“রাজপথ থেকে ইতিহাসঃ বৃহত্তর চট্টগ্রামের ন্যায্য অধিকার প্রতিষ্ঠার আন্দোলন ১৯৯২ থেকে ১৯৯৬: সংগ্রাম, নেতৃত্ব ও স্বপ্নের এক অমর ইতিহাস-

By admin
7 Min Read

 -মো. কামাল উদ্দিন  ইতিহাস কেবল রাজা-বাদশাহ, রাষ্ট্রপ্রধান কিংবা ক্ষমতাবানদের হাতে রচিত হয় না। ইতিহাস রচনা করেন সাধারণ মানুষ—যারা অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়ান, বৈষম্যের প্রতিবাদ করেন, অধিকার আদায়ের জন্য আপসহীন সংগ্রাম করেন। সময়ের প্রবাহে অনেক নাম হারিয়ে যায়, কিন্তু মানুষের কল্যাণে পরিচালিত আন্দোলনের স্মৃতি কখনো হারায় না। ইতিহাসের পাতায় তা চিরকাল বেঁচে থাকে প্রেরণার উৎস হয়ে। আজ বহু বছর পর ১৯৯২ সালের সেই সাদা-কালো ছবিটির দিকে তাকালে মনে হয়, এটি কেবল একটি ছবি নয়—এটি আমার জীবনের এক অগ্নিঝরা সময়ের দলিল, একটি স্বপ্নবাজ প্রজন্মের প্রতিচ্ছবি এবং বৃহত্তর চট্টগ্রামের ন্যায্য অধিকার প্রতিষ্ঠার সংগ্রামের নীরব সাক্ষী। চট্টগ্রামের ঐতিহ্যবাহী জে. এম. সেন হলের সেই মঞ্চে আমি বক্তব্য রাখছিলাম বৃহত্তর চট্টগ্রাম উন্নয়ন ছাত্র সংগ্রাম কমিটির কেন্দ্রীয় সভাপতি হিসেবে। মঞ্চের সামনে ছিল হাজারো তরুণের দীপ্ত চোখ। তাদের চোখে ছিল পরিবর্তনের স্বপ্ন, কণ্ঠে ছিল প্রতিবাদের বজ্রধ্বনি, আর হৃদয়ে ছিল একটি উন্নত, বৈষম্যহীন ও মর্যাদাপূর্ণ চট্টগ্রাম গড়ার প্রত্যয়। স্বৈরাচার পতনের পরও বৈষম্যের অবসান হয়নি ১৯৯০ সালের গণঅভ্যুত্থানের মাধ্যমে স্বৈরাচার এরশাদ সরকারের পতন ঘটে। দেশে গণতন্ত্র ফিরে আসে। জনগণের ভোটে বিএনপি সরকার ক্ষমতায় আসে। আমরা ভেবেছিলাম, এবার হয়তো দেশের প্রতিটি অঞ্চল সমান গুরুত্ব পাবে। কিন্তু বাস্তবতা ছিল ভিন্ন। জাতীয় অর্থনীতির চালিকাশক্তি, দেশের প্রধান সমুদ্রবন্দর, শিল্প ও বাণিজ্যের প্রাণকেন্দ্র এবং বৈদেশিক বাণিজ্যের প্রবেশদ্বার হওয়া সত্ত্বেও বৃহত্তর চট্টগ্রাম তখনও উন্নয়ন বৈষম্যের শিকার। শিক্ষা, স্বাস্থ্য, বিদ্যুৎ, যোগাযোগ, অবকাঠামো, প্রশাসনিক বিকেন্দ্রীকরণ—সব ক্ষেত্রেই ছিল দীর্ঘদিনের অবহেলা। এই বঞ্চনার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করতেই আমরা গড়ে তুলেছিলাম বৃহত্তর চট্টগ্রাম উন্নয়ন ছাত্র সংগ্রাম কমিটি। আমাদের আন্দোলনের লক্ষ্য ছিল না কোনো ব্যক্তিগত স্বার্থ, ক্ষমতা কিংবা পদ-পদবি। আমাদের একমাত্র লক্ষ্য ছিল বৃহত্তর চট্টগ্রামের মানুষের ন্যায্য অধিকার প্রতিষ্ঠা।
আন্দোলনের অর্থও সংগ্রহ করেছি নিজেরাই আজকের প্রজন্ম হয়তো বিশ্বাসই করবে না—একটি আন্দোলন পরিচালনার জন্য আমাদের কাছে কোনো বড় অর্থের উৎস ছিল না। আমরা চেরাগী পাহাড়ের নকশা দিয়ে ক্যালেন্ডার ছাপিয়েছি। সেই ক্যালেন্ডার হাতে নিয়ে রাজপথে, অলিগলিতে, দোকানে দোকানে, অফিসে অফিসে ঘুরে বিক্রি করেছি। সেই সামান্য অর্থ দিয়েই ছাপিয়েছি লিফলেট, পোস্টার, ব্যানার; আয়োজন করেছি সংবাদ সম্মেলন, সভা-সমাবেশ, গণসংযোগ এবং আন্দোলনের প্রতিটি কর্মসূচি। আমরা বিশ্বাস করতাম—যে আন্দোলনের অর্থ জনগণ দেয়, সেই আন্দোলনের শক্তিও জনগণ।


