— মো. কামাল উদ্দিনঃ
“ওসি প্রদীপের ভাই সদীপ কোথায়?”—এই প্রশ্ন এখন বাংলাদেশের মানুষের মুখে মুখে ঘুরছে। প্রথমে এই প্রশ্ন শুনে অবাক হয়েছিলাম। কিন্তু পরে বুঝতে পারলাম, প্রদীপকে যেমন ভয়, ঘৃণা ও আতঙ্কের সঙ্গে মনে রাখে মানুষ, তার ভাই সদীপকেও সমান কৌতূহল ও জিজ্ঞাসা ঘিরে রেখেছে। প্রদীপের নাম উচ্চারণ মানেই মানুষের মনে ভেসে ওঠে এক ভয়াবহ অধ্যায়—রক্ত, হত্যা, লুটপাট, নির্যাতন ও ভয়ের ইতিহাস। কিন্তু সদীপ? তিনি কি সত্যিই শুধুই ভাই প্রদীপের ছায়ায় ঢাকা একজন সাধারণ পুলিশ কর্মকর্তা, নাকি তার নিজেরও কোনো ইতিহাস আছে, যেটি জনমনে সন্দেহ তৈরি করেছে? প্রদীপ কুমার দাশ : এক ভয়ঙ্কর অধ্যায়ের প্রতীক- প্রদীপ কুমার দাশ, সাবেক টেকনাফ থানার ওসি। তার বিরুদ্ধে অভিযোগের শেষ নেই—শত শত মানুষকে বিনা কারণে হত্যা করা, পাখির মতো জীবন নিভিয়ে দেওয়া, কোটি কোটি টাকা হাতানো, ক্ষমতার অপব্যবহার এবং নারী নির্যাতনের অভিযোগ। অবসরপ্রাপ্ত সেনা কর্মকর্তা মেজর সিনহা মোহাম্মদ রাশেদ হত্যার মামলায় তিনি মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত এবং বর্তমানে ফাঁসির অপেক্ষায় কারাগারে বন্দি। প্রদীপের অপরাধ এত ভয়াবহ যে, তার পরিবারও সমাজে সন্দেহের চোখে দেখা শুরু করে। তার ভাই সদীপও সেই ছায়া থেকে মুক্তি পাননি।সদীপ : প্রদীপের ভাই হওয়ার অভিশাপ-সদীপও পুলিশে কর্মরত ছিলেন। তবে প্রদীপের অপরাধ প্রকাশ্যে আসার পর থেকেই তাকে নিয়েও প্রশ্ন উঠতে থাকে। সাধারণ মানুষ ধরে নেয়, দুই ভাই নিশ্চয়ই একই রকম। এটাই ছিল সদীপের জন্য সবচেয়ে বড় অভিশাপ।
যদিও কোনো প্রমাণ নেই যে সদীপ প্রদীপের মতো হত্যাযজ্ঞে জড়িত ছিলেন, তবুও তাকে নিয়ে নানা গুজব ছড়ায়। কেউ বলেন, সদীপও নাকি আওয়ামী সরকারের দোসর হিসেবে কাজ করেছেন। আবার কেউ অভিযোগ করেন, তারা দুজনই ভারতের হয়ে পুলিশের ভেতর থেকে গুপ্তচর হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন।
অভিযান ও আন্দোলনের লক্ষ্য সদীপ
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা দেশত্যাগের পর পরিস্থিতি পুরোপুরি বদলে যায়। ছাত্র-জনতার আন্দোলন চরমে পৌঁছায়। সেই তালিকায় যারা সরকারের দমন-পীড়নে যুক্ত ছিলেন, তাদের নাম ঘুরে বেড়াতে থাকে। এর মধ্যে প্রদীপের পাশাপাশি সদীপের নামও উঠে আসে।
বিক্ষুব্ধ জনতা ও আন্দোলনকারীরা বিশ্বাস করত, পুলিশের নৃশংস দমন-পীড়নে সদীপও সক্রিয় ভূমিকা রেখেছেন। ফলে তাঁকে খুঁজতে থাকে আন্দোলনকারীরা। শুধু আইনের কাঠগড়ায় নয়, আন্দোলনকারীদের একাংশ চাইত তাকে মব জাস্টিসের মাধ্যমে শাস্তি দিতে। একাধিকবার উত্তেজিত জনতা সদীপের বাসার সামনে যায়। ভাগ্যক্রমে সে সময় তিনি বাসায় ছিলেন না। পরে তিনি বুঝতে পারেন, দেশে থাকলে যে কোনো মুহূর্তে প্রাণ হারাতে হবে।
