পুঁজিবাজারে বাড়ছে বন্ধ কোম্পানি, শেয়ারদর বৃদ্ধি নিয়ে উদ্বেগ

0
13

পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত থাকলেও ব্যবসায়িক কার্যক্রম বন্ধ—এমন কোম্পানির সংখ্যা ক্রমেই বাড়ছে। ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জে (ডিএসই) বর্তমানে এ ধরনের কোম্পানির সংখ্যা ৩৭। এর মধ্যে চলতি বছরেই কার্যক্রম বন্ধ হয়েছে পাঁচটি প্রতিষ্ঠানের। সর্বশেষ এই তালিকায় যুক্ত হয়েছে সিঅ্যান্ডএ টেক্সটাইলস।

অন্যদিকে, দীর্ঘদিন ধরে উৎপাদন বন্ধ থাকা কয়েকটি কোম্পানির শেয়ারদর সম্প্রতি ৯ থেকে ৩৬ শতাংশ পর্যন্ত বেড়েছে। ব্যবসা না থাকলেও এসব প্রতিষ্ঠানের শেয়ারে লেনদেন ও দরবৃদ্ধি বিনিয়োগকারীদের ঝুঁকি এবং বাজার তদারকি নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে।

ডিএসইর তথ্য অনুযায়ী, ২০১৬ সাল থেকে গত মঙ্গলবার পর্যন্ত ৩৬টি তালিকাভুক্ত কোম্পানির কার্যক্রম বন্ধ হয়েছে। এর সঙ্গে ২০০২ সাল থেকে বন্ধ থাকা মেঘনা পেট ইন্ডাস্ট্রিজকে যুক্ত করলে বর্তমানে বন্ধ কোম্পানির সংখ্যা দাঁড়ায় ৩৭টি। অর্থাৎ দুই দশকেরও বেশি সময় ধরে ব্যবসায়িক কার্যক্রম না থাকলেও প্রতিষ্ঠানটি এখনো পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত।

চলতি বছর বন্ধ হয়ে যাওয়া পাঁচটি কোম্পানি হলো অ্যাকটিভ ফাইন কেমিক্যালস, এএফসি অ্যাগ্রো বায়োটেক, এস আলম কোল্ড রোল্ড স্টিলস, ফু-ওয়াং ফুড ও সিঅ্যান্ডএ টেক্সটাইলস। প্রতিষ্ঠানগুলোর কার্যক্রম যথাক্রমে ২৫ জুন, ৯ জুলাই, ১ আগস্ট, ২২ আগস্ট ও ৪ অক্টোবর বন্ধ হয়েছে।

তালিকাভুক্তির সময় বিবেচনায় এই পাঁচ কোম্পানির মধ্যে সবচেয়ে পুরোনো ফু-ওয়াং ফুড, যা ২০০০ সালের জুলাইয়ে পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত হয়। এস আলম কোল্ড রোল্ড স্টিলস তালিকাভুক্ত হয় ২০০৬ সালে, অ্যাকটিভ ফাইন কেমিক্যালস ২০১০ সালে, এএফসি অ্যাগ্রো বায়োটেক ২০১৪ সালে এবং সিঅ্যান্ডএ টেক্সটাইলস ২০১৫ সালে।

অর্থাৎ চলতি বছর কার্যক্রম বন্ধ হওয়া পাঁচটি প্রতিষ্ঠানের মধ্যে চারটিই অন্তত এক দশক ধরে পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত ছিল।

বাজার-সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের মতে, তালিকাভুক্ত কোম্পানির একের পর এক কার্যক্রম বন্ধ হয়ে যাওয়া পুঁজিবাজারের কাঠামোগত দুর্বলতা, নিয়ন্ত্রক সংস্থার নজরদারি এবং বিনিয়োগকারীদের স্বার্থ সুরক্ষার বিষয়গুলো সামনে এনেছে।

এসব প্রতিষ্ঠানের অনেকেই একসময় পুঁজিবাজার থেকে সাধারণ বিনিয়োগকারীদের অর্থ সংগ্রহ করেছিল। পরবর্তী সময়ে উদ্যোক্তাদের বিরোধ, আর্থিক অনিয়ম, ঋণখেলাপি, আইনি জটিলতা ও ব্যবসায়িক সক্ষমতা হারানোর মতো নানা কারণে সংকটে পড়ে প্রতিষ্ঠানগুলো। এ ছাড়া জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি, গ্যাসসংকট, ব্যাংকিং বিধিনিষেধ, কার্যকরী মূলধনের অভাব এবং কাঁচামাল সংগ্রহের সমস্যাও কোনো কোনো কোম্পানির উৎপাদন বন্ধের কারণ হয়েছে।

এস আলম কোল্ড রোল্ড স্টিলস চলতি বছরের আগস্টে উৎপাদন বন্ধ করে। কোম্পানিটির পক্ষ থেকে ব্যাংকিং বিধিনিষেধের পাশাপাশি কাঁচামাল ও দক্ষ শ্রমিকের সংকটকে কারণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছিল।

