কোটা আন্দোলন থেকে গণঅভ্যুত্থান: বৈষম্যের অবসান নাকি নতুন বৈষম্যের জন্ম? ইতিহাস, বাস্তবতা ও দুই বছর পরের মূল্যায়ন

By admin
7 Min Read

মো. কামাল উদ্দিনঃ
বাংলাদেশের ইতিহাসে কিছু আন্দোলন কেবল একটি দাবি বা ইস্যুর মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না; সময়ের প্রবাহে তা একটি জাতির আশা-আকাঙ্ক্ষা, ক্ষোভ, বঞ্চনা ও পরিবর্তনের আকাঙ্ক্ষার প্রতীকে পরিণত হয়। কোটা সংস্কার আন্দোলনও ছিল তেমনই একটি আন্দোলন, যা শুরু হয়েছিল সরকারি চাকরিতে বৈষম্য দূর করার দাবিতে, কিন্তু শেষ পর্যন্ত তা রাষ্ট্রীয়, রাজনৈতিক ও সামাজিক পরিবর্তনের এক বড় অধ্যায়ে পরিণত হয়।
এই লেখার শুরুতেই আমি কোটা আন্দোলনকে কেন্দ্র করে সংঘটিত সহিংসতা, সংঘর্ষ ও অস্থিরতায় নিহত সকল মানুষের স্মৃতির প্রতি গভীর শ্রদ্ধা জানাই। যেকোনো মৃত্যুই বেদনাদায়ক। একটি প্রাণহানি শুধু একটি পরিবারের নয়, একটি জাতিরও ক্ষতি। আমরা এমন বাংলাদেশ চাই, যেখানে মত প্রকাশের অধিকার থাকবে, কিন্তু তার মূল্য কোনো তরুণ প্রাণকে জীবন দিয়ে দিতে হবে না। কোটা আন্দোলনের শেকড় কোথায়?
বাংলাদেশে কোটা ব্যবস্থা নতুন নয়। এর শিকড় পাকিস্তান আমলে। পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠীকে প্রশাসন ও রাষ্ট্রীয় কাঠামোর সঙ্গে যুক্ত করার জন্য ১৯৪৯ সালে কোটা ব্যবস্থা চালু করা হয়। স্বাধীনতার পর বাংলাদেশেও সেই ধারা অব্যাহত থাকে। ১৯৭২ সালে স্বাধীন বাংলাদেশে সরকারি চাকরিতে জেলা, মুক্তিযোদ্ধা, নারীসহ বিভিন্ন শ্রেণির জন্য কোটা চালু হয়। পরবর্তীতে ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী ও প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদেরও এই ব্যবস্থার অন্তর্ভুক্ত করা হয়। কোটার মূল দর্শন ছিল—যারা পিছিয়ে আছে তাদের এগিয়ে আনা। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে প্রশ্ন উঠতে শুরু করে, কোটা কি তার মূল উদ্দেশ্য পূরণ করছে, নাকি নতুন ধরনের বৈষম্য সৃষ্টি করছে?
