
চট্টগ্রাম মহানগরীর সাম্প্রতিক জলাবদ্ধতা পরিস্থিতি নিয়ে স্থানীয় সরকার মন্ত্রীর বক্তব্যে গভীর উদ্বেগ, তীব্র ক্ষোভ ও দুঃখ প্রকাশ করেছে চট্টগ্রাম নাগরিক ফোরাম। বাস্তবতার সঙ্গে সাংঘর্ষিক এই বক্তব্য শুধু বিভ্রান্তিকরই নয়, বরং দীর্ঘদিন ধরে জলাবদ্ধতার যন্ত্রণায় থাকা নগরবাসীর প্রতি এক ধরনের অবজ্ঞা—এমনটাই মনে করছে সংগঠনটি। গত ২৮ এপ্রিল হঠাৎ নামা বৃষ্টিতে চট্টগ্রাম নগরী মুহূর্তেই পরিণত হয় এক অচল জলনগরীতে। প্রধান সড়ক, অলিগলি, আবাসিক এলাকা, বাণিজ্যিক কেন্দ্র—সবখানেই গলা সমান পানি জমে পড়ে। যানবাহন চলাচল বন্ধ হয়ে যায়, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও অফিস-আদালতের কার্যক্রম ব্যাহত হয়। অসংখ্য পরিবার ঘরবন্দি হয়ে পড়ে, আর ব্যবসায়ীরা শ’ কোটি টাকার ক্ষতির মুখে পড়ে। নগরবাসীর কাছে এটি কোনো নতুন অভিজ্ঞতা নয়—বরং প্রতি বর্ষায় পুনরাবৃত্ত এক দুঃসহ বাস্তবতা। এই ভয়াবহ পরিস্থিতির মধ্যেই স্থানীয় সরকার মন্ত্রীর “আমি কোথাও পানি দেখিনি” মন্তব্য চট্টগ্রামবাসীর মনে বিস্ময় ও ক্ষোভের জন্ম দিয়েছে। এমন বক্তব্য বাস্তবতাকে অস্বীকার করারই শামিল। বিষয়টি আরও হতাশাজনক যে, চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের মেয়র ডা. শাহাদাত হোসেন সেই সময় উপস্থিত থাকলেও নগরবাসীর দুর্ভোগের প্রকৃত চিত্রটি মন্ত্রীর বক্তব্যে প্রতিফলিত হয়নি। চট্টগ্রাম নাগরিক ফোরামের চেয়ারম্যান ব্যারিস্টার মনোয়ার হোসেন এবং মহাসচিব মো. কামাল উদ্দিন এক যৌথ বিবৃতিতে বলেন, “চট্টগ্রামের জলাবদ্ধতা নিরসন প্রকল্প কোনো দয়া বা অনুগ্রহের ফল নয়—এটি আমাদের দীর্ঘদিনের আন্দোলন, সংগ্রাম ও নাগরিক চাপে অর্জিত একটি সাফল্য। ২০১৭ সালে প্রায় ৫ হাজার ৬১৬ কোটি টাকার যে বরাদ্দ দেওয়া হয়েছিল, তা ছিল চট্টগ্রামবাসীর অধিকার আদায়ের ফল। পরবর্তীতে বরাদ্দ আরও বৃদ্ধি পেলেও প্রকল্প বাস্তবায়নে যে ধীরগতি, তা অত্যন্ত হতাশাজনক।” বিবৃতিতে আরও উল্লেখ করা হয়, প্রায় এক দশক অতিক্রান্ত হলেও জলাবদ্ধতা নিরসনের কাজ আজও সম্পূর্ণ হয়নি। বরং প্রতি বর্ষায় একই দুর্ভোগে পড়তে হচ্ছে নগরবাসীকে। অপরিকল্পিত নগরায়ন, খাল-নালা দখল, অপর্যাপ্ত ড্রেনেজ ব্যবস্থা এবং সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর সমন্বয়হীনতাই এই সমস্যাকে আরও জটিল করে তুলেছে। চট্টগ্রাম নাগরিক ফোরাম আরও দুঃখ প্রকাশ করে জানায়, জলাবদ্ধতা পরিস্থিতি সরেজমিনে পরিদর্শনের সময় চট্টগ্রামের দায়িত্বপ্রাপ্ত অন্যান্য মন্ত্রী ও সংসদ সদস্যদের অনুপস্থিতি অত্যন্ত দুঃখজনক। তাদের উপস্থিতি থাকলে বাস্তব চিত্র আরও স্পষ্টভাবে তুলে ধরা সম্ভব হতো এবং এ ধরনের বিভ্রান্তিকর বক্তব্য দেওয়ার সুযোগ তৈরি হতো না। বিবৃতিতে স্পষ্ট ভাষায় বলা হয়, “চট্টগ্রামবাসীর দুর্ভোগ নিয়ে কোনো ধরনের অসত্য, অবহেলামূলক বা দায়িত্বজ্ঞানহীন বক্তব্য আমরা মেনে নেব না। যেভাবে আমরা আন্দোলনের মাধ্যমে জলাবদ্ধতা নিরসনের প্রকল্প আদায় করেছি, ঠিক সেভাবেই প্রয়োজন হলে আবারও আন্দোলনের মাধ্যমে এই মিথ্যা বক্তব্যের জবাব দেওয়া হবে।” শেষে চট্টগ্রাম নাগরিক ফোরাম সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের প্রতি আহ্বান জানায়—প্রকল্প বাস্তবায়নে গতি বৃদ্ধি, কার্যকর মনিটরিং এবং দায়বদ্ধতা নিশ্চিত করতে হবে। কারণ একটি উন্নয়নশীল নগরীর জন্য জলাবদ্ধতা শুধু একটি সমস্যা নয়, এটি নাগরিক জীবনের নিরাপত্তা, অর্থনীতি এবং মর্যাদার সঙ্গে সরাসরি জড়িত। চট্টগ্রামবাসীর প্রত্যাশা একটাই—প্রহসন নয়, বাস্তবসম্মত ও টেকসই সমাধান।