মো.কামাল উদ্দিনঃ
প্রত্যেক মানুষের জীবনে কিছু সময় থাকে যা মনে রাখার মতো। আবার কিছু মুহূর্ত থাকে, যা শুধু মনে রাখলেই হয় না, হৃদয়ের গহীনে তা জায়গা করে নেয়। এমনই এক অবিস্মরণীয় মুহূর্তের সাক্ষী হয়ে রইল চট্টগ্রামের জেলা প্রশাসন পরিবার—যেখানে বিদায় সংবর্ধনায় সম্মানিত হলেন একজন সৎ, নির্মোহ, নিঃস্বার্থ, নিষ্ঠাবান কর্মপ্রাণ মানুষ, আমাদের আপন ইউনুস ভাই। জীবনের শেষ কর্মদিবসে এমন সম্মাননা পাওয়া কেবল একজন সৌভাগ্যবান মানুষের জন্যই নয়, বরং একটি প্রতিষ্ঠানের সুস্থ ও মানবিক চেতনারও বহিঃপ্রকাশ। এই বিদায় শুধুই আনুষ্ঠানিকতা ছিল না, এটি ছিল ভালোবাসার স্বীকৃতি, কর্তব্যপরায়ণতার প্রতি এক অমূল্য শ্রদ্ধার্ঘ্য। প্রথার পরিবর্তনে নতুন ধারা-প্রশাসনের প্রথাগত পদ্ধতিতে এক সময় অবসরপ্রাপ্ত কর্মচারীদের বিদায় জানানো হতো নির্দিষ্ট শাখার ছোট্ট কোনো আনুষ্ঠানিকতায়। এতে সবার উপস্থিতি যেমন নিশ্চিত হতো না, তেমনি অবদানের স্বীকৃতিও অনেকাংশে সীমিত থেকে যেত। কিন্তু সময়ের বিবর্তনে, চিন্তার পরিসরে এবং মননের প্রসারে এই প্রথার মাঝে নতুন চিন্তার সঞ্চার ঘটলো। স্টাফ রিভিউ সভায় যখন বিষয়টি আলোচিত হয়, তখন তৎকালীন জেলা প্রশাসক মহোদয় পুরো প্রশাসনিক কাঠামোকে সম্পৃক্ত করে সম্মিলিতভাবে বিদায় সংবর্ধনার আয়োজনের সিদ্ধান্ত দেন। এই সূচনাই হয়ে ওঠে একটি শুভ প্রবণতার সূচনা। হ্যাঁ, মাঝপথে নানা জটিলতায় হয়তো এই যাত্রা কিছু সময় থেমে গেছে। তবে ইউনুস ভাইয়ের বিদায় লগ্নে সেই থেমে থাকা পথে আবার আলো ফুটলো। থেমে থাকা কালো মেঘ সরে গিয়ে যেন উঁকি দিল আলোকোজ্জ্বল সূর্য।একটি আলোকোজ্জ্বল বিকেল মঙ্গলবারের সেই বিকেল ছিল অভাবনীয়, আবেগপূর্ণ, হৃদয়গ্রাহী। চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের স্নিগ্ধ পরিবেশে আয়োজন করা হয়েছিল একটি সংবেদনশীল, শৃঙ্খলাপূর্ণ বিদায় সংবর্ধনার। নেতৃত্বে ছিলেন স্বয়ং জেলা প্রশাসক ও বিজ্ঞ জেলা ম্যাজিস্ট্রেট জনাবা ফরিদা খানম, যিনি তাঁর মমতাময় দৃষ্টিভঙ্গি, সুসংগঠিত নির্দেশনা এবং সহযোগিতার মাধ্যমে এই বিদায় অনুষ্ঠানকে শুধু আনুষ্ঠানিকতা নয়—একটি আবেগময় মানবিক চিত্রে রূপ দিয়েছেন। সাথে ছিলেন উপ-পরিচালক স্থানীয় সরকার বিভাগের জনাব নোমান হোসেন, অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (সার্বিক) জনাব মো. কামরুজ্জামান, অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট জনাব সৈয়দ মাহবুবুল হক এবং সিনিয়র সহকারী কমিশনার, এনডিসি ও অন্যান্য কর্মকর্তারা। তারা সবাই উপস্থিত হয়ে এই বিদায়ী মুহূর্তকে আলোকিত করে তুলেছেন তাদের দোয়া, ভালোবাসা, আর প্রেরণাদায়ী বক্তব্য দিয়ে।