মো.কামাল উদ্দিনঃ
সাংবাদিকতা মহান পেশা। কলমের শক্তিকে সত্য ও ন্যায়ের পক্ষে ব্যবহারের জন্য এই পেশা যুগ যুগ ধরে সম্মানিত। কিন্তু যখন কেউ সাংবাদিকতার নাম করে অজ্ঞতা, বিদ্বেষ ও বিকৃত বৈজ্ঞানিক মতবাদ ছড়ায়, তখন তা আর গণমাধ্যম নয়, হয়ে ওঠে অমানবিক অপপ্রচারের হাতিয়ার। করোনা মহামারির সময় বাংলাদেশে ধর্মীয় বিধান অনুযায়ী মৃত মুসলমানদের দাফনের নিয়ম নিয়ে টেলিভিশনের এক টকশোতে বিতর্কিত মন্তব্য করেছিলেন সাংবাদিক ফারজানা রুপা। তিনি প্রস্তাব করেছিলেন—”কবর নয়, বরং পুড়িয়ে ফেলা হোক। এটাই নাকি বিজ্ঞানসম্মত।” এই মন্তব্য শুধু ইসলামী বিধানের পরিপন্থীই নয়, বরং একটি স্পষ্ট ধর্মদ্রোহী মনোভাবের প্রকাশ।
একজন মুসলমান হয়ে রুপার এমন প্রস্তাব শুধু অজ্ঞানতা নয়, বরং ইচ্ছাকৃত কোরআন-সুন্নাহ অবমাননা। ইসলাম ধর্মে মৃত্যুর পর দাফন একটি ফরজ কাজ। রাসূল (স.) নিজেই দাফনের পদ্ধতি শিক্ষা দিয়েছেন। মৃতদেহকে সম্মান দিয়ে কাফন পরানো, জানাজা পড়ানো এবং তাকে কবরস্থ করা হলো মুসলমানদের ধর্মীয় দায়িত্ব। কবর নয়, আগুনে দেহ দাহ করার যে চিন্তাধারা রুপা উত্থাপন করেছিলেন তা হিন্দু ধর্মীয় সংস্কৃতি থেকে উদ্ভূত, ইসলামের নয়। রুপার সঙ্গে এ মতের সমর্থনে টকশোতে বক্তব্য রেখেছিলেন আরেকজন তথাকথিত প্রগতিশীল, বহুবার ইসলামবিদ্বেষে অভিযুক্ত, পলাতক সাংবাদিক শ্যামল দত্ত। তাঁর বক্তব্য ছিল আরও তীব্র, যেটি বাংলাদেশের ধর্মীয়-সামাজিক রীতিনীতির বিরুদ্ধে স্পষ্ট অপমানজনক বার্তা বহন করে।
দুঃখজনকভাবে, করোনা পরিস্থিতিতে ফারজানা রুপা নিজেই তার মায়ের মৃত্যুতে প্যারোলে মুক্তি নিয়ে এসেছিলেন। তাঁর উচিত ছিল নিজস্ব মতবাদের প্রয়োগ করে মাকে “বিজ্ঞানসম্মতভাবে” আগুনে পুড়িয়ে ফেলা। কিন্তু তা তিনি করেননি। বরং তিনি মাকে ইসলামি রীতিতেই কবর দিয়েছেন। এ থেকে বোঝা যায়—তার সেই কথিত বৈজ্ঞানিক যুক্তির পেছনে ছিল আত্মপরিচয় হীনতা, লোক দেখানো প্রগতিশীলতার ঢং। এখানে প্রশ্ন জাগে—যে যুক্তিকে নিজ জীবনে প্রয়োগ করতে পারেন না, সেটিকে জাতির সামনে বৈজ্ঞানিক, প্রগতিশীল ও বাস্তবসম্মত বলে উপস্থাপন করার অধিকার কীভাবে থাকে? এটা কি না জ্ঞানপাপিতা?
বাংলাদেশ একটি মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশ। এখানে ধর্মীয় অনুভূতিকে আঘাত করার অধিকার কারও নেই। গণমাধ্যমের স্বাধীনতা মানে এই নয় যে, কেউ নিজের মতবাদ চাপিয়ে দিয়ে ধর্মীয় মূল্যবোধকে নস্যাৎ করবে। সাংবাদিকতার নৈতিকতা হচ্ছে—সততা, সত্যনিষ্ঠতা ও সম্মান। কিন্তু রুপা ও শ্যামল দত্ত সেই নৈতিকতার সাথে প্রতারণা করেছেন।
এই ঘটনা একটি বড় শিক্ষা দেয়—
বুদ্ধিবৃত্তিক মতপ্রকাশের স্বাধীনতা থাকা জরুরি, কিন্তু তা যেন কোনো ধর্ম, সম্প্রদায় ও সংস্কৃতির অপমান না হয়।একজন মুসলমান সাংবাদিকের দায়িত্ব হলো সত্য তুলে ধরা, কিন্তু তা ধর্মীয় সত্যের বিরুদ্ধাচরণ করে নয়। দুর্যোগ ও মহামারির সময় মানুষকে সান্ত্বনা, সম্মান ও আশা দেয়া উচিত, বিদ্বেষ ছড়ানো নয়।
আজ যখন বিশ্ব ইসলামোফোবিয়ায় আক্রান্ত, তখন দেশের ভেতর থেকে ধর্মবিদ্বেষী এমন বুদ্ধিজীবীদের সরবতা সমাজকে বিভাজনের দিকে ঠেলে দেয়। এই ধরনের বক্তব্য শুধু মুসলিম সমাজ নয়, সব ধর্মপ্রাণ মানুষের অনুভূতিকে আহত করে।
আমরা চাই—ফারজানা রুপা ও শ্যামল দত্তের মতো কলমধারীরা যেন নিজেদের বিশ্বাস ও চিন্তাধারাকে যাচাই করেন। মতপ্রকাশের স্বাধীনতা যেন বিবেকবোধ ও সমাজচেতনার ছায়ায় ঘটে। সংবাদপত্রের কালি যেন বিশ্বাস আর মানুষের মর্যাদাকে মুছে না ফেলে, বরং সেই মর্যাদাকে সুরক্ষা করে।
শেষ কথা—সাংবাদিকতার ছদ্মবেশে ধর্মবিরোধী অবস্থান গ্রহণ করে কেউ জনগণের শ্রদ্ধা অর্জন করতে পারেন না।
সমাজের প্রত্যেক সচেতন নাগরিককে এই জ্ঞানপাপীদের মুখোশ চেনা দরকার।