তফাজ্জল হোসেন (মানিক মিয়া)’র ৫৫ তম মৃত্যু বার্ষিকী স্মরণেমানিক মিয়া সাংবাদিকতার ইতিহাসে উপমহাদেশের নির্বিক বিরল সাংবাদিক ছিলেন

17 Min Read

মো. কামাল উদ্দিন
সাংবাদিকতাকে যিনি গণচেতনার মৌল চালিকাশক্তিতে রূপান্তরিত করেছিলেন তিনি তফাজ্জল হোসেন (১৯১১-১৯৬৯)। দৈনিক ইত্তেফাক-এর প্রতিষ্ঠাতা ও সম্পাদক তফাজ্জল হোসেন বাংলাদেশের সাংবাদিকতার একটি অবিস্মরণীয় নাম। তিনি ‘মানিক মিয়া’ নামেও পরিচিত। তারঁ কালে সমাজের সর্বস্তরের পাঠকের কাছে তিনি ছিলেন প্রিয়। তবে তাঁর পোষাকী নামে তিনি যত না পরিচিত ছিলেন তারচেয়ে বেশি পরিচিত ছিলেন ‘মোসাফির’ নামে। তিনি দৈনিক ইত্তেফাকে ‘রাজনৈতিক মঞ্চ’ নামে একটি কলাম লিখতেন ‘মোসাফির’ ছদ্মনামে। ছদ্মনাম নিলেও প্রায় সবাই জানতেন ‘মোসাফির’ হলেন ইত্তেফাক সম্পাদক তফাজ্জল হোসেন। তা জানলেও পাঠকরা তাকে ‘মোসাফির নামেই বেশি চিনতেন। বাংলাদেশের সংবাদপত্র ‘রাজনৈতিক মঞ্চের’ চেয়ে পাঠকনন্দিত জনপ্রিয় কলাম আজ অবদি লেখা হয়নি। ‘রাজনৈতিক মঞ্চ’ কত জনপ্রিয় ছিল তা এখকার সংবাদপত্র পাঠকদের ঠিক লিখে বোঝানো যাবে না ।
তফাজ্জল হোসেনের পত্রিকা ‘ইত্তেফাক’ নিছক একটি সংবাপত্র ছিল না। এখনকার ‘ইত্তেফাক’ বা অন্যান্য সংবাপত্র দেখে মানিক মিয়ার ‘ইত্তেফাক’কে বিচার ও ‘ইত্তেফাক’কে বিচার করা যাবে না । সে ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন এক কাল। ১৯৫৪ থেকে ১৯৬৯ সাল মানিক মিয়া ও  ইত্তেফাক’-এর সোনালি অধ্যায়। সে সময়ের রাজনীতি, অর্থনীতি, সমাজ, সংস্কৃতি সবকিছু এর পটভূমি হিসেবে বিবেচনা করতে হবে। তখন পাকিস্তান সদ্য স্বাধীনতা পেয়েছে। আমরা বাস করি পূর্ব পাকিস্তানে। পাকিস্তানের কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব ছিল পশ্চিম পাকিস্তানিদের হাতে। ১৯৪৮ সালে ও ১৯৫২ সালে পর পর দুবার বাংলা ভাষার জন্য আন্দোলন হয়েছে পূর্ববাংলায়। বিশেষ করে ১৯৫২ সালে ২১ ফেব্রুয়ারি ঢাকায় বাংলা ভাষার আন্দোলনে প্রাণ দিয়েছেন কয়েকজন। কেন্দ্রে ও পূর্ব বাংলায় মুসলিম লীগ সরকারের অত্যাচার, দমননীতি ও নিপীড়ণে দেশব্যাপী জনগণে সোচ্চার । শুধু ভাষাগত প্রশ্নে নয়, নানা অর্থনৈতিক দিকেও পূর্ববাংলার প্রতি পাকিস্তানি শাসকদের বঞ্চনা, অবিচার, শোষন ও অত্যাচার চলছেই। ফলে পূর্ববাংলার সচেতন মানুষ পাকিস্তানি