একটি নক্ষত্রের পতন, একটি আদর্শের স্মৃতি শাহা আলম হাওলাদারের মৃত্যুতে শ্রদ্ধাঞ্জলি

By admin
5 Min Read

মো. কামাল উদ্দিন- 
জন্মের পর মানুষের সবচেয়ে নিশ্চিত সত্য হলো মৃত্যু। তবুও কিছু মৃত্যু মেনে নেওয়া কঠিন হয়ে যায়। কিছু মানুষের প্রস্থান কেবল একজন ব্যক্তির বিদায় নয়, একটি সময়ের, একটি আদর্শের, একটি সংগ্রামের অবসানের প্রতীক হয়ে ওঠে। গণদলের কেন্দ্রীয় সহ-সভাপতি শাহা আলম হাওলাদারের মৃত্যু আমার কাছে তেমনই এক গভীর বেদনার সংবাদ। ১৬ জুলাই ঢাকার পিজি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তিনি পৃথিবীর মায়া ত্যাগ করে পরপারের যাত্রী হয়েছেন। (ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন)।
সংবাদটি শোনার পর মনে হলো, রাজনীতির আকাশ থেকে যেন আরেকটি আলোকবর্তিকা নিভে গেল। এমন এক সময়ে তিনি চলে গেলেন, যখন দেশ ও জাতির জীবনে আদর্শবান, সৎ এবং নীতিনিষ্ঠ নেতৃত্বের বড় প্রয়োজন। আজকের রাজনৈতিক বাস্তবতায় আমরা প্রায়ই ক্ষমতার দ্বন্দ্ব, স্বার্থের সংঘাত এবং মূল্যবোধের অবক্ষয়ের কথা শুনি। কিন্তু শাহা আলম হাওলাদার ছিলেন ভিন্ন ধাতুর মানুষ। তিনি বিশ্বাস করতেন গণতন্ত্রে, মানুষের ভোটের অধিকারে, মত প্রকাশের স্বাধীনতায় এবং রাজনৈতিক শিষ্টাচারে।
রাজনীতি তার কাছে ক্ষমতার সিঁড়ি ছিল না; ছিল মানুষের জন্য কাজ করার একটি মহান দায়িত্ব। তিনি জানতেন, রাজনীতির মূল শক্তি জনগণ। সেই জনগণের অধিকার রক্ষার জন্য তিনি আজীবন সংগ্রাম করেছেন। দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনে তিনি বহু প্রতিকূলতা মোকাবিলা করেছেন, কিন্তু কখনো নিজের আদর্শ থেকে বিচ্যুত হননি। মানুষের ভোটের অধিকার প্রতিষ্ঠার আন্দোলনে তার সক্রিয় অংশগ্রহণ তাকে সাধারণ মানুষের কাছে একজন বিশ্বস্ত নেতা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছিল। বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে গণতন্ত্রের জন্য বহু সংগ্রামের অধ্যায় রয়েছে। সেই দীর্ঘ পথচলার একজন নীরব অথচ সাহসী যোদ্ধা ছিলেন শাহা আলম হাওলাদার। তিনি হয়তো জাতীয় রাজনীতির আলোচিত মুখ ছিলেন না, কিন্তু মাঠের রাজনীতিতে, কর্মীদের মাঝে এবং গণতান্ত্রিক আন্দোলনের ইতিহাসে তার অবদান অনস্বীকার্য। যারা তার সান্নিধ্যে এসেছেন, তারা জানেন তিনি কতটা বিনয়ী, দায়িত্বশীল এবং মানবিক ছিলেন।
বর্তমান সময়ে আমরা প্রায়ই দেখি রাজনীতি মানুষের কাছ থেকে দূরে সরে যাচ্ছে। আদর্শের জায়গা দখল করছে ব্যক্তিস্বার্থ। সেখানে শাহা আলম হাওলাদারের মতো মানুষরা ছিলেন ব্যতিক্রম। তিনি প্রমাণ করেছেন, রাজনীতি মানে শুধু ক্ষমতার লড়াই নয়; রাজনীতি মানে মানুষের পাশে দাঁড়ানো, অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করা এবং গণমানুষের অধিকার রক্ষার জন্য সংগ্রাম করা।
