“সুফিয়া কামাল: আগুনের ভেতর দিয়ে হাঁটা এক আলোকমানবী-

By admin
5 Min Read

মো. কামাল উদ্দীনঃ
২০ নভেম্বর। বাংলার ইতিহাসের বুকে আজও এই দিনটি এক অদৃশ্য শোকধ্বনি হয়ে বাজে। কারণ এদিনেই বিদায় নিয়েছিলেন আমাদের প্রিয় কবি সুফিয়া কামাল— এক নারী, যিনি ছিলেন না শুধু কবি; ছিলেন সাহসের প্রতিমা, মানবতার পথরেখা, সংগ্রামের নক্ষত্র, আর বাঙালি জাতির অন্যতম বিবেকভূষণ।আমি সাংবাদিকতার প্রথম দিন থেকেই তাঁর ভাষা, তাঁর আদর্শ, তাঁর সংগ্রামের গল্প বহুবার লিখেছি। পরে শিক্ষকতার সময়েও তাঁর বই, তাঁর কবিতা, তাঁর প্রবন্ধকে তুলে ধরেছি শ্রেণিকক্ষের তরুণ মনগুলোর কাছে। আজ, বহু বছর পর আবারও তাঁকে নিয়ে লেখার সুযোগ— একদিকে সম্মান, অন্যদিকে ভয়। কারণ সুফিয়া কামালের মতো মহীয়সীকে নিয়ে কলম ধরার অবয়ব দাঁড়ায় না; সব শব্দই যেন ক্ষুদ্র হয়ে পড়ে তাঁর মহত্ত্বের কাছে। কিন্তু তবুও লিখছি—শ্রদ্ধায়, ভালোবাসায়, বিস্ময়ে, এবং একান্ত কর্তব্যবোধে। ১৯১১ সালের শায়েস্তাবাদ— একটি ঘর, যেখানে বাংলা ভাষার উচ্চারণও নিষিদ্ধ; নারীশিক্ষা ‘বিলাসিতা’, আর মেয়েদের জীবন শুধু আড়াল আর অন্দরমহলের সীমায় আবদ্ধ। সেই পরিবেশেই জন্ম নিলেন সুফিয়া কামাল। তিনি পরে লিখেছিলেন— “অন্ধকারে জন্ম হলেও আলো আসবেই— বিশ্বাস ছিল আমার।” বাবার অনুপস্থিতি, মাতৃকুলের কঠোর নিয়ম, উর্দুভাষী নবাব বাড়ির দেয়াল— সবকিছুর ভেতর দিয়ে তিনি নিজের জন্য খুলে নিলেন বইয়ের আলোকজগৎ। মামার বিশাল গ্রন্থাগার হয়ে উঠল তাঁর স্বশিক্ষার প্রথম বিশ্ববিদ্যালয়। এ কারণেই তিনি বলেছিলেন— “শিক্ষা আমাকে কেউ দেয়নি; শিক্ষা আমি নিজের কাছে চেয়েছি।” মাত্র ১৩ বছরে বিয়ে। কিন্তু নিয়তির আশ্চর্য মমতা— তাঁর স্বামী ছিলেন আধুনিকমনস্ক। তিনি না থাকলে হয়তো আমরা কখনো সুফিয়া কামালকে পেতাম না সাহিত্য-সংগ্রামের অগ্রসেনানী হিসেবে। কলকাতায় গিয়ে তাঁর সাক্ষাৎ হলো আরেক সূর্যের সঙ্গে— বেগম রোকেয়া সাখাওয়াত হোসেন। সেই সাক্ষাৎ যেন তাঁর ভেতরের ঘুমন্ত শক্তিকে জাগিয়ে দিল আগ্নেয়গিরির মতো। রোকেয়া শুধু তাঁর প্রেরণা নন, তাঁর আদর্শ, তাঁর সংগ্রামের নকশা, তাঁর জীবনব্যাপী এক আলোকদিশারী। তিনি রোকেয়ার পথ অনুসরণ করে বলেছিলেন— “নারীর মুক্তি মানে শুধু নারী নয়, সমগ্র সমাজের মুক্তি।” ১৯২৬ সালে ‘বাসন্তী’ প্রকাশের পর বাংলা সাহিত্য থমকে দাঁড়ায়। এত কোমল ভাষায় এত দৃঢ় অভিব্যক্তি— খুব কমই এসেছে নারীর কলম থেকে। পরের বছরগুলোয় একে একে প্রকাশিত হলো: সাঁঝের মায়া,মায়া কাজল,উদাত্ত পৃথিবী
অভিযাত্রিক,মৃত্তিকার ঘ্রাণ,প্রশস্তি ও প্রার্থনা প্রতিটি বই যেন জীবনের এক একটি নতুন আয়োজন, সংগ্রামের নতুন সুর, মমতার অভূতপূর্ব জগৎ। নজরুল তাঁর কাব্যের মুখবন্ধ লিখলেন, রবীন্দ্রনাথ প্রশংসা করলেন— এ যেন বাংলা সাহিত্যে এক ইতিহাস।