শাসকদের এই অবিচার ও বঞ্চনার বিরুদ্ধে সচেতন হতে শুরু করলেন। বিভিন্নভাবে প্রতিবাদ উঠতে থাকল। এ সময় পূর্ববাংলার প্রতিবাদী মানুষের কণ্ঠস্বর হয়ে প্রকাশিত হয়েছিল একটি সপ্তাহিক পত্রিকা, নাম ‘ইত্তেফাক’। পরবর্তী কালে এই ‘ইত্তেফাক’-এর সম্পাদক, মালিক হয়েছিলেন তফাজ্জল হোসেন। ‘ইত্তেফাক’ এর পাতায় ‘রাজনৈতিক মঞ্চ’ নামে কলাম লিখে তিনি পূর্ববাংলার সংবাদপত্র পাঠকদের মধ্যে অভূতপূর্ব জনপ্রিয়তা অর্জন করেছিলেন, যে লেখা তাঁকে অমর করে রেখেছে।
তফাজ্জল হোসেন সাংবাদিক হয়েছেন ঘটনাচক্রে। তার পক্ষে রাজনীতিবিদ হওয়াই স্বাভাবিক ছিল। অবশ্য তিনি সাংবাদিকতা পেশায় আসলেও রাজনৈতিক আগ্রহ থেকে মুহুর্তের জন্য নিজেকে সরিয়ে নেননি। তিনি ঈর্ষনীয় ক্ষমতাবলে সাংবাদিকতাকে রাজনৈতিক শক্তিতে পরিণত করতে পেরেছিলেন। অসির চেয়ে যে মসী শক্তিশালী-একথা তফাজ্জল হোসেন কার্যক্ষেত্রে প্রমাণ করে গেছেন।
তফাজ্জল হোসেনের প্রাথমিক জীবন অন্য দশজন বাঙালির মতোই সাধারণ। বরিশাল জেলার পিরোজপুর মহকুমার অন্তর্গত ভা-ারিয়া গ্রামের এক সম্ভ্রান্ত পরিবারে ১৯১১ সালে তফাজ্জল হোসেন জন্মগ্রহণ করেন। তার বাবার নাম মুসলেহ উদ্দিন মিয়া। শৈশবে তাঁর মা মারা যান। গ্রামের প্রাইমারি স্কুলে তার শিক্ষা জীবন শুরু হয়। প্রাইমারি শিক্ষা শেষে ভা-ারিয়া হাইস্কুলে তিনি পড়াশুনা করেন। স্কুল জীবনেই তাঁর মধ্যে সাংগঠনিক ক্ষমতার পরিচয় পাওয়া যায়। পিরোজপুর সরকারি হাইস্কুল থেকে তিনি ম্যাট্রিক পাশ করেন। ১৯৩৫ সালে বরিশাল ব্রজমোহন কলেজ থেকে বি.এ পাশ করার পর পিরোজপুর সিভিল কোর্টে চাকরি গ্রহণ করেন। সেখানেই তিনি প্রথম কর্মজীবনে প্রবেশ করেন।
পিরোজপুর কোর্টে এক ঘটনায় তাঁর প্রতিবাদী মনের পরিচয় পাওয়া যায়। কোর্টের  জনৈক মুন্সেফ তাঁর প্রতি অবমাননাকর আচরণ করলে তিনি প্রতিবাদে চাকরি থেকে ইস্তফা দেন। পরে অবশ্য মুন্সেফ অনুতপ্ত হলে তিনি চাকরিতে ফিরে আসেন।
পিরোজপুরে কোর্টে কর্মরত থাকা কালে তিনি শহীদ সোহরাওয়ার্দীর সঙ্গে পরিচিত হন এবং তাঁর সান্নিধ্য লাভের সুযোগ পান। তখন উপ-মহাদেশে পাকিস্তান আন্দোলন চলছে। শহীদ সেহরাওয়াদী তখনই একজন প্রতিষ্ঠিত রাজনৈতিক নেতা। সোহরাওয়ার্দীর সঙ্গে তফাজ্জল হোসেনের এই যোগাযোগ খুবই তাৎপর্যপূর্ণ। পরবর্তীকালে তফাজ্জল হোসেনের জীবনে সোহরাওর্দী এক বিরাট ভূমিকা পালন করেন।
