– মো. কামাল উদ্দিনঃ
পুলিশি দায়িত্বকে আমরা সাধারণত দেখি কঠোরতা, কৌশল, অপারেশন ও আইন প্রয়োগের দৃশ্যপটে। সেই দৃশ্যপটের মধ্যে মানবিকতা, অনুভূতি কিংবা সাহিত্যচেতনার স্থান আছে—এমন ভাবনা আমাদের কাছে বিরল। কিন্তু কখনো কখনো ইউনিফর্মের ভেতরও জন্ম নেয় এমন মানুষ, যাদের যাত্রাপথে দায়িত্বের পাশাপাশি থাকে নরম আলো, ভাষার শক্তি এবং মানুষের জন্য কর্মনিষ্ঠ স্বপ্ন। ঠিক এমনই একজন পুলিশ অফিসার জাহিদুল কবির, যিনি চান্দগাঁও থানায় দায়িত্ব পালন শেষ করে এখন যাচ্ছেন বায়েজিদ থানার নেতৃত্বে—নতুন অধ্যায়, নতুন মিশন, নতুন স্বপ্ন নিয়ে।কক্সবাজার জেলার চকরিয়ার পেকুয়ার সন্তান তিনি। গ্রামের মাটি, পাহাড়ি বাতাস, সমুদ্রের নোনা গন্ধ—সেই পরিবেশে বেড়ে ওঠা এক তরুণ যখন পুলিশি জীবনে প্রবেশ করলেন, তখন ইউনিফর্ম তাকে দিয়েছে দায়িত্ব; আর তার জন্মগত স্বভাব দিয়েছে কোমলতা, বোধ, সহমর্মিতা। আমি তার পুলিশিং জীবনের শুরু থেকেই তাকে চিনি। দেখেছি কীভাবে একজন অফিসার দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি মানুষের ভাষা বোঝে, মানুষের কষ্ট আলাদা করে অনুভব করে, অপরাধীকে শুধু অপরাধী হিসেবে নয়—একটি সংশোধনযোগ্য মানুষের পরিচয়ে দেখতে চায়। চকবাজার—এক কঠিন অধ্যায় চট্টগ্রামের নিরাপত্তা ব্যবস্থায় চকবাজার থানা একসময় ছিল সবচেয়ে চাপপূর্ণ ও জটিল এলাকা। অপরাধী চক্র, পুরনো বিশৃঙ্খলা, অস্থিরতা—সব মিলিয়ে দায়িত্বটা ছিল চ্যালেঞ্জপূর্ণ। সেখানে দায়িত্ব নিয়ে তিনি দেখিয়েছেন দক্ষতা, সততা ও শৃঙ্খলাবোধ। তিনি জানতেন— কড়া নিয়ম প্রয়োগ লাগবে, দ্রুত সিদ্ধান্ত নিতে হবে, কিন্তু মানবিকতা হারানো যাবে না। এই ভিন্ন ভারসাম্যই তাকে আলাদা করে দেয়। চান্দগাঁও—যেখানে দায়িত্ব পেলো নতুন কাঠামো চকবাজারের পর তাকে চট্টগ্রাম মহানগরের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ থানা চান্দগাঁও–এ দায়িত্ব দেওয়া হয়। এই থানাটি শুধু অপরাধপ্রবণই নয়, বরং অত্যন্ত জনবহুল এবং সামাজিকভাবে জটিল এলাকা। এখানে দায়িত্ব নেয়ার পর— তিনি অপরাধ দমনে কৌশলগত ব্যবস্থা নেন যুবসমাজের অপরাধ প্রবেশ ঠেকাতে প্রিভেন্টিভ পদ্ধতি চালু করেন থানা প্রশাসনের ভেতর স্বচ্ছতা ও শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠা করেন থানার দরজা সাধারণ মানুষের জন্য উন্মুক্ত রাখেন একদিন রাতে তার চেয়ারে বসে দীর্ঘ আলাপচারিতায় আমি দেখেছি—তার সিদ্ধান্তগুলো শুধু পুলিশি ব্যবস্থা নয়; সেখানে ছিল মানবিক জীবনবোধ। তিনি বললেন “শাস্তি দিয়ে অপরাধ শেষ হয় না। সংশোধন ঘটলে অপরাধ বন্ধ হয়।” এই উপলব্ধি এক অফিসারের ভেতর পাওয়া বিরল। আমাদের আড্ডার টেবিলে সাহিত্য এসে দাঁড়াত, পাশাপাশি থাকত আইন, আদালত, মানবাধিকার, এমনকি