
— মো. কামাল উদ্দিনঃ
মুন্নির মুখে বিকেলের রোদ যেন নরম সোনার পরশ হয়ে নেমে এসেছে—চোখের কোণে আলো ঝরে পড়ছে, তবু তার দৃষ্টিতে এক শান্ত মুগ্ধতা। চারপাশে নীরব বিকেল, দূরে পাখিরা ডানা ঝাপটিয়ে ফিরছে নীড়ে, আর সেই নিস্তব্ধতার মধ্যে মুন্নি যেন এক সজীব কবিতার ছন্দ হয়ে বসে আছে। এ দৃশ্যটি তার বাবা সরফরাজ খানের বাড়ির পাঠশালার কক্ষে-—যেখানে বাতাসে মিশে আছে মাটির গন্ধ, পুরনো দিনের স্মৃতি আর পরিবারের মমতার সুর। বাগানের ফুলগুলো যেন তার সঙ্গে হাসছে, লতাগুল্মে আলো-ছায়ার খেলা যেন তার উপস্থিতিকে ঘিরে এক অলৌকিক আবহ তৈরি করেছে। তার আথিয়তার সূচনা যেন এক অনির্বচনীয় আয়োজন—চায়ের ধোঁয়া উঠছে ধীরে, চারপাশে গল্পের স্রোত, হাসির ঢেউ আর চোখে চোখে বিনিময় হওয়া নিঃশব্দ ভালোবাসা। মুন্নি কথা বলে না, কিন্তু তার হাসি বলে হাজার গল্প। মনে হয়, এই পাঠশালার প্রতিটি দেয়াল, প্রতিটি বাতাস তাকে চেনে—তার পদচারণায় যেন জেগে ওঠে সময়, আর রোদ-মাখা বিকেলটাও হয়ে ওঠে এক কাব্যিক মুহূর্ত। মুন্নির উপস্থিতিতে বিকেলটা যেন কবিতার পাতায় ছড়িয়ে পড়ে—নরম, স্নিগ্ধ, অথচ গভীর। মনে হয়, পৃথিবী যদি কখনও সৌন্দর্যের সংজ্ঞা খোঁজে, তবে সেই সংজ্ঞার এক কোণে লেখা থাকবে—তার বাবা “সরফরাজ খানের বাড়ির বিকেলে মুন্নির হাসি। পাশাপাশি আমি মনোভাব মনের অনুভূতি লিখতে বসলাম–
”আনোয়ারা ঘুরে আসলাম কথাটি শুনতে যতই সাধারণ মনে হোক, এর ভেতর লুকিয়ে আছে এক গভীর, মৃদু রহস্যের গল্প। কেন গিয়েছিলাম, তা বলা মানা—এই অজানাই যেন গল্পটিকে আরও মায়াময় করে রাখে। তবে মনে হচ্ছিল, এই ভ্রমণের নরম স্মৃতিগুলো না লিখলে যেন কিছু একটা অপূর্ণ থেকে যাবে। লেখার সেই প্রেরণা এল আমার প্রিয় বন্ধু, সাংবাদিক মিজানুর রহমান চৌধুরীর কাছ থেকে— উনার বাড়ীও আনোয়ারা এবং দীর্ঘ বছর তিনি এই আনোয়ারা বুনিয়াদি পরিবারের বিরুদ্ধে কলম যুদ্ধ করেছেন-যিনি সবসময় জানেন, আমি যেখানেই যাই, লেখার খোরাক খুঁজে ফিরি, শব্দের ভেতর খুঁজি জীবনকে। ২৩ ও ২৪ অক্টোবরের দুইটি দিন কেটে গেল আনোয়ারার বাতাসে, সূর্য ও নদীর আলোছায়ায়। চট্টগ্রাম সার্কিট হাউজ থেকে আমাদের যাত্রা শুরু—জেলাপ্রশাসক সাইফুল ইসলাম, আন্তর্জাতিক মানবাধিকার কমিশনের চেয়ারম্যান এম এ হাশেম রাজু, আর প্রিয় মানুষ গোলাম সারোয়ার খানকে সঙ্গে নিয়ে। রাজু ভাইয়ের নেতৃত্বে এই সফর শুধু একটি আনুষ্ঠানিক সফর নয়, বরং হয়ে উঠেছিল আন্তরিকতার যাত্রা। গোলাম সারোয়ার, এম এ হাশেম রাজুর জামাতা, আর আমার দীর্ঘ ২৭ বছরের পুরনো প্রিয় বন্ধু—চোখে-মুখে মেধা, ভদ্রতা, আর এক গভীর মানবিক ঔজ্জ্বল্য। সারোয়ারের বোন মুন্নির শাশুড়ি বাড়িতে আমাদের জন্য বিশেষ আয়োজন ছিল। জায়গাটি আনোয়ারার বুরুমছড়া—শান্ত, সবুজ, নদীর গন্ধে ভেজা এক স্বপ্নের জনপদ। মুন্নির শাশুড়ি বাড়ি সিকদার পরিবার—আনোয়ারার নামকরা এক জমিদার গোষ্ঠী। মুন্নির নিজের পৈতৃক ঘরও রাজকীয় ঐতিহ্যের, কিন্তু মানুষটি একেবারে মাটির কাছের। তার মুখে সহজ হাসি, কথায় বিনয়, আতিথ্যে আন্তরিকতার দীপ্তি—এই নারী যেন সোনার চামচ নিয়ে জন্ম নিয়েও