পিরোজপুরে পরিচিত হবার পর সোহরাওয়ার্দী হোসেনের বুদ্ধিমত্তা, কর্মক্ষমতা, চিন্তাধারা  ও চারিত্রিক বৈশিষ্ট্যে মুগ্ধ হন। তফাজ্জল হোসেন সোহরাওয়ার্দীর ব্যক্তিত্বে ও আদর্শে আকৃষ্ট হন। এভাবেই দু’জনের মধ্যে একটি সম্পর্ক গড়ে ওঠে।
সোহরাওয়ার্দীর পৃষ্ঠপোষকতায় তফাজ্জল হোসেন বাংলা সরকারের জনসংযোগ বিভাগে বরিশালের জনসংযোগ  অফিসার পদে চাকরি লাভ করেন। এটাই গণসংযোগ পেশায় তাঁর প্রথম পদক্ষেপ। বরিশাল এই নতুন চাকরি কিছুদিন করার পর সোহরাওয়ার্দীর পরামর্শে তিনি সরকারি চাকরি ছেড়ে দিলেন। সোহরাওয়ার্দী তাঁকে কলকাতায় নিয়ে গিয়ে প্রাদেশিক মুসলিম লীগ-এর অফিস সেক্রেটারি নিয়োগ করেন।
মুসলিম লীগ অফিসে কাজ করার সময় তিনি রাজনীতির প্রত্যক্ষ সংস্পর্শে আসেন ও উপমহাদেশের অনেক খ্যাতনামা রাজনীতিবিদের সান্নিধ্যে আসেন। তাদের চিন্তাধারা ও মতাদর্শের সঙ্গে তাঁর পরিচয় হয়। নানা রাজনৈতিক আলোচনার মধ্যে কাজ করে তাঁর নিজেরও একটা মতাদর্শ দানা বাঁধতে থাকে । এভাবে আস্তে আস্তে তিনি শহীদ সোহরাওয়ার্দীল ‘ভাব শিষ্যত্ব’ গ্রহণ করেন।
১৯৪৬ সালে শহীদ সোহরাওয়ার্দী কলকাতা থেকে একটি বাংলা দৈনিক প্রকাশের সিদ্ধান্ত নেন। নাম : “ইত্তেহাদ”। আবুল মনসুর আহমদের এর সম্পাদক নিযুক্ত করো হয়। তফাজ্জল হোসেন মুসলিম লীগ অফিসের চাকরি ছেড়ে দিয়ে ‘ইত্তেহাদ’ -এর পরিচালনা বিভাগে সেক্রেটারি পদে যোগদান করেন। এভাবেই তফাজ্জল হোসেন সংবাদপত্র জগতে পা রাখেন। তফাজ্জলন হোসেন ‘ইত্তেহাদ’- পত্রিকার ম্যানেজমেন্ট তার প্রতিভা ও সাংগঠনিক ক্ষমতার পরিচয় দিয়ে সবাইকে মুগ্ধ করে দেন। এখানে উল্লেখ্য করা প্রয়োজন, সে সময় দৈনিক ‘ইত্তেহাদ’ সবদিক থেকে একটি প্রথম শ্রেণীর বাংলা দৈনিকে পরিণত হয়েছিল।
‘ইত্তেহাদ’-এ তফাজ্জল হোসেন যদিও পরিচালনার সঙ্গে জড়িত ছিলেন তবু তাঁর রাজনৈতিক নিবন্ধ লেখার হাতেখড়িও ‘ইত্তেহাদ’-এ। বলা যায়, পরবর্তী কালের জনপ্রিয় ‘মোসাফির’-এর জন্ম এভাবেই। ১৯৪৭ সালে দেশ ভাগের পর নানা রাজনৈতিক কারণে ‘ইত্তেহাদ’ কলকাতা থেকে ঢাকায় আসতে পারেনি।
১৯৪৯ সালে মুসলিম লীগের বিরোধী প্রতিষ্ঠান হিসেবে জন্ম নেয় আওয়ামী মুসলিম লীগ। সেই বছরই দলের মুখপত্র হিসেবে প্রকাশিত হয় সাপ্তাহিক ‘ইত্তেফাক’। আওয়ামী মুসলিম লীগ-এর অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানী হলেন এই সাপ্তাহিক ‘ইত্তেফাক’-এর সম্পাদক। ১৯৫১ সালের ১৪আগষ্ট থেকে তফাজ্জল হোসেন এই পত্রিকার পূর্ণ দায়িত্ব গ্রহন করেন।
