মো.কামাল উদ্দিনঃ
আমি একজন সাধারণ সংবাদ কর্মী হিসেবে দীর্ঘ সময় ধরে সাংবাদিকতা নিয়ে কাজ করতে গিয়ে দেখেছি— এই পেশা কেবল খবরের কাগজ ভরাট করার জন্য নয়, বরং সত্যকে প্রতিষ্ঠিত করার জন্য, অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়াবার জন্য এবং জাতির বিবেক হিসেবে দায়িত্ব পালন করার জন্য। কিন্তু আজ কিছু অপ্রিয় সত্যি কথা বলতে বসেছি, কারণ নীরবতা এখন অপরাধের নামান্তর। চট্টগ্রাম প্রেসক্লাবসহ আমাদের সাংবাদিক সংগঠনগুলো বছরের পর বছর দলীয় প্রভাব ও ব্যক্তিগত স্বার্থের শৃঙ্খলে বন্দি হয়ে পড়েছে। যে প্রতিষ্ঠানগুলো মুক্তচিন্তা ও নিরপেক্ষতার প্রতীক হওয়ার কথা, সেগুলোই আজ একেকটি রাজনৈতিক দলের পাঠশালায় রূপ নিয়েছে। পেশাদার সাংবাদিকদের হেয় করা হয়েছে, অসংখ্য নির্ভীক সাংবাদিককে ‘অসাংবাদিক’ আখ্যা দিয়ে অপমান করা হয়েছে, আর প্রেসক্লাবের মতো মহৎ প্রতিষ্ঠানের সম্পদ ও মর্যাদা ব্যক্তিগত লোভ-লালসার শিকার হয়েছে। আমি জানি, এই কথা অনেকের কাছে অপ্রিয় লাগবে। হয়তো কেউ কেউ আমার বিরুদ্ধে কুৎসা রটাবে, কেউ আমার সততা নিয়ে প্রশ্ন তুলবে। তবুও সত্য উচ্চারণ করাই আমার কর্তব্য। কারণ যদি সাংবাদিকরাই সত্যকে আড়াল করে রাখে, তবে এই সমাজ আর কখনো ন্যায়ের আলো দেখবে না। আজ সময় এসেছে প্রকৃত সাংবাদিকদের পক্ষে দাঁড়ানোর, যারা দলীয় তকমা নয়, বরং কলমের শক্তিকে একমাত্র হাতিয়ার মনে করেন। সময় এসেছে চট্টগ্রাম প্রেসক্লাবসহ সব সাংবাদিক সংগঠনকে দলীয় প্রভাব থেকে মুক্ত করে, পেশাদারিত্ব, সততা ও নিরপেক্ষতার ভিত্তিতে নতুন করে গড়ে তোলার। এই দাবি কেবল সাংবাদিকদের নয়, বরং পুরো জাতির— কারণ প্রেসক্লাব জাতির বিবেকের ঘর। সেই চট্টগ্রাম প্রেসক্লাব দীর্ঘদিন ধরেই সাংবাদিক সমাজের গৌরবের প্রতীক হিসেবে পরিচিত। তবে সাম্প্রতিক সময়ে এই প্রতিষ্ঠানকে ঘিরে যে অস্থিরতা ও সংকট তৈরি হয়েছে, তা কেবল সাংবাদিকদের জন্য নয়, বরং পুরো সমাজের জন্যই উদ্বেগজনক। কারণ প্রেসক্লাব কেবল একটি সংগঠন নয়, এটি জাতির বিবেকের প্রতিষ্ঠান। এখান থেকে উঠে আসা সত্য, ন্যায় ও নিরপেক্ষতার আলো পুরো জাতিকে পথ দেখায়। অথচ দুঃখজনকভাবে আজ এই প্রতিষ্ঠানকে দলীয়করণ, বিভাজন ও অনিয়মের শৃঙ্খলে বন্দি করে ফেলা হয়েছে।
