
— মো. কামাল উদ্দিন
চট্টগ্রামের সাংবাদিকতা ইতিহাসে গত এক দশকের মধ্যে সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য, সুদীর্ঘ ও নৈতিকভাবে সুস্পষ্ট একটি নাম—চট্টগ্রাম সাংবাদিক উন্নয়ন পরিষদ। একটি সংগঠনের নাম তখনই ইতিহাস হয়, যখন তার অস্তিত্ব হয়ে ওঠে নিপীড়িতের ভরসা, সত্যের মশাল, পেশাগত মর্যাদার রক্ষাকবচ এবং মানবিকতার অবলম্বন। দশ বছর ধরে এই সংগঠন চট্টগ্রামের সাংবাদিক সমাজকে যে নৈতিক সাহস, সুরক্ষা ও মানবিক সহযাত্রার শক্তি দিয়েছে—তা কেবল সংগঠনের সাফল্য নয়; এটি পুরো সাংবাদিক সমাজের অভ্যন্তরীণ শক্তি, আত্মপরিচয় এবং দায়িত্ববোধকে সুদৃঢ় করেছে। এই প্রবন্ধে আলোচনা করা হবে চট্টগ্রাম সাংবাদিক উন্নয়ন পরিষদের জন্ম, সংগ্রাম, সাফল্য, মানবিক অবদান, নৈতিক অবস্থান, সাংগঠনিক নেতৃত্ব এবং সাংবাদিকতার ভবিষ্যৎ নির্মাণে তাদের অনন্য ভূমিকা। চট্টগ্রামের সাংবাদিক সমাজ দীর্ঘদিন ধরে নানা অবিচার, নির্যাতন, হুমকি, রাজনৈতিক প্রতিহিংসা, ক্ষমতার অপব্যবহার, চাকরিচ্যুতি, বেতনবঞ্চনা এবং মিথ্যা মামলার শিকার হয়ে আসছিল। সাংবাদিকদের উপর হামলা, হুমকি ও হয়রানির ঘটনা প্রতিনিয়তই ঘটে; কিন্তু তাদের পাশে দাঁড়ানোর মতো কোনো শক্তিশালী সংগঠন ছিল না। তখনই চট্টগ্রামের একদল সাহসী, মানবিক ও পেশাগতভাবে দায়িত্বশীল সাংবাদিক সিদ্ধান্ত নেন “আমরা নিজেরাই নিজেদের জন্য মানবিক অস্তিত্ব গড়ে তুলব।” এই সিদ্ধান্ত থেকেই জন্ম নেয় চট্টগ্রাম সাংবাদিক উন্নয়ন পরিষদ। সংগঠনটির উদ্দেশ্য ছিল স্পষ্ট—সাংবাদিকের অধিকার রক্ষা,নির্যাতিত সাংবাদিকের পাশে দাঁড়ানো মানবিক সহায়তা প্রদান,পেশাগত নৈতিকতার মান বজায় রাখা,দক্ষ ও সাহসী সাংবাদিক তৈরি,সামাজিক কল্যাণমূলক কাজের মাধ্যমে সাংবাদিক সমাজকে ঐক্যবদ্ধ করা,এই সংগঠন হয়ে ওঠে চট্টগ্রামের সাংবাদিকদের জন্য এক নিরাপদ আশ্রয়স্থল… যেখানে ভয় নয়, ছিল আত্মবিশ্বাস; নির্যাতন নয়, ছিল ন্যায়; হতাশা নয়, ছিল মানবতার আলো। সাংবাদিকতা শুধু পেশা নয়—এটি সমাজের বিবেক, রাষ্ট্রের চতুর্থ স্তম্ভ এবং সত্য প্রতিষ্ঠার সংগ্রাম। চট্টগ্রাম সাংবাদিক উন্নয়ন পরিষদ এই সত্যটিকে সবচেয়ে শক্তভাবে ধারণ করেছে। তাদের মূল দর্শন— “একজন সাংবাদিকের মর্যাদা সমাজের সামগ্রিক নৈতিক অবস্থার প্রতীক।” সুতরাং তারা যে কোনো পরিস্থিতিতে সাংবাদিকের নিরাপত্তা, স্বাধীনতা ও মর্যাদা রক্ষা করতে বদ্ধপরিকর। এ কারণেই—নির্যাতিত সাংবাদিক মিথ্যা মামলায় গ্রেপ্তার হওয়া সাংবাদিক, রাজনৈতিক প্রতিহিংসার শিকার, সাংবাদিক আর্থিক সংকটে থাকা, সাংবাদিক দুর্ঘটনায় আহত সাংবাদিক,পরিবারহীন অসহায় সাংবাদিক
