
প্রতিবেদক:
চট্টগ্রাম শিক্ষা বোর্ড যেন দীর্ঘদিন ধরেই অনিয়ম ও দুর্নীতির ছায়ায় আশ্রয় নিয়েছে। এখানে অন্যায়ই যেন ন্যায়ে পরিণত হয়েছে। ন্যায়, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতার প্রত্যাশায় থাকা এই বোর্ডের বর্তমান সংকট কেবল একটি প্রতিষ্ঠানের সমস্যা নয়; বরং এটি পুরো দেশের শিক্ষা ব্যবস্থার গভীর সংকটের প্রতিফলন। প্রভাবশালী একটি সিন্ডিকেটের জালে বন্দি চট্টগ্রাম শিক্ষা বোর্ড আজ দুর্নীতির স্বর্গরাজ্যে পরিণত হয়েছে। মোটা অংকের টাকার বিনিময়ে ছেলে পরীক্ষার্থীকে মেয়ে বানানো (লিঙ্গ পরিবর্তন), ফলাফল জালিয়াতি, কেনাকাটায় সীমাহীন লুটপাটসহ নানা অনিয়মের কারণে প্রতিষ্ঠানটির সুনাম মারাত্মকভাবে ক্ষুণ্ন হয়েছে। মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষা বোর্ড, চট্টগ্রাম—দীর্ঘকাল ধরে একটি মাফিয়া সিন্ডিকেট ও দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তা-সাম্রাজ্যের নিয়ন্ত্রণে পরিচালিত হয়ে আসছে বলে অভিযোগ রয়েছে। এই সিন্ডিকেটের শিকড় ভাঙা এবং মুখোশ উন্মোচনের চেষ্টা করতে গিয়ে তাদের রোষানলে পড়েছেন বোর্ডের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ইলিয়াছ উদ্দিন আহম্মদ। জানা যায়, অধ্যাপক ইলিয়াছ উদ্দিন আহমেদকে গত ৮ ডিসেম্বর ওএসডি করা হয়। তবে এই ওএসডি প্রক্রিয়াটি ঘিরে রহস্য ও ধোঁয়াশা সৃষ্টি হয়েছে। অনলাইনে প্রজ্ঞাপন প্রকাশ না করে সেটি ১৪ দিন গোপন রাখা হয়। অবশেষে গত ২১ ডিসেম্বর তাকে জানানো হয় যে, ৮ ডিসেম্বরই তিনি ওএসডি হয়েছেন। অথচ আগামী বছরের মার্চ মাসের ৪ তারিখে তার অবসরে যাওয়ার কথা ছিল। সরকারি কর্মকর্তাদের অবসরের আগে ওএসডি করা একটি স্বাভাবিক প্রক্রিয়া হলেও অধ্যাপক ইলিয়াছ উদ্দিন আহম্মদের ক্ষেত্রে ঘটেছে সম্পূর্ণ ভিন্ন ঘটনা। তাকে প্রায় আড়াই মাস আগে ওএসডি করা হলেও তার বাকি কর্মকাল তিনি কোথায় দায়িত্ব পালন করবেন—সে বিষয়ে প্রজ্ঞাপনে কোনো সুস্পষ্ট নির্দেশনা নেই। এরই মধ্যে তার স্থলে নতুন চেয়ারম্যান হিসেবে অধ্যাপক আব্দুল্লাহ আল মামুন চৌধুরীকে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। এতে করে চট্টগ্রাম শিক্ষা বোর্ডে ব্যাপক গুঞ্জন সৃষ্টি হয়েছে যে, অত্যন্ত সুপরিকল্পিতভাবে দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তাদের রোষানলের শিকার হয়েছেন অধ্যাপক ইলিয়াছ উদ্দিন আহমেদ। চলতি বছরের ১১ ফেব্রুয়ারি, বুধবার শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের উপসচিব মো. মাহবুব আলম স্বাক্ষরিত এক প্রজ্ঞাপনে তিনি বোর্ডের চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন। দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকেই তিনি বোর্ডের সুনাম ফিরিয়ে আনতে প্রশাসনিক ও একাডেমিক কার্যক্রম সুষ্ঠুভাবে পরিচালনার চেষ্টা করেন। কিন্তু প্রতিটি পদে পদে তিনি সিন্ডিকেটের বাধার সম্মুখীন