হৃদয়ে ধরে রেখেছেন বাংলার মাটির উষ্ণতা। আমরা যাওয়ার পথে এক মজার ঘটনা ঘটল। সারোয়ার বহু বছর ধরে ডেনমার্কে থাকেন—তাই গ্রামের পথঘাট কিছুটা ভুলে গিয়েছিলেন। ফলে আমরা পথ হারালাম! একপথ ছেড়ে অন্য পথে, আঁকাবাঁকা মেঠোপথে, সবুজ ধানখেতের পাশে পাশে এগিয়ে চলা। দূরে পাখির ডাক, বাতাসে তালপাতার দোলে দোলে বয়ে যাওয়া সুর—সব মিলিয়ে পথ হারানোও যেন এক রোমান্টিক কবিতা হয়ে উঠল। গাড়ি থামিয়ে মাঝে মাঝে সারোয়ারের মুখের মজার ভুলে সবাই হেসে উঠছিলাম। অবশেষে পৌঁছালাম সিকদার বাড়িতে। দূর থেকেই দেখতে পেলাম এক দোতলা বারান্দা থেকে মুন্নি হাসিমুখে হাত নাড়ছে। ক্লান্ত শরীর মুহূর্তেই হালকা হয়ে গেল। ভিতরে ঢুকতেই এক অপরূপ দৃশ্য—সুগন্ধি ধোঁয়া উঠছে রান্নাঘর থেকে, টেবিলজুড়ে রঙ-বেরঙের বাঙালি পদ। চিকন চালের ভাত, সাত প্রকার মাছের তরকারি, দেশি মুরগি, গরু ও হাঁসের মাংস, কয়েক রকম ভর্তা, ডাল, শুটকি, সব্জির নানা আয়োজন—এ যেন গ্রামের ঘ্রাণে ভরা এক রাজকীয় ভোজ। মুন্নির হাতের রান্না শুধু পেট ভরায়নি, মনও ভরিয়েছে। সেই খাবারের স্বাদে যেন মাটির গন্ধ মিশে ছিল। আমি রাজু ভাই, আক্কাস, আশিফ আহামেদ মিদা, আর সারোয়ার মিলে খেতে খেতে যেন এক নীরব আনন্দে ভরে উঠেছিলাম। মাঝে মাঝে মুন্নি এসে দেখছে, কার প্লেটে ভাত কম, কার তরকারি শেষ—এই যত্ন, এই ভালোবাসাই বাংলার নারীর আসল সৌন্দর্য।
খাওয়ার পর পরিবেশন হলো দই, চা, ফলমূল—সবই ঘরোয়া যত্নে পরিপূর্ণ। একসময় মনে হচ্ছিল, এই আতিথ্যের উষ্ণতায় শরীরের ওজন যেন সত্যিই বেড়ে গেছে! তৃপ্তির নিঃশ্বাস ফেলতে ফেলতে বললাম, “মুন্নি, তোমার হাতের রান্না আনোয়ারার মাটির মতো—যত খাই, তত মিষ্টি লাগে।” এরপর মুন্নি আমাদের পুরো বাড়ি ঘুরিয়ে দেখালেন। বাইরে থেকে ছোট মনে হলেও ভিতরে ছয়তলার বিশাল বিস্তার, প্রতিটি রুমে রুচিশীল সাজসজ্জা, দেওয়ালে পারিবারিক স্মৃতিচিত্র। বাড়িটি যেন আনোয়ারার ঐতিহ্য ও আধুনিকতার সংমিশ্রণ—একদিকে ইতিহাস, অন্যদিকে জীবনের আনন্দ।
বিকেলের দিকে বারান্দায় বসে চা খেতে খেতে দেখছিলাম দূরে কর্ণফুলীর ঢেউ। সোনালি আলো পড়ে ছিল ধানখেতের উপর, বাতাসে ভেসে আসছিল মোরগের ডাক। তখন মনে হচ্ছিল, সময় যেন থমকে গেছে। আনোয়ারার আকাশে একরাশ শান্তি, যেন এই মাটির নিচে লুকিয়ে আছে ভালোবাসার অনন্ত স্রোত। ফেরার পথে গাড়ির জানালায় মুখ রেখে ভাবছিলাম—আমরা আসলে পথ হারাইনি, বরং হারিয়ে গিয়ে খুঁজে পেয়েছি কিছু অমূল্য জিনিস। খুঁজে পেয়েছি মানুষের ভালোবাসা, আত্মীয়তার টান, আর বাংলার ঘরের ঘ্রাণ। মুন্নির হাসি, সারোয়ারের আন্তরিকতা, রাজু ভাইয়ের নেতৃত্ব—সব মিলিয়ে আনোয়ারা হয়ে উঠেছিল এক জীবন্ত স্মৃতি, এক সাহিত্যিক সফর। চট্টগ্রাম শহরের আলো যখন দিগন্তে ভেসে উঠল, তখন মনে হলো—আনোয়ারা শুধু ঘুরে আসা কোনো স্থান নয়, বরং আমার ভেতরের এক অনুভূতির নাম।
আজও মনে পড়ে, ফেরার পথে সূর্য ডুবে যাচ্ছিল পশ্চিমে, বাতাসে ভেসে আসছিল সিকদার বাড়ির আতিথ্যের গন্ধ। আমি মনে মনে বলেছিলাম— “আনোয়ারা ঘুরে আসলাম—তবু মনে হয়, আনোয়ারাই আমার ভেতরে থেকে গেছে।”
চলবে—