
মো. কামাল উদ্দিনঃ
স্মৃতির অ্যালবাম খুললেই চোখের সামনে ভেসে ওঠে এক টুকরো কার্ড—পুরনো, তবু অমূল্য।
গাঢ় নীল পটভূমিতে সোনালি অক্ষরে লেখা—“অপরাধ জগত”, নিচে ইংরেজিতে “The Auparadh Jagat – Fortnightly Magazine of Crime Reports”।
একটি পেশাগত পরিচয়পত্র, অথচ আজ তা শুধু পরিচয়ের নয়, এক জীবনের ইতিহাসের সাক্ষী।
কার্ড নম্বর ১২০, নামের পাশে লেখা—মো: কামাল উদ্দিন, প্রতিনিধি, চট্টগ্রাম ব্যুরো। বৈধতার মেয়াদ শেষ হয়েছিল ৩০ জুন ১৯৯৭—কিন্তু আমার কাছে এই কার্ডের বৈধতা আজও অক্ষুণ্ণ, কারণ এর ভেতর লুকিয়ে আছে এক সময়ের সংগ্রাম, এক সাংবাদিকের জন্মকথা, আর অপরাধ জগতের এক অন্ধকার অধ্যায়ের আলোকপাত। আমাকে অপরাধ জগতের প্রতিনিধি হিসেবে নিয়োগ দিয়ে এই কার্ডটি আমাকে দিয়েছিলেন অপরাধ জগত ম্যাগাজিনের সম্পাদক শামীম সাহেব। তিনি ছিলেন এমন একজন মানুষ, যিনি তরুণ সাংবাদিকদের উৎসাহিত করতেন মাঠে নেমে সত্যের অনুসন্ধান করতে। তখনকার দিনে অপরাধ জগত ছিল অপরাধ সাংবাদিকতার এক অগ্রগামী পত্রিকা—যেখানে সত্যের বিন্দুমাত্র বিকৃতি বরদাশত করা হতো না। আর আমি, তখন এক তরুণ অনুসন্ধানী কলমযোদ্ধা, স্বপ্ন দেখতাম সমাজের অন্ধকার কোণে আলো জ্বালানোর। আমার লেখালেখির সূচনা আরও আগে—১৯৮৮ সালে। চট্টগ্রামের লালখান বাজার হাইলেভেল রোডের মুখে – ডেইজি প্রিন্টিং অ্যান্ড প্যাকেজিং প্রেস তখন আমাদের প্রাণ। সেই প্রেস থেকেই সাংবাদিক রূপম চক্রবর্তী সম্পাদনা করতেন এক ছোট ম্যাগাজিন “দিনের পর দিন”। সেখানেই আমার প্রথম লেখা ছাপা হয়। তখনো জানতাম না—এই অক্ষরই একদিন আমার পেশা, আমার পরিচয়, আমার অস্তিত্ব হয়ে উঠবে। নব্বইয়ের এরশাদবিরোধী আন্দোলনের সময় রাজপথে নামা, সর্বদলীয় ছাত্র ঐক্যর নেতা হিসেবে নেতৃত্ব দেওয়া-
মিছিলের sloganeer হওয়া, আর পুলিশি তাড়া খাওয়া—এসব অভিজ্ঞতার ভেতর দিয়েই তৈরি হয় এক নতুন চেতনা। আমি বুঝলাম, কলমও এক ধরনের অস্ত্র—যা গুলি নয়, কিন্তু তবুও কাঁপিয়ে দিতে পারে অন্যায়ের দুর্গ। সেই সময় থেকেই সাংবাদিকতার প্রতি আসক্তি বাড়তে থাকে। রাজপথের কর্মী থেকে আমি ধীরে ধীরে কলমের কর্মী হয়ে উঠি। আর এই পরিবর্তনের সূত্রেই ১৯৯৪ সালে আনুষ্ঠানিকভাবে যোগ দিই অপরাধ জগত ম্যাগাজিনে, চট্টগ্রাম ব্যুরোর প্রতিনিধি হিসেবে। সেই সময়কার সাংবাদিকতা ছিল একেবারে হাতে কলমে যুদ্ধের মতো। না ছিল মোবাইল, না ইন্টারনেট, না ইমেল—সব খবর সংগ্রহ করতে হতো মানুষের মুখে মুখে, থানার রিপোর্টবুকে, আদালতের নথিপত্রে, বা কোনো গোপন সূত্রের মাধ্যমে। আমি প্রতিদিন সকালেই বের হতাম এক ব্যাগ খাতা, কলম আর রেকর্ডার নিয়ে। কোথাও হত্যাকাণ্ড, কোথাও ডাকাতি, কোথাও ধর্ষণ—সবখানেই আমার উপস্থিতি। সন্ধ্যা নামলেই চট্টগ্রাম নগরীর অন্ধকার গলিগুলো হয়ে উঠত আমার কর্মক্ষেত্র। তখনকার দিনে অপরাধ সংবাদ সংগ্রহ ছিল জীবনবিপন্ন পেশা। অপরাধীদের সাথে কথা বলতে হতো, কখনও কখনও তাদের আড্ডায় বসতে হতো, এমনকি পুলিশের চোখ ফাঁকি দিয়ে তথ্য নিতে হতো। অনেক সময় হুমকি এসেছে, জানমাল নিয়ে আশঙ্কা তৈরি হয়েছে, কিন্তু পিছু হটিনি। কারণ আমি জানতাম—সত্যের পেছনে ঝুঁকি