আত্মপ্রতিবাদের আগুনে দীপ্ত এক তরুণ: ইকবাল হোসেন জিকুর প্রতিকৃতি”

3 Min Read

রাইসা আকতারঃ
সে এক তরুণ, যাকে সহজভাবে চিনে ফেলা যেত না চোখের দৃষ্টিতে, তাকে বুঝতে হতো মন দিয়ে। তার নাম ইকবাল হোসেন জিকু—জ্বলন্ত এক নাম, যেখান থেকে নিরবধি উঠেছে প্রতিবাদের ধোঁয়া, ন্যায়ের দাবিতে জ্বলে উঠেছে আত্মার আগুন। সে কখনও প্রচলিত রাজনীতির খাঁচায় বন্দী হয়নি। নিজের দলের রঙে রঙিন হওয়ার চেয়ে, সে আপন অন্তরের রঙে নিজেকে রাঙিয়েছে—যেখানে ছিল বিবেক, সাহস আর নির্মোহ আত্মসমালোচনার স্বাক্ষর। জিকু দলীয় অনুশাসনের ভেতর থেকেও ছিল এক অদ্ভুত ব্যতিক্রম—কারণ সে যে ছিল নিজের দলেরই ভেতরে এক বিরোধী শক্তি, অন্যায়ের বিরুদ্ধে আপসহীন কণ্ঠ।
তার রাজনীতি ছিল আত্মসংগ্রামের মতো—প্রতিদিন নিজের সত্তার ভেতরে, নিজের নীরব সংশয়ের বিরুদ্ধে, নিজের ভয় আর নিরাপত্তার পেছনে লুকিয়ে থাকা কণ্ঠের বিরুদ্ধে যুদ্ধ। জিকু সেই মানুষ, যে দিনের আলোর মতো স্বচ্ছ ও রাতের নিস্তব্ধতার মতো গভীর। সে কখনও চিৎকার করেনি, তবুও তার প্রতিবাদের প্রতিধ্বনি ছড়িয়ে পড়েছে—মহোরার বাতাসে, মানুষের মগজে, সমাজের নিস্তব্ধ নৈতিকতায়।
যখন নিজের দলের নেতাকর্মীরা ক্ষমতার মোহে অন্ধ হয়ে অন্যায়ের বীজ বুনছিল এলাকায়, তখন জিকু একাই দাঁড়িয়েছিল। সে জানত, এই দাঁড়ানো মানেই নিজেকে ঝুঁকির মধ্যে ফেলা, কিন্তু তার নৈতিক সাহস তাকে বাধা দেয়নি। যখন বাকি সবাই চুপ থাকে, তখন একজন জিকুর মতো মানুষই হয়ে ওঠে আগুনের ফুলকি—একটুকরো প্রতিবাদের অনল।
১/১১ সেনাশাসিত অস্থিরতার সময়, অন্যায়ের মুখে দাঁড়িয়ে থাকার অপরাধেই তাকে গ্রেফতার করা হয়। তার বিরুদ্ধে কোনও মামলা ছিল না, কোনও প্রমাণ ছিল না, কিন্তু কারাগারের অন্ধকার তাকে শোষণ করেছে দিনের পর দিন। মুক্তি পেলেও সে পেয়েছিল এক বন্দিত্বহীন বন্দিত্ব—আপন দলীয় গোষ্ঠীর হিংস্র ছায়া আর সমাজের কৌতূহলী নীরবতা তাকে গ্রাস করে নিয়েছিল।
তার জীবন যেন এক দীর্ঘ যুদ্ধের নাম, যেখানে অস্ত্র ছিল না—ছিল কেবল শব্দের সাহস, বিবেকের দৃঢ়তা। এমন মানুষ রাজনীতির ধুলোমলিন পথে হেঁটে না—তারা হাঁটে আগুনের পথ বেয়ে। তারা দাগ রেখে যায় হৃদয়ে, ইতিহাসে, সমাজের বিবেকবর্জিত কোণে।
জিকু ছিল অপরাধীদের আতঙ্ক, কারণ সে কিনে নেয়নি নীরবতা। সে উচ্চারণ করেছিল সেই শব্দ, যা সমাজের মুখে তালা পড়ে থাকলেও হৃদয়ে কাঁপন তোলে। তার কণ্ঠস্বর আজও প্রতিধ্বনিত হয়—যেন বাতাসেও ফিসফিস করে উঠে, “অপরাধের বিরুদ্ধে কথা বলাই কি আমার অপরাধ ছিল?”
এই প্রশ্ন কোনো একক প্রশ্ন নয়। এটি এক প্রজন্মের প্রশ্ন, এক দেশের আত্মার প্রশ্ন। এই প্রশ্ন ইতিহাসের পাতায়, ভবিষ্যতের চিহ্নে বেঁচে থাকবে। এবং যতদিন অন্যায়ের বিরুদ্ধে কথা বলবে কেউ, ততদিন ইকবাল হোসেন জিকুর মতো মানুষের গল্প হবে তাদের অনুপ্রেরণা।
জিকু আমাদের স্মৃতির দরজায় কড়া নাড়ে—যেন বলতে চায়, সাহসীরা মরেন না, তারা ছড়িয়ে পড়েন বাতাসে, সময়ের শিরায় শিরায়। আজ যখন সত্যের উচ্চারণ দুর্লভ হয়ে উঠেছে, তখন এক জিকু হয়ে ওঠে সাহসের প্রতীক।

Share This Article
Leave a Comment