ধারণা বদলেছে, ডেঙ্গুর প্রকোপ এখন বছরজুড়ে

0
8

শীতের আগমনী বার্তা প্রকৃতিতে। ঋতু পরিবর্তনের এই সময়ে সাধারণত ডেঙ্গুর প্রকোপ কমতে শুরু করে। কিন্তু এবার বর্ষা মৌসুম পেরিয়েও স্বস্তি মিলছে না। বছরের শেষ প্রান্তে এসেও এডিস মশার বিস্তার ও ডেঙ্গুতে আক্রান্তের সংখ্যা উদ্বেগজনক পর্যায়ে রয়েছে। প্রতিদিন বিপুলসংখ্যক রোগী হাসপাতালে ভর্তি হচ্ছেন, দীর্ঘ হচ্ছে মৃত্যুর তালিকাও। ফলে ডেঙ্গু কেবল বর্ষাকালের রোগ—দীর্ঘদিনের এই ধারণা এখন বদলে যাচ্ছে।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, গত শুক্রবারের আগের চব্বিশ ঘণ্টায় ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন এক হাজার ১৮১ জন। একই সময়ে মারা গেছেন চারজন এবং সুস্থ হয়ে হাসপাতাল থেকে ছাড়পত্র পেয়েছেন এক হাজার ১৭৯ জন। বৃষ্টিপাতের ধরনে পরিবর্তন, তাপমাত্রার প্রভাব, অপরিকল্পিত নগরায়ণ, পানি নিষ্কাশনে দুর্বলতা এবং মশার প্রজননস্থল নিয়ন্ত্রণে ঘাটতিকে ডেঙ্গুর বিস্তারের অন্যতম কারণ হিসেবে দেখছেন জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের রোগ নিয়ন্ত্রণ শাখার সাবেক পরিচালক ও জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ডা. বে-নজির আহমেদ বলেন, ডেঙ্গুকে এখন আর শুধু বর্ষাকালের রোগ হিসেবে বিবেচনা করার সুযোগ নেই। পরিবেশ, তাপমাত্রা এবং মশার প্রজননের অনুকূল পরিস্থিতির কারণে বছরের বিভিন্ন সময়েই সংক্রমণ অব্যাহত থাকতে পারে। তাই শীত শুরু হলেই ডেঙ্গুর ঝুঁকি কমে যাবে, এমন ধারণা করা ঠিক নয়।

তিনি বলেন, মশার প্রজননস্থল ধ্বংসে সারা বছর কার্যকর কর্মসূচি চালাতে হবে। পাশাপাশি রোগী শনাক্তকরণ, চিকিৎসাব্যবস্থা ও নজরদারি জোরদার করা জরুরি। শুধু কীটনাশক ছিটিয়ে মশা নিয়ন্ত্রণ সম্ভব নয়। কোথায় মশার প্রজনন হচ্ছে, তা চিহ্নিত করে কার্যকর ব্যবস্থা নিতে হবে। সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর মধ্যে সমন্বয় ও জবাবদিহি নিশ্চিত করা না গেলে ডেঙ্গুতে সংক্রমণ ও মৃত্যু কমানো কঠিন হবে।

সরকারের রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (আইইডিসিআর) উপদেষ্টা ডা. মুশতাক হোসেনের মতে, ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে সংক্রমণের ধারাবাহিক নজরদারি এবং দ্রুত প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বছরের শেষ দিকে এসেও বিপুলসংখ্যক মানুষ আক্রান্ত হওয়া ও মৃত্যুর ঘটনা পরিস্থিতিকে গুরুত্বের সঙ্গে বিশ্লেষণের প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরছে।

তিনি বলেন, কোন এলাকায় সংক্রমণ বেশি, কোথায় মশার প্রজনন হচ্ছে এবং রোগীরা কখন চিকিৎসা নিতে আসছেন—এসব তথ্যের ভিত্তিতে প্রতিরোধমূলক কার্যক্রম পরিচালনা করতে হবে। জ্বর হলে অবহেলা না করে চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে হবে। রোগীর বিপৎসংকেত দেখা দিলে দ্রুত হাসপাতালে নেওয়া জরুরি। স্বাস্থ্য বিভাগ, স্থানীয় প্রশাসন ও সাধারণ মানুষকে সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে। বিচ্ছিন্ন অভিযান নয়, নিয়মিত ও তথ্যভিত্তিক উদ্যোগই সংক্রমণ কমাতে সহায়তা করবে।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্যমতে, চলতি বছরের শুরু থেকে গত শুক্রবার পর্যন্ত দেশে ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন এক লাখ আট হাজার ৪৪০ জন। এ সময়ে রোগটিতে প্রাণ হারিয়েছেন ৩৩৫ জন। সুস্থ হয়ে হাসপাতাল থেকে ছাড়পত্র পেয়েছেন এক লাখ দুই হাজার ২১০ জন।

হিসাব অনুযায়ী, হাসপাতালে ভর্তি হওয়া রোগীদের প্রায় ৯৪ শতাংশ ইতোমধ্যে ছাড়পত্র পেয়েছেন। তবে আক্রান্তের বিপুল সংখ্যা এবং মৃত্যুর পরিসংখ্যান দেশের জনস্বাস্থ্যের জন্য উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

