“সন্ত্রাসের সামনে আপসহীন ওসি আবদুর রহিম—খুলশীতে আইনের শাসনের নতুন বার্তা”

By admin
6 Min Read

চট্টগ্রাম নগরীর খুলশী—আবাসিক এলাকা, গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান ও নানা শ্রেণি-পেশার মানুষের বসবাসের কারণে আইনশৃঙ্খলার দিক থেকে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি এলাকা। এই এলাকায় মাদক, সন্ত্রাস, চাঁদাবাজি ও অপরাধচক্রের বিরুদ্ধে কার্যকর পুলিশি তৎপরতা শুধু আইনশৃঙ্খলা রক্ষার বিষয় নয়; এটি সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা ও নগরজীবনের স্বস্তির সঙ্গেও সরাসরি সম্পৃক্ত। এই বাস্তবতায় খুলশী থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) মোহাম্মদ আবদুর রহিমের সাম্প্রতিক ভূমিকা বিশেষভাবে আলোচনায় এসেছে। গত ২৩ আগস্ট ২০২৬ সিএমপি কমিশনারের স্বাক্ষরিত আদেশে সিটি স্পেশাল ব্রাঞ্চ (সিটিএসবি)-এর পুলিশ পরিদর্শক মোহাম্মদ আবদুর রহিমকে খুলশী থানার ওসি হিসেবে দায়িত্ব দেওয়া হয়। অর্থাৎ তিনি দায়িত্ব নেওয়ার পর খুব অল্প সময়ের মধ্যেই একটি আলোচিত ও ঝুঁকিপূর্ণ আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির মুখোমুখি হন। সাম্প্রতিক ঘটনায় ওয়াকিল হোসেন ওরফে বগাকে গ্রেপ্তারের জন্য খুলশী থানা পুলিশ অভিযান চালায়। গণমাধ্যমের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, তাঁর বিরুদ্ধে একাধিক মামলা রয়েছে এবং একটি অস্ত্র মামলায় গ্রেপ্তারি পরোয়ানাও ছিল। একই সময়ে পাহাড়তলী ডিগ্রি কলেজের এক শিক্ষককে তুলে নিয়ে মারধর ও অধ্যক্ষকে ভিডিও কলে হুমকি দেওয়ার ঘটনায় করা মামলায়ও তাঁকে আসামি করা হয়েছে। পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী, অভিযানে গেলে বগার সহযোগীরা রাস্তায় ব্যারিকেড তৈরি করে পুলিশকে লক্ষ্য করে ইট-পাটকেল ও ককটেল সদৃশ বস্তু নিক্ষেপ করে এবং পুলিশের গাড়ি ভাঙচুর করে। এ ঘটনায় ওসি আবদুর রহিমসহ কয়েকজন পুলিশ সদস্য আহত হন। বিভিন্ন গণমাধ্যমে আহত পুলিশের সংখ্যা ছয় থেকে আটজন বলা হয়েছে—তাই সুনির্দিষ্ট সংখ্যা নিশ্চিত করতে সংশ্লিষ্ট পুলিশ নথিই চূড়ান্ত বিবেচ্য হওয়া উচিত। এখানেই প্রশ্নটি বড় হয়ে ওঠে—একজন পুলিশ কর্মকর্তা যখন আদালতের পরোয়ানাভুক্ত আসামিকে গ্রেপ্তার করতে গিয়ে নিজের ওপর হামলার ঝুঁকি নিয়েও অভিযানে নেতৃত্ব দেন, তখন তাঁকে কি একা রেখে দেওয়া যায়? আমার দৃষ্টিতে উত্তর—না। পুলিশের ওপর হামলা মানে রাষ্ট্রের আইন প্রয়োগের ক্ষমতার ওপর হামলা পুলিশ কোনো ব্যক্তির ব্যক্তিগত বাহিনী নয়। পুলিশ রাষ্ট্রের আইন প্রয়োগকারী