২০২৪ সালের আগস্টে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর প্রতিষ্ঠানটির মালিক দেশ ছাড়েন। পরবর্তী সময়ে ব্যাংক হিসাব জব্দ হওয়ায় কাঁচামাল ও অন্যান্য উৎপাদন উপকরণ সংগ্রহে সমস্যায় পড়ে কোম্পানিটি।

অন্যদিকে, হামিদ ফেব্রিকস গত বছরের জুনে কারখানার কার্যক্রম বন্ধ করে। পর্যাপ্ত গ্যাসের চাপ না থাকাকে এর কারণ হিসেবে জানিয়েছিল প্রতিষ্ঠানটি। এর আগে প্রায় দুই বছর ধরে গ্যাসসংকটে উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছিল। পরিস্থিতির অবনতি হলে শেষ পর্যন্ত কারখানার কার্যক্রম বন্ধ হয়ে যায়।

অ্যাপোলো ইস্পাত কমপ্লেক্স ২০১৩ সালে পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত হয়ে প্রাথমিক গণপ্রস্তাবের (আইপিও) মাধ্যমে ২২০ কোটি টাকা সংগ্রহ করেছিল। রানি মার্কা ঢেউটিন উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানটির কার্যক্রম ২০২০ সালের অক্টোবর থেকে বন্ধ। তালিকাভুক্তির কয়েক বছরের মধ্যেই কোম্পানিটির আর্থিক অবস্থার অবনতি শুরু হয়। এ ছাড়া সাবেক পরিচালকদের বিরুদ্ধে অর্থ আত্মসাতের অভিযোগও উঠেছিল।

দীর্ঘতম সময় ধরে কার্যক্রম বন্ধ থাকা কোম্পানিগুলোর মধ্যে রয়েছে মেঘনা পেট ইন্ডাস্ট্রিজ। ২০০২ সাল থেকে প্রতিষ্ঠানটির ব্যবসায়িক কার্যক্রম বন্ধ রয়েছে।

কোম্পানিটির সঙ্গে যোগাযোগের তথ্যও সীমিত। ডিএসইর ওয়েবসাইটে প্রতিষ্ঠানটির যোগাযোগ নম্বর কিংবা কোম্পানি সচিবের নাম উল্লেখ নেই।

অন্যদিকে, ফ্যামিলিটেক্স (বিডি) কার্যত উৎপাদনের ভৌত সম্পদও হারিয়েছে। চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জের (সিএসই) সাম্প্রতিক এক পরিদর্শনে দেখা গেছে, কোম্পানিটির কারখানা ও অন্যান্য সম্পদ একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের কাছে বিক্রি করা হয়েছে।

সিঅ্যান্ডএ টেক্সটাইলস দীর্ঘদিন ধরেই সংকটে রয়েছে। ২০১৫ সালে পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত হয়ে আইপিওর মাধ্যমে ৪৫ কোটি টাকা সংগ্রহ করেছিল প্রতিষ্ঠানটি। কিন্তু তালিকাভুক্তির মাত্র দুই বছরের মাথায় ২০১৭ সালের জুনে এর উৎপাদন বন্ধ হয়ে যায়।

২০২১ সালে সমস্যাগ্রস্ত কোম্পানিটির নিয়ন্ত্রণ নেয় আলিফ গ্রুপ। প্রতিষ্ঠানটিকে পুনরায় উৎপাদনে ফেরানোর উদ্যোগের অংশ হিসেবে ২০২২ সালে পরীক্ষামূলক উৎপাদনও শুরু হয়। তবে ডিএসইর সর্বশেষ পরিদর্শনে কারখানাটি আবারও বন্ধ পাওয়া গেছে।

উৎপাদন বন্ধ থাকার পাশাপাশি আর্থিক তথ্য প্রকাশেও পিছিয়ে রয়েছে কোম্পানিটি। ডিএসইর তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালের মার্চে শেষ হওয়া প্রান্তিকের পর থেকে সিঅ্যান্ডএ টেক্সটাইলস আর কোনো প্রান্তিক আর্থিক প্রতিবেদন প্রকাশ করেনি। নির্ধারিত সময়ে বার্ষিক সাধারণ সভা (এজিএম) করতে ব্যর্থ হওয়ায় ২০২৫ সালের জানুয়ারিতে কোম্পানিটিকে ‘জেড’ শ্রেণিতে নামিয়ে দেয় ডিএসই।

এর আগে সিঅ্যান্ডএ টেক্সটাইলসকে আলিফ ইন্ডাস্ট্রিজের সঙ্গে একীভূত করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল। ব্যাংক, ঋণদাতা, শেয়ারহোল্ডার, উচ্চ আদালত ও নিয়ন্ত্রক সংস্থার প্রয়োজনীয় অনুমোদন সাপেক্ষে একীভূতকরণের পরিকল্পনা থাকলেও প্রক্রিয়াটি এখনো শেষ হয়নি।

