“চান্দগাঁও থানার অফিসার ইনচার্জ জসিম উদ্দিন—অপবাদ পেরিয়ে কর্মের মঞ্চে এক সাহসী প্রত্যাবর্ত-

By admin
15 Min Read

-মো. কামাল উদ্দিনঃ
কিছু মানুষের জীবন কেবল জীবনের গল্প নয়—একটি সময়ের দলিল। কিছু মানুষের কর্মজীবন শুধু চাকরি, পদোন্নতি, বদলি কিংবা দায়িত্ব পালনের ধারাবাহিকতা নয়—তার ভেতরে লুকিয়ে থাকে সময়ের রাজনীতি, ক্ষমতার পরিবর্তন, মানুষের ভুল বোঝাবুঝি, অপবাদ, বৈষম্য, প্রতিকূলতা এবং শেষ পর্যন্ত নিজের যোগ্যতা দিয়ে ফিরে আসার এক দীর্ঘ উপাখ্যান। চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশের বর্তমান চান্দ গাঁও থানার অফিসার ইনচার্জ মোহাম্মদ জসিম উদ্দিনকে আমি তেমনই একজন মানুষ হিসেবে দেখি। তাকে আমি চিনি তিন দশকেরও বেশি সময় ধরে। তার পুলিশজীবনের শুরু থেকে বিভিন্ন সময়ের নানা ঘটনা খুব কাছ থেকে দেখেছি। একজন তরুণ পুলিশ কর্মকর্তা হিসেবে যে জসিম উদ্দিনকে দেখেছিলাম, তার মধ্যে তখনই ছিল আত্মবিশ্বাস, সাহস, দায়িত্ববোধ এবং নিজের অবস্থানে দৃঢ় থাকার এক অদ্ভুত মানসিক শক্তি। সময় বদলেছে, সরকার বদলেছে, রাজনৈতিক বাস্তবতা বদলেছে, প্রশাসনিক পরিবেশ বদলেছে—কিন্তু তার কর্মজীবনের পথ কখনোই খুব মসৃণ ছিল না। বরং তার পথের কোথাও ছিল রাজনৈতিক পরিচয়ের ছায়া, কোথাও ছিল সন্দেহের দৃষ্টি, কোথাও ছিল প্রশাসনিক সিদ্ধান্তের ধাক্কা, আবার কোথাও ছিল এমন কিছু মানুষ—যারা হয়তো তার পেশাগত অগ্রযাত্রাকে সহজভাবে নিতে পারেননি। কিন্তু একটি মানুষকে চেনার সবচেয়ে ভালো উপায় হলো তার বিরুদ্ধে কী বলা হয়েছে তা নয়; বরং প্রতিকূলতার মধ্যেও সে কীভাবে কাজ করেছে, সেটি দেখা। আর সেখানেই জসিম উদ্দিনের গল্পটি অন্যরকম। সেই সময়—যখন একটি সাক্ষাৎও হয়ে উঠতে পারত অপরাধ জসিম উদ্দিনের কর্মজীবনের শুরুর দিকের একটি ঘটনা আমার স্মৃতিতে আজও অত্যন্ত স্পষ্ট। দেশ তখন রাজনৈতিকভাবে অস্থির। ক্ষমতার রাজনীতি, রাজনৈতিক বিরোধ, প্রশাসনিক চাপ—সবকিছু মিলিয়ে সময়টি ছিল অত্যন্ত সংবেদনশীল। সেই সময় চট্টগ্রামের বহদ্দারহাটে বিএনপির প্রভাবশালী নেতা সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরীর একটি জনসভা আয়োজনের বিষয় আসে। পুলিশের অনুমতির দায়িত্ব আমার ওপর ছিল। তখন জসিম উদ্দিন চান্দগাঁও থানায় এসআই হিসেবে কর্মরত। সেই সূত্রে একদিন আমি ও এম.