
শুভ জন্মদিন প্রিয় অগ্রজ, শ্রদ্ধেয় কলিম সারোয়ার: সব মানুষ বয়সে বড় হন, কিন্তু সবাই ইতিহাসের অংশ হয়ে উঠতে পারেন না। সবাই পদ লাভ করেন, কিন্তু সবাই সম্মান অর্জন করতে পারেন না। সবাই পরিচিত হন, কিন্তু সবাই হৃদয়ে জায়গা করে নিতে পারেন না। যুগে যুগে কিছু মানুষ জন্ম নেন, যাঁরা তাঁদের কর্ম, সততা, প্রজ্ঞা এবং ব্যক্তিত্ব দিয়ে নিজেদের নামকে একটি প্রতিষ্ঠানে রূপ দেন। চট্টগ্রামের সাংবাদিকতা অঙ্গনে কলিম সারোয়ার তেমনই এক বিরল ব্যক্তিত্ব, যাঁর নাম উচ্চারণ করলেই শ্রদ্ধায় মাথা নত হয়ে আসে। আজ তাঁর জন্মদিন। এই দিনটি শুধু তাঁর পরিবারের জন্য নয়, তাঁর অসংখ্য শুভাকাঙ্ক্ষী, সহকর্মী, অনুজ সাংবাদিক এবং তাঁকে ভালোবাসা মানুষের কাছেও আনন্দ ও গৌরবের একটি দিন। কারণ কলিম সারোয়ার কেবল একজন ব্যক্তি নন; তিনি একটি সময়ের সাক্ষী, একটি প্রজন্মের শিক্ষক এবং সাংবাদিকতার নৈতিক শক্তির এক উজ্জ্বল প্রতীক। জীবনের পথচলায় আমরা অনেক মানুষের সঙ্গে পরিচিত হই। কেউ ক্ষণিকের জন্য আসেন, আবার হারিয়ে যান সময়ের অতলে। কিন্তু কিছু মানুষ থেকে যান হৃদয়ের গভীরে, স্মৃতির পাতায় এবং সম্মানের সর্বোচ্চ আসনে। কলিম সারোয়ার তাঁদেরই একজন। তাঁকে যতবার দেখেছি, ততবার মনে হয়েছে—প্রকৃত ভদ্রতা, প্রকৃত জ্ঞান এবং প্রকৃত ব্যক্তিত্ব কখনো শব্দ করে নিজের পরিচয় দেয় না; বরং তার উপস্থিতিই তার পরিচয় হয়ে ওঠে। তাঁর হাসিমাখা মুখ, বিনয়ী আচরণ, মমতাভরা কথাবার্তা এবং গভীর চিন্তাশীলতা মানুষকে সহজেই আপন করে নেয়। দৈনিক পূর্বকোণের ইতিহাসে তাঁর নাম এক গৌরবময় অধ্যায়। এমন এক সময়ে তিনি সাংবাদিকতা করেছেন, যখন সংবাদ ছিল মানুষের বিবেকের ভাষা, সত্য ছিল সাংবাদিকতার সবচেয়ে বড় শক্তি এবং নৈতিকতা ছিল পেশার অলংকার। সেই সময়ের সংবাদযোদ্ধাদের অন্যতম ছিলেন কলিম সারোয়ার। তিনি জানতেন, সাংবাদিকতা কেবল পেশা নয়; এটি মানুষের প্রতি দায়বদ্ধতা। তাই তিনি কখনো সত্যের সঙ্গে আপস করেননি। কখনো অন্যায়ের সামনে মাথা নত করেননি। কখনো সুবিধাবাদের স্রোতে নিজেকে ভাসিয়ে দেননি। তাঁর কলম ছিল বিবেকের কণ্ঠস্বর, তাঁর অবস্থান ছিল ন্যায়ের পক্ষে, তাঁর সাহস ছিল সত্যের প্রতি অবিচল অঙ্গীকার। চট্টগ্রাম প্রেস ক্লাবের সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালনকালে তিনি দেখিয়েছেন, নেতৃত্ব মানে কেবল চেয়ার নয়; নেতৃত্ব মানে দায়িত্ব, ত্যাগ, সাহস এবং সহকর্মীদের প্রতি দায়বদ্ধতা। তাঁর নেতৃত্বে সাংবাদিক সমাজ পেয়েছে দিকনির্দেশনা, পেয়েছে সাহস এবং পেয়েছে একটি সম্মানজনক অবস্থান। সম্প্রতি একটি সামাজিক অনুষ্ঠানে