কেন ক্ষোভ জমেছিল? বাংলাদেশের লাখ লাখ শিক্ষার্থী বছরের পর বছর কঠোর পরিশ্রম করে চাকরির প্রস্তুতি নেয়। কিন্তু অনেকের অভিযোগ ছিল, মেধার চেয়ে কোটার হার বেশি হওয়ায় সাধারণ প্রতিযোগিতার সুযোগ সংকুচিত হয়ে পড়ছে। বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে তখন একটি প্রশ্ন ঘুরপাক খেতে থাকে— “রাষ্ট্র কি নাগরিককে তার যোগ্যতা দিয়ে মূল্যায়ন করবে, নাকি পরিচয়ের ভিত্তিতে?” এই প্রশ্ন থেকেই ধীরে ধীরে আন্দোলনের জন্ম।
২০১৮: প্রথম বড় বিস্ফোরণ ২০১৮ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়কে কেন্দ্র করে কোটা সংস্কার আন্দোলন দেশব্যাপী ছড়িয়ে পড়ে। শিক্ষার্থীরা ৫ দফা দাবি উত্থাপন করে। আন্দোলন শান্তিপূর্ণভাবে শুরু হলেও পরে নানা সংঘাত, হামলা, গ্রেপ্তার এবং রাজনৈতিক উত্তেজনার সৃষ্টি হয়। অবশেষে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা জাতীয় সংসদে কোটা বাতিলের ঘোষণা দেন। পরে প্রজ্ঞাপন জারি করে প্রথম ও দ্বিতীয় শ্রেণির সরকারি চাকরিতে কোটা বাতিল করা হয়। অনেকেই ভেবেছিলেন, এখানেই বিতর্কের অবসান ঘটল। কিন্তু বাস্তবে সেটি ছিল আরেকটি অধ্যায়ের সূচনা। ২০২৪: আদালতের রায় ও নতুন উত্তেজনা কোটা বাতিলের প্রজ্ঞাপনকে চ্যালেঞ্জ করে আদালতে মামলা হয়। ২০২৪ সালে আদালতের একটি রায়ের পর কোটা ব্যবস্থা পুনর্বহালের প্রশ্ন সামনে আসে। এরপর নতুন করে আন্দোলনে নামে শিক্ষার্থীরা।
এই সময় আন্দোলনের ভাষা বদলে যায়। কোটা প্রশ্নের পাশাপাশি সামনে আসে— কর্মসংস্থানের সংকট দুর্নীতি প্রশাসনিক বৈষম্য রাজনৈতিক অসহিষ্ণুতা মতপ্রকাশের স্বাধীনতা রাষ্ট্রীয় জবাবদিহিতা একটি দাবিভিত্তিক আন্দোলন ধীরে ধীরে বৃহত্তর গণআন্দোলনের রূপ নিতে শুরু করে। আন্দোলন থেকে গণঅভ্যুত্থান বাংলাদেশের ইতিহাসে বহুবার দেখা গেছে, একটি নির্দিষ্ট দাবিকে কেন্দ্র করে শুরু হওয়া আন্দোলন পরে বৃহত্তর রাজনৈতিক রূপ নিয়েছে। ভাষা আন্দোলন, শিক্ষা আন্দোলন, ১৯৬৯-এর গণঅভ্যুত্থান কিংবা ১৯৯০-এর স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনের মতোই কোটা আন্দোলনও একসময় কেবল কোটার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকেনি। সাধারণ মানুষের ক্ষোভ, তরুণ সমাজের হতাশা, অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা এবং রাজনৈতিক বাস্তবতা একত্রিত হয়ে আন্দোলনকে নতুন মাত্রা দেয়। পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে পৌঁছে যে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার কাঠামোতেই বড় পরিবর্তন ঘটে। সরকার পতনের পর মানুষের প্রত্যাশা যখন পরিবর্তন আসে, তখন মানুষ নতুন স্বপ্ন দেখে। তরুণরা ভেবেছিল—দুর্নীতি কমবে। স্বজনপ্রীতি বন্ধ হবে। যোগ্যতার মূল্যায়ন হবে।