চলতি বছর শেষ হতে আরও সময় বাকি থাকায় ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণের ওপর গুরুত্ব দিচ্ছেন সংশ্লিষ্টরা। বিশেষ করে শিশু, বয়স্ক ব্যক্তি এবং আগে ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হওয়া ব্যক্তিদের ক্ষেত্রে জটিলতার ঝুঁকি বিবেচনায় রেখে সতর্কতা অবলম্বন করা প্রয়োজন।

ডেঙ্গুতে নতুন রোগী শনাক্ত হওয়ার পাশাপাশি আগের রোগীদের চিকিৎসা, পর্যবেক্ষণ এবং জটিলতা মোকাবিলা করতে হচ্ছে হাসপাতালগুলোকে। প্রতিদিন বিপুলসংখ্যক রোগীর চিকিৎসা নিশ্চিত করতে গিয়ে স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থার ওপর বাড়ছে চাপ।

গত শুক্রবারের আগের চব্বিশ ঘণ্টায় এক হাজার ১৮১ জন নতুন রোগী হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার বিপরীতে ছাড়পত্র পেয়েছেন এক হাজার ১৭৯ জন। নতুন রোগীর আগমন এবং চিকিৎসাধীন রোগীদের পর্যবেক্ষণ—দুই ক্ষেত্রেই হাসপাতালগুলোকে প্রস্তুত থাকতে হচ্ছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, ডেঙ্গু পরিস্থিতি মোকাবিলায় হাসপাতালের চিকিৎসাসেবার পাশাপাশি মাঠপর্যায়ে সংক্রমণ প্রতিরোধে কার্যকর উদ্যোগ নিতে হবে। আক্রান্তের সংখ্যা বাড়ার পর ব্যবস্থা নেওয়ার পরিবর্তে ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা চিহ্নিত করে আগাম পদক্ষেপ গ্রহণ জরুরি।

ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে ব্যক্তিগত সচেতনতার পাশাপাশি স্থানীয় সরকার ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের ধারাবাহিক কার্যক্রম গুরুত্বপূর্ণ। বাড়ি ও আশপাশে পানি জমতে না দেওয়া, পানির পাত্র নিয়মিত পরিষ্কার করা, অব্যবহৃত টায়ার ও পাত্র সরিয়ে ফেলা এবং পানির ট্যাংক ঢেকে রাখা এডিস মশার প্রজননস্থল কমাতে সহায়তা করে।

সপ্তাহে অন্তত এক দিন বাড়ি ও আশপাশের সম্ভাব্য প্রজননস্থল পরীক্ষা করার অভ্যাস গড়ে তোলার পরামর্শ দেন বিশেষজ্ঞরা। তবে ডেঙ্গু প্রতিরোধের দায়িত্ব শুধু নাগরিকদের সচেতনতার মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখা যাবে না। ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় নিয়মিত মশার প্রজননস্থল শনাক্ত, পরিচ্ছন্নতা অভিযান এবং নেওয়া পদক্ষেপের কার্যকারিতা মূল্যায়ন করতে হবে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোকে।

কীটনাশক প্রয়োগের ক্ষেত্রেও বৈজ্ঞানিক পদ্ধতি অনুসরণ, সঠিক মাত্রা নিশ্চিত করা এবং প্রয়োগের কার্যকারিতা যাচাই করা প্রয়োজন।

ডেঙ্গুর উপসর্গ দেখা দিলে নিজে থেকে ওষুধ সেবন না করে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া জরুরি। তীব্র পেটব্যথা, বারবার বমি, রক্তপাত, অতিরিক্ত দুর্বলতা, শ্বাসকষ্ট, অস্বাভাবিক ঘুমঘুম ভাব কিংবা প্রস্রাবের পরিমাণ কমে যাওয়ার মতো বিপৎসংকেত দেখা দিলে দ্রুত হাসপাতালে যেতে হবে।

বিশেষভাবে মনে রাখতে হবে, জ্বর কমে গেলেই ডেঙ্গুর ঝুঁকি শেষ হয়ে যায় না। অনেক ক্ষেত্রে জ্বর কমার পরও রোগীর শারীরিক অবস্থার অবনতি হতে পারে। তাই এ সময়ে রোগীর অবস্থার প্রতি বাড়তি নজর রাখা প্রয়োজন।

সব মিলিয়ে, ডেঙ্গুর মৌসুমি চরিত্র বদলে যাওয়ার বাস্তবতায় কেবল বর্ষাকেন্দ্রিক কর্মসূচি দিয়ে পরিস্থিতি সামাল দেওয়া কঠিন। সারা বছর মশার প্রজনন নিয়ন্ত্রণ, তথ্যভিত্তিক নজরদারি, সমন্বিত প্রতিরোধমূলক কার্যক্রম এবং দ্রুত চিকিৎসা নিশ্চিত করা না গেলে ডেঙ্গুর সংক্রমণ ও মৃত্যু কমিয়ে আনা বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে থাকবে।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here