এ. হাশেম রাজুকে সঙ্গে নিয়ে জসিম উদ্দিন সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরীর বাসভবনে গিয়েছিলেন। আজকের দিনে ঘটনাটি হয়তো খুব সাধারণ মনে হতে পারে। কিন্তু তৎকালীন রাজনৈতিক বাস্তবতায় একটি রাজনৈতিক নেতার বাসায় একজন পুলিশ কর্মকর্তার যাওয়া কতটা সংবেদনশীল হিসেবে দেখা হতে পারে, তা তখনকার পরিস্থিতি জানলেই বোঝা যায়। ঘটনাটি গোয়েন্দা পর্যায়েও আলোচনায় আসে। জসিম উদ্দিনকে চাকরি থেকে সরিয়ে দেওয়ার চেষ্টা হয়েছিল—এমন পরিস্থিতির কথাও আমার স্মৃতিতে রয়েছে। প্রশাসনের বিভিন্ন পর্যায়ে নানা আলোচনা শুরু হয়েছিল। আমি নিজেও তখন বিষয়টি সামাল দেওয়ার চেষ্টা করেছি। কারণ আমি জানতাম—একজন তরুণ পুলিশ কর্মকর্তার জন্য এমন একটি ঘটনা তার পুরো কর্মজীবনের ওপর ছায়া ফেলতে পারে। তাকে সতর্ক করা হয়েছিল। চাকরি হারানোর আশঙ্কার কথাও বলা হয়েছিল। কিন্তু জসিম উদ্দিনের উত্তর ছিল অত্যন্ত সরল— “আমি কোনো অপরাধ করিনি। একজন জাতীয় পর্যায়ের রাজনৈতিক নেতার সঙ্গে দেখা করতে গিয়েছি। যদি এ কারণে চাকরি চলে যায়, তবুও আমি অনুতপ্ত নই।” একজন তরুণ কর্মকর্তার মুখ থেকে এমন কথা শোনা সহজ নয়। কারণ সাহসের কথা বলা সহজ; কিন্তু চাকরি হারানোর ভয় সামনে রেখে সাহসী থাকা কঠিন। সেই দিন জসিম উদ্দিন হয়তো বুঝেছিলেন—তার সামনে দীর্ঘ পথ। আর সেই পথ সবসময় ফুলে সাজানো থাকবে না। রাজনীতি বদলেছে, সময় বদলেছে—কিন্তু ছায়া থেকে গেছে এরপর বাংলাদেশের রাজনীতিতে বহু পরিবর্তন এসেছে। সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরী গ্রেফতার হয়েছেন, বিচার হয়েছে এবং তার মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হয়েছে। কিন্তু সেই সময়ের রাজনৈতিক উত্তাপের স্মৃতি অনেকের কর্মজীবনে দীর্ঘ ছায়া ফেলেছিল। জসিম উদ্দিনও তার বাইরে ছিলেন না।চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনার সময় তার ছাত্রদলের রাজনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ততার কথা জানা যায়। কিন্তু একজন মানুষ যখন পুলিশ বাহিনীতে যোগ দেন, তখন তার প্রথম ও প্রধান পরিচয় হওয়া উচিত—তিনি একজন পুলিশ কর্মকর্তা।রাষ্ট্রীয় দায়িত্ব পালনের সময় তার কাছে দল-মত নয়, আইনই হবে প্রধান।আমার দীর্ঘ পরিচয়ের জায়গা থেকে বলতে পারি—জসিম উদ্দিনকে আমি তার পুলিশজীবনে একজন পেশাদার কর্মকর্তা হিসেবেই দেখেছি।কিন্তু অতীতের রাজনৈতিক পরিচয় অনেক সময় মানুষের পিছু ছাড়ে না।একটি পরিচয়কে বারবার সামনে এনে একজন মানুষের বর্তমান কর্মদক্ষতাকে অস্বীকার করার প্রবণতা আমাদের সমাজে নতুন নয়।