তার মৃত্যুতে গণদলের চেয়ারম্যান গোলাম মাওলা চৌধুরী এবং মহাসচিব আবু সাঈদ গভীর শোক প্রকাশ করে বলেছেন, শাহা আলম হাওলাদারের মৃত্যুতে জাতীয় রাজনীতিতে এক অপূরণীয় শূন্যতার সৃষ্টি হয়েছে। এই কথার মধ্যে কোনো অতিশয়োক্তি নেই। কারণ একজন আদর্শবান কর্মীর মৃত্যু কখনো শুধু একটি দলের ক্ষতি নয়, এটি সমগ্র সমাজের ক্ষতি। এমন মানুষদের সংখ্যা কমে গেলে রাজনীতির মানবিক মুখটিও ক্রমশ দুর্বল হয়ে পড়ে। আজ যখন আমরা তার জীবনকে স্মরণ করি, তখন শুধু একজন রাজনৈতিক নেতাকে নয়, একজন সংগ্রামী মানুষকে দেখি। একজন মানুষকে দেখি যিনি বিশ্বাস করতেন মানুষের শক্তিতে, জনগণের অধিকারে এবং গণতন্ত্রের বিজয়ে। তার জীবনের প্রতিটি অধ্যায়ে ছিল দেশপ্রেম, দায়িত্ববোধ এবং মানুষের প্রতি অকৃত্রিম ভালোবাসা।
মৃত্যু মানুষকে পৃথিবী থেকে বিচ্ছিন্ন করে দেয়, কিন্তু স্মৃতি থেকে মুছে ফেলতে পারে না। একজন মানুষের প্রকৃত পরিচয় তার সম্পদে নয়, তার কর্মে। শাহা আলম হাওলাদারের কর্মই হবে তার সবচেয়ে বড় পরিচয়। তিনি চলে গেছেন, কিন্তু তার আদর্শ, তার সংগ্রাম এবং তার বিশ্বাস বেঁচে থাকবে অসংখ্য মানুষের হৃদয়ে।
পিরোজপুরের ভান্ডারিয়ার মাটিতে জানাজার নামাজ শেষে তাকে দাফন করা হয়েছে। জন্মভূমির মাটি তাকে শেষ আশ্রয় দিয়েছে। হয়তো আজ তার কবরের পাশে নীরব বাতাস বইছে, হয়তো গ্রামের আকাশও আজ কিছুটা বিষণ্ন। কিন্তু একজন মানুষের শারীরিক মৃত্যু তার আদর্শের মৃত্যু নয়। তার চিন্তা, তার সংগ্রাম, তার স্বপ্ন এবং তার রাজনৈতিক দর্শন ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য প্রেরণার উৎস হয়ে থাকবে। আমরা এমন এক সমাজে বাস করছি, যেখানে ভালো মানুষের অভাব ক্রমশ প্রকট হচ্ছে। তাই যখন একজন সৎ, আদর্শবান এবং সংগ্রামী মানুষ আমাদের ছেড়ে চলে যান, তখন সেই শূন্যতা সহজে পূরণ হয় না। শাহা আলম হাওলাদারের মৃত্যুও তেমনই এক অপূরণীয় ক্ষতি। তিনি ছিলেন একটি মূল্যবোধের নাম, একটি বিশ্বাসের নাম, একটি রাজনৈতিক চেতনার নাম।
আজ এই শোকের দিনে আমি গভীর শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করছি মরহুম শাহা আলম হাওলাদারকে। মহান আল্লাহর দরবারে প্রার্থনা করছি, তিনি যেন মরহুমকে জান্নাতুল ফেরদাউসের সর্বোচ্চ মর্যাদা দান করেন। তার জীবনের সকল ভুলত্রুটি ক্ষমা করে দেন এবং তার পরিবার, আত্মীয়-স্বজন, সহকর্মী ও শুভানুধ্যায়ীদের এই গভীর শোক বহন করার শক্তি প্রদান করেন। মানুষ মরে যায়, আদর্শ বেঁচে থাকে। কণ্ঠ স্তব্ধ হয়ে যায়, কিন্তু সত্যের পক্ষে উচ্চারিত শব্দ ইতিহাসে প্রতিধ্বনিত হতে থাকে। শাহা আলম হাওলাদারও তেমনি বেঁচে থাকবেন তার কর্মে, তার আদর্শে এবং গণতন্ত্রের জন্য তার অবিস্মরণীয় সংগ্রামের মধ্য দিয়ে। বিদায় শাহা আলম হাওলাদার। আপনার পথচলা থেমে গেছে, কিন্তু আপনার স্বপ্ন এখনো জীবিত। আপনার কণ্ঠ নীরব হয়েছে, কিন্তু আপনার আদর্শ এখনো কথা বলে। আপনার মৃত্যু হয়েছে, কিন্তু আপনার সংগ্রাম অমর হয়ে থাকবে।

Share This Article
Leave a Comment