
মো. কামাল উদ্দিন মানুষের জীবনে কিছু পরিচয় আসে খুব ধীরে—নদীর জোয়ারের মতো। শব্দ করে নয়, ঘোষণা দিয়ে নয়; নিঃশব্দে, অদৃশ্য কোনো পথ ধরে। অথচ একসময় সেই উপস্থিতি হৃদয়ের ভেতর এমনভাবে জায়গা করে নেয় যে, তাকে আর অচেনা বলে মনে হয় না। ছবিটির দিকে তাকালে প্রথমেই চোখে পড়ে এক তরুণী। আকাশি নীল পটভূমির সামনে দাঁড়িয়ে আছে সে। গায়ে ফুলেল নকশার পোশাক, দীর্ঘ কালো চুল বাতাসে স্থির হয়ে আছে, আর দৃষ্টিতে যেন এক অদ্ভুত প্রশান্তি। তার চোখ দুটি দূরের কোনো অদেখা স্বপ্নের দিকে তাকিয়ে আছে। মুখে নেই কোনো কৃত্রিম হাসি, নেই সাজানো অভিব্যক্তি। যেন জীবনের সহজ সৌন্দর্য নিজেই তার মুখাবয়বে এসে আশ্রয় নিয়েছে। এই ছবির মানুষটির নাম আদ্রিতা আরোহী। কিন্তু এই গল্প কোনো ছবির সৌন্দর্যের গল্প নয়। এটি একজন মানুষের অন্তর্লোকের গল্প। এটি সেই মানবিকতার গল্প, যা আজকের ব্যস্ত পৃথিবীতে ক্রমশ বিরল হয়ে উঠছে। জীবনের দীর্ঘ পথচলায় আমি অসংখ্য মানুষের সঙ্গে পরিচিত হয়েছি। সাংবাদিকতার পেশা আমাকে মানুষের সুখ-দুঃখ, হাসি-কান্না, সংগ্রাম আর সাফল্যের অগণিত গল্পের সামনে দাঁড় করিয়েছে। প্রতিদিন নতুন মুখ দেখেছি, নতুন সম্পর্ক তৈরি হয়েছে, আবার হারিয়েও গেছে। কিন্তু সব মানুষ স্মৃতিতে জায়গা পায় না। কিছু মানুষ থাকে, যারা সময়ের ভিড়ে হারিয়ে যায়। আর কিছু মানুষ থাকে, যারা খুব অল্প সময়েই হৃদয়ের গভীরে একটি স্থায়ী ঠিকানা তৈরি করে নেয়। আদ্রিতা তেমনই একজন। পরিচয়ের শুরু ছিল খুব সাধারণ। হয়তো একটি ছবি, হয়তো কয়েকটি কথোপকথন। কিন্তু ধীরে ধীরে সেই সাধারণতার ভেতর থেকে একজন অসাধারণ মানুষকে আবিষ্কার করতে শুরু করলাম। মানুষকে চেনার সবচেয়ে বড় উপায় তার কথায় নয়, তার আচরণে। অনেক মানুষ বড় বড় কথা বলতে পারে, কিন্তু সবাই মানুষের পাশে দাঁড়াতে পারে না। সবাই খোঁজ নিতে পারে না। সবাই অন্যের ক্লান্তি বুঝতে পারে না। কিন্তু আদ্রিতার মধ্যে আমি সেই বিরল গুণটি দেখেছি। ব্যস্ত দিনের শেষে হঠাৎ একটি ছোট্ট বার্তা— “আজ কেমন আছেন?” কিংবা— “এত কাজ করেন, নিজের শরীরেরও খেয়াল রাখবেন।” বাক্যগুলো হয়তো খুব সাধারণ। কিন্তু পৃথিবীর সবচেয়ে মূল্যবান অনুভূতিগুলোও তো সাধারণ শব্দের মধ্যেই লুকিয়ে থাকে। একজন মানুষ যখন বিনিময়ে কিছু না চেয়েও আরেকজন মানুষের ভালো থাকার খবর নেয়, তখন সেই আন্তরিকতার মূল্য কোনো উপহার, কোনো অর্জন কিংবা কোনো সম্মানের চেয়েও বড় হয়ে ওঠে। খুলনার মেয়ে আদ্রিতা। খুলনার নাম শুনলেই আমার চোখে ভেসে ওঠে রূপসা নদীর শান্ত জলরাশি, সুন্দরবনের সবুজ নীরবতা, কুয়াশায় মোড়ানো ভোর আর প্রকৃতির অপার মমতা। মনে হয়, সেই প্রকৃতির কিছু সৌন্দর্য যেন তার ভেতরেও বাস করে। কারণ প্রকৃত সৌন্দর্য কখনো মুখে থাকে না। সৌন্দর্য থাকে মানুষের ব্যবহারে। সৌন্দর্য থাকে তার হৃদয়ের কোমলতায়। সৌন্দর্য থাকে তার মানবিকতায়।