চাকরির সুযোগ বাড়বে। প্রশাসন হবে আরও স্বচ্ছ। রাজনৈতিক প্রতিহিংসা কমবে। বৈষম্য দূর হবে। এই প্রত্যাশাগুলোই ছিল আন্দোলনের প্রকৃত শক্তি। দুই বছর পর: কী বদলেছে? আজ, আন্দোলনের দুই বছর পর দাঁড়িয়ে আমাদের সাহসের সঙ্গে আত্মসমালোচনা করতে হবে। প্রশ্ন হচ্ছে—কর্মসংস্থানের সংকট কি কমেছে? লাখ লাখ শিক্ষিত তরুণ এখনও চাকরির অপেক্ষায়। অনেকেই উচ্চশিক্ষা শেষ করেও কাঙ্ক্ষিত কর্মসংস্থান পাচ্ছেন না। দুর্নীতি কি কমেছে? দুর্নীতির ধরন পরিবর্তিত হতে পারে, কিন্তু দুর্নীতির বিরুদ্ধে সংগ্রাম এখনও চলমান। স্বজনপ্রীতি কি শেষ হয়েছে? অনেক ক্ষেত্রেই অভিযোগ রয়েছে যে প্রভাবশালী গোষ্ঠীর সুবিধা গ্রহণ এখনও পুরোপুরি বন্ধ হয়নি। প্রশাসন কি আরও জবাবদিহিমূলক হয়েছে? কিছু ইতিবাচক পরিবর্তন এলেও জনগণের প্রত্যাশা এখনও অনেক বেশি। বৈষম্য কি কমেছে? এই প্রশ্নের উত্তর এখনো সুস্পষ্ট নয়। বৈষম্যের প্রকৃত চেহারা আমরা প্রায়ই বৈষম্য বলতে কেবল কোটা বুঝি। কিন্তু বাস্তবতা আরও গভীর। একজন গ্রামের দরিদ্র কৃষকের সন্তান ও শহরের ধনী পরিবারের সন্তানের সুযোগ কি সমান? একজন পাহাড়ি অঞ্চলের শিক্ষার্থী ও রাজধানীর নামী প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীর প্রতিযোগিতা কি একই অবস্থান থেকে শুরু হয়? একজন বেকার মেধাবী তরুণ ও রাজনৈতিক পরিচয়ধারী প্রার্থীর সুযোগ কি সমান? যদি উত্তর “না” হয়, তাহলে বৈষম্যের বিরুদ্ধে সংগ্রাম এখনও শেষ হয়নি।মুক্তিযুদ্ধ, কোটা ও ইতিহাসের প্রতি দায়িত্ব মুক্তিযুদ্ধ বাংলাদেশের সবচেয়ে গৌরবময় অধ্যায়। মুক্তিযোদ্ধাদের অবদানকে সম্মান জানানো এবং রাষ্ট্রীয়ভাবে স্বীকৃতি দেওয়া অবশ্যই প্রয়োজন। একই সঙ্গে নতুন প্রজন্মের মেধা, শ্রম ও প্রতিযোগিতার ন্যায্য সুযোগ নিশ্চিত করাও রাষ্ট্রের দায়িত্ব। সুতরাং এই বিতর্ককে কখনোই মুক্তিযুদ্ধ বনাম নতুন প্রজন্মের সংঘাতে পরিণত করা উচিত নয়।
কারণ মুক্তিযুদ্ধের চেতনার অন্যতম মূল কথা ছিল ন্যায়, সাম্য ও মানবিক মর্যাদা। ইতিহাসের শিক্ষা
ইতিহাস আমাদের শিখিয়েছে ক্ষমতা চিরস্থায়ী নয়। কোনো আন্দোলনও চূড়ান্ত নয়। প্রতিটি আন্দোলনের পরে আসে মূল্যায়নের সময়। আজ সেই মূল্যায়নের সময় এসেছে, যারা আন্দোলন করেছিলেন, তাদেরও প্রশ্ন করতে হবে— আমরা যে স্বপ্ন দেখেছিলাম, তার কতটুকু বাস্তবায়িত হয়েছে? আর যারা ক্ষমতায় আছেন, তাদেরও ভাবতে হবে— পরিবর্তনের যে প্রত্যাশা মানুষ করেছিল, তা কতটুকু পূরণ হয়েছে? কোটা আন্দোলন বাংলাদেশের ইতিহাসে একটি যুগান্তকারী ঘটনা। এটি শুধু একটি চাকরি নীতির বিরুদ্ধে আন্দোলন ছিল না; এটি ছিল ন্যায়বিচার, সমান সুযোগ এবং মর্যাদার প্রশ্নে তরুণ সমাজের এক উচ্চারণ। কিন্তু ইতিহাসের সবচেয়ে বড় সত্য হলো—কোনো আন্দোলনের সাফল্য সরকার পরিবর্তনে নয়, মানুষের জীবন পরিবর্তনে। আজও যদি বেকারত্ব থাকে, দুর্নীতি থাকে, বৈষম্য থাকে, অন্যায় থাকে তাহলে সংগ্রাম শেষ হয়নি। দুই বছর পর দাঁড়িয়ে তাই নতুন করে প্রশ্ন জাগে কোটা আন্দোলন কি শুধু একটি সরকারের পতনের ইতিহাস, নাকি এটি বৈষম্যহীন বাংলাদেশ গড়ার দীর্ঘ যাত্রার একটি অধ্যায় মাত্র?
এই প্রশ্নের উত্তর ভবিষ্যৎ প্রজন্ম দেবে। আর ইতিহাস তার নিরপেক্ষ বিচারের মাধ্যমে একদিন সবকিছুর মূল্যায়ন করবে।

Share This Article
Leave a Comment