জনগণের ভোটের মূল্যায়নে প্রয়োজন পিআর পদ্ধতি নির্বাচন-

By admin
4 Min Read


-মো.কামাল উদ্দিনঃ
বাংলাদেশের নির্বাচন ব্যবস্থা নিয়ে দীর্ঘদিন কাজ করতে গিয়ে আমি একটি প্রশ্ন বারবার সামনে এনেছি—আমাদের দেশে জনগণের প্রতিটি ভোটের মূল্য কতটুকু প্রতিফলিত হয়? প্রায় তিন দশক ধরে নির্বাচন পর্যবেক্ষণের অভিজ্ঞতার আলোকে আমি ২০১০ সালে গবেষণামূলক গ্রন্থ লিখেছিলাম—“বাংলাদেশের নির্বাচন ও নির্বাচনি তথ্য-উপাত্ত।” বইটি দেশে-বিদেশে আলোচিত হয় এবং বিশেষত চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়সহ কয়েকটি বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞানের পাঠক্রমে রেফারেন্স হিসেবে অন্তর্ভুক্ত হয়। এ বইকে ঘিরে আলোচনায় আমাকে প্রায়ই জিজ্ঞেস করা হয়েছে—বাংলাদেশে ভোটারের আসল ইচ্ছা সংসদে কতটা প্রতিফলিত হয়? দীর্ঘ পর্যবেক্ষণে আমি দেখেছি—বাংলাদেশ যেহেতু বহুদলীয় গণতন্ত্রের দেশ, এখানে বহু মত, বহু চিন্তা, বহু দর্শন সহাবস্থান করে। কিন্তু বাস্তবতায় কয়েকটি বড় দল ছাড়া অন্য কোনো রাজনৈতিক দল সংসদে স্থান পায় না। ছোট দলগুলোর নীতি-আদর্শ যতই গণমুখী হোক না কেন, নির্বাচনে জয়ী হতে না পারায় তাদের বক্তব্য বা জনগণের আশা সংসদে প্রতিফলিত হয় না। কোটি কোটি ভোট কার্যত অকার্যকর হয়ে যায়, আর ভোটাররা হতাশ হন। এখানেই প্রয়োজন প্রোপোরশনাল রিপ্রেজেন্টেশন বা পিআর নির্বাচন ব্যবস্থা। পিআর পদ্ধতির মূল শক্তি হলো প্রতিটি ভোটের সমান মূল্য নিশ্চিত করা। বর্তমানে ফার্স্ট পাস্ট দ্য পোস্ট ব্যবস্থায় একটি আসনে সর্বাধিক ভোট পাওয়া প্রার্থী জয়ী হন, যদিও তিনি সংখ্যাগরিষ্ঠ ভোট না পান। এর ফলে একটি আসনে প্রায় অর্ধেক ভোট কার্যত বাতিল হয়ে যায়। পিআর ব্যবস্থায় এ বৈষম্য থাকে না। দলগুলো তাদের প্রাপ্ত মোট ভোটের অনুপাতে সংসদে আসন পায়। ফলে কোনো ভোটই বৃথা যায় না, জনগণের প্রতিটি ভোটই সংসদে প্রতিফলিত হয়। বাংলাদেশের সমাজ বহুবিচিত্র। নানা সম্প্রদায়, নানা মত ও রাজনৈতিক দর্শনের মানুষ এখানে বসবাস করে। ছোট দলগুলো সংসদে আসন না পাওয়ায় তাদের কণ্ঠস্বর চাপা পড়ে যায়। অথচ গণতন্ত্রের সৌন্দর্যই হলো ভিন্নমতের প্রতি শ্রদ্ধা ও তা শোনার সুযোগ। পিআর ব্যবস্থা চালু হলে প্রান্তিক ও সংখ্যালঘু রাজনৈতিক শক্তিগুলোও সংসদে প্রতিনিধিত্ব করতে পারবে। এতে সংসদের চরিত্র হবে বহুমাত্রিক ও বাস্তবসম্মত। একক দলের আধিপত্য গণতন্ত্রকে দুর্বল