
— মো. কামাল উদ্দিন একজন লেখকের জীবনে কিছু মুহূর্ত থাকে, যা কেবল স্মৃতি নয়—প্রেরণার অনন্ত উৎস হয়ে থাকে। সাহিত্য মানুষের আত্মার ভাষা। সেই ভাষার বিশ্বজনীন মহাসম্মেলনে অংশ নেওয়ার সুযোগ প্রতিটি লেখকের জন্য এক বিরল সৌভাগ্য। আমার জীবনেও তেমনই এক গৌরবময় অধ্যায় যুক্ত হয়েছিল ২০১২ সালে, যখন দক্ষিণ কোরিয়ার ঐতিহাসিক শহর গোয়াংজুতে অনুষ্ঠিত ৭৮তম পেন ইন্টারন্যাশনাল কংগ্রেস (বিশ্ব লেখক সম্মেলন)-এ বাংলাদেশের প্রতিনিধি হিসেবে অংশগ্রহণ করি। পৃথিবীর প্রায় প্রতিটি মহাদেশ থেকে আগত লেখক, কবি, গবেষক, অনুবাদক ও সাহিত্য-সংগঠকদের মিলনমেলায় উপস্থিত ছিলেন বিশ্বের বহু খ্যাতিমান সাহিত্যিক। তাঁদের মধ্যে সবচেয়ে আকর্ষণের কেন্দ্রবিন্দু ছিলেন ১৯৮৬ সালে সাহিত্যে নোবেল পুরস্কারপ্রাপ্ত নাইজেরিয়ার কিংবদন্তি লেখক ওল সোয়িঙ্কা। তাঁকে প্রথমবার কাছ থেকে দেখা, তাঁর সঙ্গে করমর্দন করা, আলাপচারিতায় অংশ নেওয়া এবং একই মঞ্চে সময় কাটানো—আমার সাহিত্যজীবনের এক অমূল্য সম্পদ। প্রথম দেখাতেই মনে হয়েছিল, তিনি যেন সংগ্রাম, প্রজ্ঞা ও মানবতার এক জীবন্ত প্রতীক। কৃষ্ণবর্ণ মুখমণ্ডল, শুভ্র সাদা চুল ও দাড়ি, গভীর অথচ শান্ত চোখ, পরিমিত হাসি এবং অনাড়ম্বর ব্যক্তিত্ব—সব মিলিয়ে তিনি ছিলেন একজন সত্যিকারের বিশ্বমানব। তাঁর মধ্যে কোনো অহংকার ছিল না; বরং প্রতিটি লেখকের প্রতি ছিল সমান সম্মান ও আন্তরিকতা। প্রতিবাদের কলম, মানবতার কণ্ঠস্বর ওল সোয়িঙ্কা ১৯৩৪ সালের ১৩ জুলাই নাইজেরিয়ার ইয়োরুবা পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। শৈশব থেকেই তিনি শিক্ষা, সংস্কৃতি ও মানবিক মূল্যবোধের পরিবেশে বেড়ে ওঠেন। পরে ইংল্যান্ডের লিডস বিশ্ববিদ্যালয়ে ইংরেজি সাহিত্য অধ্যয়ন করেন এবং নাট্যকার, কবি, প্রাবন্ধিক ও ঔপন্যাসিক হিসেবে বিশ্বজুড়ে পরিচিতি লাভ করেন। নাইজেরিয়ার স্বাধীনতার পর তিনি দেশের রাজনৈতিক ও সামাজিক বাস্তবতা নিয়ে নির্ভীকভাবে লিখতে শুরু করেন। ক্ষমতার অপব্যবহার, সামরিক শাসন, দুর্নীতি ও মানবাধিকার লঙ্ঘনের বিরুদ্ধে তাঁর লেখনী ছিল আপসহীন। সত্য উচ্চারণের এই সাহসের কারণেই ১৯৬৭ সালে তাঁকে গ্রেপ্তার করা হয় এবং টানা ২২ মাস কারাবন্দি থাকতে হয়। কিন্তু কারাগারের দেয়াল তাঁর বিবেককে বন্দি করতে পারেনি। নোবেলজয়ীর চোখে বাংলা সাহিত্য আলাপচারিতার এক পর্যায়ে আমি বাংলাদেশের সাহিত্য ও সংস্কৃতির কথা তুলে ধরি। বিস্ময়ের সঙ্গে লক্ষ্য করলাম, বাংলা সাহিত্য সম্পর্কে তাঁর জ্ঞান অত্যন্ত সমৃদ্ধ। তিনি বলেন, বাংলা ভাষা বিশ্বের অন্যতম সমৃদ্ধ সাহিত্যভাষা। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, কাজী নজরুল ইসলাম এবং বাংলা সাহিত্যের বহু লেখক সম্পর্কে তিনি অবগত। ভাষা আন্দোলন ও বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ সম্পর্কেও তাঁর গভীর আগ্রহ ছিল। তিনি অত্যন্ত আন্তরিকভাবে বলেন— “বাংলাদেশের সাহিত্য বিশ্বসাহিত্যে আরও শক্ত অবস্থান তৈরি করতে পারে। সত্য ও মানবতার পক্ষে লেখালেখি কখনো বন্ধ করা যাবে না।”
