
-মো.কামাল উদ্দিনঃ
চট্টগ্রামের পাঁচলাইশ আবাসিক এলাকার ৬৫ নম্বর ভবনটি এখন বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দু। বহু বছর ধরে ‘মা মনি হাসপাতাল’ নামে একটি প্রতিষ্ঠান সেখানে পরিচালিত হলেও, সম্প্রতি চট্টগ্রাম ওয়াসা কর্তৃপক্ষ বিল পরিশোধ না করায় ভবনের পানির সংযোগ কেটে দিয়েছে। কাগজে-কলমে মিটারটি ছিল মিসেস শাহনাজ আহমেদের নামে—একজন সাধারণ নাগরিক ও মূল ভবনের মালিক। কিন্তু বাস্তবে এই মিটারটি ব্যবহার করছিল ‘মা মনি হাসপাতাল’, যা স্থানীয়দের মতে বহু বছর ধরে প্রভাবশালী রাজনৈতিক পরিচয়ের আশ্রয়ে চালু রয়েছে। দীর্ঘদিনের দখল ও অচল চুক্তি ভবনের প্রকৃত মালিক আমাদের সংবাদকর্মীদের কাছে এসে ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন— “এই ভবনটি আমরা বহু বছর আগে ভাড়া দিয়েছিলাম চিকিৎসা সেবা প্রতিষ্ঠানের উদ্দেশ্যে। কিন্তু ২০১৫ সালের পর থেকে কোনো চুক্তি নবায়ন করা হয়নি, এমনকি এক টাকাও ভাড়া দেওয়া হয়নি। তবুও তারা জোর করে ভবনে থেকে গেছে।” তিনি দাবি করেন, ‘মা মনি হাসপাতাল’ নামটি কেবল একটি ছদ্মাবরণ—এখানে বাস্তবে কোনো পূর্ণাঙ্গ হাসপাতালের কার্যক্রম নেই। রোগী, চিকিৎসক কিংবা সেবাকর্মী—সবকিছুই অনিয়মিত ও অগোছালো। “এটি মূলত ভবন দখল করে রাখার কৌশল,” বলেন তিনি। ঝুঁকিপূর্ণ ভবন, অননুমোদিত কার্যক্রম ভবনটি পাকিস্তান আমলে নির্মিত, যা এখন প্রায় অর্ধশতাব্দী পুরনো। স্থানীয় প্রশাসনের রেকর্ড অনুযায়ী, ভবনটি অনেক আগেই ব্যবহার অনুপযোগী ও ঝুঁকিপূর্ণ ঘোষণা করা হয়েছে। তবুও ‘হাসপাতাল’ নামের ছায়ায় এখনো চলছে অননুমোদিত কার্যক্রম।
প্রতিদিন অসংখ্য মানুষ চিকিৎসার আশায় এখানে আসে, কিন্তু প্রকৃত কোনো চিকিৎসা সেবা পায় না। স্থানীয়দের ভাষায়,
“এটি হাসপাতাল নয়, বরং পুরোনো একটি ভবনকে আড়াল করে রাখার অজুহাত। জায়গাটি দখল করাই যেন আসল উদ্দেশ্য।” বকেয়া বিলের পাহাড় চট্টগ্রাম ওয়াসার নথি অনুযায়ী, শাহনাজ আহমেদের নামে থাকা ওই মিটারে এপ্রিল ২০২৪ পর্যন্ত মোট ৯৪,৮৪১ টাকা বকেয়া ছিল। প্রতি মাসের নির্ধারিত বিল, ভ্যাট ও সারচার্জসহ সংযুক্ত পরিমাণ পরিশোধ না করায় ওয়াসা কর্তৃপক্ষ মিটার খুলে ফেলে পানির সংযোগ সম্পূর্ণ বন্ধ করে দিয়েছে। ভবনের মালিক বলেন— “এই বিলটি আমাদের নয়। আমাদের নামে হলেও আসলে এটি হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ ব্যবহার করছিল। অথচ এখন ওয়াসা আমাদেরই খেলাপি গ্রাহক হিসেবে চিহ্নিত করেছে।” তিনি অনুরোধ জানান, যেন ভবনমালিকের সম্মতি ছাড়া পুনরায় কোনোভাবে ওই স্থানে সংযোগ না দেওয়া হয়। অবৈধ সংযোগের ইতিহাস ও প্রশাসনিক নীরবতা স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ ওয়াসার সংযোগ ছাড়াও বিদ্যুৎ ও গ্যাসের বিলও বছরের পর বছর পরিশোধ করেনি। একাধিক নোটিশ পাঠানো হলেও, কোনো সংস্থা দৃশ্যমান পদক্ষেপ নেয়নি। কারণ হিসেবে স্থানীয়রা বলেন— “রাজনৈতিক প্রভাবশালীদের ছায়ায় এমন অনেক অনিয়ম হয়। প্রশাসন জানে, কিন্তু ভয় বা প্রভাবের কারণে কেউ কিছু বলে না।” এই নীরবতা এখন জনরোষে পরিণত হয়েছে। অনেকের প্রশ্ন—একটি পরিত্যক্ত ভবনে কীভাবে অননুমোদিত হাসপাতাল চালু থাকতে পারে, আর সরকারিভাবে ঝুঁকিপূর্ণ ঘোষণা করা ভবনে মানুষজনের প্রবেশের অনুমতি দেওয়া হয় কীভাবে? নাগরিক সমাজের উদ্বেগ চট্টগ্রামের নাগরিক ফোরাম ও স্বাস্থ্যখাতের বিশেষজ্ঞরা বলেছেন, এটি কেবল একটি ব্যক্তিগত সম্পত্তি বিরোধ নয়; এটি জননিরাপত্তা ও প্রশাসনিক দায়বদ্ধতার প্রশ্ন।
একজন স্বাস্থ্য অধিকার কর্মী বলেন, “যে ভবন সরকার নিজেই অনিরাপদ ঘোষণা করেছে, সেখানে হাসপাতাল চালানো মানে রোগী ও কর্মচারীদের জীবন ঝুঁকির মধ্যে ফেলা। এটা স্পষ্টভাবে জনস্বাস্থ্য আইন লঙ্ঘন।” রাজনৈতিক প্রভাবের অভিযোগ
যদিও সরাসরি নাম উল্লেখ না করে অনেকে ইঙ্গিত দিয়েছেন যে, প্রতিষ্ঠানটির মালিকানা ও পরিচালনায় ক্ষমতাসীন দলের প্রভাবশালী একজন সাবেক নারী সংসদ সদস্যের ভূমিকা রয়েছে। তার সময়কার রাজনৈতিক প্রভাব ও যোগাযোগ ব্যবহার করেই এতদিন প্রতিষ্ঠানটি টিকে ছিল বলে স্থানীয়দের অভিযোগ। ভবন মালিকের ভাষায়— “তারা প্রশাসনিক প্রভাব খাটিয়ে আমাদের জায়গা দখল করে রেখেছে। আমরা বারবার অনুরোধ করেছি, মামলা করেছি, কিন্তু কেউ শোনেনি। এখন যখন ওয়াসা পদক্ষেপ নিয়েছে, তখন আমরা আশা করছি অন্তত পানির সংযোগ আর না দেওয়া হয়।” ওয়াসার পদক্ষেপ ও ভবিষ্যৎ অনিশ্চয়তা ওয়াসার এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, “যেকোনো গ্রাহক দীর্ঘদিন বিল পরিশোধ না করলে, নিয়ম অনুযায়ী সংযোগ বিচ্ছিন্ন করা হয়। এই মিটারটিও সেই প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে কাটা হয়েছে।” তবে তিনি আরও বলেন,