প্রতিষ্ঠান। তাই দায়িত্ব পালনরত পুলিশের ওপর সংঘবদ্ধ হামলা, সরকারি গাড়ি ভাঙচুর কিংবা পুলিশ কর্মকর্তাকে হুমকি দেওয়ার ঘটনা কেবল একজন ওসিকে ভয় দেখানোর ঘটনা হিসেবে দেখলে ভুল হবে। এ ধরনের ঘটনা অপরাধীদের কাছে একটি বিপজ্জনক বার্তা দেয়—আইন প্রয়োগকারী সংস্থাকে ভয় দেখিয়ে আইনকে বাধাগ্রস্ত করা সম্ভব। এই জায়গাতেই আবদুর রহিমের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ। তিনি চাইলে পরিস্থিতির ঝুঁকি বিবেচনায় অভিযান থেকে পিছিয়ে যেতে পারতেন; কিন্তু পুলিশি দায়িত্বের অংশ হিসেবে পরোয়ানাভুক্ত আসামিকে গ্রেপ্তারের অভিযান পরিচালনা করেছেন—এমনটাই পুলিশের বক্তব্য ও প্রকাশিত সংবাদে উঠে এসেছে।
আবদুর রহিমের পেশাগত অভিজ্ঞতাও গুরুত্বপূর্ণ আবদুর রহিমের খুলশীতে দায়িত্ব নেওয়া আকস্মিক কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। এর আগে তিনি সিটিএসবি ও বাকলিয়া থানায় দায়িত্ব পালন করেছেন বলে বিভিন্ন সংবাদ প্রতিবেদনে তাঁর কর্মস্থলের তথ্য পাওয়া যায়। ২০২২ সালের জুনে সিটিএসবি থেকে তাঁকে বাকলিয়া থানার ওসি করা হয়েছিল। অর্থাৎ মাঠপর্যায়ের থানা পুলিশিং এবং গোয়েন্দা/বিশেষ শাখার কাজ—দুই ধরনের অভিজ্ঞতাই তাঁর পেশাগত পথচলায় রয়েছে। একজন ওসির জন্য এ ধরনের অভিজ্ঞতা অপরাধ মোকাবিলা, তথ্য সংগ্রহ, অভিযান পরিকল্পনা ও পরিস্থিতি মূল্যায়নে সহায়ক হতে পারে। সাহসী অফিসারদের পাশে দাঁড়ানো কেন জরুরি আজকের বাংলাদেশে মাদক, কিশোর অপরাধ, সন্ত্রাস, চাঁদাবাজি ও সংঘবদ্ধ অপরাধের বিরুদ্ধে লড়াই করতে শুধু পুলিশ সদস্য বাড়ালেই হবে না; প্রয়োজন সৎ, দক্ষ, সাহসী ও পেশাদার নেতৃত্ব। একজন ওসি যদি অপরাধীর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে গিয়ে হুমকির মুখে পড়েন, তাহলে তাঁর ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের দায়িত্ব হলো তাঁকে প্রাতিষ্ঠানিকভাবে সহযোগিতা করা, নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং আইনের আওতায় অপরাধীদের বিরুদ্ধে যথাযথ ব্যবস্থা নেওয়া। একই সঙ্গে পুলিশকেও মনে রাখতে হবে—সাহস মানে আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়া নয়; সাহস মানে আইনের সীমার মধ্যে থেকে অপরাধীর বিরুদ্ধে দৃঢ় থাকা। সাংবাদিকদেরও দায়িত্ব আছে। এখানে আমাদের সাংবাদিক সমাজেরও একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। সন্ত্রাসীর বিরুদ্ধে সংবাদ প্রকাশ মানে কাউকে ব্যক্তিগতভাবে হেয় করা নয়। বরং অভিযোগ, মামলা, আদালতের পরোয়ানা, পুলিশের বক্তব্য, প্রত্যক্ষদর্শীর বক্তব্য এবং