জসিম উদ্দিনের ক্ষেত্রেও এমন নানা আলোচনা, সন্দেহ, অভিযোগ ও বৈষম্যের কথা দীর্ঘদিন ধরে শুনে এসেছি। কিন্তু প্রশ্ন হলো—একজন মানুষের বর্তমানকে কি তার অতীতের একটি অধ্যায় দিয়ে চিরদিন বিচার করা যায়?আমার উত্তর—না।চান্দগাঁওয়ের প্রথম অধ্যায়—তারপর হঠাৎ ছিটকে পড়া জসিম উদ্দিন একসময় চান্দগাঁও থানার অফিসার ইনচার্জ হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন।জাতীয় নির্বাচনের আগে একটি রাজনৈতিক দলের প্রার্থীর অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে তাকে হঠাৎ দায়িত্ব থেকে প্রত্যাহার করে পুলিশ লাইনে সংযুক্ত করা হয়।একজন কর্মকর্তার জন্য এ ধরনের সিদ্ধান্ত শুধু প্রশাসনিক আদেশ নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে থাকে আত্মসম্মান, পেশাগত মর্যাদা এবং দীর্ঘদিনের কাজের মূল্যায়ন।স্বাভাবিকভাবেই তখন প্রশ্ন উঠেছিল—অভিযোগের প্রকৃত ভিত্তি কী?অভিযোগ কি প্রমাণিত হয়েছিল?নাকি রাজনৈতিক পরিবেশ ও অভিযোগের চাপ একটি প্রশাসনিক সিদ্ধান্তকে প্রভাবিত করেছিল?আমি কোনো অভিযোগকে সত্য বা মিথ্যা ঘোষণা করছি না। কারণ সেটি তদন্ত ও প্রমাণের বিষয়।কিন্তু এটুকু বলা যায়—একজন কর্মকর্তার বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠলেই তার পুরো কর্মজীবনকে বাতিল করে দেওয়া যায় না।পরবর্তীতে তৎকালীন সিএমপি কমিশনার হাসিব আজিজ বিষয়টি পর্যালোচনা করে জসিম উদ্দিনকে নগর গোয়েন্দা বিভাগে (ডিবি) পদায়ন করেন। এই পদায়নকে আমি তখন একজন কর্মকর্তার প্রতি প্রশাসনিক আস্থার একটি গুরুত্বপূর্ণ সংকেত হিসেবে দেখেছিলাম।আরও তাৎপর্যপূর্ণ বিষয় হলো, চট্টগ্রাম থেকে বিদায় নেওয়ার আগে হাসিব আজিজ তাকে পুনরায় ওসি করার আগ্রহ প্রকাশ করেছিলেন বলে আমার জানা।জসিম উদ্দিন তখন সেই সুযোগ গ্রহণ করেননি।মানুষের কর্মজীবনে এমন মুহূর্তও আসে—যেখানে পদ নয়, নিজের অবস্থান ও মানসিক প্রস্তুতিই বড় হয়ে ওঠে।পাহাড়তলী ও বায়েজিদ—কাজ দিয়ে নিজেকে পুনরায় প্রমাণপরবর্তীতে জসিম উদ্দিন পাহাড়তলী থানার অফিসার ইনচার্জের দায়িত্ব পান। সেখানে তিনি আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের পাশাপাশি জনবান্ধব পুলিশিংয়ের দিকে গুরুত্ব দেন।তারপর দায়িত্ব পান বায়েজিদ থানায়।
একটি থানার ওসি হিসেবে একজন কর্মকর্তার প্রকৃত পরীক্ষা হয় মাঠে।কাগজের রিপোর্টে নয়।
মানুষের অভিযোগ শুনতে কতটা প্রস্তুত—
অপরাধীর বিরুদ্ধে কতটা কঠোর—
নিরপরাধ মানুষের প্রতি কতটা মানবিক—
মামলা তদন্তে কতটা পেশাদার—