অপরাধীর মানসিক ট্রাজেডিও। একপর্যায়ে তিনি বললেন “কামাল ভাই, আমি আপনাকে নিয়ে একটি গবেষণা লেখা লিখতে চাই। সাধারণ মানুষের চিন্তার জায়গা থেকে, পুলিশের ভাষায় নয়।” আমি তার ভেতরে সাহিত্যিক শক্তি দেখলাম। তিনি শুধু বই পড়েন না—চিন্তা করেন, প্রয়োগ করতে চান। বায়েজিদ—তার দায়িত্বের নতুন সিঁড়ি-চান্দগাঁওয়ের সফল অধ্যায়ের পর এখন তিনি যাচ্ছেন বায়েজিদ থানায় দায়িত্ব নিতে। এই থানাও চ্যালেঞ্জপূর্ণ, সামাজিক বিচ্ছিন্নতার মধ্যেও সক্রিয় অপরাধচক্র রয়েছে। সেখানে তার দায়িত্ব হবে শুধু দমন নয়—দায়িত্ব হবে: অপরাধ প্রতিরোধ,মাদক, কিশোর অপরাধ, সংঘবদ্ধ অপরাধ নিয়ন্ত্রণ, স্থানীয় মানুষের আস্থা অর্জন সুশাসনের উদাহরণ তৈরি, যা চান্দগাঁওয়ে প্রতিষ্ঠা করেছিলেন, এবং তার আগেও চকবাজারে। কেন তিনি অন্যদের থেকে ভিন্ন? তার ভিন্নতা এই জায়গায়,কণ্ঠে অহংকার নেই,আচরণে রুক্ষতা নেই মানুষের ভাষা ধরতে পারেন,কথা বলতে জানেন পরিমিত শব্দে,অপরাধীকে মানুষ হিসেবে বিশ্লেষণ করেন এ কারণেই সাধারণ মানুষ দ্রুত তাকে কাছে টেনে নেয়। তার পিছনের নেতৃত্ব—কমিশনার হাসিব আজিজ চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশ কমিশনার হাসিব আজিজ যে নতুন ধারার পুলিশিং তৈরি করছেন—সেখানে শুধু শক্ত হাতে দমন নয়; বরং মানবিক পুলিশ সদস্য তৈরির দৃষ্টিভঙ্গি স্পষ্ট। জাহিদুল কবির সেই বাগানের এক পরীক্ষিত ফুল। কমিশনার যেমন বিশ্বাস করেন—
“ভালো পুলিশিং মানে মানুষ নিরাপদ অনুভব করবে”— তা বাস্তবে রূপ দেওয়ার সক্ষমতা জাহিদুল কবিরের মধ্যে আছে। লেখক মন—যা তাকে ভিন্নতর ব্যাখ্যা দেয় তার ভেতরে একটি লেখক-মন কাজ করে। অপরাধ দেখে শুধু মামলা নয় বরং সমাজের অসঙ্গতি, মানুষের মানসিক ভাঙন, আইন ও আদালতের সময়সীমার দ্বন্দ্ব,সমাজের নৈতিক পতন— এসব প্রশ্ন নিয়ে তিনি ভাবেন। তাই আমি তাকে বলেছি— “তুমি লেখো। তোমার দায়িত্ব পালনের অভিজ্ঞতা জাতির সম্পদ হবে।” আমি সত্যিই বিশ্বাস করি— সাহিত্য, প্রশাসন, মানবিকতার মিশ্রণই সমাজকে সবচেয়ে বেশি বদলায়। জাহিদুল কবির ঠিক সেই পরিবর্তনের জন্যই এগোচ্ছেন। তিনি একজন পুলিশ পরিদর্শক—এটাই তাঁর পরিচয়। কিন্তু আমার কাছে তার পরিচয় ভিন্ন— তিনি একজন মননশীল মানুষ, মানুষের ভেতর আলো দেখেন, অপরাধের ভেতর সংশোধনের পথ খোঁজেন এবং লেখালেখির মাধ্যমে সমাজকে নির্দেশনা দিতে চান। চান্দগাঁও থেকে বায়েজিদের যাত্রা কেবল বদলি নয়— এ এক দায়িত্বপূর্ণ অগ্রযাত্রা, এ এক নতুন আলো, এ এক মানবিক পুলিশিংয়ের পরিচয়। আমি প্রার্থনা করি—যেন বায়েজিদে তাঁর কর্মযজ্ঞ মানুষের জীবনে নিরাপত্তা, আস্থা ও সহমর্মিতার বাতিঘর হয়ে দাঁড়ায়। কারণ দেশের পুলিশ ব্যবস্থায় এমন মানবিক, সাহিত্যপ্রেমী এবং সৃজনশীল অফিসার সত্যিই বিরল।
