“বাবা নয়, নরপশুকে খুন করেছি” — এক মেয়ের আর্তনাদ আর সমাজের আয়না”‘

3 Min Read

মো.কামাল উদ্দিনঃ
৯৯৯ নম্বরে ফোন করে যখন এক তরুণী বললেন—”আমি আমার বাবাকে খুন করেছি, আমাকে ধরে নিয়ে যান”—তখন নিশ্চয়ই অপারেটর থমকে গিয়েছিলেন কিছুটা। কিন্তু ঘটনার গভীরে যে ভয়াবহ বাস্তবতা লুকিয়ে ছিল, তা শুনে স্তব্ধ হয়ে যাবে যে কেউ। এই সমাজ, এই রাষ্ট্রব্যবস্থা, এই পরিবার নামের কাঠামো—সব কিছুকে প্রশ্নবিদ্ধ করে দিল সাভারের এই একটিমাত্র ঘটনা।
ঘটনাটি ঘটেছে ঢাকার সাভার পৌর এলাকার মজিদপুরে। ৫৫ বছর বয়সী আব্দুস সাত্তার, নাটোরের সিংড়ার বাসিন্দা, স্ত্রী মারা যাওয়ার পর একমাত্র মেয়ে জান্নাতুল জাহান শিফাকে নিয়ে সেখানে বসবাস করছিলেন। শুনতে এ পর্যন্ত কিছুই অস্বাভাবিক নয়। কিন্তু অস্বাভাবিকতা শুরু হয় যখন জানা যায়, এই বাবা গত চার বছর ধরে নিজের মেয়েকে নিয়মিত ধর্ষণ করে আসছিলেন।
বাবা! যে শব্দটায় ভরসা থাকে, আশ্রয় থাকে, নিরাপত্তা থাকে, সেই শব্দটিই এখানে হয়ে উঠেছে ভয়, আতঙ্ক আর হিংস্রতার প্রতিচ্ছবি।
২০২২ সালে শিফা নিজেই নাটোরের সিংড়া থানায় বাবার বিরুদ্ধে ধর্ষণ মামলা দায়ের করেন। কিন্তু সেই নরপশু জামিনে বেরিয়ে আবার মেয়ের ঘরে ফিরে আসে। আর তার সঙ্গে ফের ফিরে আসে ভয়াবহ রাতগুলোর দুঃসহ স্মৃতি।
শেষ পর্যন্ত, এক রাত। আর না। শিফা সিদ্ধান্ত নেন—এই কলঙ্ককে আর বাঁচিয়ে রাখা নয়। খাবারে মিশিয়ে দেন ২০টি ঘুমের ওষুধ।
ভোররাতে, ঘুমন্ত অবস্থায়, ধারালো অস্ত্র দিয়ে কুপিয়ে ‘বাবা’ নামের সেই অমানুষটিকে হত্যা করেন।
হ্যাঁ, এটা হত্যা। কিন্তু এর আগে সমাজ কী করেছে এই মেয়ের জন্য? রাষ্ট্র, পরিবার, প্রতিবেশী—কারো কাছে কি সে নিরাপদ ছিল?
হত্যার পর সে পালিয়ে যায়নি।
সে ফোন করেছিল ৯৯৯ নম্বরে। গলায় কাঁপা কাঁপা স্বর, তবুও এক দৃঢ় উচ্চারণ—
“আমি খুন করেছি। আমাকে ধরে নিয়ে যান। আমি একজন নরপশুকে শেষ করেছি।” এই ভয়ংকর কাহিনি যেন এক পাঁজর কাঁপানো ঝড়। আমাদের বিবেক, নৈতিকতা, সমাজব্যবস্থা—সবকিছুকে প্রশ্নবিদ্ধ করে সে ঝড়।
নিজের মেয়েকে বছরের পর বছর ধরে ধর্ষণ করে কীভাবে একজন মানুষ নিজেকে বাবা দাবি করতে পারে?
এই কি আমাদের সমাজ? যেখানে নারীর শরীর শুধু ভোগের বস্তু, যেখানে কন্যা সন্তানও রক্ষা পায় না জন্মদাতার হাত থেকে?
আজ শিফা খুনি। কিন্তু প্রশ্ন থেকে যায়—খুন করেছে কাকে? বাবা না পশুকে? মানুষ না রাক্ষসকে?
এই হত্যার দায় কি একা শিফার, নাকি এই রাষ্ট্র ও সমাজেরও, যারা চোখ বন্ধ করে রেখেছে এতদিন?
শিফার কাণ্ডজ্ঞান, আত্মসমর্পণ আর স্বীকারোক্তি আমাদের সামনে এক নারীর আত্মরক্ষার করুণ প্রতিবাদ। সে দোষী, কিন্তু একাই কি?
এই ঘটনা আমাদের ভাবায়—আর কতদিন আমরা মুখ ফিরিয়ে থাকব?
আর কত ‘বাবা’ নামের কলঙ্ক সমাজে ঘুরে বেড়াবে?
আর কত শিফা চুপ করে সহ্য করবে, আর শেষমেশ হয়ে উঠবে ‘খুনি’?
এই কলাম তাদের জন্য—যারা নিজের ঘরে এখনও বাবার ভয়ংকর ছায়া দেখে।
এই কলাম সমাজের সেই স্তম্ভদের জন্য—যারা বলেছিলেন, “বাপের ঘরেই মেয়েরা সবচেয়ে নিরাপদ”।
না, সত্যি নয়। প্রতিরোধের ভাষা যদি আইন না দেয়, তবে হয়তো একদিন আরেকজন শিফা আবার হাতে তুলে নেবে ন্যায়বিচারের ছুরি।
আমরা কি তবে অপেক্ষা করব, আরও একটি খুনের জন্য? না কি এবার জেগে উঠবে এই বিবেকশূন্য সমাজ?

Share This Article
Leave a Comment