তাঁর কথাগুলো আজও আমার কানে বাজে। তিনি বাংলাদেশ সফরের আগ্রহও প্রকাশ করেছিলেন এবং সাহিত্য কিংবা জনকল্যাণমূলক যেকোনো আয়োজনে আমন্ত্রণ জানালে সুযোগ হলে আসবেন বলে আশ্বাস দিয়েছিলেন। গোয়াংজুতে বিশ্বের লেখকদের মিলনমেলা ২০১২ সালের ১০ সেপ্টেম্বর গোয়াংজুর হুন্দাই হোটেলে বিশ্ব লেখক সম্মেলনের আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন হয়। উদ্বোধনী অধিবেশন থেকেই নোবেলজয়ী সাহিত্যিকদের বক্তব্য শোনার জন্য ছিল ব্যাপক আগ্রহ। তাঁদের প্রতিটি বক্তব্যে উঠে আসে মতপ্রকাশের স্বাধীনতা, মানবাধিকার, শান্তি, গণতন্ত্র এবং সাহিত্যের সামাজিক দায়বদ্ধতার প্রশ্ন। প্রতিদিন সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত সেমিনার, আলোচনা, সাহিত্যপাঠ, মতবিনিময় ও সাংস্কৃতিক আয়োজন চলত। ভাষা ভিন্ন হলেও অনুভূতির ভাষা ছিল এক—মানুষের মুক্তি, সত্যের জয় এবং সাহিত্যের স্বাধীনতা। বাংলাদেশের গর্বিত প্রতিনিধিদল বাংলাদেশ প্রতিনিধি দলে নেতৃত্ব দেন একুশে পদকপ্রাপ্ত লেখিকা ফরিদা হোসাইন। তাঁর সঙ্গে ছিলেন সাংবাদিক এরশাদ মজুমদার, ড. সৈয়দা আইরিন পারভিন, লেখক মহিউদ্দিন, লেখক আলী আহামদসহ আরও অনেকে। ফরিদা হোসাইন অত্যন্ত দক্ষতার সঙ্গে বাংলাদেশের সাহিত্য ও সংস্কৃতিকে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে উপস্থাপন করেন। তিনি বিশ্বখ্যাত লেখকদের বাংলাদেশ সফরের আমন্ত্রণ জানান। সাংবাদিক এরশাদ মজুমদারের আন্তরিক ব্যবহার বিদেশি লেখকদের সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক গড়ে তুলতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। অটোগ্রাফের দীর্ঘ সারি, অথচ নেই কোনো অহংকার প্রতিটি বিরতিতে নোবেলজয়ী সাহিত্যিকদের সঙ্গে ছবি তোলা ও অটোগ্রাফ নেওয়ার জন্য দীর্ঘ সারি তৈরি হতো। আশ্চর্যের বিষয়, ওল সোয়িঙ্কা কখনো বিরক্ত হননি। তিনি ধৈর্য ধরে সবার সঙ্গে কথা বলেছেন, ছবি তুলেছেন এবং হাসিমুখে শুভেচ্ছা জানিয়েছেন। বিশ্বজোড়া খ্যাতির শিখরে থেকেও তিনি ছিলেন অত্যন্ত সাধারণ একজন মানুষ। এই বিনয়ই তাঁকে আরও বড় করে তুলেছে। স্বাধীন লেখনীই সভ্যতার শক্তি সম্মেলনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ আলোচ্য বিষয় ছিল—লেখকের স্বাধীনতা। বক্তারা বলেন, রাষ্ট্র কিংবা ক্ষমতাসীন গোষ্ঠীর ভয়ে যদি লেখক সত্য লিখতে না পারেন, তবে সমাজ অন্ধকারে ডুবে যাবে। ওল সোয়িঙ্কা নিজের জীবনের অভিজ্ঞতা তুলে ধরে বলেন, সত্যের পক্ষে দাঁড়াতে হলে ত্যাগ স্বীকারের প্রস্তুতি থাকতে হবে। তাঁর ২২ মাসের কারাবাস সেই সত্যেরই প্রমাণ। এই কথাগুলো আমার লেখকজীবনে গভীর প্রভাব ফেলেছে। আমি উপলব্ধি করেছি, একজন লেখকের সবচেয়ে বড় শক্তি তাঁর বিবেক এবং সত্যের প্রতি দায়বদ্ধতা। একজন বিশ্বমানবের কাছ থেকে পাওয়া শিক্ষা কোরিয়ার সেই কয়েকটি দিন আমাকে নতুনভাবে সাহিত্যকে চিনতে শিখিয়েছে। বুঝতে শিখেছি—সাহিত্য কেবল সৌন্দর্যের চর্চা নয়; এটি মানুষের স্বাধীনতা, ন্যায়বিচার, মানবতা এবং প্রতিবাদেরও ভাষা। আজও যখন সেই মুহূর্তগুলোর কথা মনে পড়ে, মনে হয় আমি যেন বিশ্বসাহিত্যের জীবন্ত ইতিহাসের এক উজ্জ্বল অধ্যায়ের সাক্ষী ছিলাম। ওল সোয়িঙ্কার সঙ্গে সেই করমর্দন, সেই আলাপ, সেই অনুপ্রেরণা আজও আমার কলমকে সাহস জোগায়। তাঁর বিনয়, প্রজ্ঞা ও সত্যের প্রতি অবিচল অবস্থান আমাকে বারবার মনে করিয়ে দেয়—একজন প্রকৃত লেখক কখনো ক্ষমতার নয়, তিনি মানুষের পক্ষের মানুষ। এই স্মৃতি শুধু আমার ব্যক্তিগত অর্জন নয়; এটি বাংলাদেশের সাহিত্যচর্চার সঙ্গে বিশ্বসাহিত্যের এক সেতুবন্ধনের স্মারক। ভবিষ্যৎ প্রজন্মের লেখকদের জন্যও এই অভিজ্ঞতা একটি অনুপ্রেরণার দলিল হয়ে থাকবে। (এই স্মৃতিচারণের মূল রূপ ২০১৫ সালের একুশে বইমেলায় প্রকাশিত আমি মো. কামাল উদ্দিনের লেখা গ্রন্থ ‘সমকালীন কথার’-এ প্রকাশিত হয়েছিল।