ইউনুস ভাই: কর্মনিষ্ঠার প্রতীক-ইউনুস ভাই শুধু একজন সরকারি কর্মকর্তা ছিলেন না—তিনি ছিলেন কর্তব্যের এক অবিচল সেবক। কোনো কৃতিত্বের পেছনে তিনি কখনোই নিজেকে তুলে ধরেননি। তাঁর জীবন ছিল মাটি ও মানুষের সাথে নিবিড়ভাবে যুক্ত। প্রশাসনের নানা সংকটময় সময়ে, নানা প্রয়োজনে তাঁকে আমরা দেখেছি নির্লিপ্তভাবে কাজ করে যেতে। তিনি ছিলেন দৃশ্যপটের পেছনের নায়ক, যাঁর নীরব শ্রমেই গড়ে উঠেছে অনেক সাফল্যের ভিত। এই সংবর্ধনা তাই নিছক কোনো অনুষ্ঠান ছিল না, ছিল কাজের স্বীকৃতি, সততার পুরস্কার, একজন মানুষের নীরব অবদানের প্রতি সমাজের কৃতজ্ঞতা। ইউনুস ভাইয়ের চোখে যেমন অশ্রু ছিল, তেমনি সহকর্মীদের চোখেও ছিল ভালোবাসার জল। কর্মজীবনের এমন বিদায় অনেকেই চান, কিন্তু সবাই পান না। ইউনুস ভাই পেয়েছেন, কারণ তিনি সে প্রাপ্যতার যোগ্য ছিলেন।
জেলা প্রশাসক ফরিদা খানম: নেতৃত্বের মহিমা-প্রশাসনের নেতৃত্বে যখন থাকে দূরদৃষ্টি, মানবিকতা ও শৃঙ্খলা, তখনই সে প্রতিষ্ঠান হয় উদাহরণ। ফরিদা খানম স্যার সেই নেতৃত্বের একটি উজ্জ্বল নাম। তিনি শুধু একটি অনুষ্ঠানের নির্দেশ দেননি, তিনি একজন সহকর্মীর বিদায়কে জীবনের পরম প্রাপ্তিতে রূপান্তর করেছেন। তাঁর মুখে ছিল সম্মান, অন্তরে ছিল কৃতজ্ঞতা। অধীনস্থদের প্রতি ছিল অগাধ বিশ্বাস, ভালোবাসা ও স্নেহ। এই বিশ্বাস আর স্নেহই ইউনুস ভাইয়ের মুখে এনে দিয়েছে অভিব্যক্তির স্বাধীনতা, ভালোবাসার বহিঃপ্রকাশ। জেলা প্রশাসকের এমন উদ্যোগ শুধু ইউনুস ভাইয়ের জন্য নয়, আমাদের সকলের জন্য এক অনুপ্রেরণা। এটা আমাদের শেখায়—কাজের শেষদিনেও আপনি পেতে পারেন সম্মান, যদি আপনার পথ থাকে সোজা, মন থাকে নির্মল। বিদায় মানেই সমাপ্তি নয়-ইউনুস ভাইয়ের এই বিদায় বেলায় আমরা উপলব্ধি করি, জীবনের প্রতিটি অধ্যায়ই একেকটি গল্প। এই গল্পের নায়ক যেমন কর্মে, তেমনি ব্যবহারে। তাঁর বিদায় আমাদের শিখিয়েছে—যদি আপনি সততার সঙ্গে কাজ করে যান, সময়মতো দায়িত্ব পালন করেন, তাহলে আপনার বিদায় শুধু ‘শেষ’ নয়, সেটি হবে ‘স্মরণীয় সমাপ্তি’। আজকে যখন তিনি বললেন, “আলহামদুলিল্লাহ, আমি কৃতজ্ঞ”—তখন মনে হচ্ছিল, এ যেন কেবল তাঁর নয়, আমাদের সবার কণ্ঠস্বর। একজন নির্মোহ, নির্লিপ্ত মানুষকে সম্মান জানাতে পেরে আমরা নিজেরাও ধন্য। ভালোবাসা ছুঁয়ে থাকুক-আমরা জানি, আগামী দিনে ইউনুস ভাই নতুন অধ্যায়ের দিকে এগিয়ে যাবেন, হয়তো আর প্রশাসনিক ভবনের চেনা করিডোরে দেখা হবে না, কিন্তু তাঁর কর্ম, চরিত্র, ও ভালোবাসা থাকবে আমাদের সকলের হৃদয়ে। তাঁর মতো কর্মীর বিদায় আমাদের সকলকে মনে করিয়ে দেয়, প্রতিটি কাজেরই মূল্য আছে, প্রতিটি অবদানেরই স্বীকৃতি আছে, যদি নেতৃত্বে থাকে দূরদৃষ্টি আর সহকর্মীদের মধ্যে থাকে হৃদ্যতা।শুভ কামনা ইউনুস ভাই, আপনার জীবনের এই নতুন অধ্যায় হোক আরও আনন্দময়, শান্তিময় ও সার্থক।