“বেকারি কামাল” বলে যারা ডাকেন, তাদের প্রতি আমার কৃতজ্ঞতা-

By admin
6 Min Read

-মো. কামাল উদ্দিনঃ কিছু মানুষ মনে করেন, আমাকে “বেকারি কামাল” বলে ডাকলে হয়তো আমাকে ছোট করা হয়, বা আমাকে ব্যঙ্গ করা যায়, কিংবা বা আমার পরিচিতিকে খাটো করা যাবে। আমি তাদের প্রতি কোনো ক্ষোভ পোষণ করি না। বরং তাদের ধন্যবাদ জানাই। কারণ তারা না জেনেই আমার জীবনের একটি গৌরবময় অধ্যায়কে উচ্চারণ করেন। আমি সাংবাদিকতায় আসছি ১৯৮৮ সালে দিনের পর দিন মাসিক ম্যাগাজিনে লেখা লেখির মাধ্যমে – বেকারি মালিকনা বা বেকারি শিল্পের আন্দোলনের সাথে জড়িত হয়েছি ২০০৫ থেকে ২০১০ সাল পর্যন্ত। তার আগে পরের আমার আরো বহু আন্দোলন সংগ্রামের ইতিহাস রয়েছে, সাংবাদিকতা চলাকালীন আমি বেকারির আন্দোলনের মাধ্যমে বেকারিশিল্পের জনক হিসেবে পরিচিত লাভ করেছি। হ্যাঁ, আমি তার জন্য গর্বের সঙ্গে বলতে চাই—আমি একজন চট্টগ্রাম উন্নয়ন আন্দোলনের সংগঠক এবং আমি সাংবাদিক, একজন লেখক, একজন টেলিভিশন উপস্থাপক। কিন্তু একই সঙ্গে আমি বেকারি শিল্পের অধিকার আদায়ের আন্দোলনের একজন সংগঠক, একজন কর্মী এবং একজন পথিকৃৎ। যদি এই পরিচয়ের কারণে কেউ আমাকে “বেকারি কামাল” বলে ডাকেন, তাহলে আমি অপমানিত নই, আমি সম্মানিত বোধ করি। জীবনে কোনো মানুষই একদিনে প্রতিষ্ঠিত হয় না। প্রতিটি পরিচয়ের পেছনে থাকে ত্যাগ, সংগ্রাম, ঘাম, অশ্রু এবং অসংখ্য নির্ঘুম রাত। আমার জীবনও তার ব্যতিক্রম নয়। সাংবাদিকতার জগতে পরিচিত হওয়ার বহু আগে আমি বেকারি শিল্পের সঙ্গে সম্পৃক্ত ছিলাম। একজন উদ্যোক্তা হিসেবে আমি দেখেছি এই শিল্পের অসংখ্য সমস্যা, বঞ্চনা ও সংকট। দেখেছি কিভাবে শত শত ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তা অবহেলা আর বৈষম্যের শিকার হচ্ছেন। দেখেছি শ্রমিকদের কষ্ট, মালিকদের অসহায়ত্ব এবং একটি সম্ভাবনাময় শিল্পের ধুঁকে ধুঁকে বেঁচে থাকার লড়াই। সেই বাস্তবতা থেকেই জন্ম নিয়েছিল আন্দোলনের চিন্তা। ব্যক্তিগত স্বার্থের বাইরে গিয়ে আমি বিশ্বাস করেছিলাম, যদি আমরা সংগঠিত না হই, তাহলে এই শিল্প একদিন ধ্বংস হয়ে যাবে। সেই বিশ্বাস থেকেই চট্টগ্রাম বেকারি মালিক সমিতির প্রতিষ্ঠা এবং আন্দোলনের সূচনা। আমাকে প্রতিষ্ঠাতা সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল, কিন্তু সেটি কোনো পদ ছিল না—সেটি ছিল একটি দায়িত্ব, একটি অঙ্গীকার, একটি সংগ্রামের শপথ। অনেকেই আজকের আধুনিক বেকারি শিল্প দেখেন, কিন্তু এর পেছনের ইতিহাস জানেন না। তারা জানেন না কত সভা-সমাবেশ, কত আন্দোলন, কত দাবি-দাওয়া, কত দরজায় কড়া নাড়া এবং কত ত্যাগের মধ্য দিয়ে এই শিল্প আজকের অবস্থানে এসেছে। তারা জানেন না, সেই সময় আমি নিজের ব্যবসার লাভ-লোকসানের কথা না ভেবে বৃহত্তর স্বার্থে কাজ করেছি। একজন মালিক হিসেবে কোটি কোটি টাকার আর্থিক ক্ষতির মুখোমুখি হয়েছি, কিন্তু কখনো আন্দোলনের পথ থেকে সরে দাঁড়াইনি। আমি বিশ্বাস করতাম, একজন মানুষের ব্যক্তিগত সফলতার চেয়ে সমাজের সম্মিলিত সফলতা অনেক বড়। আমার ক্ষতি হয়েছে, কিন্তু যদি হাজার মানুষের উপকার হয়, যদি একটি শিল্প টিকে থাকে, যদি ভবিষ্যৎ প্রজন্ম একটি সুসংগঠিত শিল্প পায়—তাহলে সেই ত্যাগ বৃথা নয়। আজ যখন কেউ আমাকে “বেকারি কামাল” বলে ব্যঙ্গ করার চেষ্টা করেন, তখন আমি মনে মনে হাসি। কারণ তারা হয়তো জানেন না, পৃথিবীর ইতিহাসে যারা পরিবর্তন এনেছেন, তাদের অধিকাংশকেই কোনো না কোনো সময় ব্যঙ্গ সহ্য করতে হয়েছে। ব্যঙ্গ কখনো ইতিহাস লিখতে পারে না; ইতিহাস লেখে সংগ্রাম, ত্যাগ এবং সাহস।