ক্ষমতাবান ও সাধারণ মানুষের ক্ষেত্রে আইন প্রয়োগে কতটা ভারসাম্যপূর্ণ—
এসবই একজন ওসির প্রকৃত পরিচয়।
জসিম উদ্দিনের কর্মজীবনের এই অধ্যায়গুলোই তার পেশাগত সক্ষমতার আসল জায়গা।
তারপর আবার চান্দগাঁও—একটি প্রত্যাবর্তন
২০২৬ সালের জুনে সিএমপিতে একাধিক থানায় ওসি পর্যায়ে রদবদল হয়। ১৫ জুনের অফিস আদেশে ডিবি-দক্ষিণের নিরস্ত্র পুলিশ পরিদর্শক জসিম উদ্দিনকে চান্দগাঁও থানার নতুন অফিসার ইনচার্জ হিসেবে পদায়ন করা হয়।এই একটি সিদ্ধান্তের ভেতরে আমি অনেক বড় একটি অর্থ দেখি।কারণ একই থানায় একজন কর্মকর্তা আবার ফিরে আসা সবসময় সাধারণ ঘটনা নয়।বিশেষ করে সেই কর্মকর্তা যদি অতীতে একই দায়িত্ব থেকে প্রত্যাহৃত হয়ে থাকেন, তাহলে ফিরে আসাটা হয়ে ওঠে আরও তাৎপর্যপূর্ণ।এটি শুধু বদলি নয়।এটি হতে পারে আস্থার পুনঃপ্রতিষ্ঠা।এটি হতে পারে অভিজ্ঞতার পুনর্মূল্যায়ন।এটি হতে পারে অতীতের বিতর্কের ওপর বর্তমান কর্মদক্ষতার জয়।আর সেই জায়গাতেই পুলিশ কমিশনার হাসান মো. শওকত আলীর সিদ্ধান্তটি আলোচনার দাবি রাখে।
শওকত আলীর সিদ্ধান্ত—ব্যক্তি নয়, কর্মজীবনকে মূল্যায়নের বার্তাএকজন পুলিশ কমিশনারের হাতে প্রতিদিন অসংখ্য প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত থাকে।কাকে কোথায় দায়িত্ব দেওয়া হবে, কে কোন থানার জন্য উপযুক্ত, কার অভিজ্ঞতা কোথায় কাজে লাগবে—এসব সিদ্ধান্তের প্রতিটি ক্ষেত্রেই থাকে প্রতিষ্ঠান ও জনস্বার্থের প্রশ্ন।শওকত আলী জসিম উদ্দিনকে চান্দগাঁও থানার দায়িত্ব দেওয়ার মাধ্যমে অন্তত একটি ইতিবাচক বার্তা দিয়েছেন একজন কর্মকর্তাকে শুধু পুরোনো অভিযোগ দিয়ে নয়, তার সামগ্রিক কর্মজীবন ও সক্ষমতা দিয়েও মূল্যায়ন করা প্রয়োজন।এই সিদ্ধান্তের সবচেয়ে বড় সৌন্দর্য এখানেই।কারণ প্রশাসনে যদি কোনো কর্মকর্তা ভুল করেন, তদন্ত হবে, জবাবদিহি হবে, আইনানুগ ব্যবস্থা হবে।কিন্তু যদি অভিযোগের আড়ালে একজন দক্ষ কর্মকর্তাকে অকারণে থামিয়ে দেওয়া হয়, তাহলে ক্ষতিগ্রস্ত হন শুধু ওই কর্মকর্তা নন—ক্ষতিগ্রস্ত হয় প্রতিষ্ঠানও।আবারও একটি কুচক্রী মহল?জসিম উদ্দিন চান্দগাঁও থানার দায়িত্ব নেওয়ার পরও তাকে ঘিরে নানা ধরনের নেতিবাচক প্রচারণা ও অভিযোগের কথা শোনা যাচ্ছে।এখানে একটি বিষয় অত্যন্ত পরিষ্কারভাবে বলা দরকার—অভিযোগ থাকলে তদন্ত হোক।প্রমাণ থাকলে ব্যবস্থা হোক।কিন্তু অপপ্রচার কোনোভাবেই তদন্তের বিকল্প হতে পারে না।কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠী যদি রাজনৈতিক বা ব্যক্তিগত স্বার্থে একজন কর্মরত পুলিশ কর্মকর্তাকে হেয় করার চেষ্টা করে, সেটি যেমন অনৈতিক, তেমনি প্রশাসনিক পরিবেশের জন্যও ক্ষতিকর।একজন কর্মকর্তা ভালো কাজ করলে তার কাজের প্রশংসা হবে—এটাই স্বাভাবিক।আর যদি কোনো ভুল করেন, তারও জবাবদিহি থাকবে।কিন্তু একজন মানুষকে আগে থেকেই অপরাধী বানিয়ে ফেলা কোনো সভ্য প্রশাসনিক সংস্কৃতির অংশ হতে পারে না।আমি মনে করি, জসিম উদ্দিনের ক্ষেত্রেও একই নীতি প্রযোজ্য হওয়া উচিত।আওয়ামী লীগ আমলের রাজনৈতিক বাস্তবতার কথাও ভুলে গেলে চলবে না জসিম উদ্দিনের কর্মজীবনের সবচেয়ে কঠিন দিকগুলোর একটি ছিল রাজনৈতিক পরিচয়ের ছায়া। একটি নির্দিষ্ট রাজনৈতিক সময়ের সঙ্গে তার অতীতকে বারবার মিলিয়ে দেখা হয়েছে—এমন অভিযোগ তার পরিচিত মহলে রয়েছে।তবে কোনো কর্মকর্তার বিরুদ্ধে রাজনৈতিক বৈষম্য হয়েছে কি না, তার চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত অবশ্যই নিরপেক্ষ তদন্ত ও প্রামাণ্য নথির ভিত্তিতে হওয়া উচিত।কিন্তু বাংলাদেশের রাজনৈতিক বাস্তবতা নিয়ে যারা দীর্ঘদিন কাজ করেছেন, তারা জানেন—ক্ষমতার সঙ্গে প্রশাসনিক সম্পর্ক কতটা জটিল হতে পারে।একটি সরকার আসে, অন্যটি যায়।
কিন্তু প্রশাসনিক ফাইলে থেকে যায় পুরোনো মন্তব্য।একটি অভিযোগ আসে, কিন্তু তার প্রভাব থেকে যায় বছরের পর বছর।একজন কর্মকর্তা একসময় যে রাজনৈতিক বাস্তবতার মধ্যে কাজ করেছেন, তার ছায়া পরবর্তী সময়েও তাকে অনুসরণ করতে পারে।জসিম উদ্দিনের জীবনকে আমি সেই বাস্তবতার একটি উদাহরণ হিসেবেই দেখি।একজন পুলিশ কর্মকর্তার সবচেয়ে বড় জবাব—তার কাজ
জসিম উদ্দিনের সামনে এখন সবচেয়ে বড় সুযোগ হলো—কথার জবাব কথায় না দিয়ে কাজ দিয়ে দেওয়া।চান্দগাঁও একটি গুরুত্বপূর্ণ এলাকা।এখানে সাধারণ মানুষের প্রত্যাশা অনেক।
অপরাধ দমন করতে হবে।মাদক ও কিশোর অপরাধের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে হবে। চাঁদাবাজি ও সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে কঠোর হতে হবে। নারী, শিশু ও দুর্বল জনগোষ্ঠীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে।
মামলা ও জিডি গ্রহণে মানুষের হয়রানি কমাতে হবে।
থানাকে মানুষের আস্থার জায়গায় পরিণত করতে হবে।
একজন ওসির সাফল্য তখনই, যখন থানার দরজায় আসা একজন সাধারণ মানুষ মনে করবেন—
“আমি এখানে ন্যায়বিচারের আশায় আসতে পারি।”
জসিম উদ্দিনের সামনে এখন সেই পরীক্ষাই।
আমি কেন জসিম উদ্দিনের পক্ষে কথা বলছি?
