বছরটা ২০০৫। দিনটি ছিল ২৫ জুলাই। আকাশ ভারী মেঘে ঢাকা, চারদিকে টিপ টিপ বৃষ্টি। সন্ধ্যা নামছিল ধীরে ধীরে, ঠিক যেন কোনো অজানা আশঙ্কার ইঙ্গিত দিচ্ছিল প্রকৃতি। চকরিয়া ফায়ার সার্ভিস পরিদর্শন শেষে আমি ফিরছিলাম চট্টগ্রামে। গাড়ির স্টিয়ারিং নিজেই ধরেছিলাম—বিশ্বস্ত সঙ্গী, সাদা টয়োটা ‘নাইন্টি’।
গন্তব্যের পথে গাড়ি এগিয়ে চলছিল ধীরে ধীরে, কারণ বৃষ্টির পানিতে রাস্তাঘাট ছিল পিচ্ছিল। যখন আমি লোহাগাড়া ডিগ্রি কলেজের সামনের পথ অতিক্রম করছিলাম, ঠিক তখনই ঘটে গেল জীবনের সবচেয়ে ভয়াবহ ঘটনা।
প্রতিপক্ষ গাড়িটি আসছিল সাতকানিয়ার দিক থেকে। পরে জানতে পারি, একটি ভয়ংকর ডাকাতি ঘটনার পর পুলিশি ধাওয়ার মুখে তারা উন্মত্ত গতিতে পালাচ্ছিল। গাড়ির নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে আমার গাড়ির একেবারে মুখোমুখি সজোরে ধাক্কা দেয় তারা। মুহূর্তেই বিকট শব্দে কেঁপে উঠে পুরো এলাকা। আমার গাড়ির সামনের অংশ দুমড়ে-মুচড়ে এক ভয়াবহ ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়।
রক্তাক্ত অবস্থায় আমি পড়ে থাকি স্টিয়ারিংয়ে হেলে পড়া। মুখে, মাথায় ও শরীরের বিভিন্ন স্থানে গুরুতর আঘাত পাই। ঘটনাস্থলে উপস্থিত কিছু মানুষ এবং পরে পুলিশ আমাকে উদ্ধার করে দ্রুত হাসপাতালে নিয়ে যায়।
শারীরিকভাবে আমি পুরোপুরি ভেঙে পড়ি। একটানা কয়েক মাস আমাকে বিছানায় কাটাতে হয়। দেশের নামী চিকিৎসকদের পরামর্শে যখন তেমন উন্নতি হচ্ছিল না, তখন বিদেশে গিয়ে চিকিৎসা নিতে হয়। সময় কাটতে থাকে থেরাপি আর ব্যথানাশকের সঙ্গে যুদ্ধ করে।
এই দুর্ঘটনার আরেকটি নির্মম দিক রয়েছে—আমার একমাত্র কন্যাসন্তান জন্ম নেয় এই ভয়াল দুর্ঘটনার দুদিন পর, ২৭ জুলাই। অথচ আমি তখন হাসপাতালের শয্যায়। কন্যার মুখ প্রথমবার দেখেছি অনেক পরে, কোলের উষ্ণতা তখনো স্পর্শ করতে পারিনি। একজন বাবার জন্য এর চেয়ে বেদনাদায়ক মুহূর্ত আর কী হতে পারে!
এই ঘটনার পর থেকে সড়ক দুর্ঘটনা আমার কাছে শুধুই সংবাদ নয়, তা হয়ে দাঁড়িয়েছে ব্যক্তিগত দুঃখ, বেঁচে ফেরার বিস্ময়, এবং সমাজের প্রতি দায়বদ্ধতার এক কঠিন স্মারক। তাই ২০১১ সাল থেকে আমি নিয়মিতভাবে সড়ক দুর্ঘটনা নিয়ে লেখালেখি করছি—আহতদের কষ্ট, মৃতদের স্বজনের কান্না, আর চালকদের অসচেতনতা নিয়ে।
আমি ঠিক করেছি, আমার জীবনের সেই ভয়াবহ অভিজ্ঞতাকে কেন্দ্র করে একটি ধারাবাহিক লেখা শুরু করব—যেখানে শুধু আমার কাহিনি নয়, থাকবে আমাদের সমাজের বহু অবহেলিত গল্প, অসচেতনতার চিত্র, এবং দুর্ঘটনাকে প্রতিরোধ করার বাস্তব উপায়।
সড়ক যেন আর কাউকে কেঁদে উঠতে না বাধ্য করে, হাসপাতালের বিছানায় যেন আর কোনো বাবাকে কন্যাসন্তানের মুখ দেখা থেকে বঞ্চিত না হতে হয়—এই প্রত্যাশাতেই আমার কলম চলবে।