চিকিৎসা সফর, আমেরিকা ও হুমকির মুখে পরিবার-জীবন বাঁচাতে সদীপ প্রথমে ১৩ দিনের চিকিৎসার জন্য ব্যাংকক যান। সেখানে থেকে তিনি গোপনে যুক্তরাষ্ট্রে যান। তবে এই সময়ে বাংলাদেশের বিভিন্ন জামাতপন্থি ও উস্কানিমূলক সংবাদপত্রে তার বিরুদ্ধে প্রচার শুরু হয়। তাকে হিন্দু সম্প্রদায়ের পক্ষে পুলিশ কর্মকর্তা হিসেবে উপস্থাপন করা হয়, আবার বিভিন্ন মিডিয়ায় প্রচার করা হয় যে তিনি ভারতের গুপ্তচর বা এজেন্ট। এই ধরনের উস্কানিমূলক প্রচার ও জনরোষের কারণে তার পরিবার এখন হুমকির মুখে আছে। সদীপ গণমাধ্যমকে জানিয়েছেন, উত্তেজিত জনতা ও ছাত্র-ছাত্রীদের এক গ্রুপ তার বাসায় এসে তাঁকে না পেয়ে স্ত্রী, ছেলে ও মেয়েদের হুমকি দিয়েছে, অপদস্ত করেছে।
সদীপ আক্ষেপ করে বলেন, “মব জাস্টিস বা উস্কানিমূলক জনতার কারণে আমার পরিবারকে হুমকির মুখে পড়তে হয়েছে। প্রশাসনিক হয়রানির সম্ভাবনাও ছিল প্রবল। মিথ্যা মামলায় ফাঁসানো হতে পারত। তাই আমি জীবন বাঁচানোর জন্য চাকরি ছেড়ে পালিয়ে যাই। আমার পালিয়ে যাওয়া ইচ্ছাকৃত নয়, পরিস্থিতি আমাকে বাধ্য করেছে।”
সন্দেহ, কৌতূহল ও জনমত-
ওসি সদীপ কি সত্যিই নির্দোষ? তিনি কি কেবল প্রদীপের ছায়ায় ঢাকা একজন পরিস্থিতির শিকার, নাকি তার ভেতরেও লুকিয়ে আছে কোনো ইতিহাস? সরাসরি কোনো প্রমাণ এখনো প্রকাশ হয়নি, তবে মানুষের অবিশ্বাস, গুজব এবং প্রদীপের ইতিহাস সদীপকেও সন্দেহের কেন্দ্রে নিয়ে এসেছে। সাধারণ মানুষের প্রতিক্রিয়া স্পষ্ট করে বলে:“প্রদীপের ভাই মানেই অপরাধী।” “যদি নির্দোষ হতো, তবে পালিয়ে যেত না।” “দুজনেই সরকারের দোসর, ভারতের এজেন্ট।” “এদের জায়গা দেশের মাটিতে নয়, জনতার বিচারই অপেক্ষা করছে।” আইনের ও জনতার বিচারের মুখোমুখি সদীপ বর্তমানে আমেরিকায় আত্মগোপনে আছেন। তবে বাংলাদেশে মানুষ তাকে ভুলে যায়নি। প্রদীপের নামের সঙ্গে সদীপের নামও উচ্চারিত হয়—কখনো ঘৃণার সুরে, কখনো কৌতূহলের স্রোতে।
যদি দেশে ফিরে আসেন, তাকে দুই ধরনের বিচারের মুখোমুখি হতে হবে: আইনের আদালত: চাকরি ছেড়ে পালিয়ে যাওয়া ও প্রশাসনিক শৃঙ্খলাভঙ্গের কারণে তিনি দায়বদ্ধ। জনতার আদালত: সাধারণ মানুষ বিশ্বাস করে, প্রদীপের মতো সদীপও সরকারের দমন-পীড়নে যুক্ত ছিলেন। উত্তেজিত জনতা এবং মব জাস্টিসের সম্ভাবনা এড়িয়ে যাওয়া কঠিন। ওসি সদীপের পরিবার এখন হুমকির মুখে। তিনি হিন্দু সম্প্রদায়ের পুলিশ প্রতিনিধি হিসেবে পরিচিত হলেও উস্কানিমূলক প্রচার ও জনরোষের কারণে তাঁর পরিবার ঝুঁকিতে। দেশে ফিরে আসলে আইনের পাশাপাশি জনতার বিচারের মুখোমুখি হতে হবে। সতর্কতা এবং পরিবারের নিরাপত্তা নিশ্চিত না হলে দেশে ফেরার সিদ্ধান্ত তার জন্য অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। সত্যিই কি তিনি কেবল পরিস্থিতির শিকার, নাকি নিজের ও পরিবারের জীবন রক্ষার জন্য বিদেশে অবস্থান করছেন—সময়ই তার উত্তর দেবে।