২০২৪ সালের ১৩ ডিসেম্বর চট্টগ্রাম প্রেসক্লাবের অচলাবস্থা কাটাতে জেলা প্রশাসক ফরিদা খানমকে আহ্বায়ক করে অন্তবর্তী কমিটি গঠন করা হয়। প্রায় সাত মাস দায়িত্ব পালনের পর তিনি ২০২৫ সালের ৩১ জুলাই কৌশলে পদত্যাগ করেন। পদত্যাগপত্রে তিনি স্পষ্ট করে জানান, জেলা প্রশাসক হিসেবে বহুমুখী দায়িত্ব পালনের কারণে প্রেসক্লাবের দায়িত্ব বহন করা সম্ভব হচ্ছে না। একই সঙ্গে তিনি প্রেসক্লাবের কার্যক্রম আরও গতিশীল করার লক্ষ্যে নতুন অন্তবর্তী কমিটি গঠন, নির্বাচন কমিশন নিয়োগ এবং নির্বাচনের মাধ্যমে নতুন নেতৃত্ব নির্বাচনের প্রস্তাব দেন।
তবে ভেতরের সূত্র বলছে, এ পদত্যাগের পেছনে রয়েছে তীব্র চাপ ও নানা অস্বচ্ছ কর্মকাণ্ড। বহিষ্কৃত ও স্থগিত সদস্যদের প্রভাব খাটিয়ে জেলা প্রশাসককে পদত্যাগে বাধ্য করা হয় এবং পরবর্তীতে তাদের পছন্দের ব্যক্তিদের দিয়ে ছয় সদস্যের একটি পর্যালোচনা কমিটি গঠন করা হয়। এই ঘটনাই প্রেসক্লাবের অভ্যন্তরীণ সংকটকে আরও ঘনীভূত করেছে। অন্তবর্তী কমিটি সম্প্রতি প্রায় ৪০ জন সদস্যকে বহিষ্কার ও ৫৬ জনের সদস্যপদ স্থগিত করে। অভিযোগ ছিল— এদের অনেকে ছাত্র আন্দোলনের বিরুদ্ধে কাজ করেছেন, সরকারের পক্ষ নিয়ে বিরোধী আন্দোলন দমন করেছেন, অর্থ আত্মসাৎ করেছেন এবং এমনকি সাংবাদিকদের নামে প্লট দখল করেছেন। তবে বহিষ্কৃতদের দাবি— এসব অভিযোগ রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত। আবার অনেকে বলছেন, এই বহিষ্কার ও স্থগিতকরণের পেছনে মূলত অভ্যন্তরীণ ক্ষমতার দ্বন্দ্বই কাজ করেছে। প্রেসক্লাবের সাবেক নির্বাচিত ব্যবস্থাপনা কমিটি সম্প্রতি বিজ্ঞপ্তি দিয়ে অভিযোগ তুলেছে, অন্তবর্তী কমিটির সদস্য সচিবসহ কয়েকজন ব্যক্তি ক্লাবের কোটি কোটি টাকা আত্মসাৎ করছেন। তারা শুধু ক্লাবের সম্পদই নয়, নিয়মিত আয়ের অংশ থেকেও বিপুল অর্থ লোপাট করেছেন বলে দাবি উঠেছে। আরও বলা হচ্ছে, এসব ব্যক্তি নিজেদের অন্তবর্তী কমিটির পরিচয়ে বিভিন্ন অনুষ্ঠানে অতিথি আসন দখল করছেন এবং বিভিন্ন জায়গায় চাঁদাবাজি করছেন। এসব কর্মকাণ্ড প্রেসক্লাবের ভাবমূর্তিকে ভয়াবহভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করছে।