“যদি ভবনের মালিক লিখিতভাবে জানায় যে এটি তাদের ব্যবহারে ছিল না, এবং পরবর্তীতে অন্য কোনো পক্ষ এটি পুনঃসংযোগের চেষ্টা করে, তাহলে ওয়াসা প্রশাসনিকভাবে বিষয়টি যাচাই করে সিদ্ধান্ত নেবে।” এই বক্তব্যে স্পষ্ট—সংস্থাটি এখন ভবিষ্যৎ পদক্ষেপের আগে আইনি যাচাইয়ের দিকেই ঝুঁকছে। স্থানীয়দের ক্ষোভ ও নিরাপত্তা উদ্বেগ পাঁচলাইশ এলাকার কয়েকজন বাসিন্দা জানান, ভবনটির ভেতরে দুর্গন্ধযুক্ত পরিবেশ, অপর্যাপ্ত আলো-বাতাস এবং জরাজীর্ণ অবস্থা বিরাজ করছে। তারা আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন, কোনোদিন ভবনটি ধসে গেলে বড় দুর্ঘটনা ঘটতে পারে। একজন বলেন— “এখানে কোনো নিয়মিত ডাক্তার নেই। রোগীদের রাখা হয় পুরনো বিছানায়, জানালা-দরজা ভাঙা। অথচ বাইরে থেকে এটি হাসপাতাল হিসেবে চালানো হচ্ছে।” আইনি পদক্ষেপের দাবি ভবনের মালিক এখন আইনি প্রক্রিয়ার মাধ্যমে দখল পুনরুদ্ধারের প্রস্তুতি নিচ্ছেন। তিনি বলেন, “আমরা চাই প্রশাসন দ্রুত হস্তক্ষেপ করুক। এই ভবনটি আমাদের পারিবারিক সম্পত্তি। দীর্ঘদিন ধরে ভাড়া না দিয়ে, বিল না মিটিয়ে তারা ক্ষমতার জোরে বসে আছে।” চট্টগ্রাম নাগরিক সমাজ ও মানবাধিকার সংস্থাগুলোর পক্ষ থেকেও দাবি উঠেছে—এই ঘটনাটি শুধু সম্পত্তি দখলের নয়, বরং প্রশাসনিক দুর্নীতির প্রতীক। তারা মনে করেন, সরকারি সংস্থাগুলোর দায়বদ্ধতা না থাকলে ভবিষ্যতে আরও অনেক সাধারণ মানুষ এমন ভোগান্তির শিকার হবে। ন্যায়বিচারের প্রত্যাশা চট্টগ্রামের পাঁচলাইশের এই ঘটনাটি বাংলাদেশের নগর জীবনের একটি বড় সমস্যার প্রতিচ্ছবি—ক্ষমতার প্রভাব, প্রশাসনিক উদাসীনতা ও নাগরিক অধিকারের হরণ। একজন সাধারণ ভবন মালিক বহু বছর ধরে নিজের সম্পত্তি হারিয়ে অসহায় হয়ে পড়েছেন, অথচ তার নামে বকেয়া বিলের দায় চাপানো হচ্ছে। চট্টগ্রাম ওয়াসার এই পদক্ষেপ হয়তো একটি ছোট ঘটনা, কিন্তু এটি বড় একটি বার্তা দিয়েছে—কেউই আইনের ঊর্ধ্বে নয়। এখন প্রশ্ন, এই পদক্ষেপ কি কেবল সাময়িক শাস্তি, নাকি এর মাধ্যমে প্রশাসন সত্যিকারের ন্যায়বিচারের পথে হাঁটবে? নাগরিক সমাজের দাবি একটাই— “অবৈধভাবে পরিচালিত হাসপাতালটির কার্যক্রম বন্ধ করতে হবে, ভবনের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে, এবং প্রকৃত মালিকের অধিকার ফিরিয়ে দিতে হবে।” চট্টগ্রামের মানুষ এখন অপেক্ষায়—দেখতে, ন্যায় ও আইনের শক্তি কি প্রভাব ও প্রভাবশালীর দেয়াল ভেদ করতে পারে।