তখন পূর্ব বাংলার রাজনীতিতে নানারকম উত্থান-পতন ঘটছে। কেন্দ্রে ও প্রদেশে মুসলিম লীগের প্রতাপ। ‘মুসলিম লীগকে  গদি থেকে নামাতে হবে’ সারা পূর্ববাংলায় একটাই আওয়াজ। রাজনৈতিক অঙ্গনে বিরাজমান এই পরিস্থিতিতে পূর্ব পাকিস্তানে আসন্ন সাধারণ নির্বাচনের প্রাক্কালে, আওয়ামী মুসলিম লীগের অন্যতম প্রধান নেতা হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীর উৎসাহ, অনুপ্রেরণা ও সহযোগিতায় ‘ইত্তেফাক’ সাপ্তাহিক থেকে দৈনিক রূপান্তরিত হয়। তফাজ্জল হোসেন স্বয়ং এই পত্রিকায় সম্পাদক হলেন।
দৈনিক ‘ইত্তেফাক’-এর সম্পাদকের দায়িত্ব গ্রহণের পর তফাজ্জল হোসেন পত্রিকাটিকে মুসলিম লীগ বিরোধী ও পূর্ববাংলার বঞ্চিত গণমানুষের মুখপত্র হিসেবে গড়ে তুলতে থাকেন। ‘ইত্তেফাক’ অল্পদিনের ভেতরেই সাধারণ পাঠকদের মধ্যে জনপ্রিয়তা অর্জন শুরু করে। ‘ইত্তেফাক’-এর সুরটাই ছিল লীগ বিরোধী সুর। একদিকে ‘ইত্তেফাক’-এ নানা ধরনের খবর অপরদিকে ‘মোসাফির’-এর রাজনৈতিক মঞ্চ।  পাঠকরা যেন গোগ্রাসে সবটা গিলতে থাকে। বিশেষ করে ‘রাজনৈতিক মঞ্চ’। এই কলামে তিনি অত্যন্ত অন্তরঙ্গ ভাষায় ও সাদামাটাভাবে মুসলিম লীগ সরকারের নানা বৈষম্য, অত্যাচার, অবিচার ও বঞ্চনার কাহিনী তীক্ষ্মভাবে লিখতে থাকেন । তার এই কলাম ছিল মুসলিম লীগের জন্য হুল- এর মতো আবার লীগ বিরোধী সাধারণ পাঠকদের কাছে বিরাট আনন্দের ব্যাপার। নির্বাচনের প্রাক্কালে মোসাফির-এর  ‘রাজনৈতিক মঞ্চ’ মুসলিম লীগ বিরোধী একটি জনমত গড়ে তুলতে সহায়ক হয়েছিল।
১৯৫৪ সালে পূর্ব পাকিস্তানে অনুষ্ঠিত হয় সাধারণ নির্বাচন। এই নির্বাচনে মুসলিম লীগের বিরুদ্ধে অন্যান্য বিরোধী দল সংঘবদ্ধ হয়ে ‘যুক্তফ্রন্ট’ গঠন করে। যুক্তফ্রান্টের পক্ষে ‘ইত্তেফাক’ অক্লান্তভাবে লিখতে থাকে । নির্বাচনে মুসলিম লীগের ভারাডুবি হয়। যুক্তফ্রন্টের এই নির্বাচনের সময় ‘ইত্তেফাক’ ও ‘মোসাফির’ পাঠকদের বিশ্বাস ও আস্থা অর্জন করে । ‘মোসাফির’ অর্জন করে বিপুল জনপ্রিয়তা। অনেকের ধারণা, যুক্তফ্রণ্টের এই অভাবিত বিজয়ের পেছনে ‘মোসাফির’-এর কালজয়ী লেখনী বিরাট ভূমিকা পালন করেছিল। ‘সেদিন সমগ্র পূর্ব বাংলায় লীগ বিরোধী মানসিকতার ক্ষেত্রটি আগে