এই ছবিতে যে হাসি দেখা যাচ্ছে, সেটি হয়তো একটি মুহূর্তের। কিন্তু একজন মানুষের মনের সৌন্দর্য তার পুরো জীবনকে আলোকিত করে রাখে। আর আদ্রিতার মধ্যে আমি সেই আলোর উপস্থিতি অনুভব করেছি। একজন লেখক হিসেবে আমি সমাজের অনেক অন্ধকার দেখেছি। দেখেছি ক্ষমতার অহংকার, অন্যায়ের দম্ভ, স্বার্থের নির্মমতা। দেখেছি মানুষের চোখের জল, দেখেছি স্বপ্ন ভাঙার শব্দ। কিন্তু সেই অন্ধকারের মাঝেও কিছু মানুষ হঠাৎ আলোর মতো এসে দাঁড়ায়। তারা পৃথিবী বদলে দেয় না। তারা ইতিহাস লেখে না। তারা কোনো অলৌকিক কাজও করে না। কিন্তু তাদের উপস্থিতি মানুষকে মনে করিয়ে দেয়—মানবতা এখনো বেঁচে আছে। আদ্রিতা আমার কাছে সেই মানবিক আলোর প্রতীক। ছবির পেছনে বিস্তৃত নীল আকাশ যেন তার ব্যক্তিত্বেরই প্রতিচ্ছবি। বিশাল, নির্মল, নিরাভরণ। আর তার দৃষ্টির গভীরে যেন লুকিয়ে আছে এক নীরব আত্মবিশ্বাস—যে আত্মবিশ্বাস মানুষকে বড় করে, সুন্দর করে, মহৎ করে। আমি জানি না ভবিষ্যতে তার জীবনের গল্প কোথায় গিয়ে পৌঁছাবে। জানি না সে কত দূর পথ পাড়ি দেবে। কিন্তু এটুকু বিশ্বাস করি, যে মানুষ নিজের ভেতরের সৌন্দর্যকে বাঁচিয়ে রাখতে পারে, সে কখনো সত্যিকার অর্থে হারিয়ে যায় না। সময় হয়তো একদিন সবকিছু বদলে দেবে। ব্যস্ততা হয়তো দূরত্ব তৈরি করবে। অনেক কথা হয়তো হারিয়ে যাবে। অনেক স্মৃতি হয়তো মুছে যাবে। কিন্তু কিছু অনুভূতি আছে, যেগুলো সময় স্পর্শ করতে পারে না। কারণ সেগুলো কোনো সম্পর্কের সংজ্ঞার ওপর দাঁড়িয়ে থাকে না; দাঁড়িয়ে থাকে শ্রদ্ধা, মুগ্ধতা এবং মানবিকতার ওপর। আজ এই লেখার শেষ প্রান্তে এসে মনে হচ্ছে, জীবন সত্যিই বিস্ময়কর।
এখানে কখনো কখনো অচেনা মানুষও পরিচিত অনুভূতির জন্ম দেয়। কোনো দাবি ছাড়া। কোনো প্রত্যাশা ছাড়া। শুধু তার ভদ্রতা, সৌন্দর্য, মমতা আর মানবিকতার শক্তিতে। তাই শেষ করার আগে শুধু একটি কথাই বলতে চাই— আদ্রিতা আরোহী, তুমি হয়তো জানো না, কিন্তু একজন লেখকের ব্যস্ত জীবনের আকাশে তুমি এক শান্ত আলোকবর্তিকা। নীল আকাশের ওপারে জ্বলতে থাকা এক নক্ষত্র, যার আলো দূর থেকেও অনুভব করা যায়। তুমি কোনো সম্পর্কের নাম নও, কোনো সংজ্ঞার সীমায় আবদ্ধ নও। তুমি এক টুকরো নির্মল মানবিকতা, এক টুকরো সৌন্দর্য, এক টুকরো আলো।
আর সেই আলোর নাম—আদ্রিতা আরোহী।