মো.কামাল উদ্দিনঃ
পৃথিবীতে যত শব্দ উচ্চারিত হয়, তার মধ্যে সবচেয়ে মধুর, সবচেয়ে কোমল এবং সবচেয়ে পবিত্র শব্দটি নিঃসন্দেহে “মা”। এ এক এমন শব্দ, যার উচ্চারণে জেগে ওঠে অদ্ভুত এক কোমলতা, যার গভীরতা মাপা যায় না কোনও মানদণ্ডে, যার ভালবাসা বিশ্লেষণ করা যায় না কোনও যুক্তির পরিমাপে। কবির ভাষায়,
“মা কথাটি ছোট্ট অতি, কিন্তু যেন ভাই
ইহার চেয়ে নাম যে মধুর ত্রিভুবনে নাই।”
পৃথিবীর প্রতিটি মাকে শ্রদ্ধা জানানোর জন্য প্রতিবছর মে মাসের দ্বিতীয় রবিবার পালিত হয় আন্তর্জাতিক মা দিবস—একটি দিন, যা উৎসর্গ করা হয় সেই নারীর প্রতি, যিনি আমাদের পৃথিবীতে নিয়ে এসেছেন নিঃস্বার্থ মমতার ছায়ায়।
এই বিশেষ দিবসটির সূচনায় যাঁর নাম অনাড়ম্বর শ্রদ্ধায় উচ্চারণযোগ্য, তিনি হলেন অ্যানা মেরি জারভিস—এক মহীয়সী নারী, যাঁর একাগ্রতা, আদর্শ এবং গভীর ভালোবাসা আমাদের উপহার দিয়েছে মা’দের সম্মানের জন্য একটি আন্তর্জাতিক দিন।
অ্যানা জারভিস: মা দিবসের প্রবর্তিকা
১৮৬৪ সালের ১লা মে, আমেরিকার ওয়েস্ট ভার্জিনিয়ার ওয়েবস্টার শহরে জন্মগ্রহণ করেন অ্যানা জারভিস। এগারো ভাইবোনের মধ্যে তিনি ছিলেন নবম। তাঁর মা অ্যান রিভস জারভিস ছিলেন এক মানবতাবাদী, যিনি জীবিত ও মৃত মা’দের স্মরণে একটি স্মৃতিচিহ্ন গড়ে তোলার স্বপ্ন দেখতেন। সেই স্বপ্নের বাস্তবায়নে তিনি ১৮৬৫ সালে ‘মাদার ফ্রেন্ডশিপ ডে’ চালু করেন, যা পরে স্থানীয় একটি বার্ষিক উৎসবে পরিণত হয়।
মা মারা যাওয়ার পর ১৯০৭ সালে, মায়ের দ্বিতীয় মৃত্যুবার্ষিকীতে অ্যানা তাঁর স্মরণে ছোট একটি অনুষ্ঠানের আয়োজন করেন। সেখান থেকেই তাঁর ভিতরে জন্ম নেয় এক অদম্য সংকল্প—বিশ্বজুড়ে মা’দের জন্য একটি সম্মানসূচক দিবস প্রতিষ্ঠার। শুরু হয় তাঁর প্রচারযাত্রা। নানা জায়গায় চিঠি, বক্তৃতা, অনুরোধ—এককালের নিঃসঙ্গ মেয়ে অ্যানা হয়ে ওঠেন লক্ষ মানুষের আশা।
১৯১৪ সালে মার্কিন প্রেসিডেন্ট উড্রো উইলসন একটি ঐতিহাসিক ঘোষণা দেন—মে মাসের দ্বিতীয় রবিবার জাতীয় মা দিবস হিসেবে পালন করা হবে। সেদিন থেকে শুরু করে আজ পর্যন্ত, মা দিবস পালিত হয় সারা বিশ্বে।
তবু অ্যানার হতাশা
তবে দুর্ভাগ্যজনক হলেও সত্য, এই দিবসটির অন্তর্নিহিত আবেগ যখন পুঁজিবাদের রঙে বিবর্ণ হয়ে পড়ল, তখন অ্যানা জারভিস কেঁদে ফেললেন মনের গভীরে। এক সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন, “আমি দুঃখিত যে আমি এই দিবসটি প্রতিষ্ঠা করেছি।” তিনি চেয়েছিলেন হৃদয়ের গভীর থেকে মা’কে স্মরণ—না যে একগুচ্ছ ফুল বা চকচকে কার্ডে আবদ্ধ ভালোবাসা।