থেকে তৈরি করে রেখেছিল মোসাফির’। ৫৪ সালে নির্বাচনের সময় মোসাফির পাঠকদের কাছে কতটা জনপ্রিয় হয়েছিলেন তা বোঝা যায় একটি ঘটনা থেকে । নির্বাচনোত্তরকালে যখন ঢাকা সমেত সমগ্র পূর্ব বাংলা বিজয়োল্লাস স্পন্দিত তখন ঢাকায় রাজারবাগে মোসাফির- এর গণসংবর্ধনা অনুষ্ঠিত হয়েছিল। সেই প্রথম তফাজ্জল হোসেন ওরফে ‘মোসাফির’ পত্রিকার নেপথ্য ভূমিকা থেকে পাঠকদের সামনে সরাসরি হাজির হয়েছিলেন। সেই সংবর্ধনা সভায় বিপুল জনসমাগম হয়েছিল।
১৯৫৪ এর নির্বাচনের পাটভূমিতে মোসাফির তাঁর ‘রাজনৈতিক মঞ্চ’ লিখে পাঠকদের মন যেভাবে জয় করেছিলেন তা তাঁর মৃত্যু পর্যন্ত অটুট ছিল । ‘ইত্তেফাক’-এর পাঠকরা তার লেখার প্রতি কখনো বিমুখ হননি। তার লেখার ভঙ্গি, বিষয়, ভাষা, উপস্থাপন ও ধার সবই প্রায় অটুট ছিল জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত।
তিনি তার কলামে প্রধানত: ক্ষমতাসীন মুসলিম লীগ সরকারের স্বরূপ উন্মোচন করেছেন। পূর্ববাংলাকে কীভাবে বঞ্চিত করে রাখা হয়েছে সেটাই তিনি বার বার তার লেখার মাধ্যমে প্রতিষ্ঠিত করতে চেয়েছেন। অধিকার বঞ্চিত পূর্ববাংলার মানুষের কাছে  তাই ‘মোসাফির’ এত প্রিয় ছিলেন। সে সময় দৈনিক ‘আজাদ’-এর মতো জনপ্রিয় কাগজের সঙ্গে নতুন দৈনিক হিসেবে ‘ইত্তেফাক’ যে পাল্লা দিতে পেয়েছিল তার পেছনে একটি মাত্র কারণ ছিল তা হলো : মোসাফিরের অসাধারণ ধারালো কলম।  তাঁর লেখা কোনো ইন্টেলেকচুয়াল লেখা ছিল না। কিন্তু ইন্টেলেকচুয়ালরাও তার লেখা শ্রদ্ধার সঙ্গে পড়তেন। তার ভাষা ছিল অতি সাধারণ, আটপৌরে। তথাকথিত নাগরিক সপ্রতিভতা তার লেখায় পাওয়া তার লেখায় পাওয়া যেত না। প্রায়শ: তিনি আঞ্চলিক শব্দ, গ্রামীণ উপমা, প্রবাদ ব্যবহার করতেন। সাধরান পাঠকও যেন রাজনীতি, অর্থনীতির জটিল পর্যালোচনা সহজে বুঝতে পারে সেটাই ছিল তার লক্ষ্য। বলা যায়, ভাষাই ছিল ‘রাজনৈতিক মঞ্চের’ প্রাণ। তার এই কলাম পড়লে বোঝা যেত মাতৃভূমিকে তিনি কত অন্তরঙ্গভাবে জেনেছিলেন।
এই প্রসঙ্গে ড. আবু হেনা মোস্তফা কামাল লিখেছেন “সকল পাঠকের অন্তর স্পর্শ করতে হলে যে উষ্ণ, জীবনঘনিষ্ঠ ভাষার প্রয়োজন তাকে সহজে ধরতে পেরেছিলেন বলেই এদেশের মানুষও তাকে আপনজন হিসেবে বরণ করেছে। শুধু  একটি কলাম লিখে স্মরণকালের মধ্যে কোনো সাংবাদিক এমন অবিস্মরণীয় ভাবমূর্তি তৈরি করতে পেরেছেন বলে মনে