কিন্তু তিনি কখনো অহংকারে ডুবলেন না।  কারণ তিনি জানতেন— “সাহিত্য যদি মানুষের পাশে না দাঁড়ায়, তবে তা কেবলই শব্দের পোশাক।” ঢাকায় এসে ১৯৫২ সালে তিনি নারীদের মিছিলে দাঁড়ালেন সামনের সারিতে। প্রতিটি শ্লোগানে তিনি ছিলেন দৃপ্ত, সাহসী, নির্ভীক। রবীন্দ্রসঙ্গীত নিষিদ্ধ করা হলে তিনি প্রতিবাদ করলেন— মৃত্যুভয়কে অগ্রাহ্য করে। ১৯৬৯-এর গণঅভ্যুত্থানে তিনি বর্জন করলেন পাকিস্তানের ‘তমঘা-ই-ইমতিয়াজ’। তিনি লিখেছিলেন— “অন্যায্যের পুরস্কার গ্রহণ মানে নিজের বিবেককে বিক্রি করে দেওয়া।” ১৯৭১-এ তাঁর ধানমন্ডির বাসভবন ছিল নজরদারিতে। তবুও তিনি দেশের স্বাধীনতার স্বপ্ন বুকে নিয়ে দাঁড়িয়ে ছিলেন অবিচল। বাংলাদেশ রাষ্ট্রকে তিনি দেখেছিলেন ভালোবাসায়, দায়িত্বে, আর এক ধরনের মাতৃত্বে। তিনি প্রতিষ্ঠা করলেন: কচিকাঁচার মেলা মহিলা পরিষদ,নারী আন্দোলনের অসংখ্য সংগঠন ছায়ানটের সভাপতি হিসেবে তিনি গড়ে তুললেন  সাংস্কৃতিক প্রতিরোধের শক্তি। তাঁর নেতৃত্বে বাংলা গান, কবিতা, নাটক হয়ে উঠল অসাম্প্রদায়িকতার অস্ত্র। ১৯৯০ সালের স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনে তিনি কার্ফিউ ভেঙে নীরব শোভাযাত্রার নেতৃত্ব দিলেন— এ যেন বয়সকে অতিক্রম করে উঠে দাঁড়ানো সময়েরই এক বিস্ময়। ১৯৯৯ সালের ২০ নভেম্বর তিনি মারা গেলেন। কিন্তু কি সত্যি মারা গেলেন? না—আজও তিনি বইয়ের পাতায় জাগেন, নারীর চোখে আশার আলো হয়ে জ্বলেন, এবং প্রতিটি প্রগতিশীল চিন্তার ভেতরে প্রাণ পায় তাঁরই সাহস। বাংলাদেশের ইতিহাসে রাষ্ট্রীয় সম্মানে সমাহিত হওয়া প্রথম নারী— সেটাই বলে দেয়, এই দেশ তাঁকে শুধু ভালোবাসেনি, তাঁকে নিজের অন্তরে ধারণ করেছে। একজন পুলিশ কর্মকর্তা হিসেবে আমার কাজ হয়তো অপরাধ, আইন, সমাজ নিয়ে। সাহিত্যিক নই। তবুও তাঁর কথা লিখতে গিয়ে মনে হয়— কলম কেঁপে ওঠে। কারণ তিনি নিজেই ছিলেন একটি চলমান মহাকাব্য।
যেখানে প্রতিটি অধ্যায় সংগ্রামের আগুনে গড়া। প্রতিটি বাক্য মানবতার ফুলে ভরা। আর প্রতিটি কবিতা নারী জাগরণের মশাল। তাঁকে স্মরণ করা মানে নিজের বিবেককে জাগানো। নিজেকে প্রশ্ন করা— আমি কি সত্যিই মানুষের পাশে দাঁড়িয়েছি?
আমি কি সত্যের পক্ষে থেকেছি? এ প্রশ্নগুলোই তো তিনি শিখিয়েছিলেন আমাদের। তাঁর একটি কবিতায় তিনি লিখেছিলেন—“মানুষের মাঝে থাকবো চিরদিন, মানুষের ভালোর জন্য আমার পথচলা।” তিনি সত্যিই থেকে গেছেন— মানুষের ভেতরে, মানুষের ভালোবাসায়, মানুষের সংগ্রামে। আজ, তাঁর ২৬তম মৃত্যুবার্ষিকীতে— আমরা মাথা নত করে বলি:
আপনি আমাদের আলোর পথ, আপনি আমাদের বিবেকের চিরন্তন জাগরণ।শ্রদ্ধা, গভীর শ্রদ্ধা।

Share This Article
Leave a Comment