আমার মা—আমার পৃথিবী
এই লেখার প্রতিটি শব্দ লিখতে লিখতে আমার হৃদয় ভারাক্রান্ত হয়ে উঠছে। আমার মা—যাঁর কোল ছিল পৃথিবীর সবচেয়ে নিরাপদ আশ্রয়—আজ নেই। সাত কন্যার পর আমার জন্ম, তাই মা আমাকে নিয়ে আরও বেশি আশঙ্কা, আরও বেশি স্নেহে জড়িয়েছিলেন। কিন্তু ভাগ্যের নিষ্ঠুর খেলায় আমার ছোট ভাইয়ের হারিয়ে যাওয়া মায়ের হৃদয়ে যে শূন্যতা তৈরি করেছিল, তা তাঁকে মানসিকভাবে অসুস্থ করে তোলে। ২০০১ সালের ২ আগস্ট সেই অপার মমতার প্রতিমূর্তি আমাদের ছেড়ে চলে গেলেন চিরতরে।
তাঁর হাতের ছোঁয়া, চোখের চাহনি, আর নামাজ শেষে ডাকা দোয়ার শব্দ—সবকিছুই যেন এখনও বাতাসে ভেসে আসে। আমি জানি, এমন ভালোবাসা আর কোনও মানুষ দিতে পারবে না।
মা ও মহামানবেরা
বিশ্ব ইতিহাসে অনেক মহাপুরুষ তাঁদের সাফল্যের পেছনে যাঁর অবদান সর্বাধিক বলে স্বীকার করেছেন, তিনি হলেন তাঁদের মা। আব্রাহাম লিংকন বলেছিলেন: “আমি যা হয়েছি বা হতে চাই, তার সবটুকুর জন্যই আমি আমার মায়ের কাছে ঋণী।”জর্জ ওয়াশিংটন বলতেন: “সবচেয়ে সুন্দর নারী আমার মা। আমি তাঁর কাছেই ঋণী আমার সবকিছুর জন্য।”বালজাক বলেছিলেন: “মায়ের হৃদয় এক বিশাল আশ্রয়, যেখানে ক্ষমা ও ভালবাসার অনন্ত ছায়া পাওয়া যায়।”মার্ক টোয়েন তাঁর মাকে ছোটখাটো নারী বললেও বলেছিলেন, তাঁর হৃদয়ে স্থান পায় সব আনন্দ আর দুঃখ।
এমনকি ইতিহাসের কৌতুকময় কিছু মায়ের কথাও উল্লেখ করা যায়, যেমন—নেপোলিয়নের মা বলতেন: “রেজাল্ট কার্ড যদি জ্যাকেটের ভেতর লুকাও, কাজের মধ্যে দেখাও তুমি কী শিখেছ।”কলম্বাসের মা আফসোস করে বলেছিলেন: “তুমি আমেরিকা আবিষ্কার করলে, কিন্তু আমায় চিঠি লিখলে না?”এডিসনের মা বলতেন: “ইলেক্ট্রিক বাতির আবিষ্কার হয়েছে ঠিকই, কিন্তু এখন ঘুমাতে যাও, বেটা।”
বিশ্ব মা দিবস যেন শুধু একটি দিবসেই সীমাবদ্ধ না থাকে—বরং প্রতিটি দিনের হৃদয়হরণকারী প্রার্থনায় মা’কে স্মরণ করি আমরা। কারণ, মা হচ্ছেন সেই নীরব ছায়া, যে দুঃখে পাশে থাকেন, আনন্দে সরে দাঁড়ান।
এই মা দিবসে আমার প্রিয় মা-কে, আপনাদের মা-কে এবং পৃথিবীর প্রতিটি মাকে জানাই বিনম্র শ্রদ্ধা, অফুরন্ত ভালোবাসা।
“মা, তুমি আকাশের মতো, তোমার কোনও শেষ নেই।
তুমি মাটির মতো, তোমার বুক সবকিছু ধারণ করে।
তুমি শুধু মা নও—তুমি মহাবিশ্বের প্রথম প্রেম।”