“রক্তে লেখা স্বাধীনতার দাবি: ফিলিস্তিনের আর্তনাদ ও ইরান-ইসরায়েল সংঘাতের বাস্তবতা”

8 Min Read

মোঃ কামাল উদ্দিনঃ
মধ্যপ্রাচ্যের রক্তাক্ত ইতিহাসে একটি নাম দীর্ঘকাল ধরে অন্যায়ের প্রতীকে পরিণত হয়েছে—ইসরায়েল। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর যখন ফিলিস্তিনিদের ভূখণ্ড ভাগ করে জোর করে প্রতিষ্ঠিত হয় ইহুদি রাষ্ট্র ইসরায়েল, তখন থেকেই শুরু হয় এক নির্মম ইতিহাস। সেই ১৯৪৮ সাল থেকে শুরু করে আজ পর্যন্ত, প্রতি যুগে ফিলিস্তিনের মুসলমানরা নিজ জন্মভূমিতে পরবাসীর মতো জীবন যাপন করছে। তাদের স্বপ্ন, ঘর, আত্মীয়স্বজন—সবকিছু নিঃশেষ করে দেওয়া হয়েছে এক নিষ্ঠুর পরিকল্পনার অংশ হিসেবে।
ফিলিস্তিন: দীর্ঘতম এক মানবিক বিপর্যয়ের নাম
ফিলিস্তিন ইস্যু শুধু একটি জাতিগোষ্ঠীর ভূখণ্ড হারানোর গল্প নয়, এটি বিশ্বের অন্যতম দীর্ঘ চলমান মানবিক সংকট। ১৯৪৮ সালের ‘আল-নাকবা’ বা মহাবিপর্যয়ের দিনে লক্ষ লক্ষ ফিলিস্তিনি তাদের ঘর থেকে বিতাড়িত হন। এরপর ১৯৬৭ সালে ‘সিক্স ডে ওয়ার’-এর মাধ্যমে আরও জমি দখল করে ইসরায়েল। পশ্চিম তীর, গাজা ও পূর্ব জেরুজালেম ধীরে ধীরে পরিণত হয় একটি ওপেন-এয়ার কারাগারে।
প্রতিদিন গাজায় বোমা ফেলা হয়, পশ্চিম তীরে বসতি স্থাপন করা হয় আন্তর্জাতিক আইন অমান্য করে। জাতিসংঘ বহুবার এই কাজকে অবৈধ বলেছে, কিন্তু ইসরায়েল তা পাত্তাও দেয় না। কারণ তার পেছনে রয়েছে যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপীয় শক্তিগুলোর নগ্ন সমর্থন।
গাজা: এক ভয়ংকর খোলা কবরস্থানে পরিণত হয়েছে
বিশ্ব যখন উন্নয়ন, মানবাধিকার ও গণতন্ত্রের বুলি আওড়ায়, তখন গাজার শিশুরা বোমায় ছিন্নভিন্ন হয়। খাদ্য নেই, পানি নেই, বিদ্যুৎ নেই, চিকিৎসা নেই—তারপরও প্রতিরোধ আছে, আছে আত্মত্যাগ।
২০০৮, ২০১2, ২০১৪, এবং সর্বশেষ ২০২১ ও ২০২৩ সালের গণহত্যাগুলো বিশ্ব দেখেছে সরাসরি। লক্ষাধিক মানুষ নিহত, হাজার হাজার নারী ও শিশু পঙ্গু কিংবা মানসিকভাবে ভেঙে পড়েছে। জাতিসংঘের প্রতিবেদন অনুযায়ী, প্রতিটি হামলায় আন্তর্জাতিক মানবাধিকার লঙ্ঘন করেছে ইসরায়েল, কিন্তু শাস্তি হয়নি একটিবারও।
বিশ্ব যখন ইউক্রেন নিয়ে সরব হয়, তখন ফিলিস্তিনের বিষয়ে নিশ্চুপ—এটাই পৃথিবীর তথাকথিত মানবতার মুখোশ উন্মোচন করে দেয়।
ইরান-ইসরায়েল উত্তেজনা: একটি অঘোষিত যুদ্ধের পর্দানাটক
