেছেন বটে, কিন্তু একটি জাতিরাষ্ট্র সৃষ্টির সংগ্রামে একক রাজনৈতিক কতৃত্ব প্রতিষ্ঠার ঐতিহাসিক সুযোগ পাননি। তাই বঙ্গবন্ধুর সমকক্ষতা এদেশের ইতিহাসে দুর্লক্ষ্য। তাঁকে খুঁজে পাওয়া যেতে পারে, আমেরিকার আব্রাহাম লিংকনের মাঝে; রাশিয়ার লেনিনের মাঝে; ইংল্যান্ডের চার্চিল কিংবা ফ্রান্সের দ্য গলের মাঝে; চীনের মাও সে তুং কিংবা ভিয়েতনামে হো চি মিনের মাঝে; ইন্দোনেশিয়ার সুকর্নো কিংবা তুরস্কের কামাল আতাতুর্কের মাঝে; দক্ষিন অফ্রিকার নেলসন ম্যান্ডেলার মাঝে; কঙ্গোর প্যাট্রিস লুমুম্বা কিংবা কেনিয়ার জোমো কেনিয়াত্তার মাঝে; আলজেরিয়ার বেনবেল্লা কিংবা কিউবার ফিদেল কাস্ত্রোর মাঝে; কিংবা ভারতের মহাত্মা গান্ধীর মাঝে। বঙ্গবন্ধু একটি প্রজাতন্ত্রের মহান স্থপতি। একজন সফল রাষ্ট্রনায়ক। বঙ্গবন্ধু একজন জন্ম রাজনীতিবিদ। রাজনীতি তাঁর রক্তের সাথে মিশে থাকা এক সত্ত¡ার নাম। শৈশবকাল থেকেই তিনি অন্যায়ের প্রতিবাদ করতেন এবং রাজনীতি বলতে যদি অন্যায়ের প্রতিবাদ করা, সহপাঠীদের প্রতি দায়িত্ববোধ বোঝায় তাহলে স্কুল জীবনেই তাঁর রাজনীতির হাতেখড়ি বলতে হয়। ১৯৩৭ সালে যখন গোপালগঞ্জ মিশন স্কুলে ভর্তি হন, তখন মুসলিম এবং দলিত সম্প্রদায়ের ছাত্ররা সামনের বেঞ্চে বসতে পারতো না। মুজিব স্কুল জীবনের প্রথম দিনেই সেই জাতিভেদ প্রথাকে অগ্রাহ্য করে সামনের বেঞ্চে বসেন। সকলের চক্ষু চড়কগাছ হয়। কিন্তু মুজিবের মনোবল এবং যৌক্তিক তেজ দেখে শ্রেণি শিক্ষক গিরিশ বাবু ঘটনাটিকে চেপে যান। ১৯৩৮ সালে অবিভক্ত বাংলার প্রধানমন্ত্রী শেরে বাংলা একে ফজলুল হক এবং শ্রমমন্ত্রী হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী গোপালগঞ্জ পরিদর্শনে গেলে নবম শ্রেণির ছাত্র মুজিব স্বেচ্ছাসেবকদের প্রধান হিসেবে তাঁদের সাথে সাক্ষাত করেন এবং স্কুল ভবনের ছাদ চুঁইয়ে জল পড়ার ব্যাপারটি নজরে এনে সমাধান আদায় করেন। বাংলার ওই দুই রাজনৈতিক দিকপালের সাথে পরিচয় মুজিবের রাজনৈতিক জীবনের মাইলফলক হয়ে ওঠে। ব্রিটিশ আমলে ছাত্র রাজনীতি জাতীয় রাজনীতির সাথে ঘনিষ্ট সর্ম্পকযুক্ত ছিলো। সে সময়ে সকল মুসলিম ছাত্রই নিখিল ভারত মুসলিম ছাত্রলীগের সাথে যুক্ত ছিলেন। হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীর উৎসাহে মুজিব ১৯৪০ সালে মুসলিম লীগের ছাত্র সংগঠন নিখিল ভারত ছাত্র ফেডারেশনে যোগদান করেন। ১৯৪৩ সালে সেই উগ্রপন্থি সংগঠন পরিত্যাগ করে তিনি উদারনৈতিক প্রগতিশীল সংগঠন বেঙ্গল মুসলিম লীগে যোগদান করেন। এ সময়ে সোহরাওয়ার্দীর সাথে তার ঘনিষ্টতা বাড়ে এবং তিনি তার নিকট থেকে রাজনৈতিক দীক্ষা লাভ করেন। ১৯৪৯ সালে তিনি মুসলিম লীগ পরিত্যাগ করে হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী এবং মওলানা ভাসানীর সাথে আওয়ামী মুসলিম লীগ প্রতিষ্ঠা করেন এবং নিজে প্রথম যুগ্ম সম্পাদক হন। ১৯৫৩ সালে সাধারণ সম্পাদক হন। ১৯৬৩ সালে সোহরাওয়ার্দীর মৃত্যুর পর পার্টির হাল ধরেন। তিনি আয়ুব খানের ব্যাসিক ডেমোক্রেসির ঘোরতর বিরোধী ছিলেন। ১৯৬৬ সালে লাহোরে বিরোধী দলের জাতীয় সম্মেলনে ঐতিহাসিক ৬ দফা প্রস্তাব পেশ করেন । বস্তুত, ঐ ৬ দফাই পূর্ব পাকিস্তানের স্বায়ত্বশাসনের রূপরেখা এবং এর ভেতরেই একাত্তরের স্বাধীনতার বীজও নিহিত ছিলো। ৬ দফার প্রতি প্রভূত গণসমর্থনে ভীত হয়ে আয়ুব খান মুজিবকে এক নম্বর আসামী করে আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা করে। এতে আগুনে ঘৃতাহুতি হয় । আন্দোলন দাবানলের মতো ছাড়িয়ে পড়লে সরকার মুজিবকে মুক্তি দিতে বাধ্য হয়। ১৯৬৯ সালের ২৩ ফেব্রæয়ারি ঢাকা রেসকোর্স ময়দানে এক উত্তাল জনসমুদ্রে সদ্য কারামুক্ত নেতা মুজিবকে গণসংবর্ধনা দেয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংগাম পরিষদ। লক্ষ জনতার এই সমাবেশে মুজিবকে ‘বঙ্গবন্ধু’ উপাধি দেয়া হয়। এই উপাধি তাঁর তুঙ্গস্পর্শী জনপ্রিয়তার এক ঐতিহাসিক স্বীকৃতি। ১৯৭০ সালের ৭ ডিসেম্বর অনুষ্ঠিত সাধারণ নির্বাচনে বঙ্গবন্ধুর গণমুখী রাজনীতির পরম বিজয় সাধিত হয়। বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ তৎকালিন পূর্ব পাকিস্তানের জাতীয় পরিষদের ১৬৯ টি আসনের মধ্যে ১৬৭ এবং প্রাদেশিক পরিষদের ৩১০ টি আসনের মধ্যে ৩০৫টিতে জয়লাভ করে। কিন্তু কায়েমী পশ্চিম পাকিস্তান জনপ্রতিনিধির হাতে ক্ষমতা হস্তান্তরে গড়িমসি করলে বঙ্গবন্ধুর দ্রোহী রাজনীতির সূচনা হয়। চ‚ড়ান্ত স্বাধীনতার লক্ষ্যে ধাবিত মুজিব বিপ্লবের ডাক দেন দেশ ও জাতির অনিবার্য প্রয়োজনে। বঙ্গবন্ধুর রাজনৈতিক আদর্শের দুটো দিক এখানে প্রণিধানযোগ্য। একটি হলো- শান্তিপূর্ন অহিংস প্রতিবাদের (Civil Disobedience) মধ্য দিয়ে যৌক্তিক দাবি বাস্তবায়ন করা এবং দ্বিতীয়টি হলো- আক্রান্ত হলে প্রতিহত করা (Resistance) । বঙ্গবন্ধু মূলত মহাত্মা গান্ধির অহিংস আন্দোলনের দ্বারা গভীরভাবে অনুপ্রাণিত ছিলেন । আবার আক্রান্ত হলে নেতাজি সুভাস বোসের রণনীতি গ্রহণেও দ্বিধা করেন নি। নেতাজী বলতেন “তুম মুঝে খুন দো, ম্যাঁয় তুমহো আজাদি দুঙ্গা।” বঙ্গবন্ধু বলেছেন “রক্ত যখন দিয়েছি রক্ত আরো দেবো, এ দেশের মানুষকে মুক্ত করে ছাড়ব- ইনশাল্লাহ্।” যে মুজিবকে আমরা শান্তির দূত হিসেবে দেখি, যিনি বলেন “যদি কেউ ন্যায্য কথা বলে , আমরা সংখ্যায় বেশি হলেও , একজনও যদি সে হয়, তাঁর ন্যায্য কথা আমরা মেনে নেবো।”৭ মার্চের রেসকোর্স ভাষণ সেই মুজিবকেই আবার প্রয়োজনে রণহুংকার দিতে দেখি, “প্রত্যেক ঘরে ঘরে দূর্গ গড়ে তোল। তোমাদের যা কিছু আছে তাই নিয়ে শত্রুর মোকাবেলা করহে হবে।