তাদের সকলের প্রথম নির্ভরযোগ্য ঠিকানা হয়ে উঠেছে এই সংগঠন। এই সংগঠন কখনোই কেবল কাগজে-কলমে প্রতিবাদে সীমাবদ্ধ থাকেনি। যেখানে অন্যায় হয়েছে, সেখানেই তারা দাঁড়িয়েছে রাজপথে। গত দশ বছরে তারা বহু মানববন্ধন করেছে,প্রতিবাদ সমাবেশ করেছে,স্মারকলিপি প্রদান করেছে,সাংবাদিক নির্যাতনের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নিয়েছে,আইনি লড়াই চালিয়েছে,এই সংগঠনের কর্মকাণ্ড প্রমাণ করে— সত্যের পক্ষে দাঁড়াতে হলে কখনও কখনও রাজপথে নামতে হয়। কারণ সাংবাদিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত না হলে সত্যের পথ ঝুঁকির মুখে পড়ে। করোনা মহামারি সাংবাদিকতার ইতিহাসে সবচেয়ে কঠিন সময়। সাংবাদিকরা তখন জীবন বাজি রেখে মাঠে ছিলেন হাসপাতাল, কবরস্থান, লকডাউন এলাকা—সব জায়গায়। সেই সময় চট্টগ্রাম সাংবাদিক উন্নয়ন পরিষদ ছিল এক মহামানবিক শক্তি। সংগঠন যা করেছে—খাদ্য সহায়তা পৌঁছে দিয়েছে,অসুস্থ সাংবাদিককে হাসপাতাল পৌঁছে দিয়েছে,ওষুধ কিনে দিয়েছে,মৃত সাংবাদিকদের পরিবারকে সহায়তা দিয়েছে,কর্মহীন সাংবাদিকদের আর্থিক সহযোগিতা করেছে,দাফন-কাফন পর্যন্ত দায়িত্ব নিয়েছে,এমন দৃশ্য চট্টগ্রাম আগে দেখেনি। এই সংগঠন তখন কেবল একটি সংগঠন ছিল না— এটি ছিল মানবতার মহাকাব্য, সত্যের সহযাত্রীদের সেবা কেন্দ্র। বর্তমানে সাংবাদিকতার সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ— পেশাগত দক্ষতা,নৈতিকতা,যাচাই-বাছাইয়ের ক্ষমতা,অনুসন্ধানী দৃষ্টিভঙ্গি,ডিজিটাল নিরাপত্তা চট্টগ্রাম সাংবাদিক উন্নয়ন পরিষদ এই বিষয়গুলোকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়েছে। তারা আয়োজন করেছে— প্রশিক্ষণ কর্মশালা, সাংবাদিকতার নৈতিকতা বিষয়ক আলোচনা,অনুসন্ধানী সাংবাদিকতা প্রশিক্ষণ,সংবাদ সম্পাদনার ওপর বিশেষ প্রশিক্ষণ,আইনি পরামর্শ কর্মশালা,ডিজিটাল নিরাপত্তা প্রশিক্ষণ,নতুন সাংবাদিকদের জন্য দিকনির্দেশনা ক্লাস,এই প্রচেষ্টার ফলে চট্টগ্রাম পেয়েছে নতুন এক জনশক্তি— যাদের কলম নির্ভীক, মনন শাণিত, আচরণ পেশাদার, এবং উদ্দেশ্য সত্যনিষ্ঠ। চট্টগ্রাম সাংবাদিক সমাজ বহুদিন ধরে বিভক্তির শিকার। কখনো রাজনৈতিক দলবদ্ধতা, কখনো ব্যক্তিগত বিরোধ, কখনো সংগঠনের প্রতিদ্বন্দ্বিতা সাংবাদিকদের ঐক্যকে দুর্বল করেছে। কিন্তু চট্টগ্রাম সাংবাদিক উন্নয়ন পরিষদ ভিন্নধারার একটি সংগঠন। এর মূলমন্ত্র “সাংবাদিকতা আগে, রাজনীতি নয়।” তাই এখানে,রাজনৈতিক বিভাজন নেই, দলমত নির্বিশেষে সবাই সমান,নির্বাচনভিত্তিক ক্ষমতার লড়াই নেই,ক্ষমতাবানদের চাটুকারিতা