পূর্ণেন্দু দস্তিদার : বিপ্লব, কারাবরণ ও কলমযুদ্ধের এক অনন্য ইতিহাস আজ ৯ মে

By admin
4 Min Read

এই দিনটি চট্টগ্রামের ইতিহাসে এক গভীর বেদনার দিন। কারণ এই দিনে আমরা হারিয়েছিলাম এক সাহসী বিপ্লবী, সংগ্রামী রাজনীতিবিদ, প্রাজ্ঞ সাহিত্যিক এবং ইতিহাসসচেতন বাঙালি মনীষী— পূর্ণেন্দু দস্তিদার-কে। আমি একজন ইতিহাস ভিক্ষুক হিসেবে আজ গভীর শ্রদ্ধা, ভালোবাসা ও কৃতজ্ঞতায় স্মরণ করছি সেই মানুষটিকে, যিনি জীবনভর লড়েছেন দেশের স্বাধীনতা, মানুষের অধিকার এবং সত্য ইতিহাসের পক্ষে। চট্টগ্রামের পটিয়া উপজেলার ধলঘাট গ্রামের ঐতিহাসিক দস্তিদার পরিবারে জন্ম নেওয়া পূর্ণেন্দু দস্তিদার ছিলেন এক অসাধারণ প্রতিভার নাম। এই পরিবার শুধু রাজনৈতিকভাবেই নয়, বুদ্ধিবৃত্তিক ও সাংস্কৃতিক ক্ষেত্রেও ছিল অত্যন্ত সমৃদ্ধ। শহীদ বিপ্লবী অর্ধেন্দু দস্তিদার, কমিউনিস্ট নেতা সুখেন্দু দস্তিদার ও শরদিন্দু দস্তিদার, কবি ত্রিদিব দস্তিদারের মতো আলোকিত ব্যক্তিত্বদের সঙ্গে একই পরিবারে বেড়ে ওঠা পূর্ণেন্দু খুব অল্প বয়সেই দেশপ্রেম ও সংগ্রামের আদর্শে উদ্বুদ্ধ হন। চট্টগ্রাম কলেজ থেকে ১৯২৭ সালে প্রথম বিভাগে আইএসসি পাস করে তিনি যাদবপুরে ভর্তি হন। কিন্তু তার জীবন কেবল পাঠ্যবইয়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকেনি। ছাত্রজীবনেই তিনি জড়িয়ে পড়েন ব্রিটিশবিরোধী স্বাধীনতা আন্দোলনে। বিপ্লবী সংগঠনের একজন সক্রিয় কর্মী হিসেবে তিনি হয়ে ওঠেন ব্রিটিশ শাসকদের আতঙ্ক। মাস্টারদা সূর্য সেন-এর নেতৃত্বে সংঘটিত ঐতিহাসিক চট্টগ্রাম অস্ত্রাগার লুণ্ঠন-এ সক্রিয় অংশগ্রহণ ছিল পূর্ণেন্দু দস্তিদারের জীবনের সবচেয়ে গৌরবোজ্জ্বল অধ্যায়গুলোর একটি। ১৯৩০ সালের ১৮ এপ্রিলের সেই দুঃসাহসিক অভিযানে তিনি অস্ত্র হাতে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের ভিত কাঁপিয়ে দিয়েছিলেন। কিন্তু বিপ্লবের পথ কখনোই সহজ ছিল না। গ্রেপ্তার হয়ে তাকে দীর্ঘদিন কারান্তরালে থাকতে হয়। জেল, নির্যাতন, নিপীড়ন—কোনো কিছুই তার মনোবল ভাঙতে পারেনি। কারামুক্তির পরও তিনি থেমে থাকেননি। ভারতের কমিউনিস্ট পার্টিতে যোগ দিয়ে শোষণহীন সমাজ প্রতিষ্ঠার স্বপ্নে কাজ করে গেছেন। দেশভাগের পর পূর্ববাংলার রাজনীতিতেও সক্রিয় ভূমিকা পালন করেন। পূর্ববঙ্গ বিধানসভার সদস্য নির্বাচিত হয়ে তিনি সাধারণ মানুষের কথা বলেছিলেন সাহসের সঙ্গে। কিন্তু শাসকগোষ্ঠী কখনো স্বাধীনচেতা মানুষদের সহ্য করতে পারে না। ১৯৪৮ সালে সামরিক আইন জারির পর আবারও তাকে কারাগারে পাঠানো হয়। পরে আইয়ুব খানের শাসনামলেও তিনি অন্তরীণ অবস্থায় দিন কাটিয়েছেন। পূর্ণেন্দু দস্তিদার কেবল একজন বিপ্লবীই ছিলেন না, ছিলেন একজন শক্তিমান সাহিত্যিক ও ইতিহাস-অনুসন্ধানী লেখকও। তার লেখনীতে উঠে এসেছে চট্টগ্রামের স্বাধীনতা সংগ্রাম, বিপ্লবীদের আত্মত্যাগ, গণমানুষের সংগ্রাম ও বাংলার সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য। তার রচিত “স্বাধীনতা সংগ্রামে চট্টগ্রাম”, “কবিয়াল রমেশ শীল”, “বীরকন্যা প্রীতিলতা” আজও ইতিহাস গবেষণার মূল্যবান দলিল। এছাড়া বিশ্বসাহিত্যের গুরুত্বপূর্ণ রচনাও তিনি বাংলায় অনুবাদ করেছিলেন। ‘শেখভের গল্প’ ও ‘মোপাসাঁর গল্প’-এর মতো অনুবাদ গ্রন্থ তার সাহিত্যবোধ ও আন্তর্জাতিক দৃষ্টিভঙ্গির পরিচয় বহন করে। ১৯৭১ সালে মহান মুক্তিযুদ্ধ শুরু হলে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর বর্বর আক্রমণ থেকে বাঁচতে তিনি ভারতের উদ্দেশ্যে রওনা দেন। কিন্তু ভাগ্য তাকে আর সময় দেয়নি। পথিমধ্যে অসুস্থ হয়ে ১৯৭১ সালের ৯ মে তিনি মৃত্যুবরণ করেন। স্বাধীন বাংলাদেশের সূর্যোদয় তিনি দেখে যেতে পারেননি, অথচ সেই স্বাধীনতার বীজ বপনকারীদের অন্যতম ছিলেন তিনি। আজকের প্রজন্ম হয়তো অনেকেই পূর্ণেন্দু দস্তিদারের নাম জানে না। কিন্তু ইতিহাস কখনো প্রকৃত সৈনিকদের ভুলে যায় না। যারা নিজেদের জীবন, যৌবন, স্বপ্ন ও সুখ বিসর্জন দিয়ে জাতির জন্য লড়েছেন, তারা ইতিহাসের পাতায় অমর হয়ে থাকেন। আজ তার মৃত্যুবার্ষিকীতে গভীর শ্রদ্ধায় স্মরণ করছি এই মহান বিপ্লবীকে। তার আত্মত্যাগ, সংগ্রাম ও আদর্শ নতুন প্রজন্মকে সত্য ও ন্যায়ের পথে চলার প্রেরণা দিক। শ্রদ্ধাঞ্জলি পূর্ণেন্দু দস্তিদার। আপনি ইতিহাসের গর্ব, চট্টগ্রামের অহংকার, বাঙালির চেতনায় এক অনির্বাণ

Share This Article
Leave a Comment