চেরাগী পাহাড়ের সেই দিনগুলো
আজকের চেরাগী পাহাড় সবুজ, প্রাণবন্ত ও সৌন্দর্যে ভরপুর। কিন্তু তখনকার চেরাগী পাহাড় ছিল ঝোপঝাড়ে ঘেরা, অনেকটাই জঙ্গলাকীর্ণ এবং অবহেলিত।  পরবর্তীকালে তৎকালীন মেয়র মীর মোহাম্মদ নাছির উদ্দীন সেখানে চট্টগ্রামের ঐতিহ্যকে ধারণ করে স্মৃতিস্তম্ভ নির্মাণ এবং সৌন্দর্যবর্ধনের উদ্যোগ নেন। আজ যখন সেই চেরাগী পাহাড় দেখি, তখন সেই ক্যালেন্ডার বিক্রির দিনগুলোর কথা মনে পড়ে যায়। একটি শক্তিশালী কর্মীবাহিনী ছিল আমাদের সবচেয়ে বড় সম্পদ একজন নেতার শক্তি কখনো একার নয়। তার শক্তি তার সহযোদ্ধারা। আমার পাশে ছিল একঝাঁক মেধাবী, সাহসী, ত্যাগী ও আদর্শবান কর্মী। তারা দিন-রাত পরিশ্রম করেছে। পোস্টার সেঁটেছে, লিফলেট বিলি করেছে, মিছিল সংগঠিত করেছে, সভা সফল করেছে। অনেক সময় নিজেদের পকেটের টাকা খরচ করে আন্দোলনের কাজ চালিয়েছে। আজ তাদের অনেকেই দেশের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে আছেন। কেউ সচিব, কেউ বিচারক, কেউ ব্যারিস্টার, কেউ আইনজীবী, কেউ চিকিৎসক, কেউ অধ্যাপক, কেউ সাংবাদিক, কেউ লেখক, কেউ সফল ব্যবসায়ী, কেউ শিল্পোদ্যোক্তা, আবার কেউ প্রবাসে থেকেও দেশের সুনাম বয়ে নিয়ে চলেছেন। তাদের প্রত্যেককে আমি আজও গভীর শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করি। কারণ তারা কোনো ব্যক্তির জন্য নয়—একটি আদর্শের জন্য সংগ্রাম করেছিলেন।
১৯৯৪ সালের ঐতিহাসিক আন্দোলন
দীর্ঘ প্রস্তুতির পর ১৯৯৪ সালের ২ জুন চট্টগ্রাম প্রেসক্লাবের অস্থায়ী কার্যালয়ে সংবাদ সম্মেলনের মাধ্যমে আমরা তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়াকে এক মাসের সময় দিই। আমরা স্পষ্ট ঘোষণা করি—দাবি বাস্তবায়ন না হলে ১৯৯৪ সালের ৯ জুলাই বৃহত্তর চট্টগ্রামে অর্ধদিবস হরতাল পালিত হবে। সেই কর্মসূচি সফলভাবে পালিত হয়েছিল। এটি কোনো সহিংস কর্মসূচি ছিল না; এটি ছিল একটি অঞ্চলের ন্যায্য অধিকার প্রতিষ্ঠার শান্তিপূর্ণ গণআন্দোলন। আমাদের দশ দফা দাবি ছিল ভবিষ্যৎ উন্নয়নের রূপরেখা