নেই, এখানে আছে— শুদ্ধ সাংবাদিকতার মূল্যবোধ এবং মানবিকতা। একজন সাংবাদিক মারা গেলে শুধুই একজন মানুষ নয়— একটি বিবেক, একটি কলম, একটি সত্যের কণ্ঠ নিভে যায়। চট্টগ্রাম সাংবাদিক উন্নয়ন পরিষদ এই সত্য গভীরভাবে উপলব্ধি করে। তাই সংগঠন,মৃতসাংবাদিকের পরিবারকে আর্থিক সহায়তা,শোকসভা আয়োজন দোয়া মাহফিল,সন্তানদের পাশে দাঁড়ানো,চিকিৎসা ও শিক্ষা সহায়তা,এসব দায়িত্ব অত্যন্ত মানবিকতার সঙ্গে পালন করে। এটি চট্টগ্রামের সাংবাদিক সমাজের জন্য এক দৃষ্টান্ত। সাংবাদিকতা পেশাটি যতই মহৎ হোক— বাস্তবতা হলো অনেক সাংবাদিক আর্থিক অনটনে দিন কাটান। এ কারণেই সংগঠনটি— প্রতি বছর ঈদ উপহার বিতরণ,শীতবস্ত্র প্রদান, চিকিৎসা সহায়তা,জরুরি আর্থিক অনুদান, এসব কার্যক্রম পরিচালনা করে আসছে। ফলে সংগঠনটি একসময় কেবল একটি পেশাগত সংগঠন নয়—একটি পরিবারে পরিণত হয়েছে। চট্টগ্রাম সাংবাদিক উন্নয়ন পরিষদের যাত্রা, সাফল্য ও মানবিকতার প্রতিটি স্তরে যার নাম আলাদা করে উচ্চারিত হয়— তিনি সৈয়দ মিজান উল্লাহ সমরকন্দী। তিনি কেবল একজন সাংবাদিক নন—তিনি একজন দৃষ্টিভঙ্গিসম্পন্ন নেতৃত্বশিল্পী। তার বৈশিষ্ট্য— সাহস সততা পারিবারিক প্রভাব ও সুপ্রতিষ্ঠা বুদ্ধিমত্তা সমস্যার মুহূর্তে দ্রুত সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা,মানবিকতা তার সাংগঠনিক দক্ষতা সংগঠনটিকে দিয়েছে শক্ত ভিত্তি। আজ সংগঠনটি চট্টগ্রামের সাংবাদিক সমাজে মর্যাদার আসনে যে অবস্থায় দাঁড়িয়ে আছে, তার মূল স্থপতি মিজানুর রহমান সমরকন্দী। আগামী ৫ ডিসেম্বর, চট্টগ্রামের হালিশহর সানসেট পয়েন্ট,দশ বছরের গৌরবময় যাত্রাকে স্মরণ করতে আয়োজন করা হচ্ছে এক মহা-উৎসব। অনুষ্ঠানে থাকবে,পতাকা উত্তোলন, র্যালী,কেক কাটা,মধ্যাহ্ন ভোজ আলোচনা সভা,সংবর্ধনা প্রদান,কাওয়ালী ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান এটি শুধু উৎসব নয়—এটি দায়বদ্ধতার নতুন শপথ। চট্টগ্রাম সাংবাদিক উন্নয়ন পরিষদ দেখিয়েছে—একটি সংগঠন কেবল অফিস-সভা-নিয়মে গঠিত হয় না। এটি গড়ে ওঠে —সাহসে,সত্যে,নৈতিকতায়,মানবিকতায়,দায়িত্ববোধে এই দশ বছর তাই একটি সংগঠনের ইতিহাস নয়— এটি চট্টগ্রামের সাংবাদিক সমাজের সাহসী জাগরণের দলিল। আমি এই সংগঠনের সকল নেতা-কর্মীকে, বিশেষ করে,সৈয়দ মিজান উল্লাহ সমরকন্দীকে, চট্টগ্রামের সাংবাদিক সমাজের প্রতি তার অবদান, দায়িত্ববোধ ও মানবিকতার জন্য আন্তরিক অভিনন্দন জানাই। এই আলোকযাত্রা আরও দূরে, আরও দৃঢ়ভাবে এগিয়ে যাক সত্যের পথে, ন্যায়ের পথে, মানুষের পথে। লেখকঃ সাংবাদিক, গবেষক ও টেলিভিশন উপস্থাপক।