হন। একটি দুর্নীতিমুক্ত প্রতিষ্ঠানে রূপ দিতে গিয়ে তাকে ব্যর্থ হতে হয়। বিশেষ করে চট্টগ্রাম শিক্ষা বোর্ডের ইতিহাসে সবচেয়ে বড় আলোচিত কেলেঙ্কারি প্রকাশ পায় খাতা গণনায়। যেখানে বিশেষায়িত খাতা থাকার কথা ছিল ১৬ লাখ ৪৫ হাজার, সেখানে পাওয়া গেছে মাত্র ১০ লাখ ৪৭ হাজার। একইভাবে ১২ লাখ ৪৮ হাজার লুজ শিটের পরিবর্তে মজুদে ছিল মাত্র সাড়ে ৮ লাখ। অর্থাৎ প্রায় সাড়ে ১০ লাখ খাতা উধাও। পরীক্ষায় অংশ না নিয়েও শিক্ষার্থীর জিপিএ-৫ পাওয়া, পুনঃনিরীক্ষণে খাতার চেয়ে সার্ভারে বেশি নম্বর দেখানো, কিংবা ১০ লাখ টাকার লেনদেনে মেয়ের জায়গায় ছেলে পরীক্ষায় অংশ নেওয়ার মতো ভয়াবহ অনিয়ম—এসব দুর্নীতির বিরুদ্ধে সোচ্চার ছিলেন অধ্যাপক ইলিয়াছ উদ্দিন আহমেদ। বোর্ডের একাধিক সূত্র জানায়, মূলত ১০ লাখ খাতা গায়েব হওয়া, ১০ লাখ টাকার লেনদেনে লিঙ্গ পরিবর্তনের ঘটনা, কেনাকাটায় সীমাহীন লুটপাট এবং ফল জালিয়াতির কারণ অনুসন্ধান ও প্রতিষ্ঠানকে দুর্নীতিমুক্ত করতে তার নেওয়া নানা পদক্ষেপের কারণেই দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তাদের চোখের শূল হয়ে ওঠেন তিনি। অভিযোগ রয়েছে, এক ছাত্রীর নাম পরিবর্তন করে অন্য একজনের পরীক্ষা দেওয়ারও। গত ৩ সেপ্টেম্বর নাঈম চৌধুরী নামে এক ব্যক্তি বোর্ড চেয়ারম্যানের কাছে লিখিত অভিযোগ করেন। অভিযোগে বলা হয়, ১০ লাখ টাকার বিনিময়ে খাগড়াছড়ির শহীদ লেফটেন্যান্ট মুশফিক হাইস্কুলের এক পরীক্ষার্থীর নাম পরিবর্তন করে অন্য একজনের নামে প্রবেশপত্র তৈরি করা হয়েছে। বিষয়টি তদন্তে তিনি একটি তদন্ত কমিটি গঠন করেন। এদিকে চলতি বছরের এসএসসি পরীক্ষার উত্তরপত্র পুনর্নিরীক্ষণের ফল জালিয়াতিসহ বিভিন্ন অভিযোগের তদন্তে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) চট্টগ্রাম শিক্ষা বোর্ডে অভিযান চালায়। দুদকের সহকারী পরিচালক সাঈদ মোহাম্মদ ইমরান হোসেনের নেতৃত্বে এই অভিযান পরিচালিত হয়। ২০২৫ সালের এসএসসি পরীক্ষার পুনর্নিরীক্ষণের ফলাফলে অসংগতি পাওয়ায় গত ১১ সেপ্টেম্বর বোর্ড কর্তৃপক্ষ তিন সদস্যবিশিষ্ট একটি তদন্ত কমিটি গঠন করে। হিসাব ও নিরীক্ষা শাখার উপপরিচালক মুহাম্মদ একরামূল হককে প্রধান করে গঠিত কমিটি জানায়, ৩৪টি উত্তরপত্রে নম্বরের গরমিল পাওয়া গেছে। বিষয়টি দুদকে অভিযোগ আকারে জমা পড়ে এবং প্রয়োজনীয় নথিপত্র সংগ্রহ করে তদন্ত করছে দুদক। এর আগেও বোর্ড কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে ফল জালিয়াতির অভিযোগ রয়েছে। ২০২৩ সালের এইচএসসি পরীক্ষায় বোর্ডের তৎকালীন সচিব নিজ ছেলের ফল জালিয়াতি করেন। ওই ঘটনায় তাকে বরখাস্ত করা হয় এবং মামলাটি এখনো বিচারাধীন। সূত্র জানায়, চট্টগ্রাম শিক্ষা বোর্ডের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত নন। যে সরকার ক্ষমতায় থাকে, তারা সেই সরকারের তাবেদারি করে চলে। জবাবদিহিতার অভাবে একটি শক্তিশালী দুর্নীতিবাজ সিন্ডিকেট এখানে দীর্ঘদিন ধরে সক্রিয়। এই সিন্ডিকেটের সঙ্গে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের কিছু ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রয়েছে বলেও অভিযোগ আছে। ফলে তাদের বিরুদ্ধে কেউ কথা বললে বদলি কিংবা নানা ধরনের হয়রানির শিকার হতে হয়। