ভূমিকম্প, ধস বা দুর্ঘটনার পর বহু দিন পর জীবিত উদ্ধার হওয়ার খবর প্রায়ই শোনা যায়। কিন্তু প্রশ্ন হলো—খাবার বা পানি ছাড়াই মানুষ আসলে কত দিন টিকে থাকতে পারে? বিজ্ঞানীরা বলছেন, এর সুনির্দিষ্ট উত্তর নেই। কারণ নৈতিক কারণে কাউকে দিনের পর দিন না খাইয়ে গবেষণা করা যায় না। তবে বয়স, ওজন, দেহে চর্বি ও পানির পরিমাণ, স্বাস্থ্য, পরিবেশের তাপমাত্রা—সব মিলিয়ে টিকে থাকার সময় নির্ভর করে। বাস্তব অভিজ্ঞতা অনুযায়ী, খাবার ও পানি দুটোই বন্ধ থাকলে সাধারণত মানুষ ৮ থেকে ২১ দিন পর্যন্ত বাঁচতে পারে। আর শুধু খাবার ছাড়া পানি পান করলে ২ থেকে ৩ মাস পর্যন্ত বেঁচে থাকা সম্ভব। ন্যাশনাল সেন্টার ফর বায়োটেকনোলজি ইনফরমেশনের তথ্যমতে, খাবার ও পানি ছাড়া গড়ে ৮–২১ দিন পর্যন্ত টিকে থাকা যায়। কেবল খাবার না খেলে প্রায় দুই মাস পর্যন্ত বেঁচে থাকা সম্ভব। ইতিহাসে দেখা গেছে, রাজনৈতিক অনশন বা ধর্মঘটে অংশ নেওয়া কিছু মানুষ ৪৫ থেকে ৬১ দিন পর্যন্ত বেঁচে ছিলেন। ২০১৮ সালের এক গবেষণায় বলা হয়, যাদের শরীরের ভর সূচক (BMI) ১৮.৫–এর নিচে, তাদের আয়ু স্বাভাবিক ওজনের মানুষের তুলনায় গড়ে ৪ বছর কম। অর্থাৎ, বয়স, দেহের গঠন ও চর্বি—সবকিছুই না খেয়ে বেঁচে থাকার সময়কে প্রভাবিত করে। **না খেয়েও কীভাবে টিকে থাকে শরীর** খাবার না পেলে শরীর প্রথমে সঞ্চিত গ্লুকোজ থেকে শক্তি নেয়। একদিন পর সেই মজুদ ফুরিয়ে গেলে লিভার ও পেশির গ্লাইকোজেন ভেঙে শক্তি তৈরি হয়। দুই দিনের মধ্যে সেটিও শেষ হয়ে গেলে শরীর চর্বি ভাঙা শুরু করে—এই প্রক্রিয়াকে বলে কিটোসিস। তখন শরীর ফ্যাট থেকে কেটোন তৈরি করে শক্তি জোগায়। এ কারণেই স্থূল মানুষ রোগার চেয়ে কিছুটা বেশি দিন টিকে থাকতে পারেন। প্রথম ৫ দিনে ওজন কমে যায় ১–২ কেজি পর্যন্ত, যার বেশির ভাগই পানি ও ইলেকট্রোলাইটের ঘাটতির কারণে। কয়েক সপ্তাহ পর কমার হার দাঁড়ায় দিনে প্রায় ০.৩ কেজি। যখন চর্বিও শেষ হয়ে যায়, তখন শরীর পেশি ভাঙতে শুরু করে, যা শেষ পর্যন্ত মৃত্যুর দিকে ঠেলে দেয়। **পানি কেন এত জরুরি** পানি ছাড়া টিকে থাকা আরও কঠিন। পর্যাপ্ত পানি না পেলে কিডনি কয়েক দিনের মধ্যেই বিকল হতে শুরু করে। ১৯৯৭ সালের এক গবেষণায় দেখা গেছে, প্রতিদিন অন্তত দেড় লিটার পানি পান করলে এবং তার সঙ্গে অল্প লবণ মিশিয়ে নিলে অনাহারে থেকেও তুলনামূলক দীর্ঘ সময় টিকে থাকা সম্ভব। **দীর্ঘ অনাহারের ক্ষতি** দীর্ঘদিন না খেলে শরীরের স্বাভাবিক কার্যক্রম ব্যাহত হয়। দুর্বলতা, অবসাদ, রক্তচাপ কমে যাওয়া, বমি ভাব, কোষ্ঠকাঠিন্য, অগ্ন্যাশয়ের প্রদাহসহ নানা জটিলতা দেখা দেয়। এছাড়া ত্বক শুষ্ক হয়ে যায়, চুল পড়ে, হাড় ভঙ্গুর হয়, মেয়েদের ঋতুচক্র অনিয়মিত হয় এবং মস্তিষ্কের কার্যক্ষমতাও কমে যায়। **শেষ কথা** মানবদেহের সহনশীলতা সীমিত। খাবার ও পানি ছাড়া কয়েক সপ্তাহ টিকে থাকা সম্ভব হলেও তা প্রাণঘাতী ঝুঁকি সৃষ্টি করে। দীর্ঘ অনাহার দেহের অঙ্গপ্রত্যঙ্গ স্থায়ীভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করে। তাই অনাহার কোনো সমাধান নয়, বরং এটি জীবনের জন্য এক ভয়াবহ বিপদ।