ইরান ও ইসরায়েলের মধ্যে যে শত্রুতা বিদ্যমান, তা কেবল ভূরাজনৈতিক কিংবা সামরিক নয়—এটি আদর্শিক ও ধর্মীয় দ্বন্দ্বও বটে। ইরান ইসলামি বিপ্লবের পর থেকেই নিজেদেরকে মুসলিম বিশ্বের অভিভাবক হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে চেয়েছে। তারা হিজবুল্লাহ, হামাস, ইসলামিক জিহাদের মতো সংগঠনগুলোর পৃষ্ঠপোষক। পক্ষান্তরে ইসরায়েল চায় ইরানকে ধ্বংস করতে—কারণ তারা জানে, একমাত্র ইরানই সামরিকভাবে তাদের জন্য হুমকি হতে পারে।
ইসরায়েল বহুবার ইরানের ভেতরে গোপন অভিযান চালিয়েছে, পারমাণবিক বিজ্ঞানীদের হত্যা করেছে। ২০২৪ সালে যখন ইরান-ইসরায়েল সরাসরি ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র বিনিময়ে জড়িয়ে পড়ে, তখন তা মধ্যপ্রাচ্যকে যুদ্ধের দ্বারপ্রান্তে নিয়ে যায়। ইরান ঘোষণা দেয়, “যদি ফিলিস্তিনের জনগণের ওপর আর একটিও বোমা পড়ে, আমরা চুপ থাকব না।”
এই উত্তেজনা স্পষ্ট করে দেয় যে, মধ্যপ্রাচ্য একটি ভয়াবহ বিস্ফোরণের মুখে দাঁড়িয়ে আছে—যার ফলাফল হবে সর্বগ্রাসী ধ্বংস।
মুসলিম বিশ্বের ভূমিকা: নীরবতা না প্রতিরোধ?
এই প্রশ্নটি এখন সবচেয়ে জরুরি—মুসলিম বিশ্ব কি শুধু বিবৃতি দিয়েই দায়িত্ব শেষ করবে, নাকি ফিলিস্তিনিদের পাশে দাঁড়াবে? সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত, বাহরাইনের মতো কিছু দেশ ইসরায়েলের সঙ্গে কূটনৈতিক সম্পর্ক স্থাপন করেছে—অর্থনৈতিক সুবিধার আশায়। কিন্তু তারা ভুলে গেছে, ফিলিস্তিনের রক্তের দাগ কখনো মুছানো যায় না।
অন্যদিকে, তুরস্ক মাঝে মাঝে শক্ত বক্তব্য দিলেও বাস্তব পদক্ষেপ সীমিত। মালয়েশিয়া, ইন্দোনেশিয়া, পাকিস্তান কিছুটা মনোভাব দেখিয়েছে, কিন্তু নেতৃত্ব দেয়ার সাহস এখনো অদৃশ্য।
ফিলিস্তিন: কেবল একটি জাতির নয়, গোটা মুসলিম উম্মাহর সম্মান
কিয়ামতের দিন যখন বিচার হবে, তখন আল্লাহ জিজ্ঞেস করবেন, “তোমরা কাদের পক্ষে ছিলে?” সেইদিন হয়তো কোনো মুসলিম নেতা মুখ তুলে বলবে না—”আমি নিরপেক্ষ ছিলাম।”
কারণ ফিলিস্তিনের মাটি শুধু রাজনৈতিক বিতর্ক নয়, এটি নবী ইব্রাহিম (আ.), ঈসা (আ.), এবং নবী মুহাম্মদ (সা.)-এর ভূমি। এখানেই রয়েছে বায়তুল মুকাদ্দাস—ইসলামের তৃতীয় পবিত্রতম স্থান।
একজন মুসলমানের জন্য ফিলিস্তিন কেবল সহানুভূতির বিষয় নয়, এটি ঈমানের পরীক্ষার বিষয়।
বিশ্ব সম্প্রদায়: মানবতা কি কেবল পাশ্চাত্যের একচেটিয়া বিষয়?