চট্টগ্রাম প্রেসক্লাবের সংকটের মূলে রয়েছে দলীয় প্রভাব। যে দল ক্ষমতায় আসে, প্রেসক্লাবও সেই দলের নিয়ন্ত্রণে চলে যায়। একসময় এটি সাংবাদিকদের পেশাগত সংগঠন হলেও এখন তা অনেকাংশে রাজনৈতিক দলের পাঠশালায় পরিণত হয়েছে। এর ফলে পেশাদার সাংবাদিকদের মধ্যে বিভাজন সৃষ্টি হয়েছে। অনেকে ‘অসাংবাদিক’ আখ্যা দিয়ে অপমানিত হয়েছেন, বৈষম্যের শিকার হয়েছেন। এরই ধারাবাহিকতায় ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর এই বৈষম্যের প্রতিক্রিয়া আরও প্রকটভাবে দেখা দিয়েছে। প্রশ্ন হচ্ছে— আজ যারা প্রেসক্লাবের দায়িত্বে, তারা কি সত্যিই অতীতের বৈষম্য থেকে মুক্ত হতে পেরেছেন? উত্তর হচ্ছে— না। কারণ আগের মতোই দলীয় প্রভাব এখনো প্রবল। কেবল ব্যানার পাল্টেছে, কিন্তু অনিয়ম, দখলদারিত্ব, চাঁদাবাজি ও অর্থ আত্মসাতের মতো ঘটনা একইভাবে চলছে। এর ফলে সাংবাদিক সমাজ আরও বিভক্ত হচ্ছে এবং পেশাদারিত্ব প্রশ্নবিদ্ধ হচ্ছে। চট্টগ্রাম প্রেসক্লাবকে সত্যিকারের পেশাদার গণমাধ্যমকর্মীদের সংগঠন হিসেবে পুনর্গঠন করা জরুরি। এজন্য দরকার—দলীয় প্রভাব মুক্তকরণ – প্রেসক্লাব যেন আর কোনো রাজনৈতিক দলের প্রভাবাধীন না থাকে, তা নিশ্চিত করতে হবে। নিরপেক্ষ নির্বাচন কমিশন – একটি স্বাধীন ও নিরপেক্ষ নির্বাচন কমিশনের অধীনে সুষ্ঠু নির্বাচন আয়োজন করতে হবে। আর্থিক স্বচ্ছতা – প্রেসক্লাবের সমস্ত আর্থিক কার্যক্রম স্বচ্ছতার সঙ্গে প্রকাশ করতে হবে এবং নিয়মিত অডিট চালু করতে হবে। বৈষম্য দূরীকরণ – অতীতের মতো কাউকে ‘অসাংবাদিক’ আখ্যা দিয়ে অপমান না করে, যোগ্যতার ভিত্তিতে সদস্যপদ নিশ্চিত করতে হবে।
ঐক্য ও পেশাদারিত্ব – হানাহানি ও বিভাজন বাদ দিয়ে সাংবাদিকদের পবিত্র পেশার মর্যাদা রক্ষা করতে হবে। চট্টগ্রাম প্রেসক্লাবের সংকট শুধু সাংবাদিক সমাজের ভেতরের দ্বন্দ্ব নয়, বরং একটি জাতির নৈতিক শক্তিকে দুর্বল করার ষড়যন্ত্র। তাই এ সংকট থেকে উত্তরণের জন্য সাংবাদিকদেরই এগিয়ে আসতে হবে— দলমত নির্বিশেষে, নিরপেক্ষতা ও পেশাদারিত্বের ভিত্তিতে। প্রেসক্লাবকে যদি জাতির বিবেকের প্রতিষ্ঠান হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে হয়, তবে এর অভ্যন্তরীণ সংকটের অবসান ঘটাতে হবে এবং সত্যিকার অর্থে একটি গণমাধ্যমকর্মী সংগঠন হিসেবে পুনর্গঠন করতে হবে।
এখনই সময়— চট্টগ্রাম প্রেসক্লাবকে দলের নয়, জনগণের, সত্য ও নিরপেক্ষতার প্রতিষ্ঠানে রূপান্তরিত করার।