… আমরা ভাতে মারবো। আমরা পানিতে মারবো।” [প্রাগুক্ত] মুজিবের একদিকে যেমন গান্ধীর অহিংসবাদ অন্যদিকে তেমনি লেনিন , মাও সে তুংয়ের বিপ্লবী চেতনা। বঙ্গবন্ধুর রাজনীতি পল্লী বাংলার পলিমাটির মতো। প্রয়োজনে কাদার মতো নরম ও কোমল আবার প্রয়োজনে পাথরের মতো শক্ত। তবে তাঁর রাজনীতি সর্বদা ধাবিত হয়েছে দেশ ও মানুষের মুক্তির প্রয়োজনে। বঙ্গবন্ধুর রাজনীতির একটি অগ্রগণ্য বিষয় হলো- তাঁর সেক্যুলার দৃষ্টিভঙ্গি। বাঙালি মুসলিম সমাজে জন্ম এবং বেড়ে ওঠার কারণে মুসলিম লীগের রাজনীতির মধ্য দিয়ে যাত্রারম্ভ হলেও কালক্রমে তিনি পূর্ব বাংলার মানুষের সহস্র বছরের অসাম্প্রদায়িক ঐতিহ্যের ধারাকে তার রাজনীতির সাথে একাত্ম করে তোলেন এবং মুসলিম লীগ থেকে আওয়ামী মুসলিম লীগ এবং তারপর সম্পূর্ণ সেক্যুলার আওয়ামী লীগে উন্নীত হন। সোহরাওয়ার্দী শেষ পর্যন্ত তাঁর সাথে সংযুক্ত থাকলেও মওলানা ভাসানী থাকতে পারেন নাই এবং এক সময় ছিটকে পড়েছেন বাংলাদেশের অভ্যুদয়ের অনুকূলের রাজনৈতিক মূলধারা থেকে। জাতি-ধর্ম-বর্ণ-গোত্র নির্বিশেষে বাংলাদেশের মানুষ যে তথাকথিত দ্বিজাতি তত্ত্বের বেড়াজালে আবদ্ধ একটি মধ্যযুগীয় ধর্মরাষ্ট্র ভেঙ্গে একটি আধুনিক, প্রগতিশীল, অসম্প্রদায়িক রাষ্ট্র গঠনের জন্য একটি শক্তিশালী জনমত (Public opinion) এবং রাজনৈতিক ইচ্ছা (Political will) লালন করতেন তা সবচাইতে বেশি উপলব্ধি করেছেন বঙ্গবন্ধু এবং সেই গণ-ইচ্ছার বাস্তবায়ন ঘটানোই ছিলো তাঁর রাজনৈতিক মূল লক্ষ্য। হেগেল যেমন ফরাসী বিপ্লবকে ‘আধুনিক যুগের এক রাজনৈতিক জন্ম’ (The political birth of the modern era) হিসেবে মনে করতেন- যার পেছনে কাজ করেছে একটি শক্তিশালী জনমত ও একটি রাজনৈতিক ইচ্ছা- বাংলাদেশের অভ্যুদয়ও তেমনি একটি প্রচণ্ড শক্তিশালী জনমতের রাজনৈতিক বিস্ফোরন। বঙ্গবন্ধুর রাজনীতির মূলও এই শক্তিশালী জনমত এবং রাজনৈতিক ইচ্ছার বহি:প্রকাশ। বঙ্গবন্ধুর রাজনৈতিক দর্শনের আরেক পরিচয় মেলে স্বাধীন-সার্বভৌম বাংলাদেশের সংবিধান রচনার মধ্যে। বাঙালি জাতীয়তাবাদ, গণতন্ত্র, সমাজতন্ত্র এবং ধর্মনিরেপক্ষতার মূল স্তম্ভের ওপর তিনি প্রতিষ্ঠিত করতে চেয়েছেন তাঁর সৃষ্ট জাতি রাষ্ট্র। দেশের সর্বোচ্চ আইন হিসেবে সংবিধান প্রণয়নের মধ্যে তাঁর রাজনৈতিক দূরদৃষ্টির পরিচয় মেলে। বঙ্গবন্ধু আজীবন রাজনীতি করে গেছেন বঙালি জাতিয়তাবাদকে প্রতিষ্ঠিত করার জন্য। বাঙালির অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য। বাংলা ভাষা ও বাঙালি সংস্কৃতির অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য। বাঙালির মাতৃভাষার অধিকার কেড়ে নিয়ে যারা উর্দু