এই প্রশ্নও কেউ করতে পারেন।
উত্তর খুব সহজ।
আমি তাকে দীর্ঘদিন ধরে চিনি।
আমি তার জীবনের উত্থান-পতনের অনেক অধ্যায় দেখেছি।
তার বিরুদ্ধে অভিযোগ থাকলে তদন্ত হোক—আমি তার পক্ষেও বলব।
তার ভুল থাকলে ভুল বলব।
কিন্তু তাকে না জেনে, তার কর্মজীবন না দেখে, শুধু রাজনৈতিক পরিচয়ের পুরোনো ছায়া সামনে এনে যদি কেউ তার বর্তমান পেশাদারিত্বকে অস্বীকার করতে চান, সেখানে আমি প্রশ্ন তুলব।
কারণ সাংবাদিকতার একটি বড় দায়িত্ব হলো—যেখানে অন্যায় দেখব, সেখানে প্রশ্ন করা।
আর যেখানে একজন মানুষকে অন্যায়ভাবে বিচার করা হচ্ছে বলে মনে হবে, সেখানে তার কথাটিও তুলে ধরা।
এটি কোনো ব্যক্তির অন্ধ সমর্থন নয়।
এটি ন্যায্য মূল্যায়নের দাবি।
জসিম উদ্দিনের জন্য এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ
চান্দগাঁও থানায় ফিরে এসে জসিম উদ্দিন যেন কোনোভাবেই অতীতের বিতর্ককে বর্তমানের ওপর প্রভাব ফেলতে না দেন—এটাই আমার প্রত্যাশা।
তিনি যেন আরও স্বচ্ছ হন।
আরও জনবান্ধব হন।
আইনের প্রয়োগে আরও নিরপেক্ষ হন।
রাজনৈতিক পরিচয় নয়—আইনকে সামনে রাখেন।
ব্যক্তি নয়—অপরাধকে দেখেন।
ক্ষমতাবান নয়—ন্যায়কে গুরুত্ব দেন।
আর সবচেয়ে বড় কথা, থানাকে যেন কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর প্রভাবমুক্ত রেখে জনগণের থানায় পরিণত করেন।
তাহলেই তার বিরুদ্ধে থাকা সব অভিযোগের সবচেয়ে শক্তিশালী জবাব তিনি নিজেই দিতে পারবেন।
অপবাদ ক্ষণস্থায়ী, কর্মই স্থায়ী
মানুষের বিরুদ্ধে অপবাদ ছড়ানো খুব সহজ।
একটি পোস্ট, একটি মন্তব্য, একটি গুজব—মুহূর্তেই হাজার মানুষের কাছে পৌঁছে যায়।
কিন্তু একজন মানুষের ৩০ বছরের কর্মজীবন কি একটি পোস্ট দিয়ে মুছে ফেলা যায়?
যায় না।
একজন মানুষের সুনাম তৈরি হতে সময় লাগে বছর, কখনো দশক।
সেই সুনাম ধ্বংস করতে কয়েক মিনিটই যথেষ্ট।
কিন্তু ইতিহাসের বিচারে শেষ পর্যন্ত টিকে থাকে কাজ।
আজ যে মানুষকে নিয়ে অপবাদ, কাল হয়তো সেই মানুষটির কাজই হয়ে উঠবে তার সবচেয়ে বড় পরিচয়।
জসিম উদ্দিনের ক্ষেত্রেও সময়ই সবচেয়ে বড় বিচারক।
প্রত্যাবর্তনের এই গল্প এখানেই শেষ নয়
চান্দগাঁও থানায় জসিম উদ্দিনের প্রত্যাবর্তন তাই আমার কাছে একটি অসমাপ্ত গল্প।
একজন তরুণ এসআই থেকে একজন অভিজ্ঞ পুলিশ কর্মকর্তা হয়ে ওঠার গল্প।
রাজনৈতিক উত্তাপের মধ্য দিয়ে পথ চলার গল্প।
অভিযোগের মুখে দাঁড়িয়ে থাকার গল্প।