করে। আমাদের দেশে বহুবার দেখা গেছে—একটি দল সংখ্যাগরিষ্ঠ আসন পেয়ে সংসদ দখলে নিয়েছে, অথচ তাদের ভোটশেয়ার মোট ভোটের অর্ধেকও নয়। অর্থাৎ অর্ধেকের কম ভোট নিয়েই তারা একচ্ছত্র ক্ষমতা ভোগ করেছে। এ অবস্থা গণতন্ত্রের জন্য ভয়াবহ। পিআর পদ্ধতিতে বড় দলগুলোকে ছোট দলের সঙ্গে সমঝোতা করতে হবে। আলোচনার সংস্কৃতি গড়ে উঠবে, একক আধিপত্য ভাঙবে, আর গণতন্ত্র অর্থবহ হবে। বিগত সময়ে ভোট ডাকাতি, অনিয়ম, প্রশাসনিক প্রভাব ও নানা অসঙ্গতি জনগণের আস্থা নষ্ট করেছে। ভোটাররা মনে করেন তাদের ভোট কেবল আনুষ্ঠানিকতা। কিন্তু পিআর পদ্ধতি চালু হলে তারা বুঝবেন তাদের ভোট সংসদে প্রতিফলিত হয়েছে। এতে জনগণের আস্থা ফিরবে, ভোটাররা আবারও নির্বাচনে আগ্রহী হবেন। গণতান্ত্রিক অধিকার তখন শুধু সংবিধানের পাতায় নয়, বাস্তবেও কার্যকর হবে। গবেষণার সময় আমি ইউরোপের জার্মানি, নেদারল্যান্ডস, সুইডেনসহ অনেক দেশের উদাহরণ দেখেছি। এসব দেশে পিআর পদ্ধতি চালু থাকায় প্রতিটি ভোট গণনায় ধরা হয়, সংসদ বহুমাত্রিক হয়, আর গণতন্ত্র শক্তিশালী হয়। বাংলাদেশের জন্যও এটি অত্যন্ত কার্যকর একটি মডেল হতে পারে।
বাংলাদেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে জোট অপরিহার্য হয়ে উঠেছে। কিন্তু আমাদের বর্তমান ব্যবস্থায় জোট প্রায়ই কেবল নির্বাচনী হিসাব-নিকাশের জন্য হয়। পিআর পদ্ধতি এ জোটকে অর্থবহ করবে। কারণ সংসদে টিকে থাকতে বড় দলগুলোকে সত্যিকারের আলোচনায় বসতে হবে। এতে রাজনীতিতে সমঝোতা ও অংশগ্রহণমূলক সংস্কৃতি বিকশিত হবে। আজ সময় এসেছে সাহসী সিদ্ধান্ত নেয়ার। জনগণ আর দেখতে চান না তাদের ভোট অকার্যকর হয়ে যাক। ছোট দলের ভোটও সংসদে মূল্য পাক, ভিন্ন মতও সংসদে প্রতিফলিত হোক। জনগণের দীর্ঘদিনের বঞ্চনা ও আস্থাহীনতা কাটিয়ে উঠতে হলে পিআর ব্যবস্থা এখনই চালু করা দরকার। বাংলাদেশ একটি বহুদলীয় গণতন্ত্রের দেশ। কিন্তু প্রচলিত নির্বাচনী ব্যবস্থায় জনগণের ভোটের পূর্ণ প্রতিফলন ঘটে না। ফলে জনগণের আস্থা হারিয়ে যাচ্ছে, গণতন্ত্র দুর্বল হচ্ছে, আর ছোট দলগুলোর কণ্ঠরোধ হয়ে যাচ্ছে। প্রোপোরশনাল রিপ্রেজেন্টেশন বা পিআর পদ্ধতি চালু হলে প্রতিটি ভোটের মূল্যায়ন হবে, জনগণের অধিকার সুরক্ষিত হবে, এবং গণতন্ত্র আরও শক্তিশালী ও জবাবদিহিমূলক হয়ে উঠবে। আজ তাই সময়ের সাহসী দাবি একটাই—বাংলাদেশে পিআর নির্বাচন ব্যবস্থা চালু করতে হবে।

Share This Article
Leave a Comment