ইসরায়েলের বর্বরতায় যখন শিশুর কান্না আকাশ কাঁপায়, তখন পশ্চিমা মিডিয়া এটিকে ‘সেল্ফ-ডিফেন্স’ বলে চালায়। যখন একজন ফিলিস্তিনি তরুণ পাথর ছোড়ে, তখন তাকে ‘সন্ত্রাসী’ বলা হয়। অথচ অস্ত্রধারী ইসরায়েলি সেনা যখন ঘুমন্ত শিশুর বুকে গুলি চালায়, তখন সেটি ‘স্ট্র্যাটেজিক অপারেশন’ হয়ে যায়।
এটাই আজকের বিশ্ব। এখানে সত্য মেপে দেখা হয় কার অর্থনীতি বড়, কে জাতিসংঘে বেশি অনুদান দেয়।
আশার আলো: প্রতিরোধের আগুন এখনো নিভে যায়নি
গাজার ধ্বংসস্তূপ থেকে যখন এক শিশু ধুলো ঝেড়ে উঠে দাঁড়ায়, তখন সেটাই আমাদের আশা। পশ্চিম তীরের প্রতিটি শহীদ তরুণের রক্তে ফুটে ওঠে বেঁচে থাকার আকুতি। হামাস, ইসলামিক জিহাদ—যদিও বিতর্কিত এবং সমালোচিত, তবুও তারা দেখিয়েছে কীভাবে একটি বধ্যভূমিকেও প্রতিরোধের মাটিতে রূপান্তর করা যায়।
আর ইরান যখন বলে, “আমরা জেরুজালেম মুক্ত করেই ছাড়বো”, তখন মুসলিম বিশ্বে এক নতুন আবেগ, এক নতুন সাহস জন্ম নেয়। যদিও কূটনৈতিক যুদ্ধ, অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা, সামরিক হুমকি—সবই আছে, তবুও আশার প্রদীপ এখনো জ্বলছে।
শেষ কথা: সময় এসেছে, আমাদের জেগে ওঠার
আমরা যদি আজও ঘুমিয়ে থাকি, তাহলে একদিন হয়তো ফিলিস্তিন থাকবে না—বাকি থাকবে শুধু আমাদের লজ্জা।
আমরা যদি আজও কিছু না বলি, তাহলে ইতিহাসে লেখা হবে—এই সময়ের মুসলিমরা শুধু ভোগে মত্ত ছিল, আর আত্মমর্যাদাহীন জীবন বেছে নিয়েছিল।
আসুন, অন্তত কলম নিয়ে দাঁড়াই। অন্তত দোয়া করি, অন্তত প্রতিবাদ করি, অন্তত বিশ্বকে জানিয়ে দিই—
ফিলিস্তিন একা নয়।
ইসরায়েলের অন্যায়কে মেনে নেব না।
আর যদি সময় আসে, তাহলে জান-মন-সম্পদ দিয়ে সহযোদ্ধা হব—জেরুজালেম মুক্ত করবো, ইনশাআল্লাহ। আমরা বিশ্বের ইতিহাসের পাতায় যদি দেখি- তাহলে
“আল্লাহর নামে শুরু হয়েছিল সেই যাত্রা — আর বিজয়ের পতাকা উঠেছিল আকাশচুম্বী হয়ে!”প্রতি যুগে, প্রতি শতাব্দীতে যখনই অন্যায় মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছে, তখনই মুসলমানরা সত্য ও ন্যায়ের ঝাণ্ডা হাতে দাঁড়িয়েছে—আল্লাহর ওপর পূর্ণ ভরসা নিয়ে। তাদের অস্ত্র ছিলো শুধু তরবারি নয়, বরং ঈমান, তাকওয়া ও শুদ্ধ নিয়ত।
বদরের প্রান্তরে শুরু হয়েছিল ইতিহাসের মোড় ঘোরানো যুদ্ধ। ৩১৩ জন নিরস্ত্র সাহাবী — বিপরীতে ১ হাজার সজ্জিত কাফের। তবে মুসলমানদের সঙ্গে ছিলেন আল্লাহর সাহায্য। জিবরাইল (আ.) সহ হাজারো ফেরেশতা অবতীর্ণ হয়েছিলেন বদরের প্রান্তরে। এই ছোট্ট দলটিই ইতিহাসে প্রথমবারের মতো কুফরের শক্তিকে পরাজিত করে বিজয়ের সূচনা করেছিল।