পড়ে না। আমারে অধিকাংশ জাতীয় দৈনিক এমন কথা ভাষাকেই খবর পরিবেশনার মাধ্যমে হিসেবে মেনে নিয়েছেন। কিন্তু কেবল সর্বনাম ও ক্রিয়াপদের রূপান্তরেই কি কথাভাষার আবেদন ও ফলপ্রষূতা মেলে? বস্তুত তফাজ্জল হোসেনের গদ্যের ক্রিয়াপদ ও সাধুরূপ বাদ দিলে তার মর্মমূলে ছিল কথাভাষার শক্তি। এবং সেই ভাষা হয়তো কেতাদূরস্ত নাগরিক জীবনের বেমানান কিন্তু তার সজীবতা ও সৌন্দর্য খুঁজে নিতে সাধারণ পাঠকের কখনো অসুবিধা হয়নি।”
মোসাফির তথা ‘ইত্তেফাক’ এর জনপ্রিয়তা কাল হয়েছিল তফাজ্জল হোসেনের। মোসাফির-এর সত্য ভাষণ পাকিস্থানের ক্ষমতালোভী, স্বার্থান্বেষী কেন্দ্রীয় শাসকচক্র কখনো সহ্য করতে পারেনি। তাই লেখার জন্য তাকে বার বার রাজরোষে পড়তে হয়েছে। পূর্ববাংলার অধিকার কথা তুলে ধরে তিনি দেশপ্রেমিকের দায়িত্ব পালন করলেও পাকিস্তানের স্বৈরাচারী শাসকচক্র তার লেখার মধ্যে দেশদ্রোহিতার গন্ধ আবিষ্কার করতেন। ফলে পাকিস্তান সরকার তাকে বার বার কারাগারে নিক্ষেপ করেছে, তার পত্রিকার নিষিদ্ধ করেছে, তার প্রেস বাজেয়াপ্ত করেছে। কিন্তু আইনের বিচারে তাকে কখনো দোষী সাব্যস্ত করা যায়নি। পাকিস্তানের স্বৈরাচারী সরকারের আক্রোশের শিকার তফাজ্জল হোসেন কখনো স্বৈরাচারের কাছে মাথা নত করেননি। তার কারণ, তিনি ছিলেন যথার্থ অর্থেই সাংবাদিক, তিনি নিছক সংবাদপত্র ব্যবসায়ী ছিলেন না। সাংবাদিকতাতে তিনি রাজনীতি ও দেশপ্রেমের বহি:প্রকাশ হিসেবে নিয়েছিলেন। যদি তিনি সাংবাপত্র প্রকাশনাকে শুধু ব্যবসা হিসেবে নিতেন তাহলে আইয়ুব আমলে স্বৈরাচারী সরকারে পছন্দমতো লেখা লিখে তাদের নেক-নজরে থাকতে পারতেন। এতে তার ব্যবসায় শ্রীবৃদ্ধি ঘটতো এবং এক রকম আর্থিক স্বাচ্ছন্দ্যেই জীবনযাপন করতে পারেন । কিন্তু সেই মসৃণ পথে তিনি যাননি কারণ ৫৪ সালের পর পূর্ববাংলার রাজনীতিতে যে ভাঙাগড়ার সূচনা হয় এবং পূর্ববাংলার উপর পাকিস্তানের কেন্দ্রীয় সরকার যে বৈষম্য, অবিচার ও বঞ্চনা চাপিয়ে দেয় তা তফাজ্জল হোসেন একজন সাংবাদিক হিসেবে কখনো মেনে নিতে পারেননি। তাই তিনি তার লেখনী ও পত্রিকার মাধ্যমে পূর্ববাংলার মানুষকে সচেতন করে তোলার প্রয়াস পেয়েছিলেন। বিনিময়ে একদিকে তিনি লাভ করছেন জনগণের শ্রদ্ধ অপরদিকে স্বৈরাচারী সরকারের নিগ্রহ।
সংবাপত্র প্রকামসান ও সাংবাদিকতা প্রসঙ্গে তফাজ্জল হোসেন জেল থেকে চিঠিতে লিখেছিলেন:
“সংবাপত্রের মারফত দেশবাসীর যতটুকু খেদমত করা যায় তাই ছিল আমার লক্ষ্য। এই দিক দিয়া আমি ইত্তেফাককে শুধুমাত্র জীবিকা নির্বাহ বা অর্থোপার্জনের অবলম্বন হিসাবে গ্রহণ করি নাই। যে জনগণের  অকুণ্ঠ সমর্থনে ইত্তেফাক প্রতিষ্ঠা লাভ করিয়াছে, সেই জনগণের অভাব, অভিযোগ, সুখ-দুঃখ, আশা আকাঙ্খা প্রতিফলিকত করাই ছিল আমার ব্রত।”
এই ব্রত পালন করতে গিয়ে তিনি বার বার নিগৃহীত হয়েছেন। ১৯৫৫ সালে পূর্ব বাংলায় ৯২-ক ধারা প্রবর্তনের পর প্রথমবারের মতো ‘ইত্তেফাক’-এর প্রকাশনা কিছুকালের জন্য কেন্দ্রীয় সরকারের নির্দেশে বন্ধ রাখা হয়। ১৯৫৮ সালের অক্টোবর মাসে জেনারেল আইয়ুব খান সামরিক অভ্যুত্থানের মাধ্যমে ক্ষমতায় আসেন। ১৯৫৯ সালের ২৮ সেপ্টেম্বর সামরিক আইন লংঘনের মিথ্যা অভিযোগে তফাজ্জল হোসেনকে গ্রেফতার করা হয়। ১৯৬২ সালে  আইয়ুব সরকার হোসেন শহীদ  সোহারাওয়ার্দীকে গ্রেফতার করলে পূর্ববাংলায় ব্যাপক প্রতিবাদ ও বিক্ষোভের ঝড় উঠে। তখন অনেক নেতার সঙ্গে তাকেও গ্রেফতার করা হয়। ১৯৬৬ সালে আওয়ামী লীগ ৬ দফা দাবী পেশ করে। ৬ দফার সমর্থনে সমগ্র আইয়ুব সরকারের দমননীতি ও স্বৈরাচার দ্বিগুণ হয়ে উঠে। বহু লোককে তখন গ্রেফতার করা হয়। ১৬ জুন তফাজ্জল হোসেনকে গ্রেফতার করা হয় এবং সঙ্গে সঙ্গে তার ‘নিউ নেশান প্রেস’র  বাজেয়াপ্ত হয়ে যায়। ফলো ‘ইত্তেফাক’ তার অপর দুটি পত্রিকা ‘ঢাকা টাইমস’ ও ‘পূর্বানী’ বন্ধ হয়ে যায়। প্রেস বাজেয়াপ্তির বিরুদ্ধে হাইকোর্টের রায়ে তিনি জয়লাভ করেন। কিন্তু স্বৈরাচারী সরকার অর্ডিন্যান্স সংশোধন করে দ্বিতীয়বার প্রেস বাজেয়াপ্ত করেন।
প্রায় দশ মাস কারাযন্ত্রণা ভোগের পর ১৯৬৭ সালের ২৯ মার্চ তিনি মুক্তি লাভ করেন। তখন তিনি খুবই অসুস্থ। তিনি মুক্তি লাভ করলেও তার প্রেস তখনো বাজেয়াপ্ত। ফলে জীবন-জীবিকার পথ রুদ্ধ। সরকার তখন তাকে নানা প্রলোভন দিতে থাকে যাতে তিনি ‘ইত্তেফাক’কে একটু নরম সুর করে প্রকাশনায় রাজি হন। কিন্তু তিনি তার নীতিতে অটল। ‘ইত্তেফাক’ যদি তার ঐতিহ্য নিয়ে প্রকাশিত হতে না পারে, তবে তিনি ‘ইত্তেফাক প্রকাশে আগ্রহী নন।
তফাজ্জল হোসেনকে আরেকভাবে দেখলে একজন তুখোড় রাজনীতিবিদ বলা যায়। তবে তিনি সক্রিয় রাজনীতর পথ গ্রহণ করেননি। তার রাজনীতি ছিল স্টেটসম্যানের রাজনীতি। বুদ্ধি এবং প্রজ্ঞাই তাঁর রাজনীতির শক্তি। রাজনীতিবিদের লক্ষ্য যেমন থাকে মানুষের মুক্তি তেমনি তফাজ্জল হোসেনের লক্ষ্যও ছিল তাই । এই প্রসঙ্গে আবদুল গাফ্ফার চৌধুরী লিখেছেন:
“তিনি কেবল স্বৈরাচারের বিরুদ্ধে লড়েছেন বা গণতন্ত্রের জন্য কলাম চালনা করেছেন বলে হলে তাঁর ভূমিকাকে ছোট করা হবে। আসলে নিজের অজান্তেই হয়তো তিনি কলম হাতে সাংবাদিকতায় নেমেছিলেন- বাংলাদেশের মানুষের ন্যাশনাাল প্রাইড এবং ন্যাশনাল আইডিনটিটি প্রতিষ্ঠার জন্য।
একজন সাংবাদিক নিজের দায়িত্ব ও ভূমিকা সম্পর্কে কতখানি সচেতন হলে একটা জাতির “ন্যাশন্যাল আইডিনটিটি” প্রতিষ্ঠার জন্যে ব্যাপৃত হন, তফাজ্জল হোসেনের সাংবাদিক জীবন পর্যালোচনা করলে তা আঁচ করা যায়।
বাঙালির জাতীয় জীবনে তিনি সংবাপত্রের মাধ্যমে এক অগ্রপথিকের ভূমিকা পালন করে গেছেন। এই ভূমিকা পালিত না হলে পরবর্তীকালে ৭১ সালে স্বাধীনতা সংগ্রাম খুব সহজসাধ্য হতো না। যদিও তিনি স্পষ্টভাবে একটি পৃথক স্বাধীন দেশ হিসেবে বাংলাদেশের অস্তিত্ব তখন কল্পনা করেননি। কিন্তু পশ্চিম পাকিস্তানের সঙ্গে সমতার ভিত্তিতে থাকা সম্ভব হবে না তা তিনি তার অসংখ্যা লেখায় পরোক্ষভাবে ইংগিত দিয়ে গেছেন। নিজের অজ্ঞাতসারেই তিনি এ ক্ষেত্রে এক বিরাট ঐতিহাসিক ভূমিকা পালন করে গেছেন। এই ভূমিকার জন্যই স্বাধীনতাত্তোরকালে তফাজ্জল হোসেন বাংলাদেশে স্মরনীয় হয়ে আছেন।
১৯৬৯ সালে ব্যাপক গণ আন্দোরনের ফলে আইয়ুব সরকার ‘ইত্তেফাক’ ছেড়ে দেয়। দু’বছর সাত মাস বন্ধ থাকার পর ১৯৬৯ সালে ১০ ফেব্রুয়ারি ‘ইত্তেফাক’ পুন: প্রকাশিত হয়। ইতোমধ্যে একাধিকবার কারাবাস, রোগভাগ ও নানা রকম মানসিক চাপে তার স্বাস্থ্য ভেঙে পড়ে। এই ভগ্নস্বাস্থ্য নিয়ে তিনি আবার ‘ইত্তেফাক’ সম্পাদনা ও ‘রাজনৈতিক মঞ্চ’ লেখায় আত্মনিয়োগ করেন। আবার নতুন উদ্যোমে ‘ইত্তেফাক’ বেরুতে লাগল। এ সময় ৬৯ সালে ২৬ মে ইত্তেফাকেরই সাংগঠনিক কাজে তিনি রাওয়ালপিত্তি যান। আর ৩১ মে তারিখে পি-ি এক হোটেলে দায়িত্ববান ও আদর্শনিষ্ঠ আগ্রণী সাংবাদিককে হারিয়েছে তা-ই নয়, দেশের একজন বড় অভিভাবককেও হারিয়েছে।
বাংলাদেশের সাংবাদিকতার ইতিহাসে এরকম নির্ভীক সাংবাদিক বিরল। পূর্ববাংলার ভাগ্য বিড়ম্বিত মানুষের দু:সময়ের এই সাহসী ‘মোসাফির’ যে আলোর রশ্মি জ্বালিয়েছিলেন তা ছিল বাচার সংগ্রামে এক আন্তহীন প্রেরণা।

Share This Article
Leave a Comment