ব্যবসায়িক কার্যক্রম বন্ধ থাকা কয়েকটি কোম্পানির শেয়ারদর সম্প্রতি উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে। এতে এসব শেয়ারে জল্পনানির্ভর লেনদেন ও সম্ভাব্য কারসাজি নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে বাজার-সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের মধ্যে।

গত বছরের মে মাস থেকে বন্ধ রয়েছে আজিজ পাইপস। গত এক মাসে কোম্পানিটির শেয়ারদর ৩৬ দশমিক ৩ শতাংশ বা ২৬ টাকা ৩০ পয়সা বেড়ে ৯৯ টাকা ৩০ পয়সায় দাঁড়িয়েছে। গত মঙ্গলবার এক দিনেই শেয়ারটির দাম বেড়েছে ৭ দশমিক ৪৭ শতাংশ।

দুই দশকের বেশি সময় ধরে বন্ধ মেঘনা পেট ইন্ডাস্ট্রিজের শেয়ারদরও গত এক মাসে ২০ দশমিক ৭১ শতাংশ বা ১২ টাকা ৩০ পয়সা বেড়ে ৭১ টাকা ৭০ পয়সায় পৌঁছেছে।

এ ছাড়া ছয় বছরের বেশি সময় ধরে উৎপাদন বন্ধ থাকা তুং হাই নিটিং অ্যান্ড ডাইংয়ের শেয়ারদর একই সময়ে বেড়েছে ২২ শতাংশ। ২০২০ সালের ডিসেম্বর থেকে উৎপাদন বন্ধ থাকা শ্যামপুর সুগার মিলসের শেয়ারদর বেড়েছে প্রায় ৯ শতাংশ।

বাজার বিশ্লেষকদের মতে, কার্যক্রম বন্ধ থাকা কোম্পানির শেয়ারদরের এমন উত্থানের সঙ্গে প্রতিষ্ঠানগুলোর মৌলিক আর্থিক অবস্থার সামঞ্জস্য রয়েছে কি না, তা খতিয়ে দেখা প্রয়োজন। এ ধরনের শেয়ারে জল্পনানির্ভর লেনদেন বা কারসাজির আশঙ্কা থাকলে সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে পড়েন সাধারণ বিনিয়োগকারীরা।

ডিএসইর এক কর্মকর্তা কালবেলাকে বলেন, অনেক কোম্পানি সময়মতো তাদের ব্যবসায়িক কার্যক্রমের প্রকৃত অবস্থা বিনিয়োগকারীদের জানায়নি। এ কারণে তালিকাভুক্ত প্রতিষ্ঠানগুলোতে সরেজমিন পরিদর্শন বাড়ানো হয়েছে। কোম্পানিগুলোর বাস্তব অবস্থা যাচাই করে সে অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়াই এ উদ্যোগের উদ্দেশ্য।

তবে শুধু পরিদর্শনের মাধ্যমে সমস্যার সমাধান সম্ভব নয় বলে মনে করেন ইনভেস্টমেন্ট করপোরেশন অব বাংলাদেশের (আইসিবি) চেয়ারম্যান অধ্যাপক আবু আহমেদ। তাঁর মতে, নিয়ন্ত্রক সংস্থা ও স্টক এক্সচেঞ্জকে এ বিষয়ে কার্যকর কর্মপরিকল্পনা নিতে হবে।

আবু আহমেদের মতে, যেসব কোম্পানির ব্যবসায় ফিরে আসার বাস্তব সম্ভাবনা রয়েছে, তাদের নির্দিষ্ট সময়সীমার মধ্যে পুনরুজ্জীবন পরিকল্পনা জমা দেওয়ার পাশাপাশি নিয়মিত অগ্রগতির তথ্য প্রকাশ করা উচিত। আর দীর্ঘদিন ধরে অকার্যকর থাকা প্রতিষ্ঠানগুলোর আর্থিক ও আইনি অবস্থা বিবেচনায় নিয়ে পৃথক সমাধানের ব্যবস্থা করা প্রয়োজন।

এদিকে বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের (বিএসইসি) চেয়ারম্যান মাসুদ খান সম্প্রতি জানিয়েছেন, দীর্ঘদিন ধরে অকার্যকর থাকা কোম্পানিগুলোর শেয়ার লেনদেন স্থগিত করার পরিকল্পনা করছে নিয়ন্ত্রক সংস্থা। তবে এ সিদ্ধান্ত কবে থেকে কার্যকর হতে পারে, সে বিষয়ে এখনো নির্দিষ্ট সময়সীমা জানানো হয়নি।

বন্ধ কোম্পানির সংখ্যা বৃদ্ধি, আর্থিক তথ্য প্রকাশে অনিয়ম এবং উৎপাদনহীন প্রতিষ্ঠানের শেয়ারদর বাড়ার ঘটনা পুঁজিবাজারে স্বচ্ছতা ও বিনিয়োগকারী সুরক্ষা নিশ্চিত করার বিষয়টিকে আরও গুরুত্বপূর্ণ করে তুলেছে।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here