আমি কলম হাতে অন্যায়ের বিরুদ্ধে লিখেছি। দুর্নীতির বিরুদ্ধে লিখেছি। ক্ষমতার অপব্যবহারের বিরুদ্ধে লিখেছি। মানুষের অধিকার নিয়ে লিখেছি। কিন্তু তারও আগে আমি রাজপথে দাঁড়িয়ে একটি শিল্পের অধিকার নিয়ে লড়েছি। সেই লড়াই ছিল মানুষের জীবিকার জন্য, শ্রমিকের পরিবারের জন্য, উদ্যোক্তাদের বেঁচে থাকার জন্য। অনেকেই আজ সাংবাদিক কামালকে চেনেন। কিন্তু তারা হয়তো জানেন না, এই সাংবাদিক কামালের ভেতরে আরেকজন সংগ্রামী মানুষ বাস করে, যে কোনোদিন অন্যায়ের কাছে মাথা নত করতে শেখেনি। যে বিশ্বাস করে মানুষের পাশে দাঁড়ানোই জীবনের সবচেয়ে বড় পরিচয়।
আমার কাছে বেকারি কোনো ব্যবসার নাম নয়। এটি একটি সংগ্রামের নাম। এটি হাজার মানুষের স্বপ্নের নাম। এটি এমন একটি শিল্পের নাম, যার সঙ্গে জড়িয়ে আছে অসংখ্য পরিবারের জীবিকা। আর সেই শিল্পের জন্য যদি আমার নামের আগে বা পরে “বেকারি” শব্দটি যুক্ত হয়, তাহলে সেটি আমার জন্য অপমান নয়, বরং গর্বের অলংকার। আজ যারা আমাকে “বেকারি কামাল” বলেন, আমি তাদের বলব—ধন্যবাদ। কারণ আপনারা আমাকে আমার অতীতের কথা স্মরণ করিয়ে দেন। আপনারা আমাকে সেই দিনগুলোর কথা মনে করিয়ে দেন, যখন আমি ব্যক্তিগত স্বার্থ বিসর্জন দিয়ে একটি শিল্পকে রক্ষার সংগ্রামে নেমেছিলাম। আপনারা অজান্তেই আমার জীবনের একটি গৌরবময় অধ্যায়কে নতুন করে সামনে নিয়ে আসেন। জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত আমি গর্বের সঙ্গে বলব—আমি একজন সাংবাদিক, আমি একজন লেখক, আমি একজন সমাজসচেতন মানুষ। আর একই সঙ্গে আমি সেই মানুষ, যে বেকারি শিল্পের অধিকার আদায়ের আন্দোলনে নেতৃত্ব দিয়েছিল। যে নিজের ক্ষতির কথা না ভেবে একটি শিল্পকে বাঁচানোর জন্য লড়েছিল। তাই “বেকারি কামাল” আমার কাছে কোনো উপহাস নয়; এটি একটি সম্মাননা। এটি কোনো বিদ্রূপ নয়; এটি সংগ্রামের স্বীকৃতি। এটি কোনো তুচ্ছতাচ্ছিল্য নয়; এটি ইতিহাসের সাক্ষ্য। সময় একদিন সবকিছুর বিচার করবে। মানুষ ভুলে যাবে অনেক নাম, অনেক পদ, অনেক ক্ষমতা। কিন্তু যে মানুষ নিজের স্বার্থের ঊর্ধ্বে উঠে মানুষের জন্য কাজ করে, সমাজের জন্য লড়ে, একটি শিল্পকে রক্ষার জন্য নিজের সবকিছু উজাড় করে দেয়—ইতিহাস তাকে ভুলে যায় না। আর সেই বিশ্বাস নিয়েই আমি আজও মাথা উঁচু করে বলতে পারি—হ্যাঁ, আমি মো. কামাল উদ্দিন। কেউ যদি ভালোবেসে কিংবা ব্যঙ্গ করে “বেকারি কামাল” বলে ডাকেন, আমি হাসিমুখে সেই নাম গ্রহণ করি। কারণ এই নামের পেছনে রয়েছে আমার শ্রম, আমার ত্যাগ, আমার সংগ্রাম এবং আমার জীবনের এক গৌরবময় ইতিহাস। লেখকঃ সাংবাদিক গবেষক টেলিভিশন উপস্থাপক ও সাবেক প্রতিষ্ঠাতা সাধারণ সম্পাদক, চট্টগ্রাম বেকারি মালিক সমিতি।

Share This Article
Leave a Comment