
— মো. কামাল উদ্দিন
গত ১৪ এপ্রিল চট্টগ্রামের নাসিরাবাদ ইয়াকুব টাওয়ারস্থ “উইন্ড অব চেইঞ্জ” রেস্টুরেন্টে এ্যাড ভিশনের নতুন কমিটির দায়িত্ব গ্রহণ অনুষ্ঠান এবং আগামী ৫ জুন বিশ্ব পরিবেশ দিবস উপলক্ষে প্রস্তুতি সভা অনুষ্ঠিত হয়। সেই সভায় আমি মূল বক্তা হিসেবে পরিবেশ, জলবায়ু পরিবর্তন, বৃক্ষরোপণ, মানবসভ্যতার ভবিষ্যৎ এবং আমাদের নৈতিক দায়িত্ব নিয়ে বিস্তারিত বক্তব্য উপস্থাপন করি। সভাটি ছিল কেবল একটি সাংগঠনিক আয়োজন নয়; বরং এটি ছিল এক গভীর মানবিক ও বৈশ্বিক দায়িত্ববোধের প্রকাশ। পৃথিবী আজ যে ভয়াবহ পরিবেশ বিপর্যয়ের মুখোমুখি, সেখানে প্রতিটি সচেতন মানুষের কণ্ঠে পরিবেশ রক্ষার আহ্বান উচ্চারিত হওয়া জরুরি। আমি আমার বক্তব্যের শুরুতেই বলেছিলাম— “মানুষ পৃথিবীর মালিক নয়, মানুষ পৃথিবীর রক্ষক। আল্লাহ তায়ালা পৃথিবীকে মানুষের কাছে আমানত হিসেবে দিয়েছেন। সেই আমানতের খেয়ানত আজ মানবসভ্যতাকে ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে নিয়ে যাচ্ছে।” আজকের পৃথিবীতে সবচেয়ে আলোচিত শব্দগুলোর একটি হলো “জলবায়ু পরিবর্তন”। একসময় এটি ছিল গবেষণাগারের বিষয়, আন্তর্জাতিক সম্মেলনের আলোচ্যসূচি কিংবা বিজ্ঞানীদের উদ্বেগ। কিন্তু এখন এটি বাস্তবতা। পৃথিবীর প্রতিটি দেশ, প্রতিটি শহর, প্রতিটি মানুষ এর প্রভাব অনুভব করছে। জাতিসংঘের বিভিন্ন গবেষণায় বলা হয়েছে, গত একশ বছরে পৃথিবীর গড় তাপমাত্রা অস্বাভাবিকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। মেরু অঞ্চলের বরফ গলছে, সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বাড়ছে, আবহাওয়ার স্বাভাবিক চক্র ভেঙে পড়ছে। কোথাও ভয়াবহ খরা, কোথাও অস্বাভাবিক বন্যা, কোথাও দাবানল, আবার কোথাও ঘূর্ণিঝড় ও জলোচ্ছ্বাস মানুষের জীবনকে বিপর্যস্ত করে তুলছে। বাংলাদেশ পৃথিবীর সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলোর একটি। বিশেষ করে চট্টগ্রাম উপকূলীয় অঞ্চল হওয়ায় জলবায়ু পরিবর্তনের বিরূপ প্রভাব এখানে আরও প্রকটভাবে দেখা যাচ্ছে। পাহাড় ধস, জলাবদ্ধতা, অতিবৃষ্টি, নদী ভাঙন, তাপমাত্রা বৃদ্ধি— সব মিলিয়ে প্রকৃতি যেন এক নীরব সতর্কবার্তা দিচ্ছে।
আমি সভায় উল্লেখ করি— চট্টগ্রাম একসময় ছিল সবুজ পাহাড়, নদী আর বৃক্ষের শহর। কিন্তু আজ অপরিকল্পিত নগরায়ন, পাহাড় কাটা, খাল ভরাট এবং নির্বিচারে বৃক্ষ নিধনের কারণে এই শহরের পরিবেশগত ভারসাম্য ভয়াবহভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