উহুদে, খন্দকে, তারপর হুনাইনে — প্রতিটি যুদ্ধে কাঁপিয়ে দিয়েছিলেন আরবের মরুভূমি। শত্রুর সংখ্যায় ও অস্ত্রে অধিক হলেও মুসলমানদের ঈমান ছিল অটুট। নবীজির (সা.) নির্দেশনায় তারা যুদ্ধ করতেন শুধু আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য, আর এই নিয়তই এনে দিত অজেয় বিজয়।
সালাহউদ্দিন আইয়ুবী — সেই অমর যোদ্ধা, যিনি জেরুজালেম জয় করে দেখিয়েছিলেন কীভাবে ঈমান, ধৈর্য, নেতৃত্ব আর দয়া একসাথে বিজয়ের পথে নিয়ে যায়। ক্রুসেডারদের শত সহস্র বাহিনীকে পরাজিত করে তিনি প্রতিষ্ঠা করেছিলেন শান্তি, ন্যায়বিচার আর ইসলামের মর্যাদা।
তুরস্কের মহান সুলতান মুহাম্মদ আল ফাতিহ — মাত্র ২১ বছর বয়সে যিনি বিজয় করেছিলেন ঐতিহাসিক কনস্টান্টিনোপল। শত শত বছর ধরে যে নগর ছিল অজেয়, সেই শহর বিজিত হয় মুসলিম বীরের হাতে। তার দৃঢ় বিশ্বাস ছিল, “নবী (সা.)-এর ভবিষ্যদ্বাণী সত্য হবেই — আমিই সেই সৈন্যদল!”
স্পেনের আন্দালুসিয়া, ভারতের দিল্লি, বাংলার সোনারগাঁ, ও আফ্রিকার সাহারা — সবখানেই মুসলিম বীরেরা ছড়িয়েছেন জ্ঞানের আলো আর ইনসাফের সুবাতাস। তারা দখলদার ছিল না, ছিল হেদায়াতের ফেরিওয়ালা। তারা কেবল জিতেনি মাটিতে — তারা জিতেছিলো মানুষের হৃদয়।
১৯৭৩ সালের ‘রমজানের যুদ্ধেও’ (Yom Kippur War), মুসলিম সেনারা আল্লাহর নামে সাহসিকতা দেখিয়েছিল ইসরায়েলি আধিপত্যের বিরুদ্ধে। সেদিনও ইতিহাস দেখেছিল, ঈমানদারদের বুকের সাহস কিভাবে আধুনিক অস্ত্রকেও থামিয়ে দেয়।
আজও প্রয়োজন সেই বদরের চেতনা
আজও আমাদের সামনে অন্যায়ের পাহাড়, সাম্রাজ্যবাদের কৃপাণ, সংস্কৃতির দাসত্ব। কিন্তু আমরা যদি বদরের সাহাবীদের মতো ঈমান রাখি, সালাহউদ্দিনের মতো নেতৃত্ব গড়ি, আর ফাতেহ সুলতানের মতো স্বপ্ন দেখি— তবে এই দুনিয়ায় আবারও বিজয় আমাদের হবেই, ইনশাআল্লাহ।
কারণ আল্লাহ বলেন:
“তোমরা যদি সাহায্য করো আল্লাহর দ্বীনের, তবে আল্লাহ তোমাদের সাহায্য করবেন এবং তোমাদের পদসমূহ সুদৃঢ় করবেন।”
— (সূরা মুহাম্মদ: ৭)
তাই মুসলিম ভাই ও বোনেরা, সাহস রাখো, আত্মবিশ্বাস রাখো, দ্বীনকে আঁকড়ে ধরো — কারণ বিজয় চিরকাল ঈমানদারদেরই হয়।
আসুন আবার আমরা গড়ি একটি বিজয়ময়, ন্যায়ভিত্তিক, জ্ঞাননির্ভর মুসলিম উম্মাহ।
আল্লাহু আকবার!

Share This Article
Leave a Comment