দায়িত্ব হারানোর গল্প।
আবার দায়িত্ব ফিরে পাওয়ার গল্প।
পাহাড়তলী ও বায়েজিদে কাজ করার গল্প।
ডিবিতে পেশাগত অভিজ্ঞতা অর্জনের গল্প।
আর শেষ পর্যন্ত আবার চান্দগাঁও থানায় ফিরে আসার গল্প।
এটি একজন মানুষের গল্প, যিনি হয়তো সবসময় জিতেছেন এমন নয়—কিন্তু প্রতিবার পড়ে গিয়ে আবার দাঁড়ানোর চেষ্টা করেছেন।
শেষ কথা—এবার বিচার হোক কাজ দিয়ে
পুলিশ কমিশনার শওকত আলীর সিদ্ধান্তের সবচেয়ে বড় মূল্য এখানেই যে, একজন কর্মকর্তাকে আবার একটি গুরুত্বপূর্ণ থানার দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে।
এখন জসিম উদ্দিনের দায়িত্ব—এই আস্থার মর্যাদা রাখা।
আর আমাদের দায়িত্ব—আগে থেকে রায় না দিয়ে তার কাজ দেখা।
তিনি ভালো করলে প্রশংসা করা।
ভুল করলে প্রশ্ন করা।
অভিযোগ হলে তদন্ত দাবি করা।
কিন্তু অপপ্রচারকে সত্যের বিকল্প না বানানো।
কারণ একজন পুলিশ কর্মকর্তা কোনো দলের নয়—তিনি রাষ্ট্রের কর্মকর্তা।
তার দায়িত্ব জনগণের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা।
আর একজন সাংবাদিকের দায়িত্ব—সত্যকে খুঁজে বের করা, প্রশ্ন করা এবং ন্যায্যতার পক্ষে দাঁড়ানো।
তাই আজ আমি জসিম উদ্দিনকে নিয়ে শুধু প্রশংসা করতে চাই না; আমি তাকে একটি চ্যালেঞ্জও দিতে চাই—
জসিম, তোমার বিরুদ্ধে যারা কথা বলছে, তাদের জবাব কথায় দিও না।
তোমার থানার দরজা সাধারণ মানুষের জন্য খুলে দাও।
অপরাধীর বিরুদ্ধে আইন প্রয়োগ করো, নিরপরাধের পাশে দাঁড়াও।
রাজনীতির ঊর্ধ্বে ওঠো, ব্যক্তিগত বিরোধের ঊর্ধ্বে ওঠো।
তোমার অতীতকে নয়—তোমার বর্তমান কাজকে কথা বলতে দাও।
তাহলেই একদিন মানুষ বলবে—
একসময় তাকে নিয়ে অনেক কথা হয়েছিল,
অনেক অভিযোগ উঠেছিল,
অনেক দরজা বন্ধ হয়েছিল;
কিন্তু শেষ পর্যন্ত মানুষটি তার কাজ দিয়ে নিজের পরিচয় তৈরি করেছিলেন।
আর সেই পরিচয় হবে—
একজন পেশাদার পুলিশ কর্মকর্তা।
একজন দায়িত্বশীল মানুষ।
একজন কর্মনিষ্ঠ কর্মকর্তা।
এবং প্রতিকূলতার মধ্যেও ফিরে আসতে জানা একজন জসিম উদ্দিন।
সময়ের কাছে শেষ পর্যন্ত কোনো অপপ্রচার টেকে না।
টিকে থাকে সত্য।
টিকে থাকে কর্ম।
টিকে থাকে মানুষের ভালোবাসা।
আর ইতিহাস—
সে কখনো তাড়াহুড়ো করে রায় দেয় না।
সে অপেক্ষা করে।
তারপর একদিন খুব নীরবে বলে দেয়—কে সত্যিই কী ছিল।
—মো. কামাল উদ্দিন
লেখক, সাংবাদিক ও টেলিভিশন উপস্থাপক

Share This Article
Leave a Comment