পাহাড় কাটা শুধু একটি অপরাধ নয়, এটি প্রকৃতির বিরুদ্ধে যুদ্ধ। একটি পাহাড় ধ্বংস মানে হাজারো গাছ ধ্বংস, জীববৈচিত্র্য ধ্বংস, মাটির স্বাভাবিক গঠন ধ্বংস এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের নিরাপত্তা ধ্বংস। প্রতি বর্ষায় পাহাড় ধসে মানুষের মৃত্যু আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেয়— প্রকৃতি কখনো অন্যায় ক্ষমা করে না। আমি আমার বক্তব্যে ধর্মীয় দৃষ্টিকোণ থেকেও পরিবেশের গুরুত্ব তুলে ধরি। ইসলাম শুধু নামাজ, রোজা বা ইবাদতের ধর্ম নয়; ইসলাম প্রকৃতি, পরিবেশ ও মানবতারও ধর্ম। মহানবী হযরত মুহাম্মদ (সা.) পরিবেশ সংরক্ষণকে অত্যন্ত গুরুত্ব দিয়েছেন। তিনি বৃক্ষরোপণকে সদকা হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন। এমনকি কেয়ামত উপস্থিত হলেও হাতে যদি একটি চারা থাকে, সেটি রোপণ করার নির্দেশ দিয়েছেন।
এই শিক্ষার মধ্যে গভীর মানবিক ও বৈজ্ঞানিক তাৎপর্য রয়েছে। কারণ একটি গাছ শুধু ছায়া দেয় না, এটি অক্সিজেন দেয়, কার্বন শোষণ করে, মাটি রক্ষা করে, বৃষ্টি আনতে সহায়তা করে এবং অসংখ্য প্রাণীর আশ্রয়স্থল হয়ে ওঠে। আমি বলেছিলাম—
“একটি গাছ কাটা মানে কেবল কাঠ হারানো নয়; একটি জীবন্ত পৃথিবীর অংশকে হত্যা করা।” পৃথিবীতে হযরত আদম (আ.)-এর আগমনের পর কৃষিকাজ ও বৃক্ষরোপণের মাধ্যমে মানবসভ্যতার সূচনা হয়েছিল। মাটি ও মানুষের সম্পর্ক তখন ছিল পবিত্র ও আত্মিক। মানুষ গাছকে ভালোবাসতো, নদীকে সম্মান করতো, প্রকৃতিকে মা হিসেবে দেখতো। অথচ আধুনিক সভ্যতা উন্নয়নের নামে সেই প্রকৃতিকেই ধ্বংস করছে। আজ নদীগুলো দূষিত। শিল্পকারখানার বর্জ্য, প্লাস্টিক, পলিথিন এবং রাসায়নিক বর্জ্যে নদীর পানি বিষাক্ত হয়ে উঠছে। একসময় যে নদী মানুষের জীবন ও সভ্যতার উৎস ছিল, আজ সেই নদী মৃত্যুর প্রতীকে পরিণত হচ্ছে। কালো ধোঁয়ায় আকাশ ঢেকে যাচ্ছে, শহরের বাতাস বিষাক্ত হয়ে উঠছে। শিশুদের শ্বাসকষ্ট বাড়ছে, নতুন নতুন রোগ সৃষ্টি হচ্ছে।
আমি আলোচনা করি— আল্লাহ তায়ালা “কলম”-এর মাধ্যমে মানুষকে জ্ঞান শিক্ষা দিয়েছেন। সেই প্রাচীন কলম ছিল গাছের কাঠ থেকে তৈরি, আর কালি ছিল প্রকৃতির উপাদান। অর্থাৎ মানবসভ্যতার জ্ঞান, সাহিত্য, ইতিহাস ও সংস্কৃতির শেকড়ও প্রকৃতির সঙ্গে জড়িয়ে আছে। প্রকৃতিকে ধ্বংস করা মানে নিজের ইতিহাস ও ভবিষ্যৎকে ধ্বংস করা। বিশ্ব পরিবেশ দিবসের ইতিহাসও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ১৯৭২ সালে সুইডেনের স্টকহোমে জাতিসংঘ মানব পরিবেশ সম্মেলনের মাধ্যমে বিশ্বব্যাপী পরিবেশ রক্ষার আন্দোলন নতুন গতি পায়। এরপর ৫ জুনকে বিশ্ব পরিবেশ দিবস হিসেবে ঘোষণা করা হয়। আজ পৃথিবীর শতাধিক দেশে এই দিবস পালন করা হয়। কিন্তু কেবল দিবস পালন করলেই হবে না; প্রয়োজন বাস্তব উদ্যোগ, সচেতনতা এবং কার্যকর পদক্ষেপ।
