
-মো.কামাল উদ্দিনঃ
রাজনৈতিক ক্ষমতা, পারিবারিক প্রভাব এবং করপোরেট ব্যাংকিং ব্যবস্থাকে পুঁজি করে সংগঠিত আর্থিক লুটপাটের এক ভয়াবহ চিত্র উঠে এসেছে সাবেক ভূমিমন্ত্রী সাইফুজ্জামান চৌধুরী জাবেদের বিরুদ্ধে দায়ের হওয়া দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) মামলায়। ইউনাইটেড কমার্শিয়াল ব্যাংক লিমিটেড (ইউসিবিএল) থেকে প্রায় ২৫ কোটি টাকা আত্মসাৎ ও বিদেশে পাচারের অভিযোগে সাবেক এই মন্ত্রীসহ ৩৬ জনের বিরুদ্ধে দায়ের করা অভিযোগপত্র গ্রহণ করেছেন আদালত। একই সঙ্গে মামলার পলাতক ৩২ আসামির বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করা হয়েছে। বুধবার অভিযোগপত্রের ওপর শুনানি শেষে চট্টগ্রাম বিভাগীয় বিশেষ জজ আদালতের বিচারক মিজানুর রহমান এই আদেশ দেন। এই আদেশকে দেশের ব্যাংকিং খাতে দুর্নীতিবিরোধী বিচারিক প্রক্রিয়ার একটি বড় অগ্রগতি হিসেবে দেখছেন সংশ্লিষ্টরা। দুদকের অভিযোগপত্র: রাজনীতির গায়ে প্রথম আইনি আঁচড় দুদক সূত্র জানায়, ৫ জানুয়ারি মামলার তদন্ত কর্মকর্তা, দুদকের প্রধান কার্যালয়ের উপপরিচালক মশিউর রহমান আদালতে অভিযোগপত্র দাখিল করেন। এতে ৩৬ জনকে আসামি এবং ৯২ জনকে সাক্ষী করা হয়েছে। সাবেক ভূমিমন্ত্রী জাবেদের বিরুদ্ধে দায়ের হওয়া একাধিক দুর্নীতির মামলার মধ্যে এটিই দুদকের প্রথম আনুষ্ঠানিক অভিযোগপত্র, যা রাজনীতিতে দুর্নীতির বিরুদ্ধে একটি স্পষ্ট বার্তা বহন করছে। দুদকের পাবলিক প্রসিকিউটর মোকাররম হোসাইন জানান, আদালত সাবেক মন্ত্রী জাবেদ, তাঁর স্ত্রীসহ পলাতক আসামিদের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারির নির্দেশ দিয়েছেন। বর্তমানে মামলার ৩৬ আসামির মধ্যে ৪ জন গ্রেপ্তার হয়ে কারাগারে রয়েছেন। মন্ত্রী, পরিবার ও ব্যাংক পরিচালনা পর্ষদ—একই চক্র এই মামলার সবচেয়ে ভয়াবহ দিক হলো—এতে অভিযুক্তদের বড় অংশই সাবেক মন্ত্রীর পরিবার, ব্যাংকের শীর্ষ পরিচালক ও ব্যবস্থাপনা পর্যায়ের কর্মকর্তা। অর্থাৎ রাজনৈতিক ক্ষমতা, পারিবারিক নিয়ন্ত্রণ এবং ব্যাংক পরিচালনা—তিন স্তর মিলেই গড়ে ওঠে একটি শক্তিশালী আর্থিক সিন্ডিকেট। গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারিকৃতদের মধ্যে রয়েছেন— জাবেদের স্ত্রী ও ইউসিবিএল ব্যাংকের সাবেক চেয়ারম্যান রুকমিলা জামান, ভাই ও সাবেক পরিচালক আসিফুজ্জামান চৌধুরী, বোন রোকসানা জামান চৌধুরী, সাবেক চেয়ারম্যান এম এ সবুর, সাবেক ভারপ্রাপ্ত ব্যবস্থাপনা পরিচালক আরিফ কাদরী, সাবেক পরিচালক ও ব্যাংক কর্মকর্তা বশির আহমেদ, একরাম উল্লাহ,আরামিট গ্রুপের কর্মকর্তা ফরমান উল্লাহ চৌধুরী, সহ ব্যাংক ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের আরও বহু প্রভাবশালী ব্যক্তি। তদন্তে উঠে এসেছে পরিকল্পিত ব্যাংক লুটের নকশা দুদকের তদন্তে উঠে এসেছে, রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে ভুয়া ও অতিমূল্যায়িত কাগজপত্রের মাধ্যমে ঋণ অনুমোদন, নিয়মনীতি উপেক্ষা করে ঋণ ছাড়, এবং পরে সেই অর্থ বিদেশে পাচারের সুপরিকল্পিত কৌশল। এই লুটপাটের ফলে ব্যাংকের আর্থিক কাঠামো দুর্বল হয়ে পড়ে এবং সাধারণ আমানতকারীরা চরম ঝুঁকির মুখে পড়েন।
তদন্তে আরও ৭ জনের সক্রিয় সম্পৃক্ততার প্রমাণ পাওয়া গেছে। তারা হলেন আরামিট গ্রুপের এজিএম উৎপল পাল, প্রদীপ কুমার বিশ্বাস, মো. জাহিদ, মো. শহীদ, মো. সুমন, ইলিয়াস তালুকদার ও ওসমান তালুকদার। আইনি লড়াইয়ের বড় পরীক্ষা
বিশ্লেষকদের মতে, সাবেক একজন মন্ত্রী, তাঁর পরিবার এবং ব্যাংকিং ও করপোরেট খাতের প্রভাবশালী ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে এ ধরনের মামলা দেশের দুর্নীতিবিরোধী বিচার ব্যবস্থার জন্য একটি বড় পরীক্ষা। মামলাটির দ্রুত, স্বচ্ছ ও দৃষ্টান্তমূলক নিষ্পত্তি হলে ভবিষ্যতে রাজনৈতিক ক্ষমতার অপব্যবহারের বিরুদ্ধে একটি শক্ত বার্তা যাবে।