বিশ্ব মৃত্যু দণ্ড রহিত দিবস: মানবতার জয়গাথান্যায়বিচার হোক মানবিক, রাষ্ট্র নয় হত্যাকারী

By admin
3 Min Read

-নিজস্ব প্রতিনিধি:
মানবাধিকারের ইতিহাসে ১০ অক্টোবর দিনটি এক মানবিক আহ্বানের প্রতীক। প্রতি বছর এই দিনে বিশ্বজুড়ে পালিত হয় ‘বিশ্ব মৃত্যু দণ্ড রহিত দিবস’ (World Day Against the Death Penalty)। এ দিনটি মনে করিয়ে দেয়—রাষ্ট্রের প্রতিশোধ নয়, বরং জীবনের প্রতি শ্রদ্ধা ও মানবিকতার বিকাশই সভ্যতার প্রকৃত মাপকাঠি।
দিবসটির সূচনা ও ইতিহাস
২০০৩ সালে ইউরোপভিত্তিক মানবাধিকার সংগঠন ‘ওয়ার্ল্ড কোলিশন এগেইনস্ট দ্য ডেথ পেনাল্টি’ প্রথমবারের মতো দিবসটি উদযাপনের সূচনা করে। সংগঠনটি প্রতিষ্ঠিত হয় ২০০২ সালে, বিশ্বের বিভিন্ন মানবাধিকার সংস্থা, আইনজীবী সংগঠন ও নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিদের অংশগ্রহণে। তাদের মূল উদ্দেশ্য ছিল—রাষ্ট্রীয় হত্যার নীতি হিসেবে পরিচিত মৃত্যুদণ্ড বিলোপ এবং ন্যায়ভিত্তিক মানবিক বিচারব্যবস্থা গড়ে তোলা। এর পর থেকে ১০ অক্টোবর দিনটি বিশ্বজুড়ে মানবাধিকারকর্মী, সাংবাদিক, আইনজীবী ও নাগরিক সমাজের জন্য এক গুরুত্বপূর্ণ দিনে পরিণত হয়েছে।
কেন মৃত্যু দণ্ড রহিতের দাবি উঠল-মানবসভ্যতার শুরু থেকেই মৃত্যুদণ্ড রাষ্ট্রীয় শাস্তির অংশ হলেও, সময়ের সঙ্গে সঙ্গে ন্যায় ও মানবিক মূল্যবোধের বিকাশে এটি প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে উঠেছে। মানবাধিকারকর্মীরা মনে করেন, মৃত্যুদণ্ড সমাজে সহিংসতার সংস্কৃতিকে টিকিয়ে রাখে, ন্যায়বিচারকে নয়। তারা উল্লেখ করেন— জাতিসংঘের ১৯৪৮ সালের মানবাধিকার ঘোষণার ৩ নম্বর অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, “প্রত্যেকের জীবনের অধিকার রয়েছে।” মৃত্যুদণ্ড এই মৌলিক অধিকারকে অমান্য করে।অনেক দেশে ভুল রায়ে নিরপরাধ মানুষ মৃত্যুদণ্ড পেয়েছেন, যা পরে প্রমাণিত হলেও ফেরানো যায়নি একটি প্রাণ।
আধুনিক সমাজে শাস্তির উদ্দেশ্য প্রতিশোধ নয়, সংশোধন। মৃত্যুদণ্ড সেই মানবিক আদর্শকে ধ্বংস করে।
গবেষণায় দেখা গেছে, যেসব দেশে মৃত্যুদণ্ড বিলোপ হয়েছে, সেখানে অপরাধের হার বাড়েনি; বরং শিক্ষা ও সামাজিক ন্যায়বিচার অপরাধ কমিয়েছে।
বিশ্বব্যাপী পরিস্থিতি
জাতিসংঘের তথ্যমতে, বর্তমানে প্রায় ১৪৪টি দেশ মৃত্যুদণ্ড আইনি বা বাস্তবে বিলোপ করেছে। এর মধ্যে ১১২টি দেশ সম্পূর্ণভাবে নিষিদ্ধ করেছে এবং ৩২টি দেশ বহু বছর ধরে এটি প্রয়োগ করছে না।
তবে চীন, ইরান, সৌদি আরব, মিশর ও যুক্তরাষ্ট্রসহ প্রায় ৫৫টি দেশ এখনো মৃত্যুদণ্ড বহাল রেখেছে। ইউরোপীয় ইউনিয়নের সদস্য হতে চাইলে যে কোনো দেশের জন্য মৃত্যুদণ্ড বিলোপ বাধ্যতামূলক শর্ত। এছাড়া জাতিসংঘ ২০০৭ সালে গৃহীত Resolution 62/149 এর মাধ্যমে বিশ্বব্যাপী মৃত্যুদণ্ড স্থগিত রাখার আহ্বান জানায়।
বাংলাদেশের অবস্থান
বাংলাদেশে এখনো মৃত্যুদণ্ড বহাল আছে। হত্যা, ধর্ষণ, মাদক ও সন্ত্রাসবিরোধী মামলায় এ শাস্তি প্রয়োগ করা হয়।
যদিও সংবিধানের ৩২ অনুচ্ছেদে জীবনের অধিকার স্বীকৃত, তবু ফৌজদারি আইনে রাষ্ট্র মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করার ক্ষমতা রাখে।
মানবাধিকারকর্মীরা বলছেন—
“ন্যায়বিচার মানে প্রতিশোধ নয়; শাস্তির উদ্দেশ্য হওয়া উচিত সংশোধন ও মানবিক পুনর্বাসন।” তারা মনে করেন, মৃত্যুদণ্ড সমাজে ভয় সৃষ্টি করে না, বরং সহিংসতার সংস্কৃতিকে টিকিয়ে রাখে।
২০২৪ সালের থিম: রাষ্ট্রীয় হত্যার অবসান ঘটিয়ে জীবনের সুরক্ষা ২০২৪ সালের থিম ছিল—“Capital Punishment and the Right to Life: Ending State Killing.”
এই থিম বিশ্বকে স্মরণ করিয়ে দেয়—মৃত্যুদণ্ড রহিত করা মানে অপরাধকে প্রশ্রয় দেওয়া নয়, বরং রাষ্ট্রকে আরও ন্যায়নিষ্ঠ, মানবিক ও আধুনিক পথে পরিচালিত করা। চট্টগ্রামে ‘অধিকার’-এর ৩১তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উদযাপন
বিশ্ব মৃত্যু দণ্ড রহিত দিবস উপলক্ষে মানবাধিকার সংগঠন ‘অধিকার’-এর ৩১তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উদযাপন অনুষ্ঠিত হয় গতকাল চট্টগ্রামে।

Share This Article
Leave a Comment