আমি সভায় বিশেষভাবে এ্যাড ভিশনের উদ্যোগের প্রশংসা করি। বিশেষ করে চট্টগ্রাম নগরীতে খেজুর গাছ রোপণের পরিকল্পনাকে আমি সময়োপযোগী, নান্দনিক ও পরিবেশবান্ধব উদ্যোগ হিসেবে উল্লেখ করি। খেজুর গাছ আমাদের ঐতিহ্যের অংশ। এটি শুধু পরিবেশ রক্ষা করে না, বরং শহরের সৌন্দর্যও বৃদ্ধি করে। এ্যাড ভিশনের কর্ণধার মাসুদ রানার প্রতি আমি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করি। কারণ সমাজে অনেক মানুষ ব্যবসা বা ব্যক্তিগত সাফল্য নিয়েই ব্যস্ত থাকেন, কিন্তু খুব কম মানুষ আছেন যারা সমাজ ও পরিবেশের ভবিষ্যৎ নিয়ে ভাবেন। মাসুদ রানা সেই ব্যতিক্রমী মানুষদের একজন, যিনি পরিবেশ রক্ষাকে সামাজিক দায়িত্ব হিসেবে গ্রহণ করেছেন। আমি নতুন কমিটির প্রতি আহ্বান জানাই— তারা যেন পরিবেশ আন্দোলনকে কেবল একটি অনুষ্ঠানের মধ্যে সীমাবদ্ধ না রাখে। স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়, তরুণ সমাজ এবং সাধারণ মানুষের মধ্যে পরিবেশ সচেতনতা গড়ে তুলতে ধারাবাহিক কর্মসূচি হাতে নিতে হবে। কারণ আগামী পৃথিবীকে রক্ষা করার দায়িত্ব আজকের তরুণ প্রজন্মের কাঁধেই।
তরুণরা যদি গাছ লাগায়, নদী রক্ষা করে, পাহাড় বাঁচানোর আন্দোলনে অংশ নেয়— তবে বাংলাদেশ আবারও সবুজ হয়ে উঠবে।
আমি আমার বক্তব্যে আরও বলেছি— আজ পৃথিবীর সবচেয়ে বড় সংকট শুধু অর্থনৈতিক নয়, নৈতিক সংকট। মানুষ প্রকৃতির সঙ্গে সম্পর্ক হারিয়ে ফেলছে। কংক্রিটের শহরে মানুষ গাছের ছায়া ভুলে যাচ্ছে, শিশুরা পাখির ডাক চেনে না, নদীর স্বচ্ছ পানি এখন গল্পের বিষয় হয়ে যাচ্ছে। আমরা যদি এখনই সচেতন না হই, তাহলে ভবিষ্যৎ প্রজন্ম আমাদের ক্ষমা করবে না। তারা প্রশ্ন করবে— “তোমরা কি পৃথিবীকে ধ্বংস করার জন্যই সভ্যতা গড়ে তুলেছিলে?” তাই এখন সময় এসেছে নতুন করে ভাবার। উন্নয়ন মানে শুধু বহুতল ভবন নয়; উন্নয়ন মানে একটি বাসযোগ্য পৃথিবী। উন্নয়ন মানে বিশুদ্ধ বাতাস, নিরাপদ পানি, সবুজ গাছপালা এবং প্রকৃতির ভারসাম্য রক্ষা। আমি সভার শেষাংশে সবাইকে আহ্বান জানাই— প্রতিটি মানুষ বছরে অন্তত একটি গাছ রোপণ করুন। শুধু রোপণ নয়, সেটিকে সন্তানের মতো যত্ন করুন। একটি গাছ একটি জীবন বাঁচায়, একটি পরিবারকে ছায়া দেয়, একটি শহরকে শীতল রাখে এবং একটি জাতির ভবিষ্যৎকে নিরাপদ করে। আজ পৃথিবী আমাদের দিকে তাকিয়ে আছে।
প্রকৃতি নীরবে অপেক্ষা করছে— মানুষ কি ধ্বংসের পথ থেকে ফিরে আসবে? আমরা যদি সত্যিই ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য একটি সুন্দর পৃথিবী রেখে যেতে চাই, তাহলে এখনই আমাদের শপথ নিতে হবে—
আমরা পাহাড় রক্ষা করবো।
নদী দূষণ বন্ধ করবো।
বৃক্ষ নিধনের বিরুদ্ধে দাঁড়াবো।
সবুজ পৃথিবী গড়ার আন্দোলনে নিজেদের যুক্ত করবো।
কারণ পৃথিবীকে বাঁচানো মানে মানুষকে বাঁচানো।
সবুজকে রক্ষা করা মানে ভবিষ্যৎকে রক্ষা করা।
বিশ্ব পরিবেশ দিবসের এই প্রাক্কালে আমাদের সবার কণ্ঠে উচ্চারিত হোক—
“গাছ লাগান, প্রকৃতি বাঁচান, ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য একটি নিরাপদ পৃথিবী গড়ে তুলুন।”