থাকে, কিন্তু সেই সত্যই একজন সাংবাদিকের মূলধন। আমার লেখা অনুসন্ধানী প্রতিবেদনগুলো সে সময় আলোচনার শীর্ষে থাকত। চট্টগ্রামের ছোট-বড় শতাধিক অপরাধের রহস্য আমি উন্মোচন করেছি—খুন, অপহরণ, মাদক, চাঁদাবাজি, মানবপাচার—সবকিছুর গভীরে গিয়েছি। অনেক সময় পুলিশ প্রশাসনও আমার কাছ থেকে তথ্য নিয়ে তদন্ত করতেন। এক অর্থে আমি হয়ে উঠেছিলাম পুলিশের এক অনানুষ্ঠানিক সহযোগী। এই সূত্রেই পুলিশের সঙ্গে আমার পেশাগত বন্ধুত্ব গড়ে ওঠে, যা এখনো টিকে আছে। সেই সময়ের এক বড় স্মৃতি—জামাল উদ্দিন নামের একজন সহযোদ্ধা সাংবাদিক।
আমরা একসাথে কাজ করতাম, তথ্য বিনিময় করতাম, কখনও দিনে কখনও গভীর রাতে। পরে আমরা দু’জন মিলে ১৯৯৪ সালে শুরু করি চট্টল চিত্র—একটি সাহসী পত্রিকা, যা প্রকাশের সঙ্গে সঙ্গেই আলোড়ন তোলে। তিনি ছিলেন সম্পাদক, আমি নির্বাহী সম্পাদক। আমাদের দলে যোগ দিয়েছিলেন সাংবাদিক রিয়াজ হায়দার চৌধুরী, কাজী মহসিনসহ আরও এক ঝাঁক তরুণ উদ্যমী সাংবাদিক। তবে সবচেয়ে চ্যালেঞ্জিং সময় কাটিয়েছি অপরাধ জগত-এর ব্যানারে। তখন ব্যুরো প্রধান ছিলেন প্রদীপ কুমার শীল—একজন দক্ষ ও পেশাদার সাংবাদিক। আমি তার অধীনে কাজ করতাম না, কিন্তু একই সঙ্গে কাজ করেছি। তার কাছ থেকে শিখেছি সাংবাদিকতার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পাঠ—তথ্যের সত্যতা যাচাই। তিনি বলতেন, “সংবাদ মানে শুধুই খবর নয়, তার পেছনের সত্যও জানা জরুরি।” তার সেই উপদেশ আজও আমার লেখা র ভিতকে দৃঢ় করে রেখেছে। অপরাধ জগতের সেই সময়টায় আমি বুঝেছি—সাংবাদিকতা কেবল তথ্য সংগ্রহ নয়, এটি একটি সামাজিক দায়বদ্ধতা অন্যায়ের মুখোশ খুলে দেওয়ার জন্য যেমন সাহস লাগে, তেমনি লাগে বিবেকের শক্তি। একটি ছোট্ট আইডি কার্ড, হাতে লেখা সংবাদ, আর কুরিয়ার সার্ভিসের ধুলোবালি মাখা খামে ঢাকায় পাঠানো—এই ছিল আমাদের বাস্তবতা। আজকের যুগে, যখন এক ক্লিকে খবর ছড়িয়ে পড়ে পৃথিবীজুড়ে, তখন ভাবি—আমরা কত কষ্টের ভেতর দিয়ে গিয়েছি। আমার প্রতিটি প্রতিবেদন ছিল একেকটি অনুসন্ধানী যুদ্ধের ফল। কখনো রেলওয়ে কলোনিতে ছদ্মবেশে প্রবেশ করেছি মাদক চক্র ধরতে, কখনো পাহাড়তলীতে গিয়েছি খুনের তদন্তে, কখনো বন্দরে রাতে গিয়েছি চোরাচালান ধরতে। কত রাত যে না ঘুমিয়ে কাটিয়েছি, কতবার যে জীবনের ঝুঁকি নিয়েছি, তার হিসেব আজও রাখিনি। আজ এই দীর্ঘ অভিজ্ঞতার পেছনে তাকিয়ে দেখি—একটি সময়, একটি প্রজন্ম, একটি সাংবাদিকতার ধারা হারিয়ে যাচ্ছে। যেখানে ছিল সততা, কষ্ট, মেধা, আর দায়বদ্ধতা—সেখানে এখন এসেছে তড়িঘড়ি রিপোর্টিং, কপি-পেস্ট সংবাদ, আর জনপ্রিয়তার প্রতিযোগিতা। এই কারণেই এখন সিদ্ধান্ত নিয়েছি—এই স্মৃতিগুলো আর গোপন রাখব না। আমি লিখব অপরাধ সাংবাদিকতার ইতিকথা—এক ধারাবাহিক স্মৃতিচিত্র, যাতে নতুন প্রজন্ম জানতে পারে আমরা কেমন লড়াই করে গড়েছি এই পেশার মর্যাদা। কারণ ইতিহাস বলে—যে প্রজন্ম অতীতের সংগ্রাম জানে না, তারা বর্তমানের দায়ও বুঝতে পারে না।
আমার এই লেখাগুলো সেই ইতিহাসের দলিল হয়ে থাকবে—যেখানে থাকবে রক্ত, ঘাম, চোখের জল, আর অক্ষরে অক্ষরে সত্যের লড়াইয়ের কাহিনি।
চলবে…