তাঁর সঙ্গে দীর্ঘদিন পর দেখা হওয়ার সৌভাগ্য হয়েছিল। চারদিকে ছিল আনন্দের আবহ, শুভেচ্ছার বিনিময়, মানুষের ভিড়। কিন্তু সেই ভিড়ের মাঝেও তিনি ছিলেন আলাদা। কারণ কিছু মানুষের ব্যক্তিত্ব এতটাই উজ্জ্বল যে তাঁদের উপস্থিতি পুরো পরিবেশকে আলোকিত করে তোলে। সেদিন তাঁর সঙ্গে কিছুক্ষণ কথা বলার সুযোগ হয়েছিল। তিনি আমার লেখালেখি নিয়ে যে আন্তরিক মূল্যায়ন করেছিলেন, তা আমাকে গভীরভাবে স্পর্শ করেছে। একজন লেখকের কাছে এর চেয়ে বড় প্রাপ্তি আর কী হতে পারে, যখন একজন অভিজ্ঞ, জ্ঞানী এবং সম্মানিত সাংবাদিক তাঁর শ্রম ও নিষ্ঠাকে স্বীকৃতি দেন! সত্যি বলতে, কলিম সারোয়ার ভাইয়ের মতো মানুষদের দেখলে মনে হয়—এখনো পৃথিবী সুন্দর। এখনো মূল্যবোধ বেঁচে আছে। এখনো সততা পরাজিত হয়নি। এখনো কিছু মানুষ আছেন, যাঁদের জীবন দেখে নতুন প্রজন্ম সৎ থাকার সাহস পায়। বর্তমান সময়ে যখন অনেক ক্ষেত্রেই নীতি ও আদর্শ প্রশ্নবিদ্ধ, তখন কলিম সারোয়ারের মতো মানুষরা আমাদের আশ্বস্ত করেন। তাঁরা শেখান, মানুষকে বড় করে তার সম্পদ নয়, তার চরিত্র। মানুষকে সম্মানিত করে তার ক্ষমতা নয়, তার সততা। মানুষকে স্মরণীয় করে তার পদ নয়, তার কর্ম।
তাঁর দীর্ঘ কর্মজীবন শুধু সাংবাদিকতার ইতিহাস নয়; এটি সংগ্রামের ইতিহাস, নৈতিকতার ইতিহাস এবং মানুষের জন্য কাজ করার ইতিহাস। তাঁর প্রতিটি পদক্ষেপ, প্রতিটি সিদ্ধান্ত এবং প্রতিটি অবস্থান নতুন প্রজন্মের জন্য শিক্ষণীয়। আজ তাঁর জন্মদিনে হৃদয়ের গভীর থেকে একটি কথাই বলতে চাই—আমরা সৌভাগ্যবান, কারণ আমরা এমন একজন মানুষকে আমাদের সময়ে পেয়েছি, যিনি সাংবাদিকতার মর্যাদা, সাহস এবং মানবিকতার এক উজ্জ্বল প্রতীক হয়ে আছেন। আল্লাহ তাআলা তাঁকে সুস্থতা, দীর্ঘায়ু, শান্তি ও সম্মানে ভরিয়ে দিন। তাঁর জীবন আরও আলোকিত হোক, তাঁর প্রজ্ঞা আরও বহু মানুষকে পথ দেখাক, তাঁর অভিজ্ঞতা আগামী দিনের সাংবাদিকদের অনুপ্রাণিত করুক। সময় একদিন সবকিছু বদলে দেয়। কিন্তু কিছু মানুষের নাম সময়ের গণ্ডি পেরিয়ে ইতিহাসের অংশ হয়ে যায়। কলিম সারোয়ার তেমনই একটি নাম—যে নামের সঙ্গে জড়িয়ে আছে সততা, সাহস, প্রজ্ঞা, নেতৃত্ব এবং মানুষের প্রতি অকৃত্রিম ভালোবাসা। শুভ জন্মদিন, প্রিয় অগ্রজ। আপনি সুস্থ থাকুন, ভালো থাকুন, দীর্ঘজীবী হোন। আপনার আলোকিত পথচলা, আপনার নির্ভীক কলম এবং আপনার মানবিক ব্যক্তিত্ব আগামী দিনের পথহারা মানুষদের জন্য প্রেরণার বাতিঘর হয়ে থাকুক। গভীর শ্রদ্ধা, আন্তরিক ভালোবাসা এবং অফুরন্ত শুভকামনায়—
মো. কামাল উদ্দিন লেখক, সাংবাদিক, গবেষক ও টেলিভিশন উপস্থাপক এবং মানবাধিকারকর্মী ও সংগঠক