সংশ্লিষ্ট পক্ষের বক্তব্য যাচাই করে সত্য তুলে ধরা। সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে কলম ধরতে হবে, কিন্তু সেই কলম হতে হবে তথ্যনির্ভর। কোনো অপরাধী রাজনৈতিক পরিচয় ব্যবহার করুক, সামাজিক প্রভাব খাটাক কিংবা অর্থের ক্ষমতা দেখাক—আইনের দৃষ্টিতে অপরাধের বিচার একই হওয়া উচিত। একইভাবে কোনো পুলিশ কর্মকর্তার বিরুদ্ধেও অভিযোগ থাকলে তার তদন্ত ও জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে। কারণ আইনের শাসন মানে পুলিশের পক্ষ নেওয়া নয়; আইনের পক্ষে দাঁড়ানো। আবদুর রহিমকে নিয়ে আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ কথা। আবদুর রহিমকে নিয়ে সাম্প্রতিক সংবাদে যেমন তাঁর সন্ত্রাসবিরোধী অভিযানের সাহসী ভূমিকা এসেছে, তেমনি অতীত দায়িত্বকাল ঘিরে কিছু অভিযোগও বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছে। সেসব অভিযোগকে আদালতে প্রমাণিত অপরাধ হিসেবে উপস্থাপন করা ঠিক হবে না; সংশ্লিষ্ট অভিযোগের বিষয়ে তদন্ত, সরকারি নথি ও জবাবদিহির প্রক্রিয়াই চূড়ান্ত বিষয়।
তাই একজন সাংবাদিক হিসেবে আমার অবস্থান পরিষ্কার—যে কর্মকর্তা অপরাধ দমনে সাহস দেখাবেন, তাঁর সাহসী ভূমিকার প্রশংসা করতে হবে; আবার তাঁর বিরুদ্ধে কোনো অভিযোগ থাকলে সেটিও তথ্য-প্রমাণের ভিত্তিতে অনুসন্ধান করতে হবে। এই ভারসাম্যই পেশাদার সাংবাদিকতার শক্তি। আজ চট্টগ্রামের মানুষ এমন পুলিশ দেখতে চায়, যারা অপরাধীর পরিচয় দেখে নয়—অপরাধ দেখে ব্যবস্থা নেবে। এমন ওসি চায়, যিনি থানায় বসে শুধু মামলা পরিচালনা করবেন না; প্রয়োজন হলে মাঠে গিয়ে অপরাধীদের বিরুদ্ধে অভিযান পরিচালনা করবেন। মোহাম্মদ আবদুর রহিমের খুলশী অধ্যায় তাই এখন একটি বড় পরীক্ষার জায়গা। তিনি যদি আইনের সীমার মধ্যে থেকে মাদক, সন্ত্রাস, চাঁদাবাজি ও অপরাধচক্রের বিরুদ্ধে ধারাবাহিক অভিযান চালিয়ে যেতে পারেন, সাধারণ মানুষের আস্থা অর্জন করতে পারেন এবং একই সঙ্গে পুলিশের পেশাদারিত্ব ও জবাবদিহি বজায় রাখতে পারেন—তাহলে তাঁর দায়িত্ব পালন নিঃসন্দেহে একটি ইতিবাচক দৃষ্টান্ত হয়ে উঠতে পারে।
সন্ত্রাসীর হুমকিতে পুলিশ পিছিয়ে যাবে না, আবার পুলিশও আইনের বাইরে যাবে না—এই হোক আমাদের প্রত্যাশা। আবদুর রহিমের মতো সাহসী কর্মকর্তাদের প্রয়োজন আছে; তবে সেই সাহসের সঙ্গে চাই সততা, পেশাদারিত্ব, মানবিকতা এবং আইনের প্রতি পূর্ণ আনুগত্য। আর আমাদের সাংবাদিকদের কলম? সেই কলম কোনো ব্যক্তি বা দলের জন্য নয়—সন্ত্রাসমুক্ত সমাজ, নিরাপদ নাগরিক এবং আইনের শাসনের পক্ষে থাকুক।

Share This Article
Leave a Comment