
–মো.কামাল উদ্দিনঃ
আনোয়ারার আকাশে যখন ভোরের প্রথম আলো ফোটে, তখন সেই আলোর সঙ্গে যেন মিশে থাকে এক মানুষের কর্মপ্রভা— নিঃশব্দে, অহংকারহীন দৃঢ়তায় যিনি মানুষের জন্য কাজ করে যাচ্ছেন দিনের পর দিন, বছর ধরে— তিনি আসরাফ সিকদার। একজন সফল ব্যবসায়ী, সমাজ উন্নয়নকর্মী, শিক্ষাপ্রেমী এবং মানবতার অনন্য প্রতীক। আনোয়ারা উপজেলার বরুমছড়া গ্রামের ঐতিহ্যবাহী সিকদার গোষ্ঠীর এই সন্তান যেমন জমিদার পরিবারের উত্তরসূরি, তেমনি দানশীলতার উত্তরাধিকারেরও বাহক। তার রক্তে মিশে আছে দায়িত্ববোধের উষ্ণতা, বংশের গৌরবের ধারাবাহিকতা এবং মানুষের প্রতি অকৃত্রিম ভালোবাসা। দান ও সেবার আলোকবর্তিকা মানুষের মধ্যে দু’ধরনের মন থাকে— একদল চায় নিতে, আরেকদল বাঁচে শুধু দিতে জানে। আসরাফ সিকদার দ্বিতীয় দলের একজন;ন্নার চুলা— আর সেই চুলার আগুনে জ্বালানি জোগান দেন নীরবে আশরাফ সিকদার। তিনি প্রতিষ্ঠা করেছেন “জাফর আয়েশা ফাউন্ডেশন”—একটি প্রতিষ্ঠান, যার প্রতিটি কর্মকাণ্ডে প্রতিফলিত হয় তার মানবপ্রেম। অসহায়, অনাহারী, গৃহহীন মানুষদের জন্য এই ফাউন্ডেশন যেন এক আলোর দিশারি। এই ফাউন্ডেশনের মা যিনি কখনও প্রতিদান চান না, বরং আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য নিজের সময়, অর্থ, পরিশ্রম—সব উজাড় করে দেন সমাজের কল্যাণে। রাতের নিস্তব্ধ অন্ধকারে যখন শহর ঘুমায়, তখন কোনো এক দরিদ্রের ঘরে হয়তো জ্বলে ওঠে রাধ্যমে শত শত পরিবারের আহার জোটে, অসংখ্য ছাত্রছাত্রী পায় শিক্ষার সুযোগ, এবং সমাজের পিছিয়ে পড়া মানুষগুলো ফিরে পায় বেঁচে থাকার আস্থা। এই প্রতিষ্ঠানটি তার মা-বাবা—জাফর সাহেব ও আয়েশা বেগম—এর স্মৃতিকে অমর করে রেখেছে।
তিনি যে শুধু নাম নয়, কাজের মধ্য দিয়ে বাবা-মাকে শ্রদ্ধা করেন— সেই প্রমাণ এ ফাউন্ডেশন তার জীবনের অন্যতম বড় অর্জন। শিক্ষা ও সমাজ উন্নয়নে নিবেদিত প্রাণ আসরাফ সিকদার দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করেন, একটি জাতির উন্নয়ন শুরু হয় শিক্ষার আলো থেকে। তাই তিনি নিজের এলাকায় স্থাপন করেছেন বহু স্কুল ও মাদ্রাসা। তার আর্থিক সহায়তা, দিকনির্দেশনা ও নেতৃত্বে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো দাঁড়িয়ে গেছে গ্রামের মানুষের আশার কেন্দ্র হয়ে। যেখানে একসময় শিশুরা অন্ধকারে ছিল, আজ সেখানে বইয়ের পাতা জ্বলজ্বল করছে আলোর মতো। এমনকি স্থানীয় হাসপাতাল, রাস্তাঘাট কিংবা ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান— সব জায়গাতেই রয়েছে তার স্পর্শ। তিনি জানেন, সমাজকে এগিয়ে নিতে হলে একক কোনো কাজ নয়, বরং সবার জন্য একটি সমন্বিত কল্যাণব্যবস্থা গড়ে তুলতে হয়। রাজনৈতিক বিশ্বাস ও আদর্শের উত্তরাধিকার আসরাফ সিকদার কেবল সমাজকর্মী বা ব্যবসায়ীই নন, তিনি একজন আদর্শনিষ্ঠ রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বও। শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের আদর্শে তিনি বিশ্বাসী, বিএনপির রাজনৈতিক দর্শনকে তিনি নিজের জীবনের নীতিমালা হিসেবে গ্রহণ করেছেন। তিনি দলের তৃণমূলের মানুষের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ, কখনও দলের কর্মীদের বিপদে পেছনে সরে যাননি— বরং সাহসিকতার সঙ্গে পাশে থেকেছেন, সহায়তা করেছেন। তার রাজনীতি ক্ষমতা বা পদবির জন্য নয়, বরং নীতির জন্য, বিশ্বাসের