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক কর্মকর্তা বলেন, “অধ্যাপক ইলিয়াছ উদ্দিন আহমেদ স্যারের মতো সৎ ও যোগ্য মানুষ খুব কমই আছে। তিনি দুর্নীতির সঙ্গে আপোষ করেননি বলেই নির্দিষ্ট সময়ের আগেই তাকে বিদায় নিতে হয়েছে। এটি আমাদের জন্য অত্যন্ত লজ্জাজনক।” জানা যায়, বোর্ডের কম্পিউটার, একাউন্টস, স্কুল, কলেজ, এডমিন ও প্রশাসন শাখার কয়েকজন কর্মকর্তা দীর্ঘদিন একই পদে থাকায় দুর্নীতির শিকড় গভীরে প্রোথিত হয়েছে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক শাখা প্রধান বলেন, “আমাদের বদলির সুযোগ নেই। ফলে কোনো চেয়ারম্যান যদি আমাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে চান, তাকেই বিপদে পড়তে হয়।” উল্লেখ্য, গত ৬ নভেম্বর বোর্ড চেয়ারম্যানের সঙ্গে অশালীন আচরণের অভিযোগে সেকশন অফিসার জাহেদ হোসেন ও অফিস সহায়ক জমির উদ্দিনকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়। বোর্ডের সচিব অধ্যাপক ড. এ কে এম সামছু উদ্দিন আজাদ স্বাক্ষরিত অফিস আদেশে বলা হয়, তারা চেয়ারম্যানের কক্ষে অনধিকার প্রবেশ করে অশোভন ও ঔদ্ধত্যপূর্ণ আচরণ করেন এবং হুমকি দেন, যা সরকারি কর্মচারী বিধিমালার পরিপন্থী। জানা যায়, তারা বিএনপির রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত। অধ্যাপক ইলিয়াছ উদ্দিন আহমেদ বলেন, “২০২৬ সালের ৪ মার্চ আমার অবসরজনিত বিষয়টি মন্ত্রণালয়কে জানানো হয়েছে। অবসরের আগে ওএসডি একটি স্বাভাবিক প্রক্রিয়া হলেও আমাকে যেভাবে গোপনে ওএসডি করা হয়েছে এবং রিপ্লেসমেন্ট দেওয়া হয়েছে, তা অত্যন্ত দুঃখজনক। চট্টগ্রাম শিক্ষা বোর্ডকে দুর্নীতিমুক্ত করতে আমি সর্বাত্মক চেষ্টা করেছি। আমার বিরুদ্ধে কোনো অভিযোগ নেই। তবে মন্ত্রণালয়ের সিদ্ধান্তকে আমি সম্মান জানাই।”চট্টগ্রাম শিক্ষা বোর্ড প্রতিষ্ঠার আন্দোলনের সংগঠন ‘ছাত্র সংগ্রাম কমিটি’র সভাপতি মো. কামাল উদ্দিন বলেন, “দুঃখজনক হলো, এই দুর্নীতিবাজ সিন্ডিকেট এখনো বোর্ডের উচ্চপদে বহাল রয়েছে। শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের নীরবতা সাধারণ মানুষের হতাশা আরও বাড়াচ্ছে।” উল্লেখ্য, অধ্যাপক ইলিয়াছ উদ্দিন আহাম্মদ ১৪তম বিসিএসে যোগ দিয়ে ১৯৯৩ সালের ১৪ নভেম্বর প্রভাষক হিসেবে শিক্ষকতা শুরু করেন। ২০১৮ সালের ৯ সেপ্টেম্বর অধ্যাপক পদে পদোন্নতি পান। পরে ২০২৩ সালের ২৩ জুলাই পটিয়া সরকারি কলেজে উপাধ্যক্ষ হিসেবে যোগ দেন এবং সর্বশেষ সেখানে ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষের দায়িত্ব পালন করছিলেন।