আমরা দাবি জানিয়েছিলাম—
চট্টগ্রাম, কক্সবাজার ও পার্বত্য চট্টগ্রামের জন্য পৃথক শিক্ষা বোর্ড প্রতিষ্ঠা।  শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ভর্তির সুযোগ বৃদ্ধি এবং পর্যাপ্ত শিক্ষক নিয়োগ। ঐতিহ্যবাহী কলেজগুলোকে বিশ্ববিদ্যালয় কলেজে উন্নীত করা। চট্টগ্রামকে বাংলাদেশের বাণিজ্যিক রাজধানী ঘোষণা। চট্টগ্রাম বিমানবন্দরকে পূর্ণাঙ্গ আন্তর্জা তিক বিমানবন্দরে উন্নীত করা। চট্টগ্রাম বন্দরের রাজস্বের ন্যায্য অংশ চট্টগ্রামের উন্নয়নে ব্যয়।
বৈষম্যমূলক ভ্যাট ও করনীতি প্রত্যাহার। কক্সবাজার পর্যন্ত আধুনিক রেললাইন সম্প্রসারণ। শিল্প ও ব্যবসা রক্ষায় নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করা। জলাবদ্ধতামুক্ত আধুনিক চট্টগ্রাম গড়ে তোলা। এই দাবিগুলো কোনো রাজনৈতিক স্লোগান ছিল না; এগুলো ছিল বৃহত্তর চট্টগ্রামের ভবিষ্যৎ উন্নয়নের রূপরেখা।

 

 

 

আন্দোলনের অর্জন
আজ ইতিহাসের দিকে তাকালে দেখা যায়, আমাদের অনেক দাবিই পরবর্তীকালে বাস্তবায়নের পথে এগিয়েছে বা বাস্তবায়িত হয়েছে। বিশেষ করে পৃথক শিক্ষা বোর্ড প্রতিষ্ঠা, কক্সবাজার পর্যন্ত রেললাইন সম্প্রসারণ, বিমানবন্দরের উন্নয়ন এবং চট্টগ্রামের অবকাঠামোগত উন্নয়ন—এসব বিষয়ে পরবর্তী সময়ে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হয়েছে। অবশ্য এখনও অনেক দাবি পুরোপুরি বাস্তবায়িত হয়নি। কিন্তু কোনো আন্দোলনের সাফল্য কেবল তাৎক্ষণিক ফলাফলে নয়; বরং ভবিষ্যতের নীতিনির্ধারণে তার প্রভাবেও মূল্যায়িত হয়।

আমার ব্যক্তিগত অনুভূতি
আজ যখন সেই ছবিটির দিকে তাকাই, তখন মনে হয়—জীবনের সবচেয়ে মূল্যবান সময়গুলো আমি কাটিয়েছি মানুষের জন্য, চট্টগ্রামের জন্য, ন্যায্য অধিকারের জন্য। রাজপথ আমাকে শিখিয়েছে—সংগ্রাম মানে কেবল স্লোগান নয়; সংগ্রাম মানে দায়িত্ব, ত্যাগ, ধৈর্য, সততা এবং মানুষের প্রতি ভালোবাসা। আমার জীবনের সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি কোনো পদ-পদবি নয়; মানুষের বিশ্বাস, সহযোদ্ধাদের ভালোবাসা এবং একটি ন্যায়ভিত্তিক আন্দোলনের নেতৃত্ব দেওয়ার সৌভাগ্য। আজকের তরুণদের কাছে আমার একটাই আহ্বান—অধিকার আদায়ের সংগ্রাম যেন সবসময় গণতান্ত্রিক, শান্তিপূর্ণ, যুক্তিনির্ভর এবং মানুষের কল্যাণকেন্দ্রিক হয়। ব্যক্তির জন্য নয়, দেশের জন্য; ক্ষমতার জন্য নয়, মানুষের জন্য; বিভাজনের জন্য নয়, উন্নয়ন ও ন্যায়ের জন্য কাজ করতে হবে।  ইতিহাসের প্রতিটি অর্জনের পেছনে কিছু নিরলস মানুষের ঘাম, শ্রম, ত্যাগ এবং সাহস লুকিয়ে থাকে। আমরা সেই ইতিহাসের একটি ক্ষুদ্র অংশ ছিলাম। সেই দিনের রাজপথ আজ ইতিহাস। সেই ইতিহাসের প্রতিটি পদচিহ্ন আজও আমাকে মনে করিয়ে দেয়—স্বপ্ন দেখতে হয়, অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়াতে হয়, মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য আপসহীন থাকতে হয়। কারণ ইতিহাস কখনো নীরব দর্শকদের নয়; ইতিহাস রচনা করেন তারাই, যারা সত্য, ন্যায় এবং মানুষের কল্যাণের পক্ষে দৃঢ় অবস্থান নিতে সাহস করেন।
লেখকঃ প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি ছাত্র সংগ্রাম কমিটি-

Share This Article
Leave a Comment