জন্য, দেশের জন্য। মানবতার সংসার: আশরাফ ও মুন্নি জীবনের সঙ্গী হিসেবে তিনি বেছে নিয়েছেন আরেক ঐতিহ্যবাহী রাজনৈতিক পরিবার থেকে আগত এক মহীয়সী নারীকে মুন্নি। তিনি চট্টগ্রামের আনোয়ারা উপজেলার বাঘখ্যাত, বুনিয়াদি জমিদার ও বিএনপির প্রতিষ্ঠা লগ্নের নেতা সরফরাজ খানের কন্যা। সরফরাজ খান ছিলেন শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের ঘনিষ্ঠ সহযোগী, জীবনের শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত যিনি দলের আদর্শ ধরে রেখেছিলেন দৃঢ়ভাবে। তার কন্যা মুন্নিও তেমনই দৃঢ়, অতিথিপরায়ণ, ও মানবিক গুণে ভরপুর। যেমন স্বামী, তেমন স্ত্রী—দু’জনের হৃদয়েই রয়েছে দান ও মানবতার প্রতি ভালোবাসা। তাদের পরিবার যেন এক জীবন্ত উদাহরণ—যেখানে ঐতিহ্য, রাজনীতি, মানবতা ও অতিথিপরায়ণতা একাকার হয়ে গেছে। অতিথি আপ্যায়নের খান্দানী ঐতিহ্য গত ২৩ অক্টোবর আমার সৌভাগ্য হয়েছিল বারুচড়া তাদের বাড়িতে অতিথি হয়ে যাওয়ার। গেটের উপরে লেখা— “আয়েশা জাফরের বাড়ি”। এই কয়েকটি শব্দ পড়তেই বুকের ভেতর অদ্ভুত এক শ্রদ্ধা জেগে উঠেছিল। সেই বাড়ির অভ্যর্থনা ছিল এককথায় স্বর্গীয়। যদিও আশরাফ সিকদার সেদিন উপস্থিত ছিলেন না, তার পক্ষ থেকে অতিথি আপ্যায়নের ভার নিয়েছিলেন তার সহধর্মিণী মুন্নি। অর্ধশতাধিক পদে সাজানো ভাতের আয়োজনে ছিল দেশের নানা অঞ্চলের স্বাদ। মাছ, মাংস, ভর্তা, সবজি—একটির পর একটি পরিবেশন হচ্ছিল, আর আমরা অবাক হয়ে যাচ্ছিলাম তাদের আতিথেয়তায়। পরে শুনলাম, আশরাফ সিকদার নাকি আফসোস করে বলেছেন— “মাছের আইটেম নাকি কম হয়েছে!” এই কথাই প্রমাণ করে, তিনি কেবল সফল মানুষ নন, বরং হৃদয়বান, মিষ্টভাষী, অতিথিপরায়ণ এক প্রকৃত বাঙালি। নম্রতায় মহত্ত্ব জীবনের বড় পরিচয় ধন-সম্পদ নয়, বরং মানুষ কতটা বিনয়ী—সেইটাই বলে দেয় তার মহত্ত্বের পরিমাণ। আসরাফ সিকদারের মধ্যে সেই বিনয় যেন সহজাত। তিনি নামের জন্য কাজ করেন না, বরং কাজের মধ্য দিয়েই নাম অর্জন করেছেন। তার এই নীরব দান, নিঃস্বার্থ সেবা, আর সমাজের প্রতি দায়িত্ববোধই তাকে মানুষ হিসেবে অন্যদের থেকে আলাদা করেছে। সমাজের কান্ডারি আজকের পৃথিবীতে যেখানে অনেকেই বৃদ্ধ মা-বাবাকে বৃদ্ধাশ্রমে পাঠিয়ে দেয়, সেখানে আশরাফ সিকদার নিজের মা-বাবার নামে বাড়ির নামকরণ করেছেন— তাদের স্মৃতিকে বাঁচিয়ে রেখেছেন সমাজকল্যাণমূলক কাজের মাধ্যমে। তার মতো সন্তানরাই সমাজের জন্য গৌরব, দেশের জন্য আশীর্বাদ।তিনি যেন আনোয়ারার এক “দুর্দিনের কান্ডারি”— মানুষের বিপদে, সমাজের সংকটে, সবসময় এগিয়ে আসেন প্রথম সারিতে। তার কাজ, তার নীরব সেবা, তার দানশীলতা— সব মিলিয়ে তিনি হয়ে উঠেছেন আনোয়ারার অহংকার, এবং বাংলাদেশের মানবতার এক উজ্জ্বল প্রতীক। একজন মানুষ কতটা বড়— তা তার উচ্চতায় নয়, বরং অন্যের জীবনে তার প্রভাবের গভীরতায় মাপা যায়। আসরাফ সিকদারের জীবনের প্রতিটি অধ্যায় সেই প্রভাবের সাক্ষ্য দেয়। তিনি নিজের পরিবার, সমাজ, রাজনীতি, ব্যবসা—সবকিছু সামঞ্জস্য রেখে এগিয়ে যাচ্ছেন দৃঢ় পায়ে, মানবতার আলোয় আলোকিত এক ভবিষ্যতের দিকে। তিনি কেবল একজন ব্যবসায়ী নন, তিনি একজন আলোকিত মানুষ, যার ছায়ায় আশ্রয় নেয় অসংখ্য জীবন,যার কর্মে মেলে মানবতার মানচিত্র। আনোয়ারার মাটিতে এমন মানুষদের কারণেই এখনো মানবতার আলো নিভে যায়নি—আর সেই আলোর নাম—
আসরাফ সিকদার।